মরিনহো দ্বন্দ্ব-নামা

‘স্পেশ্যাল ওয়ান’- কথাটিই তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। এক যুগের কোচিং ক্যারিয়ারে নিজের অর্জনকে এমন অবস্থানে নিয়ে গেছেন যাতে যে কেউ তাকে ইতিহাসের সেরা কোচদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দেবে।লিগে অবদমন অবস্থায় থাকা ফুটবল ক্লাব পোর্তোকে এনে দিয়েছেন বিশতম লিগ শিরোপার স্বাদ, পরিয়েছেন দ্বিতীয়বারের মত ইউরোপ সেরার মুকুট। চেলসিকে পঞ্চাশ বছর পরে এনে দিয়েছেন লিগ শিরোপা, ইন্টার মিলানকে ট্রেবল জয়ের পাশাপাশি চুয়াল্লিশ বছর পরে পরিয়েছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগের জয়মাল্য। হ্যাঁ, এসকল কৃতিত্বের অধিকারী কেবল একজন, তিনি চেলসির বর্তমান পর্তুগীজ কোচ হোসে মরিনহো; এমন সাফল্যের কারণেই তিনি ‘স্পেশ্যাল ওয়ান’। এত সাফল্যের পরেও তিনি তার কিছু কিছু কর্মকাণ্ডের জন্য হয়েছেন নিন্দিত, হয়েছেন সমালোচিত। বিশেষ করে, সতীর্থ কোচদের সাথে তার বাকযুদ্ধ যেন ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নিয়েছে। রাফায়েল বেনিতেজ থেকে শুরু করে পেপ গার্দিওলা হয়ে ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনি কেউই বাদ যায় নি তার কথার ছুরি থেকে। হোসে মরিনহোর সাথে তার সতীর্থদের তর্কযুদ্ধের কথাই বলব এখন।

hi-res-1a3e5f5e5163393ce0642e5aed987d1d_crop_north

 

মরিনহো বনাম বেনিতেজঃ হোসে মরিনহো ও রাফায়েল বেনিতেজের সম্পর্ক প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসের অন্যতম সাপে-নেউলে সম্পর্ক। তারা দুজনেরই ২০০৪ সালের গ্রীষ্মে  প্রিমিয়ার লিগে আগমন চেলসি ও লিভারপুলের ম্যানেজার হয়ে। এরপর থেকেই তাদের দুজনের অবস্থা হয় দাবা খেলার মত। প্রিমিয়ার লিগে যেমন মরিনহো রাজত্ব করতে থাকেন বেনিতেজের উপর, তেমন বেনিতেজও মরিনহোর উপর রাজত্ব করতে থাকেন ইউরোপিয়ান টুর্নামেন্ট ও এফএ কাপে। আর একে অন্যকে আঘাত করতে থাকেন কথার তীক্ষ্ণ ছুরি দিয়ে। বেনিতেজ চেলসির খেলাকে বিরক্তিকর, চরম বিরক্তিকর বলার পাশাপাশি মরিনহোর ‘স্পেশ্যাল ওয়ান’ খেতাবকে তাচ্ছিল্য করেই বলেন ‘ব্যর্থ ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতার বিশেষজ্ঞ’। এর জবাবে মরিনহো আবার বলেন যে লিভারপুলে যোগ আসার পরে বেনিতেজ কয়টি শিরোপা জিতেছে?

Mourinho-and-Benitez

তাদের দুজনের তর্কযুদ্ধের ছায়া প্রিমিয়ার লিগের পরেও সময়েও চলতে থাকে। বেনিতেজ মরিনহোর উত্তরসূরি হয়ে যখন ইন্টার মিলানে যোগ দেন তখন ইন্টার মিলানের প্লেয়ারদের চুয়াল্লিশ বছর পরে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের কারণে এতই মরিনহোপ্রীতি ছিলো যে প্লেয়ারদের মরিনহো বিরোধি মনোভাব তৈরি করতে গিয়ে মাত্র ছয় মাসের মাথায় বরখাস্ত হন বেনিতেজ।  এ সময় তিনি ইতালিয়ান সুপার কাপ ও বিশ্ব ক্লাব কাপের শিরোপা জয় করেন। মরিনহোর লিগ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের ফলেই এ দুটো প্রতিযোগিতায় ইন্টার মিলান অংশ নিতে পারে। তাই বেনিতেজকে কটাক্ষ করেই মরিনহো বলেন, “ আমি তাকে যে সাফল্য দিয়েছি তার জন্য তার কাছ থেকে অন্তত একটি ধন্যবাদ আশা করেছিলাম। সকল ইন্টার মিলানের ভক্তদের জিজ্ঞেস করে দেখেন তারা আমার সম্পর্কে এবং তার সম্পর্কে কি ভাবে?”

হোসে মরিনহো বেনিতেজের অধিভুক্ত হয়েই দ্বিতীয়বারের মত চেলসিতে আসেন। বেনিতেজের চেলসি অধ্যায় খুব একটা ভাল ছিলো না। এ সময় মরিনহো চেলসির মত একটি দল নিয়ে শুধুমাত্র ইউরোপা লিগ জয় করায় বেনিতেজের সমালোচনা করেন।

 

মরিনহো বনাম গার্দিওলাঃ  জোসে মরিনহো ও পেপ গার্দিওলা দুজনে একসাথে বার্সেলোনায় কাটিয়েছেন চারটি বছর। সে সময় তাদের মধ্যে ছিলো মধুর সম্পর্ক। কিন্তু সে সম্পর্ক এক সময় এসে তিক্ততায় পরিণত হয়। শোনা যায় মরিনহো বার্সার কোচ হতে আগ্রহী ছিলেন কিন্তু তাকে ডিঙ্গিয়ে গার্দিওলা শেষ পর্যন্ত কোচ হন। এরপর থেকেই তাদের তিক্ততার সম্পর্ক শুরু। তার পরিণতি আমরা দেখতে পাই ২০১০ চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিতে ন্যু ক্যাম্পে গার্দিওলার বার্সাকে ইন্টার মিলানের হারানোর পর পুরো ন্যু ক্যাম্পে জুড়ে মরিনহোর সেই বিরতিহীন দৌড়। তাদের সম্পর্ক চরম তিক্ততা পর্যায়ে আসে যখন মরিনহো রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হিসেবে সান্টিয়াগো বার্নাব্যুতে আসেন। এ সময় মরিনহো গার্দিওলার দিকে বারবার নানাভাবে কথা দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ করতে থাকেন। গার্দিওলার বার্সেলোনা ছাড়ার অন্যতম কারণও মরিনহোর উদ্ধত আচরণ। মরিনহো বলেন যে গার্দিওলা রেফারিকে প্ররোচিত করে খেলার ফল পাল্টে দেন। মরিনহোর কথার আঘাতে শান্ত গার্দিওলাও শেষ পর্যন্ত মুখ খোলেন। ২০১১ চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমি ফাইনালের আগে রিয়াল মাদ্রিদের প্রেস বক্সে মরিনহোর উদ্ধত আচরণের জবাব দেন বেশ জোরালো কণ্ঠেই।

সাপে নেউলে সম্পর্ক মরিনহো-গার্দিওলারও
সাপে নেউলে সম্পর্ক মরিনহো-গার্দিওলারও

দুজনেই মাদ্রিদ ও বার্সা ছেড়ে গেলেও তাদের তর্কযুদ্ধ এখনো থেমে থাকে নি। সম্প্রতি মরিনহো গার্দিওলা সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে তার মাথায় চুল না থাকার কারণ তিনি ফুটবল উপভোগ করেন না !

 

মরিনহো বনাম ওয়েঙ্গারঃ ২০০৪ সালে হোসে মরিনহো প্রথমবারের মত চেলসির কোচ হয়ে আসেন। তখন আর্সেনালের সাফল্যের জয় রথ চলছিলো। মরিনহো এ সময় বলেন যে খেলার সময়সূচি আর্সেনালের জন্য উপযোগী করে তৈরি করা হয়, তাই আর্সেনাল সাফল্য পায়। তিনি আরও বলেন যে ইংলিশরা পরিসংখ্যান খুব পছন্দ করে। তারা দেখে না যে ওয়েঙ্গারের জয়ের হার মাত্র পঞ্চাশ ভাগ। ওয়েঙ্গারও অবশ্য থেমে থাকে নি। তিনি চেলসির রক্ষনাত্মক কৌশলের সমালোচনা করে বলেন, “একটি খেলা তখনই সংকটে থাকে যখন দল স্বাভাবিক খেলা থেকে বিরত থাকে”। তিনি আরও বলেন, “সে (মরিনহো) সীমার বাইরে চলে গেছে, বাস্তব জগতের সাথে সম্পর্কহীন এবং তার মধ্যে কোন শিষ্টাচার নেই। আপনি যদি কোন অপদার্থকে সাফল্য এনে দেন, তবে এটি তাকে খুব বুদ্ধিমান করবে না বরং তাকে আরও অপদার্থ বানাবে”।

মরিনহো-ওয়েঙ্গার গড়িয়েছে হাতাহাতি পর্যন্ত!
মরিনহো-ওয়েঙ্গার গড়িয়েছে হাতাহাতি পর্যন্ত!

 

হোসে মরিনহো গত সিজনে স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে দ্বিতীয়বারের মত চেলসির কোচ হয়ে আসেন। ফুটবল ভক্তরা তাই তাদের দুজনের তর্কযুদ্ধ আবারও দেখতে পাবে বলেই আশা করা যায়।

 

মরিনহো বনাম রাইকার্ডঃ বছর দশেক আগের কথা ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড তখন বার্সেলোনার কোচ। মরিনহো তখন সদ্য পোর্তোকে ইউরোপ সেরা করে চেলসিতে এসেছেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে চেলসি বনাম বার্সেলোনার খেলা। দুজনে দুই লিগের কোচ হওয়ায় তেমন কোন পারস্পারিক দ্বন্দ বা সম্পর্ক ছিলো না তাদের মধ্যে। কিন্তু এরই মধ্যে মরিনহো প্রথম লেগে পরাজয় শেষে রাইকার্ডকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “ম্যানেজার হিসেবে আমার ফুটবল ক্যারিয়ারের কোন তুলনা চলে না। তিনি এখনো কোন ট্রফি জিততে পারে নি কিন্তু আমি অনেক জিতেছি”। মরিনহো আরও অভিযোগ করেন যে তিনি খেলার বিরতিতে রেফারিদের রুমে গিয়ে দ্বিতীয়ার্ধে দিদিয়ের দ্রগবাকে লাল কার্ড দেখাতে বাধ্য করেছে। দ্বিতীয় লেগে বার্সা ৪-২ গোলে হেরে নক আউট স্টেজ থেকে বিদায় নেয়। পরের বছর বার্সা চেলসিকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠলে  রাইকার্ডের দিকে তীর ছুরে বলেন, “ রাইকার্ড খুব ভাগ্যবান একজন ম্যানেজার। কারণ বার্সেলোনার তারকারা তাকে দিনের পর দিন রক্ষা করে যাচ্ছে”।

frank-rijkaard-dan-jose-mourinho

 

মরিনহো বনাম পেলেগ্রিনিঃ  হোসে মরিনহো ও ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনি দুজনে প্রিমিয়ার লিগে আসেন গত বছর যথাক্রমে চেলসি ও ম্যানচেস্টার সিটির কোচ হয়ে। স্যার এলেক্স ফার্গুসন তার ফুটবল অধ্যায়ের সমাপ্তি টানেন গত সিজনে। এতে করে প্রায় দেড় দুগের ফার্গি-ওয়েঙ্গার তর্কযুদ্ধের সমাপ্তি দেখল প্রিমিয়ার লিগ। কিন্তু সাথে সাথেই প্রিমিয়ার লিগ নতুন ফার্গি-ওয়েঙ্গার পেয়ে গেল। মরিনহো-পেলেগ্রিনি হল নতুন ফার্গি-ওয়েঙ্গার। সিটিতে এসেই তাদের লিগ শিরোপা এনে দিল পেলেগ্রিনি। এ কি সইবে মরিনহো? যার ব্যর্থার কারণে স্থলাভিষিক্ত হয়ে রিয়াল মাদ্রিদে এসেছিলেন মরিনহো, তার কাছেই কিনা হেরে গেলেন প্রিমিয়ার লিগে! আর কিছুদিন গেলে তাদের দুজনের আসল যুদ্ধ যে দেখতে পাবে ফুটবল বিশ্ব। এই সিজনে এখন পর্যন্ত যে নাম্বার ওয়ান পজিশনে আছে মরিনহোর দল চেলসি। তাদের থেকে আট পয়েন্ট কম নিয়ে তৃতীয় স্থানে আছে ইউনাইটেড।

1000x69534

 

 

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

three + 16 =