আরেক ইয়োহানের কথা

সর্বজয়ী আয়াক্স আমস্টারডামের দলের হয়ে শিরোপাবিধৌত পাঁচ বছর কাটানোর পরে স্প্যানিশ সুপারক্লাব বার্সেলোনাতে যখন যোগ দিলেন, সমর্থকেরা আদর করে তাঁকে ডাকা শুরু করলেন “ইয়োহান সেগোন” যার অর্থ “দ্বিতীয় ইয়োহান” নামে। এ প্রসঙ্গে তাঁকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় যে কিরকম লাগে দ্বিতীয় ইয়োহান হিসেবে পরিচিত হতে, হাস্যোজ্জ্বল মুখে জবাব দিয়েছিলেন “আমার বিশ্বের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠতম খেলোয়াড় হতে কোন সমস্যা নেই!”

ইয়োহান নিসকেন্সের কথা বলছি। ১৯৭১ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত সর্বজয়ী আয়াক্স দলের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি যিনি ছিলেন, সুপারস্টার ইয়োহান ক্রুইফের পাশাপাশি। টোটাল ফুটবলের পুরোধা বলতেই আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলেই একবাক্যে ইয়োহান ক্রুইফের নাম বললেও নিসকেন্সের মত খেলোয়াড়েরা ক্রুইফের পাশে না থাকলে আয়াক্সের টানা তিনবার ইউরোপিয়ান কাপও জেতা হত না, হয়তোবা ক্রুইফ নিজেও অতটা সুপারস্টারডম পেতেন না যতটা না তিনি পেয়েছেন। এটা যেমন ক্রুইফ নিজেও জানতেন, জানতেন আয়াক্সে টোটাল ফুটবলের আসল আবিষ্কর্তা, ক্রুইফ-নিসকেন্সদের গুরু কোচ রাইনাস মিশেলস। সে কারণেই আয়াক্স থেকে বার্সেলোনায় কোচ হয়ে যাওয়ার পর ক্রুইফের পাশাপাশি ঐ আয়াক্স দল থেকে শুধু নিসকেন্সকেই বার্সেলোনাতে নিয়ে এসেছিলেন রাইনাস মিশেলস, মিশেলস-ক্রুইফের শত বোঝানোর পর তবেই আয়াক্স থেকে বার্সেলোনায় নাম লিখিয়েছিলেন নিসকেন্স। অবশ্যই ক্রুইফ ও মিশেলস যেকোন দলে নিসকেন্সের গুরুত্বটা বুঝতেন!

অফুরন্ত প্রাণশক্তিতে ভরপুর, ষাট-সত্তরের দশকের রকস্টারদের মত চেহারা ও হেয়ারস্টাইলের এই খেলোয়াড়টা খেলতেন মিডফিল্ড পজিশানে, খুব সম্ভবত বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ড পজিশানের পুরোধাও যদি তাঁকে বলা হয় তাহলে অত্যুক্তি হবেনা। পুরো মাঠ দাপিয়ে বেড়াতেন, পজেশান হারালে নিমেষেই প্রতিপক্ষের পা থেকে ট্যাকল ইন্টারসেপ্ট করে বল নিয়ে আসতেন, এমনকি রাইনাস মিশেলস নিজেও চাইতেন তাঁর দলের ডেস্ট্রয়্যার হিসেবেই খেলুন নিসকেন্স। কিন্তু তাঁর নিজের মধ্যে শুধু ট্যাকল ইন্টারসেপ্ট করা ছাড়াও সামনে এগিয়ে গিয়ে ক্রুইফের সাথে আক্রমণ রচনা করার একটা স্বভাবজাত গুণ ছিল, মিডফিল্ডার হিসেবে নিজেও মাঝমাঠ থেকে গোল করেছেন প্রচুর। এ কারণেই শুধুমাত্র ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বা ডেস্ট্রয়্যারের গণ্ডিতে আটকে রাখা যাবেনা রাইটব্যাক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা এই মিডফিল্ডারকে। আজকের আর্তুরো ভিদাল, রাজ্জা নাইঙ্গোলান, ইয়ায়া ত্যুরে, ইলকায় গুন্ডোগান, মাইকেল বালাকদের আদর্শ ছিলেন এই নিসকেন্সই। ১৯৭০ সালে আয়াক্সে আসার পর মোটামুটি বছরখানেক রাইটব্যাক হিসেবেই খেলেছিলেন তিনি, এমনকি আয়াক্সের টানা তিন ইউরোপীয় শিরোপার প্রথমটার সময়েও রাইটব্যাক হিসেবেই খেলেছিলেন নিসকেন্স। সেখানেও দুর্দান্ত ছিলেন তিনি। ইঞ্জিনের মত মাঠের ডানপ্রান্তে উপর নিচে দৌড়িয়ে তটস্থ করে রাখতেন, তাঁর অফুরন্ত প্রাণশক্তি আর বল পায়ে অসাধারণ ক্ষমতার কারণে প্রতিপক্ষের জন্য অফসাইড ট্র্যাপ বানানোর কাজটা সহজ হত আয়াক্সের কিংবদন্তী সুইপার ভেলিবোর ভাসোভিচের জন্য।

পরে রাইনাস মিশেলস দেখলেন যে না, ছেলের বল পায়ে দুর্দান্ত পাস দেওয়ার ও আক্রমণে যাওয়ার যে ক্ষমতা, সেই ক্ষমতাকে রাইটব্যাকের গণ্ডিতে আটকে রাখলে চলবেনা। নিসকেন্সকে নিয়ে আসলেন মিডফিল্ডে। সেখানেও নিসকেন্সের ম্যাজিক চলতে থাকলো। এটা বলছিলাম একটু আগে, রাইনাস মিশেলস নিজেও চাইতেন তাঁর দলের ডেস্ট্রয়্যার হিসেবেই খেলুন নিসকেন্স। কিন্তু তাঁর নিজের মধ্যে শুধু ট্যাকল ইন্টারসেপ্ট করা ছাড়াও সামনে এগিয়ে গিয়ে ক্রুইফের সাথে আক্রমণ রচনা করার একটা স্বভাবজাত গুণ ছিল, মিডফিল্ডার হিসেবে নিজেও মাঝমাঠ থেকে গোল করেছেন প্রচুর। ফলে দেখা গেল পরবর্তীতে সামনে থাকা ক্রুইফের পেছনে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলছেন নিসকেন্স! পেছনে থেকে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়া, ক্রুইফের জন্য জায়গা সৃষ্টি করার যাবতীয় কাজ করতেন নিসকেন্স, ফলে ক্রুইফের জাদু দেখানোও সহজ হয়ে যেত! আরেক আয়াক্স কিংবদন্তী সতীর্থ শ্যাক সোয়ার্টের একটা কথাতেই নিসকেন্সের ভূমিকাটা স্পষ্ট হয়ে যাবে হল্যান্ড ও আয়াক্স দলে, “ও একাই দুইজন মিডফিল্ডারের কাজ করে দিত!”

বার্সায় সেরকম কিছু জেতেননি, কিন্তু তাতে তাঁর ইমেজে বিন্দুমাত্রও আঁচড় লাগেনি। সমর্থকদের কাছে অনেক পছন্দের খেলোয়াড় ছিলেন তিনি। কিন্তু বার্সা প্রেসিডেন্ট হোসেপ লুইজ নুনেজের সেরকম পছন্দের খেলোয়াড় ছিলেন না তিনি। ছয় বছরের বিশ্বস্ত মিডফিল্ড প্রহরীকে নুনেজ কিভাবে ক্লাব থেকে বের করেছিলেন সে কাহিনীটা জানেন? একদিন জেন্টস ওয়াশরুমে পাশাপাশি দুই চেম্বারে মূত্রত্যাগ করছিলেন নুনেজ আর নিসকেন্স। নুনেজের চেম্বারে টিস্যুপেপার শেষ হয়ে গিয়েছিল, তো তিনি পাশে থাকা নিসকেন্সের কাছ থেকে নিসকেন্সের চেম্বারের একটা টিস্যুপেপার চাইলেন। ফাজলামো করে নাকি অন্য কোন কারণে, প্রেসিডেন্টকে টিস্যুপেপার দেননি নিসকেন্স। ব্যস। পরের মৌসুমেই বার্সা থেকে নিসকেন্সের পত্রপাঠ বিদায়, আটলান্টিকের ওপারে নিউ ইয়র্ক কসমসে হয় তাঁর ঠিকানা!

১৯৭৪ ও ১৯৭৮ বিশ্বকাপের হল্যান্ড দলকে মানা হয় ইতিহাসের সবচাইতে হতভাগা দল, টোটাল ফুটবলের জনক হলেও বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ শিরোপাকে দুইবার ফাইনালে উঠেও ছুঁতে না পারার কারণে। প্রথমবার তো তাও ক্রুইফ ছিলেন, ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপে তিনিও ছিলেন না। সেবার হল্যান্ডকে ফাইনালের পথে নিয়ে গিয়েছিলেন এক নিসকেন্সই! আজকের ফুটবলে বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডারদের যে এত কদর, সেটা নিসকেন্সের মত ফুটবলাররা ছিলেন এ কারণেই।

জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

eleven − one =