আদিওস কাপিতান, মাস্টার ওয়েইন!

স্যার ববি চার্লটন, ব্রায়ান রবসন, জর্জ বেস্ট, ডেনিস ল, ডেনিস আরউইন, রায়ান গিগস, গ্যারি নেভিল, পল স্কোলস, এরিক ক্যান্টোনা, রয় কিন, ডেভিড বেকহাম, রিও ফার্দিনান্ড, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, পার্ক জি সুং, অ্যান্ডি কোল, ওলে গানার সোলস্কায়ার – ইউনাইটেড লিজেন্ডদের কথা বলা শুরু করলে শেষ করা সম্ভব নয়। ওল্ড ট্রাফোর্ডের হয়ে লাল শয়তানরা সবসময়ই মাঠ মাতিয়েছেন। ফুটবল বিশ্বকে দিয়েছেন অনেক উপহার। ইউনাইটেড আর এসব খেলোয়াড়রা যেন একে অন্যের সমার্থক। কিন্তু এদের সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন একজন। নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য এক পর্যায়ে, যেখানে তিনি সবার থেকে আলাদা। উপাধি হিসেবে পেয়েছেন মিস্টার ম্যানচেস্টার। বলছি ওয়েইন মার্ক রুনির কথা। বলছি আমাদের মাস্টার ওয়েইনের কথা। রুনিকে নিয়ে লেখা কি দিয়ে শুরু করব,এটা ভাবতে ভাবতেই অনেকখানি সময় পার হয়ে গেছে।
মাত্র ১৮ বছর বয়সেই এসেছিল থিয়েটার অফ ড্রিমে। ২০০৪-০৫ সিজনে রুনিকে স্যার অ্যালেক্স যখন নিয়ে আসেন তখন অনেকেই ভ্রু কুঁচকে বলেছিলেন এই বাচ্চা ছেলের জন্যে ২৫.৬ মিলিয়ন পাউন্ড! এও কি সম্ভব? ওই সময়ে রুনিই ছিলেন ২০ বছরের কম বয়সী সবচেয়ে বেশি দামী ফুটবলার। ফুটবল ঈশ্বরই হয়তো বলতে পারবেন এভারটন যদি নিউক্যাসল এর ২২ মিলিয়ন পাউন্ডের অফার রিজেক্ট না করত তাহলে আমাদের কি হত। কাকেই বা আমরা মিস্টার ম্যানচেস্টার বলতাম?
ইউনাইটেড এর হয়ে প্রথম সিজনে কোনো ট্রফি না জিতলেও রুনি ছিলেন সকল আলোচনার মধ্যমণি। থাকবেনই বা না কেন! ৮ নাম্বার জার্সি গায়ে অভিষেকেই তো করেছিলেন হ্যাটট্রিক। চ্যাম্পিয়নস লীগে টার্কিশ ক্লাব ফেনারবাচের বিপক্ষে রেড ডেভিলসদের ৬-২ জয়ে হ্যাট্ট্রিকের পাশাপাশি অ্যাসিস্টও করেন মাস্টার ওয়েইন। ওই সিজনে লীগে ৩য় হয় ম্যান ইউনাইটেড। ১১ গোল করে ইউনাইটেড এর টপ স্কোরার হন রুনি। জিতে নেন পিএফএর ইয়াং প্লেয়ার অফ দ্যি ইয়ারের সম্মান।
মৌসুম ২০০৫-০৭::
২০০৫-০৬ সিজনে লীগ কাপ জয়ের মাধ্যমে ইউনাইটেড এর হয়ে ট্রফি জয়ের ধারা শুরু হয় রুনির। উইগান অ্যাটলেটিকের সাথে ফাইনালে ২ করে রেড ডেভিলদের ৪-০ জয় নিশ্চিত করেন, হয়েছিলেন ম্যান অফ দ্যি ম্যাচও। সেবার প্রিমিয়ার লীগে ২৬ ম্যাচে ১৬ গোল করেন রুনি। ইউনাইটেড হয় লীগ রানার্স আপ। চেলসির সাথে লীগের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ইঞ্জুরিতে পড়েন তিনি। ২০০৬-০৭ সিজনের শুরুটা রুনির জন্যে ছিল এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। টানা ১০ ম্যাচে জালের দেখা পাননি এই ফরওয়ার্ড। কিন্তু সমালোচনার জবাবটা দারুনভাবেই দিয়েছিলেন বোল্টনের সাথে চমৎকার এক হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে। পরের মাসেই ২০১২ সাল পর্যন্ত ওল্ড ট্রাফোর্ডে থাকার বন্দোবস্ত করে ফেলেন নতুন চুক্তি করে। সেবার ইউনাইটেড তৎকালীন বার্ক্লেইস প্রিমিয়ার লীগ জিতে, রুনি করেন ১৪ গোল।কিন্তু চ্যাম্পিয়নস লীগে আরো বেশি প্রাণবন্ত ছিলেন রুনি। কোয়াটার ফাইনালে রোমার সাথে দুই লেগ মিলিয়ে ৮-৩ জয়ে করেন ২ গোল, পরে সেমিফাইনালের প্রথম লেগেও গুরুত্বপূর্ণ ২ গোল করেন ইতালিয়ান জায়ান্ট এসি মিলানের বিপক্ষে, ইউনাইটেড ম্যাচ জিতে ৩-২  গোলে।
মৌসুম ২০০৭-০৯:::
২০০৭ এর জুন মাসে প্রথম ১০ নাম্বার জার্সি গায়ে জড়ান। ডাচ লিজেন্ড রুড ভ্যান নিস্টলরয়ের কাছে যার মালিকানা ছিল এতদিন। মৌসুম শুরুর ম্যাচেই ইঞ্জুরিতে পড়েন রুনি। ইউনাইটেড গোলশূন্য ড্র করে নিচের সারির দল রিডিং এর সাথে। ৬ সপ্তাহ মাঠের বাইরে ছিলেন। ফিরে আসেন এএস রোমার সাথে চ্যাম্পিয়নস লীগ গ্রুপ ম্যাচে। ১-০ গোলে জয় পাওয়া লাল শয়তানদের গোলটা কিন্তু সদ্য ইঞ্জুরি ফেরত মাস্টার ওয়েইনেরই করা। অক্টোবর মাসে ইঞ্জুরি থেকে ফিরে আবার নভেম্বরেই ইঞ্জুরিতে পড়েন রুনি। ফলাফল আরো ২ সপ্তাহ মাঠের বাইরে। ডিসেম্বরে ফিরে আসেন ফুলহামের সাথে লীগ ম্যাচ দিয়ে। ০৭-০৮ সিজনটায় রুনি মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরেই বেশি ছিলেন। ইঞ্জুরি যেন পিছুই ছাড়ছিলনা ওর। তারপরেও প্রিমিয়ার লীগে ১২ গোলসহ মোট ১৮ গোল করেন তিনি। উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগের অল ইংলিশ ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী চেলসিকে হারিয়ে কাপ জিতেন রুনিরা।
মৌসুম ২০০৮-০৯:
অক্টোবর মাসে ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সের সাথে এওয়ে ম্যাচে মাঠে নামার মধ্য দিয়ে সবচেয়ে কম বয়সে ২০০ ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ ম্যাচ খেলার মাইলফলক অর্জন করেন ওয়েইন রুনি। সেবার ফিফা ক্লাব কাপের শিরোপা জিতেন ইউনাইটেড, রুনি পান টুর্নামেন্ট সেরা প্লেয়ার পুরস্কার গোল্ডেন বল। জানুয়ারি মাসে ইঞ্জুরিতে পড়েন আবারও। ওই সিজনের একদম শেষের দিকে স্পার্সের সাথে ম্যাচে রুনিময় এক অসাধারণ জয় পায় ইউনাইটেড। ০-২ এ পিছিয়ে থেকে ৫-২ এ ম্যাচ জিতে ইউনাইটেড। ২ গোল করে,আরো ২ গোলের প্রধান উৎস ছিলেন আমাদের ওয়েইন। সে ম্যাচে ইউনাইটেড এর পেনাল্টি গোলেরও এসিস্ট ছিল রুনির। বার্সেলোনার কাছে ০-২ এ চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনালে হারে ইউনাইটেড। জিততে পারল না তারা পরপর চ্যাম্পিয়নস লীগ শিরোপা। মাস্টার ওয়েইন গত মৌসুমের মত এই মৌসুমেও লীগে ১২ গোল করেন। সবমিলিয়ে ২০ গোল পুরো মৌসুমে।
মৌসুম ২০০৯-১০::
ইউনাইটেডের মৌসুমটা শুরু হয় চেলসির কাছে কমিনিউটি শিল্ড হারার মধ্য দিয়ে। পেনাল্টিতে ম্যাচ জিতে নেন টেরি-ল্যাম্পার্ডরা।তবে পিছিয়ে থাকা রেড ডেভিলসদের ম্যাচে ফেরায় ৯০ মিনিটে রুনির করা গোল। লীগ শুরুর প্রথম ম্যাচে তার এক গোলে বার্মিংহাম সিটিকে হারায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। রুনিও করেন ইউনাইটেড এর হয়ে ৯৯ গোল। উইগান অ্যাথলেটিকের সাথে এওয়ে ম্যাচে ইউনাইটেড জিতে ৫-০ তে, রুনি করেন জোড়া গোল, এরই সাথে রুনি হয়ে যান ২০ তম খেলোয়াড়, যাদের আছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর হয়ে ১০০ গোল। এই সিজনেই রুনি তার প্রায় তিন বছর পর লীগে হ্যাটট্রিকের দেখা পান। পোর্টস্মাউথের সাথে তার হ্যাটট্রিকের সুবাদে ইউনাইটেড ৪-১ গোলের জয় পায়। জানুয়ারিতে হাল সিটির বিপক্ষে লীগে রুনির ৪ গোলে ইউনাইটেড ৪-০ তে ম্যাচ জিতে, এই প্রথম রুনি একলাই ৪ গোল করেন। ইংলিশ কাপের সেমিফাইনালে একেবারে শেষ সময়ে করা ওয়েইন রুনির গোলে ডার্বি রাইভালদের ৪-৩ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠে ইউনাইটেড। ৩১ জানুয়ারি আর্সেনালের হোম গ্রাউন্ড এমিরেটস এ গানার্সদের বিপক্ষে গোল করে রুনি ইউনাইটেড এর হয়ে লীগে ১০০ গোল করার মাইলফলক স্পর্শ করেন। রুনি কিন্তু নিজের প্রথম লীগ গোলটিও করেন এই আর্সেনালের বিপক্ষে। ফেব্রয়ারিতে চ্যাম্পিয়নস লীগে ইতালিয়ান পাওয়ারহাউজ এসি মিলানের বিপক্ষে সান সিরোতে ৩-২ গোলে ইউনাইটেড এর জয়ে রুনি হেডে করেন দুই গোল। দ্বিতীয় লেগে ওল্ড ট্রাফোর্ড এ রুনির জোড়া গোলে ইউনাইটেড জিতে ৪-০ তে। চ্যাম্পিয়নস লীগের কোয়াটার ফাইনালে জার্মান পাওয়ারহাউজ বায়ার্ন মিউনিখের সাথে ম্যাচে ইঞ্জুরিতে পড়েন রুনি। সমর্থক-সতীর্থরা সবাই চিন্তায় পড়েন হয়তো বড় রকমের কোন ইঞ্জুরিতে পড়েন মাস্টার ওয়েইন। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে মিউনিখের সাথে ২য় লেগেই শুরুর একাদশেই ছিলেন রুনি। ৩-১ ইউনাইটেড জিতলেও এওয়ে গোলে দুই লেগে মিলিয়ে বাদ পড়ে লাল শয়তানরা। লীগে ২৬ আর সবকিছু মিলিয়ে ৩৪ গোল করেন রুনি।সেবার পিএফএর প্লেয়ার অফ দি ইয়ার নির্বাচিত হন রুনি।
মৌসুম ২০১০-১১::
ইউনাইটেড মৌসুম শুরু করে ওয়েস্ট হামের সাথে ৩-০ এর জয়ে। রুনি পেনাল্টি থেকে এক গোল করেন। কিছুটা বিতর্কের আভাস পাওয়া যায় সিজনের শুরুতে, স্যার অ্যালেক্স বলেন রুনি নাকি ক্লাব ছাড়তে চান, যদিও রুনি এটাকে গুজব বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু কিছুদিন পরেই শোনা যায় ক্লাব ছাড়তে উদগ্রীব ওয়েইন রুনি। তবে সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এ আরো ৫ বছর থাকার বন্দোবস্ত করেন রুনি। মৌসুমটাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যে ম্যানচেস্টার ডার্বিতে ম্যাচের শেষের দিকে ওভারহেড কিক/বাইসাইকেল কিক এ অসাধারণ এক গোল করে ২-১ ম্যাচ জিতান ইউনাইটেডকে, আর আবারো প্রমাণ করেন ম্যানচেস্টার লালই। এই গোলকে নিজের ক্যারিয়ারের সেরা গোল বলে থাকেন রুনি। স্যার ফার্গুসন বলেন ওল্ড ট্রাফোর্ড এ তার দেখা এটাই সেরা গোল। এপ্রিলে ওয়েস্ট হামের বিপক্ষে ০-২ এ পিছিয়ে থেকে ইউনাইটেড ম্যাচ জিতে ৪-২ এ। এক অসাধারণ হ্যাটট্রিক করেন রুনি। এউড পার্কে ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সের সাথে রুনির করা গোলে ১-১ এ ড্র করে ইউনাইটেড। ইউনাইটেড জিতে ১৯ তম লীগ শিরোপা, আর রুনি চতুর্থ।
সিজন ২০১১-১২::
ওয়েস্টব্রমের সাথে গোল করার মাধ্যমে মৌসুম শুরু করেন রুনি। আগস্টের শেষের দিকে ইউনাইটেড এর বিখ্যাত ৮-২ গোলের জয়ে আসে আর্সেনালের সাথে। রুনি হ্যাটট্রিক করেন, যেখানে ছিল দুটা ফ্রি-কিক গোল। ম্যান অফ দি ম্যাচও হন রুনি। এই ম্যাচে প্রথম গোলটা করে ইউনাইটেড এর হয়ে ১৫০ গোলের দেখা পান রুনি। এর পরের লীগ ম্যাচে বোল্টনের সাথে আবারও হ্যাটট্রিকের দেখা পান রুনি, যা প্রিমিয়ার লীগ ইতিহাসের ৪র্থ প্লেয়ার হিসেবে পরপর লীগ ম্যাচে হ্যাটট্রিক। চ্যাম্পিয়নস লীগে রোমানিয়ান ক্লাব ওতেলুল গালাতির বিপক্ষে গোল করে রুনি বনে যান চ্যাম্পিয়নস লিগে সবচেয়ে বেশি গোল করা ইংলিশ ফুটবলার। তবে প্রিমিয়ার লীগে টানা ৮ ম্যাচ গোলবিহীন ছিলেন এই তারকা। উলভসের সাথে জোড়া গোলের মধ্য দিয়ে গোলখরা খাটে রুনির। ফেব্রুয়ারিতে চিরশত্রু লিভারপুলের বিপক্ষে মাঠে নামার মধ্য দিয়ে রুনি সিনিয়র ক্যারিয়ারে ৫০০ ম্যাচ খেলার গৌরব অর্জন করেন। তার জোড়া গোলেই ২-১ এ জিতে রেড ডেভিলসরা। এই ম্যাচটি আবার তার লাল শয়তানদের হয়ে ৩৫০ তম ম্যাচ ছিল।
সিজন ২০১২-১৩::
ওয়েইন রুনি মৌসুম শুরু করেন ইঞ্জুরি দিয়েই। ফুলহামের সাথে ইঞ্জুরড রুনি মাঠের বাইরে ছিলেন ৪ সপ্তাহ। অক্টোবরে স্টোকের বিপক্ষে রুনির গোল ছিল ইউনাইটেড এর হয়ে তার ২০০ তম। মোটামুটি ভালোই গোল করার মধ্যে ছিলেন ইঞ্জুরি থেকে আসার পরে, ম্যানচেস্টার ডার্বিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ ইউনাইটেড এর জয়ে অবদান ছিল মাস্টার ওয়েইনের। কিন্তু মৌসুমের শেষাংশে ম্যানেজার ফার্গি হঠাৎ করেই জানান, রুনি ক্লাব ছাড়তে চান আবারো।
মৌসুম ২০১৩-১৪:::
নতুন ম্যানেজার ডেভিড ময়েস দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা করলেন,”রুনি বিক্রিয়ের জন্যে নহে”। চেলসি,আর্সেনাল, রিয়াল মাদ্রিদ, পিএসজিসহ অনেক নামি-দামী ক্লাবই রুনিকে কিনার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছিল। লাগবে নাই বা কেন, আমরা তো মিস্টার ম্যানচেস্টার এর ট্রান্সফার নিয়ে কথা বলছি। এরই মধ্যে আবার ইঞ্জুরিতে পড়েন রুনি, ট্রেনিং এর সময় সতীর্থ ফিল জোন্সের সাথে বল কন্ট্রোলিং করতে গিয়ে। যার কারণে লিভারপুলের সাথে লীগ ম্যাচ মিস করেন তিনি। রুনি মৌসুম শুরু করেন ক্রিস্টাল প্যালেসের সাথে ফ্রি-কিক থেকে গোলের মাধ্যমে। বেয়ার লেভারকুসেনের সাথে চ্যাম্পিয়নস লীগে জোড়া গোল করা রুনি এবার ম্যানচেস্টার ডার্বিতে ইউনাইটেড এর জন্যে সান্ত্বনাদায়ক গোল করেন, যেটাতে ম্যানচেস্টার সিটি জিতে ৪-১ এ। রুনি লীগে ১৫০ তম গোল করেন হালের বিপক্ষে চমৎকার এক ভলি থেকে, সেই ম্যাচে ইউনাইটেড আবার ০-২ এ পিছিয়ে থেকে ম্যাচ জিতে ৩-২ এ। বাকী দুই গোলের এসিস্টও ছিল রুনির। ২০১৯ সাল পর্যন্ত থিয়েটার অফ ড্রিমের টিকেট কেটে নেন ওয়েইন রুনি। চুক্তি করেন আরো ৫ বছরের।ওয়েস্ট হামের সাথে জোড়া গোলের মাধ্যমে রুনি অলটাইম ইউনাইটেড স্কোরার লিস্টে ৩ নাম্বারে চলে আসেন ২১২ গোল নিয়ে। ১৭ গোল আর ১০ এসিস্ট নিয়ে রুনি হন এই সিজনে ইউনাইটেড এর সর্বোচ্চ গোলদাতা আর এসিস্টদাতাও। এই সিজনের চ্যাম্পিয়নস লীগের সর্বোচ্চ এসিস্ট ছিল রুনির, ৮ টি।
মৌসুম ২০১৪-১৫:::
ইউনাইটেড অধিনায়ক নেমানিয়া ভিদিচ ইন্টারে যোগ দিলে নতুন কোচ লুইস ভ্যান হাল রুনিকে অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড তুলে দেন। সিজন ওপেনিং এ রুনি সোয়ান্সির সাথে করেন অতিসুন্দর এক বাইসাইকেল কিক, যদিও ইউনাইটেড ম্যাচ হারে ১-২ গোলে।ওয়েস্ট হামের বিপক্ষে গোল করে প্রিমিয়ার লীগের ৩য় সর্বোচ্চ গোলদাতা হন রুনি, পেছনে ফেলেন আর্সেনাল লিজেন্ড থিয়েরি অরিকে। গর্ব করার মত ম্যাচে রুনি স্টুয়ার্ট ডাওনিংকে ফাউল করে দেখেন লাল কার্ডও, সেই সাথে ৩ ম্যাচ নিষিদ্ধও হন। নভেম্বরে রুনির গোলে রাইভাল আর্সেনালকে ২-১ হারিয়ে সেই সিজনে প্রথম এওয়ে জয় পায় ইউনাইটেড। ভ্যান হাল রুনিকে প্রায়ই মিডফিল্ডে খেলিয়েছিলেন এই মৌসুমে। লীগ কাপের এক ম্যাচে প্রেস্টন ইউনাইটেড এর বিপক্ষে বিতর্কিত এক পেনাল্টি গোল করেন রুনি। ২০১৫ সালে যেটি রুনির প্রথম গোল। স্যান্ডারল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে রুনি গড়েন অনন্য এক রেকর্ড। টানা ১১ মৌসুম ১০+ গোল করার রেকর্ড। এই মৌসুমে আবারও রুনি ইউনাইটেড এর সর্বোচ্চ গোলদাতা হন, ১৪ গোল করে।
মৌসুম ২০১৫-১৬::::
চ্যাম্পিয়নস লীগের প্লে-অফে হ্যাটট্রিক করে ৮৭৮ মিনিটের গোলখরা কাটেন রুনি। ফেনেরবাচের সাথে ডেব্যু ম্যাচে হ্যাটট্রিকের পর এটাই রুনির ২য় বারের মত ইউরোপীয় টুর্নামেন্টে হ্যাটট্রিক। এভারটনের সাথে গোল করে অ্যান্ডি কোলের সমান প্রিমিয়ার লীগ গোল করেন রুনি, যা লীগ ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। নরউইচের সাথে ম্যাচের মাধ্যমে ইউনাইটেডের হয়ে নিজের ৫০০ তম ম্যাচ খেলেন রুনি। সোয়ানসির সাথে গোলে নিজেকে কোলের সামনে নিয়ে যান, সেই সাথে ইউনাইটেড এর হয়েও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হন, গোলসংখ্যা ২৩৮ হয়। লিভারপুলের সাথে ১-০ গোলে জিতা ম্যাচে রুনি স্পর্শ করেন অরির কোনো ক্লাবের হয়ে সর্বোচ্চ ১৭৬ গোলের রেকর্ড। ইঞ্জুরি আবার ঘিরে ধরে রুনিকে। কিছুদিন ছিলেন মাঠের বাইরে। কাপের ফাইনালে ক্রিস্টাল প্যালেসের সাথে পুরো ১২০ মিনিট খেলেন,তাও আবার মিডফিল্ড পজিশনে। ইউনাইটেড ম্যাচ জিতে ২-১ এ। রুনিও ক্যারিয়ারে প্রথম বারের মতন জিতেন নতুন নামে পরিচিত লিগ কাপ।
সিজন ২০১৬-১৭:::
মৌসুমটা শুরু করে ইউনাইটেড কমিউনিটি শিল্ড জিতে। রুনির এসিস্টে ইয়াং সেনসেশন হেসে লিনগার্ডের গোলে ম্যাচ জিতে ইউনাইটেড। ক্যাপ্টেন হিসেবে এটি রুনির দ্বিতীয় শিরোপা। সোয়ানসির বিপক্ষে এসিস্ট করে রুনি প্রিমিয়ার লীগে ১০০ এসিস্টকারীর তালিকায় নাম লেখান। ইউরোপা লীগে গোল করে রুনি ডাচ লিজেন্ড নিস্টলরয়ের রেকর্ড ভেঙে ইউরোপিয়ান টুর্নামেন্টে ইউনাইটেড এর হয়ে সবচেয়ে বেশি গোল করার রেকর্ড করেন। ৩৯ গোল নিয়ে রুনি এখন সবার উপরে। রিডিং এর বিপক্ষে এফএ কাপে গোল করে রুনি স্পর্শ করেন ববি চার্ল্টনের ২৪৯ গোলের রেকর্ড। ২১৫ ম্যাচ ও ৪ মৌসুম কম খেলে চার্ল্টনের রেকর্ড নিজের করে নেন রুনি। স্টোকের সাথে ফ্রি-কিক থেকে গোল করে ইউনাইটেডকে ১ পয়েন্ট পাইয়ে দেন। রুনিকে স্মারক গোল্ডেন বুট তুলে দেন স্বয়ং ববি চার্ল্টন।
ইউনাইটেড এর হয়ে রুনির অর্জনের কথা বলে শেষ করা যাবে না। ইউনাইটেডকে দিয়েছেন অনেক কিছুই। চলুন এক নজরে দেখা যাক তার উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জনসমূহ::
১. ৫ টি প্রিমিয়ার লীগ
২. ৩টি লীগ কাপ
৩. ১টি এফএ কাপ
৪. ৪টি কমিনিউটি শিল্ড
৫. ১টি করে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস ও ইউরোপা লীগ
৬. ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ (২০০৮)
ব্যক্তিগত অর্জন:::
পিএফএর ইয়াং প্লেয়ার ২ বার, প্লেয়ার অফ দি ইয়ার একবার। পিএফএর ফ্যান্স প্লেয়ার অফ দি ইয়ার দুইবার। স্যার ম্যাট বুসবি এওয়ার্ড দুইবার। ইউনাইটেড এর হয়ে সর্বোচ্চ গোল স্কোরার। এর থেকে বড় অর্জন আর কি হতে পারে?
রুনির ইউনাইটেড এর হয়ে টপ ১০টি পারফর্মেন্স ::
১. ২০০৬/০৭ সিজনে এসি মিলানের সাথে গোল। ম্যাচে ইউনাইটেড ১-২ পিছিয়ে ছিল
২. আর্সেনালের বিপক্ষে ২০১১-১২ সিজনে হ্যাট্ট্রিক, ৮-২ গোলে বিধ্বস্ত গানার্সরা
৩. স্ট্যাম্ফোর্ড ব্রিজে ২০১১-১২ ইউনাইটেড ০-৩ গোলে পিছিয়ে
৪. কার্লিং কাপ ফাইনাল,২০০৫-০৬। রুনির জোড়া গোল
৫. নিউক্যাসেল, ২০১৫-১৬। দুই গোল আর এক এসিস্ট
৬. এসি মিলান, চ্যাম্পিয়নস লীগ, ২০০৯-১০
৭. ডেব্যু ম্যাচ, ফেনারবাচের সাথে হ্যাটট্রিক, ২০০৪-০৫
৮. ওয়েস্ট হামের বিপক্ষে ২০০৯-১০। ০-২ এ পিছিয়ে ইউনাইটেড
৯. ২০০৮-০৯, শিরোপার লড়াইয়ে টিকে থাকতে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ,ইউনাইটেড ০-২ এ পিছিয়ে
১০. ম্যানচেস্টার ডার্বিতে বাইসাইকেল কিকে ৪-৩ গোলে ইউনাইটেড এর জয়
এরকম অনেক অনেক রুনি ম্যাজিক আমরা দেখেছি। একজন ইউনাইটেড ফ্যান হিসেবে রুনির খেলা দেখাটা সৌভাগ্যের চেয়েও বেশি কিছু। কোনো ইউনাইটেড ফ্যান হয়তো ভাবতেও পারেনি রুনি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে। এটা দু:স্বপ্ন। এটা একটা চূড়ান্ত দুঃস্বপ্ন। রুনিকে অন্যে ক্লাবের জার্সিতে দেখা অনেক কষ্টের। যাইহোক পেশাদারিত্বের কাছে আবেগ সবসময় পরাজিত। রুনি ছিল,আছে এবং আজীবন আমাদের মনে থাকবে। থিয়েটার অফ ড্রিমস মনে রাখবে রুনিকে অনেকদিন। ম্যানচেস্টার এর আকাশ,বাতাস সবকিছুতেই থাকবে রুনি। ওল্ড টাফোর্ডের প্রত্যেকটি ঘাস মনে রাখবে রুনিকে। গ্যালারির প্রত্যেকটি আসন মনে রাখবে রুনিকে।
Adios my captain, our captain…

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

seven + 10 =