কার্ডিফে আবারো লাল সবুজের রুপকথা

“ তুমি আমার বায়ান্ন তাস, শেষ দানেও আছি,
তোমার নামে, ধরেছি আমার, সর্বস্ব বাজি”
৯০ দশকের এই ক্তুমুল জনপ্রিয় ব্যান্ডসঙ্গীতটি কালকে প্রথম মনে হল, যখন ৪২ কি ৪৩ তম ওভারে সবার চোখ ছানাবড়া করে দিয়ে বোলিঙে ম্যাশ নিয়ে এলেন সৈকত কে। আমিও ভেবেছিলাম হয়তো বল পাবে তাসকিন। কিন্তু বাজি ধরলেন অধিনায়ক, চমকে দিলেন সবাইকে। সেই চমকে কিউইরা এমনই চমকিত হল যে, কোরে আন্ডারসনের মতো ব্যাটসম্যান সৈকতের বলে এল বি ডব্লিউর শিকার, রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারলেন না, এত সুন্দর বল ছিল- ম্যাচ টা ঘুরে গেল মূলত এখানেই। কোরে আন্ডারসন ডাক মারার পর কিউইরা আর দাড়াতে পারেনি।
অনেকে হয়তো আরেকটু পিছনে ফিরে গিয়ে বলবেন সাকিবের টাইট বোলিঙে চাপে পড়ে “ডক্টর কেনি” মানে কিউই সেনাপতি কেন উইলিয়ামসনের রান আউট ম্যাচ ঘুরিয়ে দিয়েছে, যেভাবে সাকিব আউট টি করলেন, সেটা তার ক্লাস প্রমাণ করে। আর ব্যাটিঙের সময় তো আরও একবার দুর্দান্ত ভাবে প্রমাণ করলেন। সে কথা না হয় পরেই বলি। বল হাতে রুবেল ছিলেন এক কথায় অসাধারণ। তাসকিনকে নিয়ে বাজি ধরে থাকলে চন্দিকা আর ম্যাশকে সেখানেও জয়ী বলা যায়, গতির ঝড়ে ডক্টর কেনিকে পরাস্ত করেছেন অনেকবার, ভুগিয়েছেন রস টেলর কেও।সাকিব গতকাল উইকেট না পেলেও ছন্নছাড়া বোলিং করেন নি। অধিনায়ক ম্যাশও ভালোই করেছেন। তবে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিয়েছে সৈকত। ঘূর্ণির মায়ায়্ বন্দি করে অ্যান্ডারসন, নিশাম এবং আরও একজনকে ফেরত পাঠিয়েছেন প্যাভিলিয়নে।বাজিতে জয়ী ম্যাশ, বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য ২৬৬ রান।

বাংলাদেশ ব্যাটিঙে নামতে না নামতেই তিন উইকেট নেই। ব্যাটসম্যানদের দোষ দেবনা। কারণ ঐ সময় সাউদি যেভাবে সুইং করাচ্ছিলেন, তাতে তাদের কিছু করার ছিল বলে মনে হয় না। মাত্র ৮ রান করলেও তিন নম্বরে সাব্বির রহমান কেই আমার পছন্দ। ১২ রানে নেই তিন উইকেট আর ৩৩ রানে চার। মিলনে কে দারুণ ভাবে পুল করে চার মারার পরের বলেই মুশি বোল্ড! গতিতারকা মিলনের প্রতিশোধ। এই অবস্থা থেকে জেতার আশা কে করতে পারে? সত্য কথা বলি, আমি করিনি। অবস্থা টা ছিল এমন,
“ দুলিতেছে তরী ফুলিতেছে জল ভুলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মত!”
২০০৫ এ অসিদের হারানোর সময়ে হাল ধরেছিলেন আশরাফুল হাবিবুলের জুটি আর এবার হাল ধরতে এগিয়ে এলেন দুই নাবিক, সাকিব আল হাসান- যার নামে গালাগালির বন্যা বইয়ে দেওয়া হয়েছে এই কয় দিনে, সাকিব আর সাকিব নেই বলে! আরেকজন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ- সেই ২০১৫ বিশ্বকাপে ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরি করেছিলেন, সেটা বলার কারনে এই বাঙ্গালিই আতহার আলি খানকে নিয়ে কৌতুক করে! এরপর বাকিটা ইতিহাস!
স্থিতধী মাহমুদউল্লাহ হিসাব করে ঝুঁকি নিচ্ছেন, রান রেট ও তো দেখতে হবে, কখন আবার অঝোর ধারায় বর্ষা নামে তার তো ঠিক নেই। আর অন্যদিকে সাকিব তার পরিচিত আক্রমণের পথে না গিয়ে দুলতে থাকা তরী আগে ধাতস্থ করার কাজে মন দিলেন। তাই সব সময় রিয়াদের রান ই বেশি থেকেছে, কিন্তু তাতে সাকিবের কৃতিত্ব মলিন হচ্ছে না মোটেই। এভাবে একটু একটু করে এগোতে থাকে বাংলার তরী জয়ের বন্দরের দিকে। কৌশলী দুই নাবিক সাকিব আর রিয়াদের জুটিও ৫০,১০০,১৫০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করে। আমরাও আশাবাদী হতে থাকি- এবারো মনে হয় কার্ডিফ রুপকথার আরেক অঙ্ক এখানে অভিনীত হতে যাচ্ছে! ৬০ বলে ৭০ রান- সম্ভব যদি সাকিব রিয়াদ হাল ধরে থাকতে পারেন। এক পর্যায়ে দুজনের রানই ৯৮! কে আগে করবেন সেঞ্চুরি? ২০০ রানের জুটি হয়ে গেছে ততক্ষণে আর আমরাও আরেকটি রুপকথা দেখার অপেক্ষায়। প্রথমে শতক পূরণ হল সাকিবের। এরপর সাকিব খাপখোলা তলোয়ারের মতো ব্যাট দিয়ে কচুকাটা করতে লাগলেন কিউই স্বপ্ন! এক সময় মনে হচ্ছিলো, রিয়াদের শতক হবে তো? নাকি সাকিব এই ওভারেই সব শেষ করে দেবেন। দলকে জয় থেকে ৯ রান দূরে রেখে সাকিব বোল্ড হলেন। ততক্ষণে দাড়িয়ে গেছে কার্ডিফের পুরো গ্যালারি! অসাধারণ খেলেছেন সাকিব, একথা বললেও কম বলা হয়! বরং বাপ্পা মজুমদারের গানের দুটি লাইন এখানে প্রাসঙ্গিক,
“ সমালোচকের তোপের মুখে, পড়েছি হাজারবার,
ব্যাট আর বলে, মাঠে দিয়েছি, কঠোর জবাব তার”
ক্রিজে এলেন সৈকত। হবে তো মাত্র ৯ টা রান? নাকি বিষাদ সিন্ধুর ক্রিকেটীয় অঙ্ক লেখা হবে? নাহ, কিসের বিষাদ! মুখোমুখি হওয়া পরের বলেই চার মেরে শতক পূর্ণ করলেন রিয়াদ! তার উইকেটে সিজদা দেওয়া দেখে ১২ বছর আগের মোহাম্মদ আশরাফুলের সেঞ্চুরির পর সিজদার কথা মনে হচ্ছিলো।
বিজয় নিশ্চিত করলেন সৈকত, মিলনে কে চার মেরে। ক্রিকেট একটি ফানি গেম- হ্যা আসলেই ফানি। আবার অনেক সময় অনেক সিনেমার থেকেও শ্বাসরুদ্ধকর, সিনেমার থেকেও সুন্দর! নাহলে যেই সৈকতের হাতে ম্যাচ ঘুরে গিয়েছিলো আমাদের দিকে, সেই সৈকতই নেবেব উইনিং রান- এতটা তো কোন উপন্যাসের কাহিনিকেও হার মানায়! যেই সাকিবের নামে এত গালাগালি, তিনিই কিনা দাড়িয়ে গেলেন, করলেন দুর্দান্ত সেঞ্চুরি! যেই রিয়াদের পক্ষে কথা বলার জন্য এই বাঙালি আতহার আলি খানকে নিয়ে একের পর এক কৌতুক করে, সেই রিয়াদ খেলবেন এমন দুর্দান্ত ইনিংস!
বিজয়ের পর ম্যাশের উচ্ছাস দেখে লর্ডসের ড্রেসিংরুমে ২০০২ সালে সৌরভ গাঙ্গুলির জার্সি ওড়ানোর কথা মনে হচ্ছিলো শুধু।

আসলেই- সত্য কখনো কখনো গল্পের থেকেও বিস্ময়কর! উইলিয়াম শেক্সপিয়ার বলেছিলেন ঠিক কথাটাই! ক্রিকেটের মাঠে এটা প্রমাণ করলো বাংলাদেশ!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

five × four =