এবার আসল পরীক্ষা মুস্তাফিজের

গেল এক দশকে ক্রিকেট যে আপাদমস্তক বদলটা দেখেছে , তার একটা প্রধান দিক অতি অবশ্যই খেলাটার ট্যাক্টিকাল এবং টেকনিকাল দিকটাতে আরো বেশি বেশি প্রযুক্তির আনাগোণা । আমার মনে আছে, ক্রিকেটের দুনিয়াতে ২০০০ এর পরের দিকে পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক কোচ বব উলমারের নামটা আলাদাভাবে নেওয়া হত তার প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকার ব্যাপারটাকে আমলে নিয়ে । আজ এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, এক যুগ পরে এসে বব উলমারের যুগের মত কারো নাম আর আলাদাভাবে নেওয়া হয় না । প্রত্যকটা দলের থিংকট্যাংকই আস্তে আস্তে এ জায়গাটায় প্রবেশ করার সুযোগটা পাচ্ছে ।

ছোট দৈর্ঘ্যের ক্রিকেট জনপ্রিয়তা পাওয়াতে ছোট ছোট টেকনিক্যাল ব্যাপারগুলো আলাদা করে গুরুত্ব পাচ্ছে । স্রেফ একটা ছোট উদাহরণ সামনে তুলে ধরি । আজ থেকে কয়েক বছর আগেও হক আই বা স্নিকো ছিলো ক্রিকেট টেলিকাস্টিং এর সর্বোচ্চ প্রযুক্তির নাম । সেখান থেকে ক্রিকেটে এখন চ্যানেলের ভিডিও এনালিস্টরা খেলা চলার সময়েই ভিরাট কোহলি বা স্টিভেন স্মিথের উইক জোন বা ভালো শট খেলার জোন দেখিয়ে দিচ্ছেন । তাহলে ভেবে দেখুন টেলিকাস্টিং চ্যানেলের এনালিস্টরাই এই লেভেলের এনালাইসিসে চলে যায় হুট করে , ক্রিকেট দলগুলোর থিংকট্যাংকের আরো উঁচু ক্রিকেটমস্তিষ্কসম্পন্ন লোকগুলো ঠিক কোন লেভেলের এনালাইসিসে যেতে পারে !

যেখানে আপনি খেলাতে বুনো আর বনেদী ভাবটা থাকাতে ৮০ আর ৯০ এর দশকের ব্যাটসম্যানদের এগিয়ে রাখবেন, অন্য জায়গায় আপনাকে আজকের কোহলি বা স্টিভ স্মিথকে এগিয়ে রাখতে হবে এতসব চুলচেরা বিশ্লেষণের পরেও ভালো পারফর্ম করে যাবার জন্যে । মুস্তাফিজ যখন আইপিএল খেলতে যায়, দেশের ক্রিকেটের আমজনতার মধ্যে একটা থিউরি খুব পপুলার হয়ে যায় । মুস্তাফিজ আরেক “এম” মেন্ডিসের মত হয়ে যাবে না তো ? এক এশিয়া কাপের ফাইনাল মাতানো মেন্ডিসকে কিছুদিন রিড করে শেবাগ কি পিটুনিটা পিটিয়েছিলেন সেটা ভুলে যাওয়া কঠিন । এই খেলাটায় শুধু মেন্ডিসই এরকম তালিকার প্রথম উদাহরণ নন । ব্রায়ান ভিতরি থেকে ইরফান পাঠান- সবার ক্ষেত্রেই গল্পের শুরুটা প্রবল গতিতে শুরু হয়েছিলো একদম কমার্শিয়াল ফিল্মের মতন । আর শেষটা আর্ট ফিল্মের মত বাস্তববাদী ম্যাড়মেড়েভাবে ।

২০১৬ তে এসে একটা জিনিস আপনাকে মানতেই হবে । ৮০-৯০ এর মতো একেকটা পেসারকে আপনি বছরে ২৫টা ম্যাচ খেলাতে পারবেন না । এক মাসেই ১০-১৫টা টিটোয়েন্টি খেলে ফেলে এই প্যাকেজের হট প্রপার্টি হয়ে গেলে । বিগ ব্যাশ, আইপিএল, সিপিএল, বিপিএল, ন্যাটওয়েস্ট টিটোয়েন্টি ব্লাস্ট, দক্ষিণ আফ্রিকার টিটোয়েন্টি লিগ আর সাথে জাতীয় দলের ম্যাচ । গেইল, ব্রাভো, পোলার্ড, ডোয়েন স্মিথদের মতো হট প্যাকেজদের মাসের ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো উল্টায় এদেশ থেকে অন্যদেশের ফ্লাইট ধরে । ক্রিকেটটা এখন আগের চাইতে অনেক বেশী গ্লোবালাইজড একটা খেলা । খেলোয়াড়েরা আগের চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলছেন , বেশি জায়গায় খেলছেন আর প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে আরো বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন ।

মুস্তাফিজের আইপিএলের শুরুটা হয়েছে প্রত্যাশার চেয়ে বড় ঝড় তুলে দিয়ে । কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের সাথে একটা ম্যাচে তো দেখলাম ওর বলে প্রত্যেকটা সিংগেল সেলিব্রেট করছে ব্যাটিং দল । সাথে সাথে উইকেটও আসছিলো নিয়ম করে । কিন্তু আগেই বলে রাখি , সে ম্যাচগুলোতে অমন কিছু দেখে যদি আপনি ভেবে থাকেন ফিজের পুরোটা টুর্নামেন্ট ওভাবেই যাবে , তাহলে আমি আপনাকে বলবো, এই খেলাটাতে আপনার জন্যে আরো অনেক সারপ্রাইজ আছে । আপনার জন্যে আছে এক সারপ্রাইজের ভাঁজে আরেকটা সারপ্রাইজ । পুনের সাথে একটা ম্যাচে অশ্বিন শাফল করে বেশ কয়েকটা ফ্লিক করলো মুস্তাফিজকে এবং কিছু রানও পেলো । সেদিনও ফিজের ইকোনোমিটা অসাধারণ মানুষের পর্যায়েই ছিলো । তবে তারপরে আরেকটা ম্যাচে ৪ ওভারে ৩৫ রান দিয়ে ফিজ প্রমাণ করেছিলেন , তিনিও মানুষ ।

মানুষ মুস্তাফিজের “না-মানুষ” বোলিং ফিগারগুলো আস্তে আস্তে আজ বা কাল “শুধু ভালো”র জায়গায় নেমে আসবে এটা জানাই ছিলো । তবে কবে আসবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন ছিলো । এবার বল কিন্তু মোস্তাফিজের কোর্টে । সময়টা এখন ব্যাসিক ঠিক রেখে নিজের সেরাটা মাঠে ডেলিভার করার । সময়টা এখন এটা নিশ্চিত করার অনেক ভালো মুস্তাফিজ যাতে ভালোর চাইতে নিচে কোনভাবেই না নামেন ! এ জায়গা থেকে যারা হারিয়ে যান , তারা নিজেদের ভালো সময়টা পার করে মাঝামাঝি সময়টায় ব্যাসিক ভুলে যান বলেই হারিয়ে যান । আর যারা নিজেদেরকে ক্যারিয়ার শেষে কিংবদন্তীদের কাতারে দেখতে চান, তারা নিজেদের রুট জায়গাটায় ঠিক থাকেন আর নিজের ভিতরে ভিতরে আগুন জ্বালিয়ে সেই জ্বালানি দিয়ে ইম্প্রোভাইজেশনের নতুন নতুন জায়গা বের করে আনেন । ডোয়েন ব্রাভোর বোলিং দেখে অবাক হয়েছি । স্রেফ ছোট ফরম্যাটটার জন্যে নিজের বোলিং এ কতোটা বদল এনে ফেলেছেন ! আব্রাহাম ডি ভিলিয়ার্স মডার্ন ক্রিকেটের সবচেয়ে ভার্সাটাইল ব্যাটসম্যান ঐ একই কারণেই । ব্যাসিকে থাকছেন আর সাথে সাথে নিজের শক্তির জায়গা বের করছেন । আর মাঠে গিয়ে সেই শক্তির জায়গাগুলো তুলে ধরে বিজয়ের ঝান্ডা নাচাচ্ছেন ।

স্লোয়ার কাটার কাজ না করলে ফুলটস বা হাফভলি দিলেই আত্মবিশ্বাসের বাজবে বারোটা । যতক্ষণ মূল কাজটা ফিজ ঠিকভাবে চালাতে পারবেন, ঠিক ততক্ষণ ম্যাজিক দেখানোর স্টেজটা নিজের হাতে পাবেন । তবে ম্যাজিকটা তো আর রোজ আসে না …
তাই স্টেজে দাঁড়িয়ে থাকার জন্যে ব্যাসিক কাজটা মুস্তাফিজের করতে হবে দ্রোণাচার্যের মত ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

12 + 16 =