এক ল্যাম্পসির কথা

মূল – শাহ আকিব সারোয়ার

১৯৯৬ সালের কোনো এক সন্ধ্যা; ওয়েস্টহ্যাম ইউনাইটেড ক্লাবের কোচিং স্টাফদের সাথে ফ্যানদের এক মতবিনিময় সভা চলছে। সেখানে তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন ক্লাবের তৎকালীন ম্যানেজার হ্যারি রেডন্যাপ। সভায় উপস্থিত কোচিং স্টাফদের পাশেই টেবিলের এক কোনায় বসে আছে ১৮ বছর বয়সী তরুণ এক ফুটবলার; যে শুধু ক্লাবের একজন খেলোয়াড়ই নয়, সেইসাথে সম্পর্কে কোচ রেডন্যাপের আত্মীয়ও বটে। হঠাৎ একজন রেডন্যাপের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বসলেন- শুধুমাত্র পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণেই নাকি তিনি এই ছেলেটাকে অন্য তরুণ খেলোয়াড়দের চেয়ে বেশি সুযোগ দিচ্ছেন! অভিযোগটি শুনেই ক্ষিপ্ত হয়ে রেডন্যাপ বললেন, “আমি ওর সামনে এটা বলতে চাচ্ছিলাম না, তবে আমি আপনাকে এখনই বলছি, ও একদিন অবশ্যই সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছাবে!” যাকে নিয়ে এতো বিতর্ক, সেই তরুণ ফুটবলারটি অবশ্য সেদিন কিছু বলেনি, বলার প্রয়োজনও হয়নি; পরবর্তী ১৯ বছরে তিনটি প্রিমিয়ার লিগ, চারটি এফএ কাপ এবং একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা; সেইসাথে অসংখ্য ব্যক্তিগত অর্জন- তার হয়ে যা বলার বলে দিয়েছে! ছেলেটির নাম?… ফ্র্যাঙ্ক জেমস ‘ল্যাম্পাআআআআআআর্ড’!


ফুটবলার হিসেবে ল্যাম্পার্ডের শুরুটা খুব একটা সহজ ছিল না। ওয়েস্টহ্যামের হয়ে খেলার সময় ল্যাম্পার্ডের বাবা ছিলেন ক্লাবের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। অনেকেই তখন ল্যাম্পার্ডের বিরুদ্ধে বাড়তি সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তোলে। এমনকি এক ম্যাচে ওয়েস্টহ্যাম সমর্থকদের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের কারণে ল্যাম্পার্ড ফুটবল খেলাই ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি দ্রুতই সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দেন। শুরুর সেই কঠিন দিনগুলোর কথা স্মরণ করে হ্যারি রেডন্যাপ বলেন, “১৫-১৬ বছর বয়স থেকেই থেকেই আমি তাকে প্রতিদিন ট্রেইনিংয়ে লেগে থাকতে দেখতাম। তার মধ্যে যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা আমি দেখেছি, আমার পুরো জীবনে সেটা আর কারো মধ্যেই দেখিনি!” ২০০১ সালে বাবা এবং খালু দুইজনই ক্লাব থেকে বিদায় নিলে ল্যাম্পার্ডও ওয়েস্টহ্যাম ছেড়ে চেলসিতে যোগ দেন। আর এখানেই তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়ে ওঠেন।

বাবা বা চাচা নয়, ল্যাম্পার্ড শীর্ষে উঠেছেন নিজের যোগ্যতাবলেই

ল্যাম্পার্ডের ক্যারিয়ারের সেরা সময়টা শুরু হয় ২০০৪-০৫ মৌসুমে। সেবার জোসে মোরিনিয়োর অধীনে ল্যাম্পার্ড তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জেতেন; বোল্টনের বিপক্ষে তাঁর জোড়া গোলেই ৫০ বছরে প্রথমবার চেলসি লিগ শিরোপা নিশ্চিত করে। সে বছর ল্যাম্পার্ড প্রিমিয়ার লিগের “প্লেয়ার অফ দ্যা সিজন”ও নির্বাচিত হন। পরের মৌসুমে আবারও প্রিমিয়ার লিগ জেতার পাশাপাশি ব্যালন ডি’অর এবং ফিফা ওয়ার্ল্ড প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ার- দুটি পুরষ্কারেই তিনি রোনালদিনহোর পেছনে থেকে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। তবে জোসে মোরিনিয়োর চোখে ল্যাম্পার্ডই ছিলেন সেসময়ের বিশ্বসেরা ফুটবলার।
২০০৮ সালে মা’র মৃত্যুর এক সপ্তাহের মধ্যেই কোচের অনিচ্ছাসত্ত্বেও ল্যাম্পার্ড লিভারপুলের বিরুদ্ধে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমিফাইনাল খেলার সিদ্ধান্ত নেন, এবং একটি গোলও করেন। তবে ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর কাছে টাইব্রেকারে হেরে যাওয়ায় সে বছর আর ল্যাম্পার্ডের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা ছুঁয়ে দেখা হয়নি। চার বছর পর আবার তাঁর সামনে সুযোগ আসে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার। ফাইনালে ক্যাপ্টেন জন টেরির অনুপস্থিতিতে ল্যাম্পার্ডের নেতৃত্বেই বায়ার্ন মিউনিখকে হারিয়ে চেলসি প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার গৌরব অর্জন করে। এছাড়াও চেলসির হয়ে ল্যাম্পার্ড ৪টি এফএ কাপ, ২টি লিগ কাপ এবং ১টি ইউরোপা লিগ জেতেন। সেইসাথে তিনি দুইবার প্রিমিয়ার লিগের সেরা ফুটবলার এবং একবার উয়েফার সেরা মিডফিল্ডার হিসেবেও নির্বাচিত হন। রেকর্ড ২১১টি গোল করার পর ২০১৪-১৫ মৌসুমে ল্যাম্পার্ড চেলসি ছেড়ে নিউইয়র্ক সিটি এফসি’তে যোগ দেন। তবে সবাইকে অবাক করে সেই সিজনেই ধারে ম্যানচেস্টার সিটিতে খেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। শুরুতে ৬ মাস ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে খেলার কথা থাকলেও পরবর্তীতে তিনি পুরো মৌসুমই ম্যানচেস্টারে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হলেও ল্যাম্পার্ড কিন্তু চেলসিকে ভুলে যাননি। ইতিহাদ স্টেডিয়ামে চেলসির বিরুদ্ধে সমতাসূচক গোলটি করার পরও প্রিয় ক্লাবের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তিনি সতীর্থদের সাথে উদযাপন করা থেকে বিরত থাকেন। ২০১৫-১৬ মৌসুম থেকে তিনি নিউইয়র্ক সিটি’র হয়ে খেলা শুরু করেন। সেখানে এখন পর্যন্ত ৩১ ম্যাচে ১৫টি গোল করেছেন তিনি।

স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে এ ছিল এক নিয়মিত দৃশ্য

আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড ইংল্যান্ডের হয়ে মোট ১০৬টি ম্যাচ খেলেছেন, গোল করেছেন ২৯টি। তিনি ব্যতীত আর মাত্র সাতজন ফুটবলার ইংল্যান্ডের হয়ে কমপক্ষে ১০০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার গৌরব অর্জন করতে পেরেছেন। ২০১৫ সালে তাঁকে ‘Order of the British Empire’ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।

ল্যাম্পার্ডের অসংখ্য ম্যাচজয়ী পারফর্ম্যান্সের মধ্যে একটি এসেছিলো ২০১২ সালে চেলসির হয়ে বার্সেলোনার বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমিফাইনালে। মূলত অলআউট ডিফেন্সের উপর নির্ভর করে তর্কযোগ্যভাবে সেসময়ের সেরা দলটিকে হারালেও, দ্বিতীয় লেগে দশজন নিয়ে ২-০তে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় ল্যাম্পার্ডের অসাধারণ পাস থেকে রামিরেস গোল না করলে চেলসির পক্ষে হয়তো সে ম্যাচটি জেতা সম্ভব হতো না।
১৯৯৬ সালের সেই সন্ধ্যায় ল্যাম্পার্ডের ফুটবল প্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সেই ভদ্রলোক এখন কোথায় আছেন তা অজানাই রয়ে গেছে। তবে এরপর থেকে তিনি আর কোনো ফুটবলারের প্রতিভা নিয়ে নিয়ে কোনো মন্তব্য করেছেন বলে শোনা যায়নি!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

fourteen − 7 =