মার্ক ওভারমার্স : আর্সেনালের চতুর গতিমানব

মার্ক ওভারমার্স : আর্সেনালের চতুর গতিমানব

সময়টা ১৯৯৭ এর গ্রীষ্ম..ইউরোপীয় ফুটবল বোদ্ধাদের অনেকের চোখই কপালে উঠেছিল যখন আর্সেনে ওয়েঙ্গার আয়াক্স থেকে মার্ক ওভারমার্স কে দলে ভেড়ালেন। কেউ এই প্রতিভাবান ডাচ উইঙ্গারের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন না তুললেও চরম ইনজুরিপ্রবণ এই খেলোয়াড়কে নেওয়ায় আর্সেনের দুরদর্শীতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

১৯৯৫ ইউরোপীয়ান কাপ ফাইনালে শক্তিশালী এসি মিলানকে হারানো আয়াক্স দলের গতিমানব হিসেবে পরিচিত ছিলেন এই ওভারমার্স। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী হাঁটুর ইনজুরির কারনে ইউরো ৯৬ তে খেলতে পারেননি এবং তার ক্যারিয়ার হুমকির মুখে পড়ে যায়।

আর্সেনে সিদ্ধান্ত নেন ঝুঁকিটি নেবার…বলেন “ওর (ওভারমার্স) সেরা সময় সামনে আসছে”.. আরো অনেকবারের মতোই তার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণিত হয়ে যায়। ওভারমার্স একটু সময় নিয়েছিলেন, কিন্তু ইনজুরির প্রভাবটি কাটিয়ে উঠেই প্রিমিয়ার লিগে ঝড় তুলেছিলেন।

আর্সেনের গোলন্দাজ বাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠেন তিনি। ১৯৯৮ এর সেই ক্লাসিক দলটিতে ছিল দ্যা ফেমাস ফোর টনি অ্যাডামস, স্টিভ বোল্ড, নাইজেল উইন্টারবার্ন ও লি ডিক্সনের ডিফেন্স… সাথে প্যাট্রিক ভিয়েরা এবং ইম্যানুয়েল পেতিত এর পাওয়ার… রে পারলার এর অক্লান্ত পরিশ্রম… ইয়ান রাইট, নিকলাস অানেলকার ধূর্ত ফিনিশিং আর ডেনিস বার্গক্যাম্প এর ঐশ্বরিক টেকনিক্যাল অ্যাবিলিটি ও ভিশন। এর সাথে ওভারমার্স এর বিস্ফোরক গতি, দুই পা সমান ভাবে ব্যাবহারের সহজাত ক্ষমতা, অসাধারণ ফুটওয়ার্কের সমন্বয় যোগ হওয়ায় আর্সেনাল হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। ফলাফল প্রথম অ-বৃটিশ হিসেবে আর্সেন ওয়েঙ্গারের লিগ জয় এবং ডাবল(লিগ/এফএ কাপ জয়)।

নিঃসন্দেহে বার্গক্যাম্প ছিলেন মেইন ম্যান.. তবে ওভারমার্স ছিলেন তার আল্টিমেট উইংম্যান। এই লেফট উইঙ্গারকে সামলাতে পুরো ইপিএল এর রাইটব্যাকদের যন্ত্রণাদায়ক সময় পার করতে হয়েছে। বার্গক্যাম্প এবং পেতিত এর নিঁখুত, মাপা পাস গুলো পিক করতে ফুলব্যাকদের পরাস্ত করতেন খুব সহজেই।

ডিফেন্ডাররাও জানত সামান্য পরিমাণ জায়গা দেওয়া হলেই আর তাকে ধরার কোন সুযোগ থাকবে না। এটাই হয়ে ওঠে আর্সেনের প্রথম ডাবল জয়ের অন্যতম অস্ত্র। ওভারমার্স করেছিলেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু গোল.. লীডস ও ওয়েস্ট হ্যামের সাথে জোড়া গোল এবং বার্নস্লি এর সাথে জয়সুচক গোল গুলো ১৯৯০-৯১ এর দাপুটে লিগ টাইটেল জয়ের পর প্রথম বারের মত লিগ শিরোপাকে হাতের নাগালে এনে দিতে সাহায্য করেছিল।

আর বড় কোন উপলক্ষ উদযাপনের বেলায় হেলা ফেলা ওভারমার্স এর ধাতেই ছিলোনা। ১৯৯৮ এর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মুখোমুখি হয় আর্সেনাল। আর সব আলো কেড়ে নেন এই ডাচ উইঙ্গার। স্বাগতিক দলের ডিফেন্স ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিলেন তার গতি এবং ফুটওয়ার্ক দিয়ে। জয়সূচক একমাত্র গোলটিও করেন তিনি। যে জয় শিরোপার লড়াইয়ে আর্সেনালকে এগিয়ে দিয়েছিল অনেকখানি।

মে মাসে এভারটনের সাথে ম্যাচে লিগ শিরোপা জয় নিশ্চিত করার সময়েও জয়সূচক গোলটি একক পারদর্শিতায় করেন ওভারমার্স।

এফএ কাপের ফাইনালও বা বাদ রাখবেন কেন.. তাই সেখানেও পার্থক্য গড়ে দেবার কাজটা করেন.. নিউক্যাসলের সাথে ম্যাচের ২৩ মিনিটে ইমানুয়েল পেতিত এর পারফেক্ট থ্রু বলটি রিসিভ করে ডিফেন্ডারদের পেছনে ফেলে সময়ের অন্যতম সেরা গোল রক্ষক শেয় গিভেনকে পরাস্ত করেন। আর্সেনাল ২-০ গোলে জিতে ডাবল জয় সম্পন্ন করে।

আর্সেনে তখন বলেন ” পুরো ইউরোপ ভেবেছিল ওভারমার্স মৃত কারন তার হাঁটু ভাঙ্গা.. কিন্তু ও এই মৌসুমে আমাদের প্রতিটি গুরুত্বপুর্ন ম্যাচে গোল করেছে। সে বিশ্বমানের একজন ফুটবলার এবং ওর মনোবল ওকে ইনজুরির প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছে।”

অসাধারণ একটি প্রথম মৌসুম কাটান ওভারমার্স। ইপিএলে অ-বৃটিশ খেলোয়ারদের মাঝে তখন যা ছিল বিরল। যদিও পরবর্তী দুই মৌসুমে বারবার ইনজুরিতে আক্রান্ত হওয়ায় তার পার্ফমেন্স কে বাধাগ্রস্ত করেছিল। তারপরেও তিনি আর্সেনালের হয়ে এই তিন মৌসুমে ১৪২ ম্যাচে করেন ৪১ গোল। ইনজুরি এবং তার প্লেয়িং পজিশনের কথা মাথায় রাখলে যেটাকে বলা যায় অসাধারণ পরিসংখ্যান।

২০০০ সালের গ্রীষ্মে ইতিহাসের সবচাইতে দামী ডাচ ফুটবলার হিসেবে বার্সেলোনায় পাড়ি জমান মার্ক ওভারমার্স। কিন্তু এই স্বল্পকালেই আর্সেনাল সমর্থকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে যান তিনি। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের এক জরিপে আর্সেনালের গ্রেটেস্ট ফুটবলারদের তালিকায় তাকে ১২ তম অবস্থানে রাখেন গুনাররা।
ওভারমার্সের ট্রান্সফারের বিরোধিতা করছিল সমর্থকগোষ্ঠি এবং বোর্ড। তবে আর্সেনের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা আরেকবার প্রমাণ পায় ওভারমার্স বার্সেলোনায় নিজের সেরা সময়ের ছায়া হয়ে থাকায়। আর তার শূণ্যস্থান পূরণে আর্সেনালে আসেন তখনও অপরিচিত এবং পরবর্তিতে কিংবদন্তী রবার্ট ইম্যানুয়েল পিরেস। যাকে তর্কযোগ্য ভাবে প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসের সেরা লেফট সাইডেড মিডফিল্ডার বলা হয়।

মার্ক ওভারমার্সস ১৯৭৩ সালের ২৯ মার্চ নেদারল্যান্ডের অ্যাম্স্ট এ জন্মগ্রহন করেন। তার বাবা শিশু ওভারমাসকে বর্ণনা করেন “Clumsy Child ” হিসেবে.. যিনি কিনা রোজ সকালে বহুতল ভবন থেকে সিড়ি বেয়ে নামার সময় বলকে মাথা থেকে পড়তে দিতেন না, মাটিতে বাউন্স করলে শব্দ হবে বলে। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলার হবার স্বপ্নে বিভোর ওভারমার্স কিশোর বয়সে যোগ দেন “Go Ahead Eagles” এ.. নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে যোগ দেন আয়াক্স এ। ক্যারিয়ারের সেরার সময়টি আর্সেনালে কাটিয়ে ৩০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বার্সেলোনায় জয়েন করেন।
ওভারমার্স বার্সেলোনার হয়ে খেলেন ২০০৪ পর্যন্ত। এরপর সেই হাঁটুর ইনজুরির জন্যেই অবসর নিতে হয় তাকে। জাতীয় দলে তার ছিল ১১ বছরের ক্যারিয়ার। তিনি নেদারল্যান্ডের কমলা জার্সী গায়ে চাপিয়ে ৮৬ ম্যাচে করেন ১৭ গোল। তার ব্যাক্তিগত এবং দলগত কিছু অর্জন:

Individual:-
Dutch Football Talent of the Year: 1992
Dutch Golden Shoe Winner : 1993
FIFA World Cup Best Young Player : 1994

Club Honours:-
#Ajax
Eredivisie (3): 1993–94 , 1994–95 , 1995–96
KNVB Cup: 1992–93
Johan Cruijff Shield: 1993
UEFA Champions League: 1994–95
European Super Cup: 1995
Intercontinental Cup: 1995
#Arsenal
Premier League: 1997–98
FA Cup: 1997–98
FA Community Shield: 1998

মূল – আহসানুল হক

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

sixteen + 10 =