যেভাবে কন্তের সিস্টেম বশ মানলো মরিনহো’র কাছে

গত রাতে প্রিমিয়ার লিগের পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে থাকা চেলসিকে নিজের মাঠে ২-০ গোলে হারিয়েছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। গোল করেছেন ইংলিশ স্ট্রাইকার মার্কাস র‍্যাশফোর্ড আর স্প্যানিশ মিডফিল্ডার অ্যান্ডার হেরেরা। চেলসি কোচ আন্তোনিও কন্তে, যিনি কিনা প্রায় গোটা মৌসুমেই দলকে ৩-৪-৩ ফর্মেশানে খেলিয়ে দলের খোলনলচেই পালটে দিয়েছিলেন, গতরাতে সেই ৩-৪-৩ ফর্মেশানের জুজুই তাড়িয়েছেন বহু দিনের পোড় খাওয়া ম্যানেজার হোসে মরিনহো। কিভাবে সম্ভব হল কন্তেকে এভাবে ঘোল খাওয়ানো? মরিনহোর ট্যাকটিক্সের পাতা থেকে একটু বোঝার (ব্যর্থ) চেষ্টা করা যাক!

প্রথমে শুরু করা যাক দুই দলের ফর্মেশান নিয়ে। নিজের প্রমাণিত ৩-৪-৩ ফর্মেশানেই দল সাজিয়েছিলেন চেলসি কোচ আন্তোনিও কন্তে, কিন্তু ম্যাচ শুরু হবার আগেই দু-দুটো বড় ধাক্কা খান তিনি, বেলজিয়ান গোলরক্ষক থিবো কর্তোয়া আর স্প্যানিশ লেফট উইংব্যাক মার্কোস আলোনসো, যারা কিনা দুইজনই কন্তের ফর্মেশানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুইজন খেলোয়াড়, ইনজুরির জন্য দুইজনই চলে যান মাঠের বাইরে। ফলে মার্কোস আলোনসোর জায়গায় আসা লাগে সতীর্থ ডিফেন্ডার সেজার অ্যাজপিলিকুয়েটা আর থিবো কর্তোয়ার জায়গা নেন বসনিয়ান গোলরক্ষক আসমির বেগোভিচ। ওদিকে সেন্ট্রাল ডিফেন্স থেকে অ্যাজপিলিকুয়েটা লেফট উইংব্যাক হিসেবে শিফট হবার ফলে চেলসির তিন-মানুষী সেন্ট্রাল ডিফেন্সের ডানদিকে আনা হয় ফরাসী সেন্টারব্যাক কার্ট জুমাকে।

ওদিকে কাগজে কলমে ৪-৪-২ ফর্মেশানে দল সাজান হোসে মরিনহো। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, মাঠে কিন্তু বলতে গেলে তিনিও তিন জনের সেন্ট্রাল ডিফেন্সই নামিয়েছিলেন, কারণ মাঠে নামার সাথে সাথেই ৩-৫-২ ফর্মেশানে শিফট করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। কাগজে কলমে ৪-৪-২ ফর্মেশানের দলটা ছিল অনেকটা এরকম –

ডেভিড ডা হেয়া

আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়া-এরিক বাইয়ি-মার্কোস রোহো-মাত্তেও দারমিয়ান
অ্যান্ডার হেরেরা-মারুয়ান ফালাইনি-পল পগবা-অ্যাশলি ইয়াং

হেসে লিনগার্ড-মার্কাস র‍্যাশফোর্ড

কিন্তু মাঠে নামার পর থেকে রাইটব্যাক থেকে আরেকটু উপরে উঠে রাইট উইংব্যাকের পজিশান নেন আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়া, ফলে চারজনের মিডফিল্ড পাঁচজনের হয়ে যায়, আর চারজনের ডিফেন্স থেকে একজন কমে গিয়ে তিনজন হয়ে যায়, আর তিনজনই (বাইয়ি, রোহো, দারমিয়ান) সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারের ভূমিকা নেন। এদের মধ্যে দারমিয়ানের ভূমিকা একটু বিশেষায়িত ছিল ; পুরো ম্যাচে চেলসির স্প্যানিশ রাইট উইঙ্গার পেদ্রোকে পকেটে পুরে রাখার দায়িত্বটা তাঁকেই নিতে হয়েছিল। আর ওদিকে বাইয়ি আর রোহো মিলে ব্যতিব্যস্ত রেখেছিলেন চেলসি স্ট্রাইকার ডিয়েগো কস্টাকে। ফলে ফররেমশানটা হয়ে যায় অনেকটা এইরকম –

ডেভিড ডা হেয়া

এরিক বাইয়ি-মার্কোস রোহো-মাত্তেও দারমিয়ান

আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়া-অ্যান্ডার হেরেরা-মারুয়ান ফালাইনি-পল পগবা-অ্যাশলি ইয়াং

হেসে লিনগার্ড-মার্কাস র‍্যাশফোর্ড

ম্যাচের শুরুতেই সুপারস্টার জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচকে বসিয়ে রেখে মার্কাস র‍্যাশফোর্ডকে নামিয়ে দিয়ে বড় একটা ট্যাকটিক্যাল গেম খেলেন মরিনহো, আর বলা বাহুল্য, সেই প্ল্যানটা মরিনহোর সার্থক। ইব্রাহিমোভিচ যতই কার্যকরী স্ট্রাইকার হন না কেন, মরিনহোর ডিফেন্সিভ গেইমের সাথে ইব্রা কখনোই যান না। দলের বাকী দশজন খেলোয়াড় ম্যাচের প্রয়োজনে হয়তোবা ট্র্যাকব্যাক করবেন, কিন্তু ইব্রাহিমোভিচকে দিয়ে কখনই সেরকম ট্র্যাকব্যাকের কাজটা করা সম্ভব না, এটা জানতেন মরিনহো। তাঁর উপর ইব্রা এই মৌসুমে ইংলিশ লিগে নিজেকে প্রমাণ করলেও মরিনহো জানতেন কাউন্টার অ্যাটাকে দুর্ধর্ষ চেলসিকে ঘায়েল করতে হবে তাদের অস্ত্র দিয়েই। আর সেই কাউন্টার অ্যাটাকের জন্য দুইজন স্ট্রাইকার হিসেবে এমন দুইজনকে লাগবে যাদের নিজেদের মধ্যে রসায়নটা অনেক ভালো, যারা কিনা ট্র্যাকব্যাকও করেন, এবং প্রয়োজনে নিজেদের গতি দিয়ে তুখোড় কাউন্টার অ্যাটাকও রচনা করতে পারেন। আর গোলের পর গোল করতে থাকলেও ইব্রাহিমোভিচের সেই অলরাউন্ড খেলাটার ধার যে আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে, গতি যে আস্তে আস্তে ধীর হয়ে যাচ্ছে, সেটা ভালোই বোঝেন মরিনহো। এই ম্যাচে কন্তের দলকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য এমন দুইজন স্ট্রাইকার লাগত মরিনহোর, যিনি কিনা পিচের উপরে থেকেই একটা ডিফেন্ডারের ভূমিকা পালন করতে পারেন, অর্থাৎ শুধুমাত্র ডি-বক্সের আশেপাশে সুযোগের জন্য ঘুরঘুর না করে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে নিজেরাই নিজেদের জন্য সেই সুযোগটা সৃষ্টি করতে পারেন। সে কারণেই ইব্রাহিমোভিচকে বসিয়ে র‍্যাশফোর্ডকে খেলানো। আর মরিনহোর সিদ্ধান্তটা যে ভুল কিছু ছিলনা সেটার প্রমাণ র‍্যাশফোর্ড দিয়েছেন ম্যাচের মাত্র সাত মিনিটে অ্যান্ডার হেরেরার থ্রু বল থেকে ডেভিড লুইজকে পরাস্ত করে অসাধারণ এক গোল করে।

মাত্তেও দারমিয়ানের ভূমিকার কথা ত আগেই বলেছি, চেলসির দুই উইঙ্গার/ইনসাইড ফরোয়ার্ডের মধ্যে একজন পেদ্রো – তাঁর পিছে একেবারে আঠার মত লেগে ছিলেন দারমিয়ান। আর আরেক উইঙ্গার/ইনসাইড ফরোয়ার্ড, এই মৌসুমে চেলসির সেরা খেলোয়াড় ইডেন হ্যাজার্ডকে একবারে ত্রস্ত করে ছেড়েছেন স্প্যানিশ মিডফিল্ডার অ্যান্ডার হেরেরা গোটা ম্যাচ জুড়ে।

gollachhut.com

এই এক অ্যান্ডার হেরেরার মধ্য দিয়ে মোটামুটি তিনজন খেলোয়াড়ের সুবিধা বের করে নিয়েছেন মরিনহো এই ম্যাচে। একদম পটু সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের মত প্রতিপক্ষের সেরা খেলোয়াড়টিকে খেলতেই দেননি তিনি, আঠার মত লেগে ছিলেন পুরোটা সময়, যন্ত্রের মত ট্যাকল আর ইন্টারসেপশান করে গেছেন (৪টি করে ট্যাকল আর ইন্টারসেপশান করেছেন এই ম্যাচে হেরেরা), এই এক হেরেরার কাছ থেকেই আবার প্লেমেকারের সুবিধাটাও পেয়েছেন মরিনহো, যে প্লেমেকার গোলের সুযোগ সৃর্ষ্টি আর অ্যাসিস্ট করে দলের জয়ে রেখেছেন ভূমিকা, আবার একই সাথে হেরেরা পালন করেছেন বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডারের ভূমিকাটাও, যার কাজ হল প্রতিপক্ষের ডিবক্সে একটু পর পর গিয়ে নিজেই শট করা। গোল করা, অ্যাসিস্ট করা, ট্যাকল-ইন্টারসেপ্ট করা – প্রত্যেকটা কাজই হেরেরা করেছেন অসাধারণভাবে! হেরেরার এই অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের জন্যে লাভ হয়েছে দুইজন খেলোয়াড়ের – এক. পল পগবা আর দুই. আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়া। হেরেরা হ্যাজার্ডকে চুপ করে রেখেছিলেন, তারমানে এই ম্যাচে ভ্যালেন্সিয়ার উপরে দায়িত্ব বর্তায়নি হ্যাজার্ডকে আটকানোর। ইয়াং আর ভ্যালেন্সিয়া মিলে সুন্দরমত দুইপাশ দিয়ে চেলসির দুই ইনসাইড অ্যাটাকার পেদ্রো আর হ্যাজার্ড যেন দারমিয়ান বা হেরেরাকে ফাঁকি দিয়ে সাইডের চ্যানেলগুলো দিয়ে আক্রমণ শানাতে না পারেন সেটা সতর্কভাবে লক্ষ্য রাখছিলেন। মার্কোস আলোনসোর জায়গায় খেলা সেজার অ্যাজপিলিক্যুয়েটা অবশ্য ভ্যালেন্সিয়া সেরকম কোন পরীক্ষার মধ্যে ফেলতেও পারছিলেন না, বহুদিন পর উইংব্যাকে খেলছিলেন তিনি, খেলেছেন অত্যন্ত সাধারণ মানের খেলা।

তিনজন সতর্ক সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার, দুইজন উইঙ্গার যারা কিনা আক্রমণকে মূলমন্ত্র না ভেবে ভালোভাবে ট্র্যাকব্যাক করার দিকেই গুরুত্ব দিচ্ছিলেন বেশী, তিনজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার যাদের কাজই ছিল একেবারে নিচ থেকে আক্রমণ শানানো (যাদের মধ্যে একজনের দায়িত্ব ছিল প্রতিপক্ষের সেরা খেলোয়াড়টাকে পুরো ম্যাচ নিষ্ক্রিয় করে রাখা), আর দুইজন অ্যাটাকার যারা পিচের উর্ধ্বভাগ থেকেই আক্রমণের পাশাপাশি ডিফেন্সের কাজটাও করবেন – মোটামুটি কন্তেকে আটকানোর জন্য মরিনহোর এই কয়টা মাস্টারপ্ল্যানই সার্থক করতে হত, যেটা কিনা হয়েছেও।

বিঃদ্রঃ মাত্র পাওয়া খবরে জানা গেছে ম্যাচশেষে বাসায় ফেরার পর প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ইডেন হ্যাজার্ড বাথরুমে ঢুকলে কমোডে দেখতে পান অ্যান্ডার হেরেরা বসে আছেন তার অপেক্ষায়…

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

fifteen + three =