আমাদের মহাতারকা

খোলা বারান্দা নাকি রোমান্টিকতা বাড়ায় । জাগিয়ে তোলে ভাললাগার সুপ্ত কুঁড়িকে ।
সত্যিই কি তাই ?

দখিনা বারান্দায় এক জোড়া কপোত-কপোতীর কফি মুখর শরতীয় বিকেল থেকে চলুন এবার ভিন্ন এক জায়গায় যাই ।
নাহ, ঠিক ভিন্ন বলা চলেনা জায়গাটিকে । বলতে পারেন অভিন্ন জায়গায় ভিন্ন চিত্র । খোলা বারান্দা ! আম গাছ, কাঠাল গাছ আর নানা ঔষধী গাছের নাঁচুনীতে বারান্দাটি যেন প্রাকৃতিক শীততাপ নিয়ন্ত্রিত । নিঃসন্দেহে মন ও দেহ ভালো করার উপকরণ এ নির্মল বাতাস । তবে মন ভালো থাকার সুরটা যেন কেটে গেছে কোথাও একটা । বারান্দায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘদেহী এক যুবক । মিলিটারি কাট চুলে বাতাস লাগছে বটে, তবে উড়ছেনা । বাহিরে ঝকঝকে বিকেলটা প্রশান্তির পশরা সাজিয়ে বসেছে কিন্তু ছেলেটির মুখে রাজ্যের বিষাদ ।
মন ভালো নেই তাতে কি, এ বাতাস শরীর ভালো রাখতে বড্ড পটু । কিন্তু বাতাস সওদাগর যে সেখানেও ব্যর্থ ।লাঠিতে ভর দিয়ে দাড়িয়ে আছে ছেলেটি । হ্যা, সোজা বাংলা ল্যাংড়া বা খোড়া হয়ে গিয়েছে । দেহের ব্যথা ছাপিয়ে ছেলেটির হৃদয়ের ব্যথা যেন প্রকাশিত ঐ শুভ্রনীল মেঘে ।
মায়াকার বলিষ্ঠ চেহারায় অভিমান স্পষ্ট । ছোটবেলায় স্কুল থেকে বাড়ি না ফিরে চলে যেত মাঠে । নেশা আসক্ত হয়ে গিয়েছিল ছেলেটি । নেশা তার ক্রিকেটে । নেশার নালিশ মা পাড়লো বাবার কাছে । আর রক্ষে কই ! একদিন উনুনের গরম খুন্তিই পিঠে চাপিয়ে মারলেন বাবা । ব্যথা আর তীব্র জ্বলুনি যন্ত্রণায় অশ্রুজল গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে । এরপর দিন গড়ালো । ছেলেটির নেশা থামেনি । এই নেশাই তাকে পৌছে দিলো স্বপ্নের চূড়ান্ত রঙ্গমঞ্চে । আর সেখানেই তাকে পেতে হলো আরো বড় আঘাত । বল করতে গিয়ে টান খেলেন পায়ের কোন রগে । মাঠ থেকে ঠিকানা সোজা হাসপাতালে ।

অভিমানি ছেলেটি এবার চোখ ফেরালো মেঘ থেকে । সহসাই অভিমান ভেঙ্গে ধারণ করলো রণমূর্তি । ঘাড়ের রগ বাঁকা করে চ্যালেঞ্জ করলো নিজেকেই ।
চ্যালেঞ্জে ছিল দৈর্ঘ্যে ছোট অথচ ব্যাপকতায় সুবিশাল এক আকুলতা- ‘শুধু একটা বল করতে চাই বাংলাদেশের হয়ে’ ।
সেদিনের সেই চ্যালেঞ্জে জিতেছিলেন আজকের পরিণত ব্যক্তিটি । যতবার পায়ের রগ ছিড়েছে ততবারই উল্টো বিদ্রোহ করেছে তার ঘাড়ের রগ । বলেছে- চল বেটা, খেলা হবে !
এই ত্যাড়া ঘাড়কে সঙ্গী করে ইতিহাস গড়ে ফেললেন ।
দৌড়ালেন ২২ গজের ঐ রঙ্গমঞ্চে ১৬ কোটির স্বপ্নচাঁপ নিয়ে । চাঁপ? উহু, ভালবাসাই বোধহয় বলতে তার ক্ষেত্রে । বাংলাদেশ ক্রিকেটের ফিডার খাওয়া বয়স থেকে তার যে অভ্যুদয় তা ডানা মেললো পরিণত যৌবনে । তার বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়লো দেশীয় ক্রিকেটের যৌবন জেল্লা । চোখের সামনে হেরে বসা তাপস, আজিজদের দেখে যে ছেলেটি নিজেকে চ্যালেঞ্জ করেছিল । তার খোঁড়া পায়েই বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দিলো তাবত্‍ বিশ্বকেই ।
বাঘা বাঘা সব ব্যাটসম্যানের সামনে পড়তে হয়েছে তাকে । সরল বাংলায় পেঁদানীও কম খাননি । কিন্তু দমেছিলেন কি? যে ছেলে সাতপাঁচ না ভেবে ২২ গজীয় প্রেমে নিজেকে বারবার কাঁচি ছুরিতে সঁপে দেয় । তার কলিজা মাপার দাঁড়িপাল্লা আদৌ বানাতে পারতো সিন্ধু সভ্যতা?

লোকে বলে ছেলেটি নাকি ভালবাসার ফেরিওয়ালা । আবার কেউবা বলে ভালবাসার ডাকপিওন । যে খুঁড়িয়ে দৌঁড়িয়ে ভালবাসা বিলি করে । আচ্ছা সেই ভালবাসা কি মাপার সাধ্য কি ছিল ভালবাসা দিবসের সেই সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের?

নিজেকে যিনি সারাজীবন অতি সাধারণে মাপলেন সেই তিনি কিন্তু স্বজাতির কাছে অতি দুষ্প্রাপ্য এক রত্ন । যে রত্ন তপস্যতেও মেলা অসম্ভব । বিচিত্র বিশ্রী উত্থান পতনে চলা বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যেন স্থিরতা পেয়েছে তার ঐ খোঁড়া পায়ের অভিভাবকত্বেই । জিয়ন কাঠিতে দলকে বদলেছেন যেন জীবন্ত কিংবদন্তী মহত্বে । মোহনায় গিয়ে আকুপাঁকু করা দলকে পিঠ চাপড়ে বলেছেন- ‘ঘুরে দাঁড়া, চল ধরে দিবানি’ ।
শত কোটি ভালবাসা নিয়েই ক্রীড়াজন্ম শত্রুটিকে পরাস্ত করতে পারেননি । বারবার সেই শত্রু তাকে টেনেছে ছুরি কাঁচির ঝনঝনানি শোনাতে । তাতে কি, মাঠে কিংবা হাসপাতালের খাটে- ছেলেটির অভিভাবকত্বের মহিমা যৌবনা জেল্লা বাড়িয়েছে যৌবানাধৌত বাংলার ক্রিকেটে ।

প্রিয় মাশরাফি,
রকিবুল ভাই ব্যাটে জয় বাংলা লিখে খেলতে নেমেছিলেন । শহীদ জুয়েল ক্রিকেট রেখে ক্র্যাক প্লাটুনে যোগ দিয়েছিলেন । শুধু শুনেছি তা, পড়েছি তা । আমাদের সৌভাগ্য হয়নি সে বীরত্ব দেখা । আপনার কাছে বোলিংয়ে দৌড়ানোতে রোমান্টিসিজম আছে, ডিউটি আছে । কিন্তু বীরত্ব নেই ।

দুঃখিত নেতা !

আমরা আজ সগর্বে দ্বিমত পোষণ করছি । দৃঢ় চিত্‍কারে বলছি- হ্যা, বীরত্ব আছে । যে বীরত্ব আমরা দেখেছি বারবার হাঁটু চেঁপে দৌড়ানো আপনার মাঝে ।

হে নেতা !

নিজেকে আপনি যতই মাপুন । আপনার ঐ মাপায় আমাদের থোড়াই কেয়ার । জানি, ডাক্তার-তারকারাও বড় তারকা । প্রকৃত তারকা । কিন্তু আকাশ ঘেঁষে চলা ঐ বাতাস কি বলে জানেন? আপনি হলেন মহাতারকা । যে তারকা গোটা আকাশের ভার বয়ে বেড়াচ্ছে লুকানো ব্যথা আর প্রকাশিত পরম মমতায় ।

হে বীর !

শুভ জন্মদিন!

দিন গড়াবে, যুগ পাল্টাবে, ইতিহাস উল্টাবে । তবে আপনি থেকে যাবেন স্বস্থানে স্বমহিমায় সহস্র কোটি হৃদয়ে । কোটিপ্রাণ বলে যাবে আমৃত্যু-
‘তুমি রবে সরবে, তুমি রবে গরবে,
তুমি রবে বিজয়ে, তুমি রবে আলয়ে ।

রবে তুমি ভাস্বর দৈনিক,
হে জন প্রেম কৌশিক !

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

9 + 17 =