রিয়াদ মাহরেজ : উইঙ্গার না উইংব্যাক?

আলোচনা শুরু করার আগে জেনে নেওয়া যাক এই দুটো টার্ম দ্বারা কি বোঝানো হয়। উইঙ্গার মূলত আক্রমণভাগের খেলোয়াড়। তারা দলের মূল স্ট্রাইকারের দুইপাশে খেলে থাকেন। অর্থাৎ সে হিসেবে ৪-৩-৩ ফর্মেশনে আক্রমণভাগের তিনজনের মধ্যে দুইপাশের দুইজনকে উইঙ্গার বলে। ৪-২-৩-১ বা ৩-৪-৩ ফর্মেশনের বেলাতেও সেটাই। আক্রমণভাগের তিনজন বা চারজন খেলোয়াড়ের মধ্যে যারা দুইপাশে খেলেন, তারাই উইঙ্গার। আর উইঙ্গারের একটু পেছনে অর্থাৎ মিডফিল্ডের দুইপাশে যারা খেলে থাকেন, দল তিন ডিফেন্ডার-সম্পন্ন হলে তাদেরকে উইংব্যাক বলে, আর চার ডিফেন্ডার সম্পন্ন হলে তাদেরকে ওয়াইড মিডফিল্ডার (রাইট/লেফট) বলে। অর্থাৎ ৪-৪-২ ফর্মেশনে মিডফিল্ডের দুই পাশে যারা খেলবেন তারা ওয়াইড মিডফিল্ডার। এবার আসা যাক রিয়াদ মাহরেজ এর ব্যাপারে।

রিয়াদ মাহরেজ : উইঙ্গার না উইংব্যাক?
৪-৪-২ ফর্মেশনে ওয়াইড মিডফিল্ডার/উইঙ্গার দের অবস্থান
রিয়াদ মাহরেজ : উইঙ্গার না উইংব্যাক?
৪-২-৩-১ ফর্মেশনে উইঙ্গারদের অবস্থান
রিয়াদ মাহরেজ : উইঙ্গার না উইংব্যাক?
৪-৩-৩ ফর্মেশনে উইঙ্গারদের অবস্থান
রিয়াদ মাহরেজ : উইঙ্গার না উইংব্যাক?
৩-৪-৩ ফর্মেশনে (তিনজন বিশিষ্ট রক্ষণ) উইংব্যাক ও উইঙ্গারদের অবস্থান
রিয়াদ মাহরেজ : উইঙ্গার না উইংব্যাক?
৪-১-৪-১ ফর্মেশনে উইঙ্গারদের অবস্থানে

গত মৌসুমে ডে ব্রুইনিয়া, ডেভিড সিলভা, বার্নার্ডো সিলভা, লেরয় সানে, রহিম স্টার্লিং, সার্জিও অ্যাগুয়েরো ও গ্যাব্রিয়েল জেসুস-সমৃদ্ধ আক্রমণভাগ নিয়ে দোর্দণ্ড প্রতাপে লিগ জেতার পরেও এই মৌসুমে ক্লাব রেকর্ড অর্থ ব্যয় করে লেস্টার সিটি থেকে আলজেরিয়ার তারকা উইঙ্গার রিয়াদ মাহরেজ কে দলে নিয়ে এসেছে ম্যানচেস্তার সিটি। নিন্দুকেরা প্রথমে বলাবলি শুরু করেছিল, খামোকা অর্থ খরচ করেছে সিটি, ফর্মের তুঙ্গে থাকা সানে-স্টার্লিং, ডে ব্রুইনিয়া ও দুই সিলভাকে হটিয়ে মূল একাদশে জায়গা পাওয়ার সুযোগ কোথায় মাহরেজের? কারণ সবাই জানতেন, মাহরেজ মূলত একজন উইঙ্গার। লেস্টারের কাউন্টার অ্যাটাকিং সিস্টেমে মাহরেজের ভূমিকাটা ছিল উইংয়ে থেকে প্রতিপক্ষ রক্ষণের জমাটবদ্ধ অবস্থা ভেদ করা, দ্রুতগতির ড্রিবলিং ও দূরপাল্লার শটের মাধ্যমে। লেস্টারের আক্রমণের সিংহভাগ কাজই মাহরেজকে একা করতে হত। সে কাজ ম্যানচেস্টার সিটিতে করতে পারবেন, সে নিশ্চয়তা কোথায়? কেননা পেপ গার্দিওলার অধীনে ম্যানচেস্টার সিটি চূড়ান্তমাত্রার পজেশন-বেসড ফুটবল খেলাতে পছন্দ করেন দলকে। অর্থাৎ বল পায়ে রেখে ধীরে ধীরে আক্রমণ রচনা করতে পছন্দ করেন। সেখানে মাহরেজের মত দ্রুততগতির কাউন্টার অ্যাটাকিং সিস্টেমে খেলে আসা খেলোয়াড়ের জায়গা কোথায়? মাহরেজের জায়গা হবে বেঞ্চে, ৬০ মিলিয়ন দামে সিটির সবচেয়ে দামী খেলোয়াড় হিসেবে দলে আসা মাহরেজকে খামোকাই কিনে শত্রুদের শক্তিহ্রাস করেছেন গার্দিওলা, নিশ্চিত করেছেন শিরোপাপ্রত্যাশী আর কোন দল যেন মাহরেজকে কিনতে না পারেন – নিন্দুকদের কত কথা!

সময় যাচ্ছে, সবাই আস্তে আস্তে বুঝতে পারছেন মাহরেজকে গার্দিওলা খামোকা কেনেননি। মাহরেজ কে কেনার পেছনে গার্দিওলার নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল, আর সেটাই আস্তে আস্তে সবাই বুঝতে পারছে। সেটা ব্যাখ্যা করার জন্য গত মৌসুমে সিটির রক্ষণভাগের ব্যবস্থা আর এই মৌসুমে সিটির রক্ষণভাগের ব্যবস্থার তুলনা করাটা উচিত।

গত মৌসুমে সিটি রক্ষণের পেছনে প্রচুর খরচ করে। দলে আসেন দুই রাইটব্যাক দানিলো ও কাইল ওয়াকার। আসেন লেফটব্যাক বেঞ্জামিন মেন্ডি। গার্দিওলার পরিকল্পনা ছিল, রক্ষণের দুইপাশে ওয়াকার আর মেন্ডিকে যথাক্রমে দুই মূল রাইটব্যাক ও লেফটব্যাক বানাবেন সিটির। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ইনজুরির কারণে পুরো মৌসুমের জন্য মাঠের বাইরে চলে যান বেঞ্জামিন মেন্ডি। ফলে বাম পায়ের আক্রমণাত্মক লেফটব্যাকের চাহিদাটা মেটানোর জন্য বাকী মৌসুম গার্দিওলা ইংলিশ মিডফিল্ডার ফাবিয়ান ডেলফকে দিয়ে কাজ চালান। ডেলফ যেহেতু মূলত একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ছিলেন, তাই লেফটব্যাক হিসেবে যখন তিনি খেলতে আসলেন, সেরকম আক্রমণ করতে চাইতেন না তিনি রক্ষণ থেকে উঠে গিয়ে। ফলে রক্ষণ থেকে উঠে আক্রমণ করার দায়িত্বটা পেপ গার্দিওলা কাইল ওয়াকার কেই দিয়েছিলেন। ফলে সিটির ম্যাচগুলোতে দেখা যেত, ফাবিয়ান ডেলফ নিচে বসে আছেন, ওদিকে উপরে উঠে কাইল ওয়াকার ক্রসের পর ক্রস করে যাচ্ছেন ডিবক্সে। দুইজনের মধ্যে কাইল ওয়াকার ছিলেন অনেক বেশী আক্রমণাত্মক।

এই মৌসুমে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। চোট থেকে ফিরে এসেছেন মেন্ডি। ফলে যথারীতি সিটির মূল লেফটব্যাক হিসেবে মূল একাদশে নিজের জায়গাটাও ফিরে পেয়েছেন তিনি। রক্ষণের অপর পাশে যথারীতি রয়েছেন কাইল ওয়াকার। মেন্ডি আসার পর থেকে রক্ষণ থেকে উপরে উঠে আক্রমণ করার দায়িত্বটা মেন্ডি নিজেই নিয়ে নিয়েছেন ওয়াকারের কাছ থেকে। এই মৌসুমে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ওয়াকার বলতে গেলে আক্রমণ করার জন্য উপরেই উঠছেন না। অনেকটা সেন্টারব্যাকের মত নিচে খেলছেন তিনি। আর ওয়াকার যে সেন্টারব্যাক হিসেবেও নিচে যে বেশ ভালোই খেলতে পারেন, সেটা আমরা বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের ম্যাচগুলোতেই দেখেছি। ৩-৫-২ ফর্মেশনে তিন জন সেন্টারব্যাকের একজন থাকতেন ওয়াকার। আর রাইট উইংব্যাক হিসেবে খেলানো হত কিয়েরান ট্রিপিয়েরকে।

৪ ডিফেন্ডার-সম্পন্ন যে ফর্মেশনেই গার্দিওলা সিটিকে খেলান না কেন (মূলত ৪-১-৪-১/৪-৩-৩), খেলা শুরুর পর দেখা যাচ্ছে লেফটব্যাক মেন্ডি আসলে উপরে উঠে গিয়ে উইঙ্গারই হয়ে যাচ্ছে, নামছেন খুব কমই। ফলে মেন্ডি ফেলে রাখা জায়গাটা ‘কভার’ দিচ্ছেন গার্দিওলার সিস্টেমের বামদিকের সেন্টারব্যাক – আয়মেরিক লাপোর্তে। লাপোর্তে না খেললে যে কাজটা দলের অধিনায়ক ভিনসেন্ট কম্পানিকে দিয়ে গার্দিওলা করাতেন। এ কারণেই আয়মেরিক লাপোর্তে কেও আমরা এই মৌসুমে দেখছি সিটির কৌশলের অবিচ্ছেদ্য এক অংশ হিসেবে।

তো, যা বলছিলাম, মেন্ডি উপরে চলে যাওয়ার কারণে মেন্ডির ফেলে রাখা জায়গায় নিচে রক্ষণ কাজ করেন লাপোর্তে, একটু বামদিকে সরে এসে। আরেক সেন্টারব্যাক জন স্টোনস ও আরেকটু বামদিকে সরে এসে কাইল ওয়াকারকে জায়গা করে দেন। ফলে সিটির ফর্মেশনটা ৪-১-৪-১/৪-৩-৩ থেকে অনেকটা ৩-১-৪-২ তে রূপ নেয়।

ম্যাচ শুরু পর এই মৌসুমে সিটির ছকটা বদলে অনেকটা এরকম হয়ে যাচ্ছে

ফলে দেখা যাচ্ছে, এদিকে মেন্ডি বামদিকে উপরে উঠে গিয়ে একদম মাঠের কিনারায় খেলছেন, ক্রস দিচ্ছেন, আর অপরদিকের ফুলব্যাক কাইল ওয়াকার মূলত সেন্টারব্যাক হয়ে গিয়েছেন। এখন এই পরিস্থিতিতে যদি গার্দিওলা ডানদিকের উপরে মাঠের একদম কোনায় কাউকে না রাখেন, তাহলে সেই জায়গাটা ফাঁকা পেয়ে প্রতিপক্ষ দল কাউন্টার করে সিটিকে জেরবার করতে পারে। যে সমস্যাটা গতবার দেখা গিয়েছিল। গত মৌসুমে যেহেতু মেন্ডি ছিলেন না, বামদিকের লেফটব্যাক ফাবিয়ান ডেলফ নিচেই থাকতেন, অপরদিকে ডানদিকে কাইল ওয়াকার উঠে যেতেন, কিন্তু বামদিকে ওঠার মত কেউ থাকত না। বামদিকে উপরে একদম কোনায় (লেফট মিডফিল্ডার/লেফট উইংব্যাক এর জায়গাটায়, উপরের ছবিতে যেখানে এখন মেন্ডি আছেন) পেপ গার্দিওলা কিছুদিন জার্মান উইঙ্গার লেরয় সানে কে খেলানোর চেষ্টা করেন, যার ফলাফল হয়েছিল ভয়াবহ। ম্যান সিটি যখন রক্ষণ করত বা প্রতিপক্ষে আক্রমণ যখন সামলাতো, সানে তখন নিচে নামতেই চাইতেন না, প্রচুর বল হারাতেন, বল পজেশনে রাখতে পারতেন না, উপরে বক্সে উঠে যেতে চাইতেন সবসময়।

রিয়াদ মাহরেজ : উইঙ্গার না উইংব্যাক?
গার্দিওলার সাথে

এখন মেন্ডি আসাতে গার্দিওলাকে বামদিক নিয়ে সেই সমস্যাটার মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। ডানদিকে কাইল ওয়াকার এখন গত মৌসুমের ফাবিয়ান ডেলফের মত রক্ষণাত্মক খেলছেন, দলের তৃতীয় সেন্টারব্যাক হয়ে যাচ্ছেন, আর ডানদিকের উপরে একদম কোনায় (রাইট উইংব্যাক এর জায়গাটায়) খেলানোর জন্য এই মৌসুমে মাহরেজকে নিয়ে এসেছেন গার্দিওলা। ফলে যে জিনিসটা হচ্ছে, মিডফিল্ডের দুই প্রান্তে একদম দুই কোণায় থাকার কারণে মাহরেজ ও মেন্ডির প্রতি মনোযোগ দেওয়ার জন্য প্রতিপক্ষের দুই-তিনজন খেলোয়াড়কে থাকতেই হচ্ছে। যার ফলে মাঝে জায়গা পেয়ে যাচ্ছেন রহিম স্টার্লিং, ডেভিড সিলভা আর বার্নার্ডো সিলভারা। কেভিন ডে ব্রুইনিয়ার ইনজুরির কারণে এই মৌসুমে বার্নার্ডো সিলভা তাঁর ঝলক দেখাতে পারছেন। মেন্ডি ও মাহরেজ এর কারণে মাঝে যে জায়গাটা ফাঁকা হচ্ছে, সেই জায়গায় ডেভিড সিলভা তাঁর স্বভাবজাত সেন্ট্রাল মিডফিল্ড থেকে পাসের ফুলঝুরি ছড়াতে পারছেন, বার্নার্ডো সিলভার সাথে রসায়নটাও জমছে বেশ (যে রসায়নটা গত মৌসুমে কেভিন ডে ব্রুইনিয়ার সাথে ছিল), আর ওদিকে লেরয় সানে বা রহিম স্টার্লিং এর একজন সহকারী স্ট্রাইকার হিসেবে যখন তখন প্রতিপক্ষের ডিবক্সে ঢুকে রাখার লাইসেন্স নিয়ে রেখেছেন গার্দিওলার কাছ থেকে। স্টার্লিং বা সানের উপরে ডিবক্সে পূর্ণাঙ্গ স্ট্রাইকার হিসেবে খেলছেন সার্জিও অ্যাগুয়েরো ও গ্যাব্রিয়েল জেসুসের মধ্যে যেকোন একজন। আর নিচে ওয়াকার-স্টোনস-লাপোর্তের রক্ষণভাগে প্রয়োজন হলে সহায়তা করার জন্য ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ফার্নান্দিনহো আরেকটু নেমে গিয়ে মাঝে মাঝে চতুর্থ ডিফেন্ডারের ভূমিকা পালন করেন।

নতুন ভূমিকায় মাহরেজ খেলছেনও দুর্দান্ত। বার্নলি, টটেনহ্যাম, কার্ডিফের সাথে গোলও পেয়েছেন।

কে বলেছে গার্দিওলা খামোকা বসিয়ে রাখার জন্য খেলোয়াড় কিনেন?

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

seven − four =