শুভ জন্মদিন, মিলানের রাজপুত্র!

আমি তখন বেশ ছোট। এই ক্লাস থ্রীতে পড়ি, কিংবা বড়জোড় ফোর। ঐসময়ে সাত-আট বছরের বয়সের কাউকে মনে হয় ‘ছোট’ বলাই যায়। সেই ছোটবেলা থেকেই আমি পত্রিকা পড়তাম।
নিয়মিত।
লাইব্রেরীতে যেতাম বিভিন্ন পত্রিকাগুলো পড়তে। আমার বয়সের অনেকেই যখন সেই সময়ে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিল কার্টুন দেখা। তখন আমার বিনোদনের এক মাধ্যম পত্রিকা। পেছনের আরেকটু গভীর কারণ বললে বলতে হয়, রক্ষণশীল ধর্মীয় অনুশাসনে বড় হওয়াতে টিভির মুখ দেখেছি অনেক বড় হবার পর।

তো যে কথা বলবো আর কী! টপিক থেকে দূরে সরে না যাই!

পত্রিকায় তখন খেলার পাতা খুটিয়ে খুটিয়ে পড়তাম।
সারাদিন বসে।
আমাদের বাশার, পাইলট, রফিক, আশরাফুলের খবর পড়তাম। বাইরের লারা, গাঙ্গুলি, পন্টিং, ইনজামামদের খবর পড়তাম। তবে সব থেকে বেশী মজা পেতাম ফুটবলের খবর পড়ে।

রিয়ালের জিদান, রোনাল্ডো, বেকহ্যাম, রবার্তো কার্লোস, ফিগোদের গ্যালাক্টিকসদের খবর পড়তাম মগ্ন হয়ে। আর বার্সাতে তখন সবে রোনালদিনহো ম্যাজিক শুরু হয়েছে। এতো সব তারকাদের ভিড়ে আমার মন আটকালো এক তরুণ খেলোয়াড়কে নিয়ে লেখা একটা ফিচারে।
ব্রাজিলের…
এসি মিলান নামের একটা রয়াল ক্লাবের…
রিকার্ডো কাকা!
লেখার গুণে নাকি ভাষার ব্যবহারে নাকি ঐ তরুণের চেহারার জন্যে, জানি না! ফিচারটা মনে গেঁথে গেলো একদম। ভালো লাগার শুরু সেখান থেকেই।

ফিচারে বিভিন্ন সব প্রশংসার বিশেষণ দেখে খুব মনে চাইলো এর খেলা দেখতে হবে। বিভিন্ন ছুতোয় আম্মুকে বলে বিভিন্ন আত্মীয়ের বাড়িতে যেয়ে সিরি আতে মিলানের দুয়েকটা ম্যাচের হাইলাইটস দেখেছিলাম। তখন ইএসপিএনে খেলা দেখাতো, যতোটা মনে আছে! পত্রিকা থেকে মিলানের খেলার হাইলাইটসের সময় জেনে, বেশ ঝামেলা করে তাই খেলা দেখতাম।
মিলানের জন্যে আমার ভালোবাসার জন্মও সেখান থেকেই।

এর ভিতরেই আসলো ২০০৫ সালের মে মাসের শেষের দিক।
সেই ইস্তাম্বুল ট্রাজেডি।
পত্রিকাতে পুরো ঘটনা পড়ে, বিভিন্ন ছবির ভিতর কাকার কান্না করা ছবি দেখে, কী যে খারাপ লেগেছিলো! বোঝাতে পারবো না।
সেই বয়সে আমি চ্যাম্পিয়নস লিগ বুঝতাম না। পত্রিকা পড়ে শুধু জেনেছিলাম, শত কোটি সমর্থকের হৃদয় ভেঙে ফাইনালে এসি মিলানের হার। ব্যাস এটুকু পড়েই বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লেগেছিলো সেদিন।

এরপর দেখতে দেখতেই আসলো ২০০৬ এর বিশ্বকাপ।
জার্মানীতে!
জিদান, ফিগো, রোনালদো, বেকহ্যাম, রোনালদিনহো, রিকুয়েলমে, ক্যানভারো, বালাকসহ কতো লিজেন্ডদের মিলনমেলা! কিন্তু আমার চোখ শুধু ঐ তরুণটার দিকে।
ব্রাজিলের রিকার্ডো কাকা…
আমার আস্থার প্রতিদান দিতেই যেন প্রথম ম্যাচেই গোল দিলো সে! অনেক গভীর রাতে ম্যাচ হওয়াতে দেখতে পারি নি। কিন্তু পত্রিকা পড়ে ঠিকই জেনেছিলাম।

বিশ্বকাপ গেলো। আবার বিভিন্ন লিগের খবর আসা শুরু করলো পত্রিকায়। সাথে আসতে লাগলো এসি মিলানের ঐ রাজপুত্রটার খবর।
রিকার্ডো কাকা।
পত্রিকার খবর পড়ে লোভ সামলাতে না পেরে মাঝে মাঝেই বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করে দেখতাম মিলানের খেলা।

কী দুর্দান্ত গতি!
কী অসাধারণ স্কিল!
চোখ ধাধানো ড্রিবলিং!
খেলার মাঝে চুম্বকের মতো আটকে রাখতো সে। অসাধারণ সব গোল করে তাক লাগাতো আমার মনকে।
দুর পাল্লার নিখুঁত শটে গোল করার ক্ষেত্রে, আমার একসময় মনে হতো কাকার কোন জুড়ি নেই। সাথে যোগ করুন অসাধারণ সব থ্রু পাস, ক্রস, মাইনাস, ক্লিনিকাল ফিনিশিং, আর প্রয়োজনের মূহুর্তে গোল করে দলকে জেতানো।

বাঘা বাঘা সব স্ট্রাইকারদের পিছনে ফেলে চ্যাম্পিয়নস লিগের এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোল দাতা হওয়া চাট্টিখনা কথা না। আর গ্রেট গ্রেট সব মিডফিল্ডারদের পেছনে ফেলে, চ্যাম্পিয়নস লিগের রেকর্ডবুকে সবসময়ের সর্বোচ্চ গোল করা মিডফিল্ডার হওয়া হেসে উড়িয়ে দেবার ব্যাপার না। তার খেলা যারা দেখেছে, তারাই জানে কাকা কেমন খেলতো!
মিডফিল্ড মায়েস্ত্রো এমনি এমনি বলে না। আর লিজেন্ডদের চারণক্ষেত্র ব্রাজিলের সেরা দশ লিজেন্ডের মাঝে জায়গা করে নেয়াটাও যা তা কথা না।

বিশ্বের কাছে নিজেকে চিনিয়েই মিলানকে জেতালেন ২০০৭ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ।
আর নিজে জিতলেন ০৭ সালের ব্যালন ডি অর!
মেসি রোনালদোকে হারিয়ে সেরা হওয়া সর্বশেষ এবং একমাত্র খেলোয়াড় এই রিকার্ডো কাকা।

সৃষ্টিকর্তায় প্রচন্ড বিশ্বাসী এই মানুষটার জীবনে যেন সৃষ্টিকর্তাই পরীক্ষা নিতে শুরু করলেন! সেই পরীক্ষাই যেন এলো একের পর এক ইনজুরি হয়ে।

তৎকালীন রেকর্ড ট্রানসফারে এসি মিলান থেকে মাদ্রিদে আসার পর ইনজুরীই হয়ে গেলো তার নিত্যসঙ্গী। এই ইনজুরি নিয়েই খেললেন ১০ এর বিশ্বকাপ। তিন এসিস্ট করে বোঝালেন, সুস্থ কাকা খেললে কতোটা ভয়ংকর হতেন প্রতিপক্ষের জন্য!

এরপরের গল্পটা শুধুই ইনজুরি, ফিরতে না পারা এবং হতাশার গল্প। মাদ্রিদে যখনই সুযোগ পেতেন, জাত চেনাতেন নিজের। খেলার মাঠের দিকে তাকালেই বুঝতে পারতাম, কাকা আছে কী নেই!

মাদ্রিদ থেকে আবার রাজপুত্রের ঘরে ফেরা।
কিন্তু ততোদিনে এসি মিলান হারিয়ে ফেলেছে জৌলুস। একা চেষ্টা করেও তাই পারলেন না দলের ভাগ্য বদলাতে। তবে অর্জন করলেন মিলানের জার্সি গায়ে শততম গোল করার গৌরব।

আজ এতো স্মৃতিচারণার মূল কারণ তার জন্মদিন।
৩৫ তম জন্মদিন।
এই বিশেষ দিনগুলোতেই তো মানুষ সব পুরোনো কথা মনে করে। সেজন্যেই এতো কিছু বলা আজ!

কাকা নামটা অবশ্যই আমার কাছে বিশেষ কিছু। এতো নম্র-ভদ্র, হ্যান্ডসাম, ড্যাশিং লুকিং পারসন এমনিতেই যেকোন ছেলের জীবনে রোল মডেল হতে বাধ্য। আর খেলার কথা তো বাদই দিলাম।
এইতো আমার এই ব্যক্তিটাকে ঘিরে ভালোলাগা!
এই ভালোলাগা থেকে কতো বন্ধু, কতো মানুষের সাথে তর্ক-বিতর্ক করেছি মনে নেই! জানি, আমার আইডল এই মানুষটা কখনো হয়তো জানবে না তার এই পাগল ভক্তের কথা। ভিন্নভাষী বলে পড়তেও পারবে না তাকে নিয়ে লেখা আমার এই অনুভূতিগুলো।

তাতে কী!!

ভালোলাগার অনুভূতি প্রকাশে তো মানা নেই!
বাধাও নেই!

সেজন্যেই আজগুবি টাইপ এই লেখা আর কী!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

twelve + ten =