মুশির বীরত্ব

ইশান্ত শর্মার বলটা লেংথ থেকে আচমকা লাফিয়ে ছোবল দিল মুশফিকের আঙুলে। ব্যথার তীব্রতা বোঝা যাচ্ছিল যন্ত্রণাকাতর মুখটায় তাকিয়ে। ফিজিও এলেন, ম্যাজিক স্প্রের ছোঁয়া লাগল হাতে। এরপরই ম্যাজিক মোমেন্ট!

শরীর তাক করে ইশান্তের বাউন্সার, মুশফিকের সপাট পুল। টাইমিং পারফেক্ট হয়নি, যা হয়েছে তাতেই বাউন্ডারি। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, স্টেটমেন্ট দেওয়া হয়ে গেছে। একটা ম্যাসেজ। ভড়কে যাননি, গুটিয়ে যাননি। টেস্ট ক্রিকেট মেনস গেম। এখানে একজন ‘ম্যান’ দাঁড়িয়ে, ‘কিড’ নন। চ্যালেঞ্জ এসেছে, জবাব দিয়েছেন। আঘাত এসেছে, পাল্টা আঘাত হেনেছেন।

প্রতিপক্ষের শ্রদ্ধা, সম্মান সবচেয়ে বেশী আদায় করে নেওয়া যায় এমন বীরত্ব দেখিয়েই। ওয়েলিংটনে মুশি দেড়শ করেছেন প্রথম ইনিংসে। তাতে যতটা হয়েছে, নিশ্চিত থাকতে পরেন, তার চেয়ে বেশি সমীহ আদায় করে নিয়েছেন দ্বিতীয় ইনিংসে। ভাঙা আঙুল নিয়েও ব্যাট করতে নেমে। আজ প্রথম ৭৮ রানের প্রতিরোধে যতটা না হয়েছে, ওই শেষ বাউন্ডারিতে মুশি দিয়েছেন আরও বেশি শক্ত বার্তা।

মুশির আজকের ইনিংসটা আরেকটা বিশেষত্ব, বিভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া। সাকিবের সঙ্গে জুটিতে একরকম। সাব্বিরের সঙ্গে জুটিতে আরেকরকম। মিরাজের সঙ্গে আবার ভিন্ন। ৪৬ থেকে ৪৭ পর্যন্ত যেতে খেলেছেন ২০ বল। ষষ্ঠ বাউন্ডারির পর সপ্তম বাউন্ডারি মারতে লেগেছে ৬৬ বল। মিরাজের সঙ্গে ৮৭ রানের জুটি, মিরাজেই ৫১। সিনিয়র হয়েও সহকারী ভূমিকা নিয়েছেন সময়ের দাবী মিটিয়ে। আবার নিজের জোনে পেলে এমন সুইপ খেলেছেন যে ফিল্ডার একজনও নড়ার সময় পায়নি। আপার কাট খেলেছেন। ওই সাহসী পুল তো ছিলই।

আঙুলে লাগার পরের বলে বাউন্সারে ওই বাউন্ডারি। পরের বলটিও কিন্তু আবারও বাউন্সার করেছিলেন ইশান্ত। আরও গতিময়, হেলমেট তাক করে। এবার শট না খেলে ডাক করেছেন মুশি। আগের বলে পুল ছিল বীরত্ব, পরের বলেও খেলতে যাওয়া হতো বোকামি। মুশি মেরে জিতেছেন, ছেড়েও জিতেছেন।

পরিসংখ্যান রেকর্ডের পাতায় লেখা থাকে। প্রতিপক্ষের ড্রেসিং রুমে সবচেয়ে বেশি মর্যাদা পায় ‘গাটস।’ যাকে চ্যালেঞ্জ করলে পাল্টা চ্যালেঞ্জ আসে। ব্যাটসম্যান মুশি সেই সম্মানের জায়গাটায় ক্রমেই নিয়ে যাচ্ছেন নিজেকে।

মিরাজের ব্যাটিং নিয়ে শঙ্কা ছিল না, অপেক্ষায় ছিলাম। টেকনিক-টেম্পারামেন্টের ব্যাপার নয়, মাথায় আরেকটু পরিস্কার হওয়ার। চিন্তা-ভাবনার ঘিঞ্জি ভাবটা একটু আলগা হওয়ার। সময়, পারিপার্শ্বিকতা একটু পক্ষে আসার প্রয়োজন ছিল। দরকার ছিল একটা শুরু পাওয়ার। কনফিডেন্ট ১০-১৫ টা রান পেলেই সে ভালো করবে, জানতাম।

আজকে সেটাই হয়েছে। তৃতীয় বলেই ভালো একটা শট খেলেছেন, স্নায়ু নরম্যাল হয়েছে। দ্রুত ১৫ রান করেছেন। চাপটা সরেছে। এরপর সময় গড়িয়েছে, মিরাজ উপভোগ করেছেন। উমেশ যাদবের শর্ট বলে চার মেরেছেন। অশ্বিনের ক্যারম বলে চার মেরেছেন। অশ্বিনের বলেই বেরিয়ে এসে স্পিনের বিপক্ষে যে দুটি কাভার ড্রাইভ করেছেন, আমার মতে দিনের সেরা দুটি শট।

এই ইনিংসের পর থেকেই যে মিরাজ রানের বন্যা বইয়ে দিতে শুরু করবেন , সেই আশা করছি না। শরীরটা আরেকটু সুগঠিত হতে হবে। মাসল-রিস্ট আরেকটু শক্ত হওয়া চাই। টেকনিক-টেম্পারামেন্ট সময়ের সঙ্গে ভালো হবে আশা করি। কয়েক বছর পর হয়ত মিরাজের ব্যাটিং পুরোপুরি প্রস্ফটিত হবে। ততদিনে বোলিং আরও ভালো না হওয়ার কারণ নেই। পরিপূর্ণ একজন অলরাউন্ডারের প্রতিচ্ছবি এখনই দেখা যায়।

কালকের দিনের ছবিটা কেমন হতে পারে? ফলো অন এড়াতে আরও ১৬৬ রান চাই। কঠিন, খুব কঠিন। তবে অসম্ভব নয়। উইকেটে কালকে হয়ত স্পিন ধরবে, তবে স্পিন স্বর্গ নিশ্চয়ই হবে না। ফলো অন এড়ানো মানে কালকে দেড়-দুই সেশন ব্যাট করা। ভারতকে আবার ব্যাটিংয়ে নামাতে পারলে ম্যাচটাও বাঁচানো সম্ভব!

তবে এরকম কত শত দিনে আশার পাপড়ি ঝরে গেছে প্রভাতেই! কালকে ঘন্টাখানেকের মধ্যেই গুটিয়ে যেতে পারি আমরা। বা আরও কম সময়ে। এমনও হতে পারে, কাল চা-বিরতির ঘন্টাখানেক পর ম্যাচই শেষ!

অবাক হব না। খারাপ লাগবে অবশ্যই । এই টেস্টে ভারতেরই জেতার কথা ছিল। এখনও তা-ই। তার পরও হারলে খারাপ লাগবে। তার চেয়েও বেশি খারাপ লাগবে লড়াই ছাড়া হারলে। বোলিং-ফিল্ডিং যে হতাশাটা দিয়েছে প্রথম দুদিন। ব্যাটিংয়ে শুরুটাও। মুশফিক-মিরাজ স্বস্তি দিয়েছেন সেই জায়গাতেই। লড়াই!

স্বস্তি আর তৃপ্তি যদিও এক কথা নয়। স্বস্তি উবে যেতে পারে কালই। তৃপ্তির জন্য চাই শেষ দিন শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়াই!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

three − 2 =