উইকেটের পেছনে মুশফিকের বদলে লিটন : আশা ও সম্ভাবনা

মুশফিকুর রহিম – প্রায় ১১ বছর ধরে উইকেটের পেছনে আমাদের দলের অতন্দ্র প্রহরী। খালেদ মাসুদ পাইলটের পরে উইকেটরক্ষকের জায়গাটা একরকম পাকাপোক্তই করে রেখেছিলেন সব ফরম্যাটে। বলা হয়ে থাকে সময় যত বাড়ে মানুষের অভিজ্ঞতা ততই সমৃদ্ধ হয়, কমে আসে ভুলের পরিমাণ। তবে মুশফিকের ক্ষেত্রে কথাটি প্রায়শই ভুল প্রমাণিত হয়েই এসেছে।

প্রায় প্রত্যেক সিরিজেই তার করা ভুলের মাশুল দিতে হয়েছে দলকে। ওয়ানডেতে কোনোভাবে সামাল দেয়া গেলেও টেস্টে করা ভুলগুলো অনেক সময়ই আর সামাল দেয়া যায়নি। যার কারণে অনেকদিন ধরেই চলছিল তার সমালোচনা, কিন্তু বিকল্প না থাকায় ও মুশফিকের ব্যাটিং নৈপুণ্যের কারণে সেই আলোচনা থেমে গেছে নিমেষেই। কম টেস্ট খেলাও তার মধ্যে ছোট্ট একটা কারণ হয়েছিল। তবে ২০১৫ থেকে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের কারণে সমর্থক ও বিসিবির উচ্চ মহলের সব ফরম্যাটেই ভালো করার মত একটা বিশ্বাস জন্মে যায়। ওয়ানডেতে সেই প্রত্যাশা মিটলেও টেস্টে তা অধরাই থেকে যায়। যার ফলে “ডিফেন্সিভ ক্যাপ্টেন” হিসেবে সমালোচিত মুশফিকের অধিনায়কত্ব নিয়ে শুরু হয় সমালোচনা তার সাথে প্রশ্ন উঠে একইসাথে তার তিন দায়িত্ব সামলানো নিয়ে। সেই আগুনে ঘি ঢালে তার ক্যাচ মিস, স্টাম্পিং মিসের ব্যাপারগুলো। তবে ওই বছর তাকে অধিনায়কত্ব থেকে সরানোর আলোচনা বিসিবি সভাপতি উড়িয়ে দেয় যা এখনো পর্যন্ত বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু উইকেটরক্ষক এর জায়গা থেকে সরানোর দাবি ছিল সবসময়ই। মুশফিক শত সমালোচনায় তখন কান না দিয়ে বরাবরই সেই ভার টিম ম্যানেজমেন্ট এর উপর চাপিয়ে দিয়ে গেছেন। কিপিং না ছাড়ার পিছনে এবং তিন দায়িত্ব সামলানোর সমর্থনে উদাহরণ হিসেবে দিয়ে গেছে শ্রীলংকায় করা ডাবল সেঞ্চুরির ঘটনাটা। যেখানে তিনি দীর্ঘসময় ব্যাটিং এর পাশাপাশি করেছেন কিপিং ও ক্যাপ্টেনসি। তাকে সাঙ্গাকারার কিপিং ছাড়ার উদাহরণ দিয়েও ছাড়ানো যায়নি কিপিং। অতঃপর গত সিরিজে “স্কুলবয় মিসটেক” এর পর ধৈর্যচ্যুতি ঘটে সবার। ব্যাটসম্যান মুশফিক এর কাছ থেকে আরও বেশি করে সার্ভিস পাবার জন্য অনলাইন ও অফলাইনে চলে কিপিং ছাড়ার অনুরোধ। অবশেষে সেই অনুরোধে সাড়া দিয়ে শ্রীলংকা সিরিজের আগে গ্লাভসের ভার ছেড়ে দিলেন লিটন দাসের হাতে।

টেস্টে উইকেট সামলানোর দায়িত্ব এইবার লিটনের কাঁধে

লিটন দাসকে দলে আসার আগে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বলেই ধরা হতো। ঘরোয়া ক্রিকেটে ভুরি ভুরি রান করে টিমে নেয়ার আহবান জোরালো করতে থাকেন নিয়মিতই। ২০১৫ সালে পাকিস্তান সিরিজে ডাক পেলেও প্রথম খেলা হয় ভারতের সাথে টেস্টে, খেলেন সম্পূর্ণ দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজও। তবে প্রমাণ করতে পারছিলেন না নিজেকে। যার দরুণ বাদ পড়ে যান পরবর্তীতে। তবে ১ বছর পর আবার ডাক পান গত ভারত সিরিজে ব্যাকআপ কিপার হিসেবে। কিন্তু বহুদিন পর আবার গ্লাভস হাতে নেবার সুযোগ এর পাশাপাশি একাদশে ঢোকবারও পথ হয়ে যায় মুশফিকের কিপিং ছাড়ার ঘোষণায়। তাকে সুযোগ দেওয়ায় কিছু সমর্থক অখুশি হয় কারণ তারা নিউজিল্যান্ড টেস্টে কিপিং ও ব্যাটিং এ ভালো করা নুরুল হাসান সোহানকে দলে চেয়েছিল। তবে কিপিং এর সাথে ব্যাটিংটাই এগিয়ে দেয় লিটনকে। আর ঘরোয়ার সাম্প্রতিক পারফরমেন্সও ছিল তার পক্ষে। কয়েকমাস আগেই খেলেছেন ২১৭ রানের ইনিংস। এছাড়া প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে তার ব্যাটিং গড়ও রয়েছে ৫০ এর উপরে, সাথে রয়েছে ৯টি সেঞ্চুরি। আর আগেরবার ওয়ানডেতে তার পারফরমেন্স খারাপ থাকলেও টেস্টে তুলনামূলক ভালোই ছিল পারফরমেন্স। এছাড়া গত পরশু শ্রীলংকার সাথে প্রস্তুতি ম্যাচেও খেলেছেন অপরাজিত ৫৭ রানের ইনিংস। সবমিলিয়ে নির্বাচকদের তাকে নেয়ার সিদ্ধান্তটা যে সঠিক ছিল তা বলাই যায়। তবে লিটনকে খেলাতে গিয়ে হয়তো বাদ পড়তে হবে সাব্বিরকেই। তাই লিটনকে উইকেটের পিছন সামলানোর পাশাপাশি নিজেকে প্রমাণ করতে হবে উইকেটের সামনেও। সাব্বিরের মত ব্যাটসম্যানকে বাদ দেয়ার আলোচনা ভুলিয়ে দিতে হবে তার পারফরমেন্স দিয়েই। সেটা যে খুব একটা সহজ হবেনা তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

লিটনকে ব্যাটিংয়ে পূরণ করতে হবে সাব্বিরের অভাব
অতএব লিটনের উপর এবার অনেক দায়িত্ব, অনেক চাপও। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের প্রতিভার প্রদর্শন এখনো না দেখাতে পারলেও লিটনকে আজও ক্রিকেট মহলে এদেশের ভবিষ্যৎ এবং একজন ‘ক্লাসি ব্যাটসম্যান’ হিসেবেই দেখা হয়। এবার হয়তো নিজের প্রতিভার সম্পূর্ণ ব্যবহার না করতে পারলে দলে ফেরার দরজা অনেকদিনের জন্যই বন্ধ হয়ে যেতে পারে তার। তাই এবার পারবেন কি লিটন সব সমালোচনা ধুয়ে দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে? পারবেন কি দীর্ঘ সময়ের জন্য নিজেকে দলের অংশ করে রাখতে? উত্তরগুলো সময়ের হাতেই তুলে রাখলাম। সেই পর্যন্ত তার জন্য থাকলো আগাম শুভকামনা।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

three × one =