সামনের রাস্তাটা ভারি লম্বা শ্রীলংকার

কয়েকদিন আগে এক ক্রিকেট ওয়েবসাইটে পোল দেখলাম । পোলের প্রশ্নঃ “শ্রীলংকার ইতিহাসের সেরা ব্যাটসম্যান কে ?” অপশন তিনটায় অবাক করার মত কিছুই ছিলো না । কুমার সাঙ্গাকারা, অরবিন্দ ডি সিলভা আর মাহেলা জয়াবর্ধনে । তবে সেই পোলের প্রশ্নের সবচাইতে যৌক্তিক উত্তরটা খোঁজাটা আমার মিশন না । তার চেয়ে বেশি আগ্রহ আমার শ্রীলংকার একটা জেনারেশন নিয়ে কথা বলা । যেই জেনারেশন আসলেই শ্রীলংকার ক্রিকেটকে নতুনভাবে চিনিয়েছে ।

image_20130317172208

অরবিন্দ ডি সিল্ভার খেলা কি আসলে খুব বেশি দেখেছি ? সোজাভাবে উত্তর দিতে বললে বলবো , “না …”
বেশকিছু ওয়ানডে ইনিংস দেখেছি খেলা ছেড়ে দেবার আগ দিয়ে । ডি সিলভার ক্যারিয়ারের আসল সময়টায় তার খেলা দেখার বয়স আর সুযোগ আমার হয় নাই । শ্রীলংকা মানের আমার কাছে মুরালিধরণ, শ্রীলংকা মানে আমার কাছে জয়সুরিয়া-আতাপাত্তু, শ্রীলংকা মানে আমার কাছে সাঙ্গা-জয়া । শ্রীলংকা নিয়ে কথা বলতে গেলে একটা বড় প্রশ্ন থেকেই যায় । শ্রীলংকার আসল “গোল্ডেন জেনারেশন আসলে কোনটা ??”

72808643_p88_38830b-1404489076

আমি আগেই বলে নেই, হোমগ্রাউন্ডে একটা ওয়ানডে বিশ্বকাপ জেতা আসলে ক্রিকেটের আদ্যোপান্ত উন্নয়নের সূচক নয় । তাই চোখবুজে ৯৬ এর দলকে সেরা বলে দিলে সেটা ক্রিকেটের ভালো ছাত্রের পরিচায়ক হবে না । খেলাটার আসলে উন্নয়নের জায়গা বাইরে গিয়ে টেস্টে ভালো খেলতে শেখা আর দলে সব রোলের জন্যে রেডিমেড ভালো ভালো ব্যাক আপ থাকা । আর ক্রিকেটের খেলাটাই এমন যেখানে আসলে কোন খেলোয়াড়কে কোন জেনারেশনে ফেলে দেওয়ার মত কঠিন কাজ আর ২য়টি নেই । শচীন টেন্ডুলকারকে আমি খেলা শুরু করার সময়ে তার টীমমেট রবি শাস্ত্রীর জেনারেশনে ফেলবো ? নাকি সোনালি সময় কাটানোর জন্যে সৌরভ আর দ্রাবিড়দের জেনারেশনে রাখব ? নাকি ২০১১ সালে একসাথে বিশ্বকাপ জেতাতে কোহলি আর গাম্ভীরদের জেনারেশনে ফেলে দেবো ?? তেমনিভাবে আমিও অরবিন্দ ডি সিলভাকে ৮৪ তে টেস্ট খেলা শুরু করায় না রাখতে পারবো রোশন মহানামা আর রানাতুঙ্গাদের জেনারেশনে , না রাখতে পারবো ৯৭ তে টেস্ট খেলা শুরু করা মাহেলার জেনারেশনে । সেই তর্কে যাওয়াটাও অনুচিত ।

hi-res-fb645dc6c9a3d302bdae27bef682e482_crop_north

তার চাইতে বরং শ্রীলংকা কীভাবে অনেকগুলো দিন এশিয়ার সবচেয়ে ডিসিপ্লিনড ইউনিট হয়ে ক্রিকেট খেলে গেলো সেটা নিয়ে কথা বলি ।
মারভান আতাপাত্তু টেস্ট খেলা শুরু করেন ১৯৯০ তে আর তার দীর্ঘদিনের ওপেনিং পার্টনার জয়সুরিয়াকেও শ্রীলংকা প্রথম টেস্ট খেলিয়ে দেয় তার পরের বছরেই । আর তারও পরে শ্রীলংকা পায় চামিন্দা ভাস আর আর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত হাত মুত্তিয়াহ মুরালিধরণকে । এই চারজনের কথা আলাদাভাবে বলার কারণ হলো , এই চারজন আসলে এমন কিছু নিয়ে এসেছিলেন যা পরের আরো দুই তিনটে ঝাঁকের ক্রিকেটারদের ছায়ার মত আগলে রেখেছিলো । এদের কারণেই মূলত লংকা অনেকদিন তাদের নতুন ক্রিকেটারদের নিয়ে জুয়া খেলতে পেরেছে । কখনো জিতেছে , কখনো হেরেছে । ক্রিকেটের সবচাইতে বড় মজার জায়গাটা এখানেই ।একটা দল সব সময়ই পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যেতে থাকে । এই চতুষ্টক লংকার হয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে তাদের আগের রানাতুঙ্গা আর ডি সিলভাদের জেনারেশন আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে এলো । তবে একটা জায়গাতে চোখ বোলালেই বুঝতে পারবেন লংকার রিকভারি প্রসেসটা কেন কঠিন হয় নাই । আতাপাত্তু আর জয়সুরিয়ার মিলিয়ে টেস্টের রান সংখ্যা ১২০০০ এর মতো । তবে তারা দলে থাকতে থাকতেই নতুন শতাব্দী শুরু হবার আগে ৯৭ তে লংকার টেস্ট দলে এসে গেলো মাহেলা জয়াবর্ধনে আর নতুন শতাব্দীর শুরুতে ২০০২ তে এসে গেলো কুমার সাঙ্গাকারা … যাদের একেকজনের নামের পাশেই বারো হাজারের মতো রান । বাড়ন্ত গাছের নিচে শিকর ফুঁড়ে তার চাইতেও ফলদায়ক গাছ উঠে আসা যাকে বলে । মাহেলা আর সাঙ্গারা এসে আতাপাত্তু-জয়সুরিয়া আর ডি সিলভাদের সিনিয়র হিসেবে পেয়েছেন । নীরবে সবার অলক্ষ্যে ভবিষ্যতের রসদ বড় হয়ে উঠেছে । তার ফলাফল লংকানরা পেয়েছে ২০০৭ আর ২০১১ সালে টানা দুটো বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলে । তবে ওয়ানডেতে ভালো পারফরম্যান্স অবশ্য অন্যান্য আরো অনেক জিনিসের উপরে নির্ভরশীল । ওরা থাকতে থাকতে পাশে দিয়ে দিলশানের মত খেলোয়াড়েরাও দলকে সার্ভিস দিতে শুরু করলো । এটাই ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় উন্নতির জায়গা । আপনার এখনকার দলে এমন একটা ঝাঁক থাকতে হবে যারা সবচাইতে সিনিয়র প্লেয়ারেরা চলে যাবার পরে ব্যাটনটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে তারপরের রাস্তা দেখবে ।

Kumar-Sangakkara-Test-out_3248688

বোলিং এ চামিন্দা ভাস আর মুরালি অনেকদিন থেকে যাওয়াতে লংকার আসলে অন্যদিক থেকে সাপ্লাইটা কতোটা দুর্বলভাবে এগোচ্ছিলো তা বোঝা যায় নি । কুলাসেকারা আর হেরাথেরা দলকে আগেপরে দারুন সার্ভিস দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন । আমার কাছে লংকার এখনকার দলের একমাত্র টেস্ট জেতানোর মতো বোলারের নাম হলো রঙ্গনা হেরাথ । মালিঙ্গা যতোটা ফ্র্যাঞ্চাইজি টীমের মালিঙ্গা … ততোটা লঙ্কার মালিঙ্গা লম্বা সময়ের জন্যে কখনোই হতে পারেন নাই । দিলহারা ফার্নান্ডো, ফারভিজ মাহারুফ আর নুয়ান জয়সারা এসেছেন, তবে দীর্ঘ রেসের হর্স হতে পারেন নাই দলের জন্যে । কিন্তু তারপর ?? শ্রীলংকার জন্যে আরেকটা কোয়েশ্চেন মার্ক । নুয়ান প্রদীপ – সামিন্দা ইরঙ্গা- থারিন্দু কুশলদের ফিউচারের উপরেই নির্ভর করছে শ্রীলংকার বোলিং এর ফিউচার …

Mahela-Jayawardene-Kumar-Sangakkara-ODI-batti_3237895

সাঙ্গা আর জয়াদের ছায়াতেই ভালো ব্যাটার যে লঙ্কায় আসে নি , তা বললে ভুল হবে । লাহিরু থিরিমান্নকে আমার মাঝেমাঝে খুবই সম্ভাবনাময় মনে হয়েছে । দিনেশ চান্দিমালকে অনেকেই নেক্সট সাঙ্গা বলেছেন । তবে ক্যারিয়ার যতই বড় হচ্ছে চান্দিমাল বোঝাচ্ছেন … সাঙ্গারা ডেইলি ডেইলি আসেন না । ভারতের সাথে যে ইনিংসটি খেলে ফেললেন , সে সম্ভাবনার অনুবাদ হোক দীর্ঘমেয়াদে- এমনটাই চাওয়া লংকার ক্রিকেটপ্রেমীদের । এঞ্জেলো ম্যাথুস আর থিসারা পেরেরার একসাথে ক্লিক করা শ্রীলংকার জন্যে খুব জরুরি সামনের দিন গুলোতে । ব্যাটসম্যান এঞ্জেলো ম্যাথুস অসাধারণ- তা জানার আর বাকি নেই কারো । এত কথা আসলে উঠছে পাকিস্তান সিরিজের পর থেকেই । সাঙ্গাকারার ইনিংসগুলো থাকাতেই বিশ্বকাপে কেউ লংকাকে নিয়ে এক কথা বলার ধৃষ্টতা দেখায় নি । তবে পাকিস্তান সিরিজের পরে চলছে ভারত সিরিজ । আর তারপরেই সাঙ্গাকারা বিদায় নেবেন ক্রিকেট থেকেই ।

896036-dinesh-chandimal

এবারে লংকার জন্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই । থিরিমান্নে-ম্যাথুস-চান্দিমালেরা পারবেন তো ভবিষ্যতের কয়েকটা জেনারেশনকে ছায়া দিয়ে আগলে রাখার মতো খেলোয়াড় হতে ? যেমনটা জয়সুরিয়া আর মুরালিরা পেরেছিলেন ?? পাকিস্তানের সাথে টেস্ট সিরিজটায় মুখ থুবড়ে পড়ার পরে ভারতের সাথে প্রথম টেস্টটাতেও প্রথম দুইদিন সুবিধার লাগে নি নতুন লংকাকে । যদিও শেষ দুইদিনের নাটকীয় ম্যাজিকে শেষ হাসিটা তারাই হেসেছে । কিন্তু হেরাথের বয়সও তো ৩৭ … আর কতদিন ? এর বাইরে শ্রীলংকা মোটামুটিভাবে তাদের নতুন নতুন চমকজাগানো বোলার নিয়ে আসার জন্যে বিখ্যাত । যাদের একশন আর বৈচিত্র বাকিদের ভড়কে দেয় । কখনো মেন্ডিস এসেছে , কখনো মালিঙ্গা আবার কখনো সেনানায়েকে … তাদের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন মুরালিধরনের বৈচিত্র্যের খেল তো তার ক্যারিয়ারের পুরোটা জুড়ে দলকে সার্ভিস দিয়েছে । সে রকম কেউ এসে কি নির্ভার করে দিতে পারবে লংকার ক্রিকেটকে ??

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

4 + four =