যিনি ফুটবল রোমান্টিসিজমের শেষকথা

আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় ‘আমি আর্জেন্টিনা কেন সাপোর্ট করি’ – আমি তেমন কোন সদুত্তর দিতে পারব না । মোটামুটি ভাবে
জোড়াতালি দিয়ে , এবং কিছুটা বালখিল্যতা পরিহার করে যে ব্যাখ্যা টা দাড়া করিয়েছি, তা অনেকটা এরকম । ২০০২ বিশ্বকাপে একজন একনিষ্ঠ ফ্রান্স সমর্থক হিসেবে শুরু করেছিলাম । কারণ আগের বিশ্বকাপ টা ফ্রান্সই জিতেছিল এবং আমার প্রিয় খেলোয়াড় হিসেবে জিদানের নামটি নিতেই আরাম পেতাম । সেনেগালের কাছে ফ্রান্সের হারার পরপরই ,আমার নির্দোষ এবং কচি শিশুমন থেকে ফরাসিরা বিদায় নেয় । এ কেমন দল ? বাসার লোকজন বেশ ডাকাবুকা ধরণের এক দলের সমর্থক । নাম ব্রাজিল । ওটাও সমর্থন করা যেত । কিন্তু সমস্যা হলো তাদের জার্সি । হলুদ রঙ এর ক্যাটকেটে এক জার্সি পড়ে তারা । কোনভাবেই আমার নির্দোষ এবং কচি শিশুমনে , হলুদ রঙ টি বিশেষ ভাল কোন প্রভাব ফেলতে পারলো না । অতএব আমি ঝুলেই থাকলাম ।

কাদের সমর্থন করব – এই ব্যাপারে আলোর দেখা পেলাম , আর্জেন্টিনা-নাইজেরিয়া ম্যাচের দিন । আর্জেন্টিনা নামটিই যথেষ্ট আবেদনময়ী , কেমন একটা ইংলিশ ইংলিশ ভাব আছে । তার উপর দলটি খেলছেও চমৎকার একটা জার্সি পড়ে । নেভি ব্লু জার্সিতে সাদা ৩ স্ট্রাইপ । প্রায় ফ্রান্সের মতই । তাছাড়া , প্লেয়ারগুলিও কেমন হ্যান্ডসাম দেখতে । এই দলটাই একদম সঠিক । জিদানের জায়গায় বাতিস্তুতা কেই বেশ মনে ধরলো ।

সমর্থনের শুরু টা হয়তো এইভাবে , বাতিস্তুতা – আয়ালা- সরিন দের দেখে । কিন্তু কেউ যদি আমাকে জিগেস করে , হৃদয়ে আর্জেন্টিনা দলটার প্রতি আবেগ জন্মানোর কারিগর কে বা কি? সেটার উত্তরে আমি এক মুহুর্ত সময় দেরী করব না । ম্যারাডোনা , ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা ।

ম্যারাডোনার খেলা কখনো আমি লাইভ দেখিনি , আমার জন্মের আগেই তার পিকটাইম শেষ । আমার জন্মের পর থেকে তার জীবনকাহিনীটা শুধুই স্খলনের । তাতে কিছুই আসে যায় না । নামটা যখন ম্যারাডোনা , আবেগ তৈরী করতে খেলা লাইভ দেখাটা কোন বিষয় নয় তখন ।

ম্যারাডোনার সাথে আমার পরিচিতি পর্বটা , আমার কোন মামার কাছ থেকে । মামা নিজে ব্রাজিলের একনিষ্ট সমর্থক – যেটা আমি অনেকদিন পরে জেনেছি , ভাবতাম তিনি আর্জেন্টিনা ফ্যান – বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে , আমার আর্জেন্টিনাপ্রীতি দেখে, সারাদিনই তাঁর কথা বলতেন , ম্যারাডোনার কথা । কিভাবে সে আর্জেন্টিনাকে একা একা বিশ্বকাপ জেতালো , হ্যান্ড অব গড আর সেই ৫-৬ জনকে কাটিয়ে করা গোলটার গল্প , আর ১৯৯৪ এ ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ হওয়ার গল্প । আমি হা করে শুনতাম । আমার নির্দোষ এবং কচিমন , এইসব গভীর কাহিনীর মধ্যে , শুধু ৫-৬ জনকে কাটিয়ে করা গোলটাই বুঝত – বাকি জিনিসগুলি ধরতে পারতাম না । হ্যান্ড অব গড মানে তো আল্লাহর হাত , ফুটবলে আসবে কোত্থেকে । আর ড্রাগ টেস্ট টা করতে হলো কেন ম্যাচ শেষে সেটাও তো পরিস্কার না । মজার ব্যাপার , কাটিয়ে গোল দেয়াটাকে আমার কাছে খুব সাধারণ একটা ব্যাপারই মনে হত , ফুটবল তো গোলেরই খেলা – নাহয় কাটিয়েছেই ৫-৬ জনকে । কিন্তু হ্যান্ড অব গড কিংবা ডোপ টেস্টে বাদ পড়া – চোখে না দেখেও ডিয়েগো আমার ট্র্যাজিক হিরো ।

স্বল্প শব্দভাণ্ডার , এবং দুর্বল লেখনীর কারণে আমি আমার ব্যক্তিগত আবেগটুকু কখনোই লেখায় ফোটাতে পারি না । তা নাহলে , এই অনুচ্ছেদে বোঝানোর চেষ্টা করতাম – ২০০৬ এর কথা – যেই বছর আমি সত্যি সত্যি খেলার সবরকম নিয়ম কানুন বুঝে ফুটবলটা সত্যি সত্যি দেখা শুরু করেছি , সেই বছরের ম্যারাডোনা নিয়ে আমার আবেগটুকুর কথা । দৈনিক পত্রিকাগুলি , বিশেষ উপলক্ষে সাপ্লিমেন্ট প্রকাশ করে আলাদা । বিশ্বকাপের বছর সেটি বিশ্বকাপ নিয়েই হয় । বলাই বাহুল্য সে বছর , প্রতিটি বিশ্বকাপ কাভার করে এরকম একটা সিরিজ ফিচার ছিল । সেখানে ১৯৯০ আর ১৯৮৬ এর সালের বিশ্বকাপ নিয়েও দুটি ফিচার ছিল । ছিয়াশির ফিচার নিয়ে কোন কথা বলব না । তবে ৯০ এর ফিচার থেকে , মনে করে করে কিছু সারাংশ লাইন উদ্ধৃত করি । আমার কিছুই মনে নেই লেখাটার , লেখকের নামটাও মনে নেই । শুধু সারমর্ম টুকু মনে আছে ।

” ব্রেমে যখন পেনাল্টিতে বাম প্রান্ত দিয়ে বল জালে ঠেলে দিলেন , ম্যাচের বয়স তখন ৮৫ মিনিট । আর্জেন্টিনা সমর্থকদের তখন মিরাকল এর জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না ।

ম্যাচ শেষ হলো । ম্যারাডোনা কাঁদছেন । তারা সাথে কাঁদছেন আরো কোটি ভক্ত সমর্থককে । ছিয়াশির ম্যারাডোনা বাংলাদেশকে আর্জেন্টিনা নামে একটি দেশ কে চিনিয়েছিলেন । আর নব্বইয়ের ম্যারাদোনা কোটি বাঙালির অন্তরে জায়গা করে নিলেন । কখনো গোল অব দ্যা সেঞ্চুরি করে বুনো উন্মত্ততায় কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে ছুটে গিয়ে আর কখনো বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়ে । ম্যারাদোনা কোন খেলোয়াড়ের নাম নয় , একটা আবেগের নাম । ফুটবল আবেগ ।”

ম্যারাডোনা হচ্ছেন সেই লোক , যাকে বেশিরভাগ মানুষ এখনো ইন্ডিভিজ্যুয়াল ব্রিলিয়ান্সের শেষকথা মেনে নিয়েছেন , যার ফুটবল রোমান্টিসিজমের কথা ভাবলে এখনো শরীরের রোম দাঁড়িয়ে যায় , যার বানিয়ে দেয়া আবেগের প্ল্যাটফর্মে যুগের পর যুগ ট্রফি না জেতা একটা দলকে সাপোর্ট দিয়ে যাওয়া যায় , যার পক্ষ নিয়ে দিনের পর দিন , রাতের পর রাত রগ ফুলিয়ে তর্ক করলে আফসোস হয় না ।

শুভ জন্মদিন ডিয়েগো ম্যারাডোনা!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

five × one =