কোপা আমেরিকা ২০১৫ এবং ল্যাটিন ফুটবলের অনিশ্চিত ভবিষ্যত

সকল জল্পনা কল্পনার সমাপ্তি ঘটিয়ে যবনিকা ঘটলো কোপা আমেরিকার। পাওয়া না পাওয়ার খাতায় যোগ হলো অনেক কিছুই। আরও একটি বার জাতীয় দলের হয়ে ফাইনাল না জিতার বেদনা ভর করলো এক দশক ধরে ফুটবল বিশ্ব কাঁপানো তারকা লিওনেল মেসির। আর শত বছরের অপ্রাপ্তি আর রানার্সআপ হবার গ্লানি ঘুচিয়ে ঘরের মাঠেই শিরোপা জিতে নিলো চিলি।

কোপা আমেরিকার এবারের আসরের দিকে তাকালে অনেক দিকই উঠে আসে। পাঠকদের জন্য আজ সেগুলোর প্রতি আলোকপাত করার প্রয়াস থাকবে।

রেফারিং- এবারের কোপা আমেরিকা রেফারিং ছিলো অন্যতম বাজে উদাহরণ। শুধু বাজে নয়, একেবারে জঘন্য। রেফারিদের অধিকাংশই এবারের কোপায় প্রচুর ফাউল করতে দিয়েছেন। প্রথমেই মনে পড়ে ফাইনালে চিলির ডিফেন্ডার গ্যারি মেডেলের হাই বুট ফাউলের কথা। ইউরোপ বা বিশ্বের অন্য যে কোনো জায়গায় এটা নিশ্চিতভাবেই সরাসরি লাল কার্ড পাবার যোগ্য অপরাধ। কিন্তু, রেফারি এটা হলুদ কার্ড দিয়েই ক্ষান্ত হয়েছেন, এমনকি ফাউলটার শিকার যদি লিওনেল মেসির মতো হাই প্রোফাইল খেলোয়াড় না হতেন, তাহলে কোনো কার্ড দেয়া হতো কি না সিদ্ধান্ত। প্রচুর ভুল রেফারিংও হয়েছে এবারের কোপায়।চিলির বিরুদ্ধে উরুগুয়ের এডিসন কাভানিকে পুরো অনৈতিকভাবে লাল কার্ড দেখানো হয় যদিও দেখা যায় চিলির সেই মিডফিল্ডার পুরোপুরিই দোষী ছিলেন অশালীন আচরণ করে কাভানিকে উত্যক্ত করতে। মনে পরে নেইমারকে অসংখ্য ফাউল করা কলম্বিয়ার ম্যাচ কিংবা আর্জেন্টিনা কলম্বিয়ার ম্যাচে মেসি বা রড্রিগেজের হলুদ কার্ড। এর সবগুলোই রেফারি দিয়েছেন ফাউলের কারণে নয়, তার বিরুদ্ধে ফাউলের জন্য কেন সতর্ক করা হচ্ছে না তা নিয়ে অভিযোগ করাতে।

479474914-1436076419-800

এবারে আসা যাক স্বাগতিকদের ব্যাপারে। ২০১১ সালের কোপা আমেরিকাতে আর্জেন্টিনা নিজেদের মাঠে খেললেও ভ্রমণ করেছে পুরো চার চারটি শহর। সেক্ষেত্রে, এবার ২০১৫ সালে চিলির খেলোয়াড়রা এক সান্টিয়াগো স্টেডিয়ামেই খেলেছে তাদের পুরো টুর্নামেন্ট। এছাড়াও, পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে চিলির বিরুদ্ধে থাকছে বাজে রেফারিং এর দৃষ্টান্ত। কোয়ার্টার এবং সেমিফাইনালে উরুগুয়ে এবং পেরুর একজন করে খেলোয়াড়কে অনৈতিকভাবে লাল কার্ড দেখিয়েই ফাইনালের পথ সুগম করেছে তারা। টুর্নামেন্টের ফিক্সচারও এমনভাবে করে হয়েছে যাতে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার কেউই তাদের সাথে ফাইনালের আগে মুখোমুখি না হয়। আর্জেন্টিনা যদিও ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছে, নিশ্চিত লাল কার্ড প্রাপ্য গেরি মেডেলকে হলুদ কার্ড পেয়েছেন, এবং পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনার চেয়ে ভালো খেললেও কার্ড খাওয়ার ব্যাপারে নির্ভয় থেকে, আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের যথেষ্ট ফাউল করে নিশ্চিতভাবে খেলেই জয় আদায় করে নিয়েছেন। এককথায় স্বাগতিকদের প্রতি চরম পক্ষপাতিত্বের নিদর্শন হয়ে থাকবে এই কোপা আমেরিকা।

hqdefault

এবারে খেলার মান। ওপেন প্লে এর কিছু গ্রুপ ম্যাচ বাদ দিলে কোপার খেলার মান ছিল খুবই বাজে। ল্যাটিন দ্রুপদী সৌন্দর্যের দেখা পাওয়াই ভার। আর তার পথে প্রধান বাধাই ছিলো এই বাজে রেফারিং। মারদাঙ্গা ডিফেন্সকে প্রশ্রয় দেয়ার ফল ছিলো এর মূল কারণ। সৌন্দর্যের মূল আকর্ষণ দুই দল- ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা তাদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারেনি এই কারণেই। রেফারিং এর বাজে নিদর্শন বাদ দিলেও শুধু খেলার মানেও ইউরোপের চেয়ে যোজন যোজন পিছিয়ে ছিলো মেসি নেইমার আগুয়েরো সানচেজ ভিদালের মতো তারকাঠাসা এই কন্টিনেন্টাল টুর্নামেন্টটি।

শেষতক ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার প্রসঙ্গ। কোপার মূল আকর্ষণ দুই দলের সমস্যার মূলে ছিলো কোচিং। ব্রাজিলের মতো শিল্পনির্ভর দলকে ডিফেন্সিভ খেলান দুঙ্গা। পুরো ব্রাজিল দল যেন খাপছাড়া খাপছাড়া। সবাই যেন তাকিয়ে এক নেইমারের দিকে। কলম্বিয়া তাই ডার্টি ফুটবল খেলে নেইমারকে ক্রমাগত ফাউল করে জিতে নেয় তাদের ম্যাচ। আর সে ম্যাচের শেষেই অধৈর্য্য নেইমার খেয়ে বসেন লাল কার্ড এবং চার ম্যাচ ব্যান। নেইমার নেই তো ব্রাজিলের কোপাও নেই। কিন্তু, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার মেসি থেকেও যে নেই। কোচ টাটা মার্টিনো বার্সায়ও পারেননি, আর্জেন্টিনায়ও নেই। ফেরারি বা পোরশে থাকলেই যে হয় না, তার যথাযথ ব্যবহার জানতে হয়, টাটা মার্টিনোর অধীনে লিও মেসির খেলা দেখে তাই মনে হয়। বার্সেলোনার সব আক্রমণ যেখানে একবার হলেও মেসি হয়ে ঘুরে আসে, সেখানে আর্জেন্টিনায় ফাইনালে মেসি কয়েকবার হাত বাড়িয়েও বলই পাননি। আর্জেন্টিনার অবশ্য আরেকটা সমস্যা থাকতে পারে। অতিরিক্ত আবেগ এবং ফাইনালে চোক করা। ২০১৪ বিশ্বকাপে সাবেক চোকার জার্মানীর কাছে হেরে যেন জার্মানির ১৮ বছরের চোকিং ভূত চেপে বসেছে আর্জেন্টিনার। এক বছরের মাথায় দুই ফাইনাল হারাটা কি চোকিং নয়, তাও আবার বিশ্ব র্যাবঙ্কিং এর সেরা দল নিয়ে?

কোপা আমেরিকার মান উন্নয়ন, রেফারিং এর উন্নতি, স্বাগতিকদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বর্জন এসব না করলে ইউরোপের সাথে টেক্কা দেওয়া আরো কঠিন হয়ে পড়বে। আর্জেন্টিনার অন্যতম সেরা প্রজন্ম বা ব্রাজিলের শিল্পনির্ভর খেলাও ব্যার্থই থেকে যাবে। ইউরোপের হয়ে বিশ্বকাপ জিতা সাবেক তিন দলের মধ্যেই একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিলো- একই ক্লাবের অনেক খেলোয়াড় এক সাথে জাতীয় দলে খেলা। এতে তাদের মধ্যে বোঝাপড়াটা আগের থেকেই ছিলো। ল্যাটিন ক্লাবগুলোর মানও আগের মতো নেই যে তারা ইউরোপ থেকে নিজেদের খেলোয়াড় এনে টিম-কেমস্ট্রি তৈরি করবে। তবে কি ল্যাটিন সৌন্দর্য এবাভেই ইউরোপের ফুটবলের অর্থ আর নীতির কাছে হার মেনে যাবে ? ২০১৮ সালে রাশিয়ায় ইতিহাস কি টানা চতুর্থবারের মতো ইউরোপ থেকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেখবে ? কোপা আমেরিকা ২০১৫ আমাদেরকে সেই প্রশ্নটাই আরো একবার মনে করিয়ে দিলো।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

nineteen − 14 =