ছোট্টো ডিনামাইটের এগিয়ে চলা! দ্যা স্যাভিয়রের এগিয়ে চলা !

চারপাশে এত এত ঘটনা ঘটে কোন স্পেশ্যাল ঘটনার ডেইট বা কোন স্পেশ্যাল প্লেয়ারের বার্থডে আলাদাভাবে মনে রাখা আসলে খুব কঠিন কাজ । এটাও ভুলে গিয়েছিলাম । কিন্তু ফেসবুক আছে তো ! নিউজফিডেই দেখলাম , আজকের দিনে ২০০৫ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে আমার দেখা সবচাইতে টেকনিকালি সাউন্ড ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম তার ইন্টারন্যাশনাল ক্যারিয়ার শুরু করেন । বেশিরভাগের শুরুটা ওয়ানডে দিয়ে হলেও মুশির শুরুটা হয় টেস্ট দিয়ে ।

অভিষেক টেস্টের ছোট মুশি
অভিষেক টেস্টের ছোট মুশি

হ্যাঁ ! ২০০৫ সালের ২৬ মে মুশফিকুর রহিম ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এওয়ে টেস্ট দিয়ে তার যাত্রা শুরু করেন । এটা ছিলো লর্ডস টেস্ট ! না , খালেদ মাসুদকে বাদ দিয়ে নয় , সলিড ব্যাটসম্যান হিসেবেই প্রথম দলে জায়গা পান মুশফিকুর রহিম । একই ম্যাচে দলে ছিলেন পাইলটও । অভিষেক টেস্টে এসে খুব সুখের অভিজ্ঞতা হয় নি মুশির । খেলা শেষ ৩ দিনেই ! মোট খেলা হয়েছে ১৯০ ওভারের কাছাকাছি । আর তাতে ? আমরা হেরেছিলাম ইনিংস ও ২৬১ রানে । দলে এসে বাংলাদেশকে ঠিক সে অবস্থায় পেয়েছিলেন , যখন পঞ্চম দিন সকাল পর্যন্ত খেলা গড়ালে আমরা বলি , “টেস্টটা মনে হয় শিখেই যাচ্ছি “… আর আজ তার অধিনায়কত্বে বাংলাদেশের টেস্ট দল এমন জায়গায় আছি ,যেখানে থেকে পঞ্চম দিন সকালে হারলে আমরা হাঁরেঁরেঁরেঁ করে উঠি , “টেস্ট খেলাটা আমাদের আর শেখা হলো না !”

210923

নতুন একটা জেনারেশনের প্রথম মশালবাহকের নাম মুশফিকুর রহিম যাকে ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে ফার্স্ট ক্লাস ডেব্যুর ৪ মাসের মাথায় খেলিয়ে দেওয়া হয় লর্ডস টেস্ট … যাকে পাখা মেলার আগেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো কঠিন যুদ্ধে । আমাদের অনেক দিন ধরে চলে আসা ক্রিকেট কালচারের আরেকজন এপিটোমের নাম মুশফিকুর রহিম । ভাগ্যিস মুশফিক অনেকের মত সিলেক্টর প্যানেলের এই এক্সপেরিমেন্ট নামক খেলার বল হয়ে অনেকদূর হারিয়ে যান নি ! মনে রাখবেন, কম বয়সে খেলা শুরু করার উদাহরণ হিসেবে শচীন টেন্ডুলকার যদি একটা সাফল্যের গল্প হয় , তাহলে বিফলতার স্টোরি আছে হাজার হাজার ! কিন্তু বিফলদের গল্প শোনার সময়টা এই নিষ্ঠুর পৃথিবী কোথায় পায় ? মুশফিকের গল্পটাও হতে পারত তালহা জুবায়েরের গল্প ।

এখনকার মুশফিককে নিয়ে অনেক কিছু এখন অনেকেই বলে । পিছের দিনগুলোর কথা সবাই মনে রাখে না । ঐ ছোট বয়সে অভিষেক হওয়ায় তার ক্যারিয়ারে প্রথম দিকে স্যাটেল হতে তার কি সমস্যা হয়েছিলো , সেটা কমবেশি আপনি আমি সবাই দেখেছি । হাতে শটগুলো ছিলো , কিন্তু সবসময় কেমন ভয়ে ভয়ে খেলত । প্রচুর টাইম নিত সেট হতে । আন্তর্জাতিক ক্রিকেটটা ও যতো খেললো , ততোই ওর আসল খেলাটা বেরোতে লাগলো । নির্ভরযোগ্যতা বাড়লো ! আর সবচেয়ে যেটা বেশি বাড়লো সেটা হলো … ওর কাউন্টার এটাক আর নেমেই ভালো শট খেলে চাপটা নিজেদের দিক থেকে সরিয়ে অপনেন্টের দিকে ঠেলে দেওয়া । বেশি আগে যেতে বলবো না ! পাকিস্তান সিরিজের প্রথম ম্যাচটাই দেখুন ! ম্যাচশেষে মুশিকে ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ দেওয়াতে দেখলাম অনেকেই অবাক হয়েছে । তবে আমি বলবো , আপনিও সেই দলে থাকলে আপনি এখনো ক্রিকেটের সিচুয়েশন মূল্যায়ন করতে শেখেন নি । স্লো রানরেট আর আর্লি উইকেট তারপরে নেমে যেভাবে উলটো মেরে পাকিস্তানিদের কলিজা ঠান্ডা করে দিলো , সত্যি বাংলাদেশি কারো কাছ থেকে অনেকদিন এমন দেখি নি ! স্যরি ! অনেকদিন না ! হবে কোনদিনই এমন দেখি নি ! উইকেটের চারদিকে এত দারুন দারুন শট সেদিন খেললো , আজহার আলীকে দেখলাম দিশা হারিয়ে উলট পালট বোলিং চেঞ্জ করছে । তামিমের ঐদিনের ইনিংসকে ছোটো করবো না । তবে ঐ খাদ থেকে টেনে তোলার লাইসেন্সটা মুশীই দিয়েছিলো ।

210935

একই কাজ মুশি করেছিলো বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সাথে খেলাটায় … ৮ রানে ২ উইকেট পড়ার পরে একটু পথ দেখিয়ে সৌম্যটাও চলে গেলো । তারপরে ইংলিশদের পাল্টা মেরে সাদা নাক লাল করে দিলো কে ? এই চিরতরুণ ছেলেটিই । মাহমুদুল্লাহর শতক মনে রাখুন মুশির কথাও কিন্তু ভুলবেন না ! ৭৭ বলে ৮৯ ! কি দারুন সব শট ! স্ট্রাইকরেটকে ট্র্যাকে ফেরানো, ডমিনেশন , চোখজুড়ানোসব শট । দারুন প্যাকেজ !

ভুলতে পারবেন না এই ইনিংসটাও
ভুলতে পারবেন না এই ইনিংসটাও

মুশির প্রিয় অপনেন্ট ? আমার তো মনে হয় ভারত ! ২০০৭ এ ত্রিনিদাদের সেইদিনের ইনিংস … যখন তাড়াতাড়ি বাংলাদেশের দুটো উইকেট পড়লে ভারত একটু স্বপ্ন দেখছিলো … তখন নেমে ঐ ১৯০ রানের ফিনিশিং পয়েন্টকে আরামসে শেষ করা, তারপরে এশিয়া কাপে সেদিন সাকিবকে জোচ্চুরি করে আউট করে ভারতীয়ারা যখন উল্লাসে ব্যস্ত , সেদিন সাকিবের পরে নেমে প্রাভিন আর ইরফানের বলগুলো কসাই এর মতো আঁছড়ে ফেলা – দুটো ম্যাচ তো বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসেরই সবচেয়ে বড় ১০ টা জয়ের ২টা ।

ভারত এলেই ওর ব্যাট চওড়া
ভারত এলেই ওর ব্যাট চওড়া

কি বলবেন ? দ্যা সেভিয়র ? নাকি লিটল ডিউনামাইট ? নাকি মিস্টার ডিপেন্ডেবল ?

এখনো ২৮ বছর বয়স ! সব ঠিক থাকলে আরো ৭ বছর একদম আরামসে ! ওয়ানডে অধিনায়কত্ব হারানোর পরে ওর ব্যাটিংটা শুধু ভালো হতেই দেখেছি । অধিনায়কত্বের চাপেও ব্যাটিং এর মান নামে নি । প্রতিদিনই মুশি আগের দিনের চাইতে ভালো ! আগের দিনের চাইতে বড় ম্যাচ উইনার । আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচাইতে বড় ব্যাপারটা হলো “শেখা ” … অধিনায়কত্ব কতোটা শিখছেন জানি না । তবে ব্যাটসম্যান মুশফিক শেখার দিকে থেকে বাকি দশজনের চাইতে অনেক উঁচু মানের । ওর সুইপগুলোতে একদিনের চাইতে পরেরদিন আরো বেশি আত্মবিশ্বাসের স্ফূরণ থাকে । আরো বেশি শক্তি থাকে …

কমেন্টস

কমেন্টস

One thought on “ছোট্টো ডিনামাইটের এগিয়ে চলা! দ্যা স্যাভিয়রের এগিয়ে চলা !

মন্তব্য করুন

4 × one =