একজন কেভিন পিটারসেন

(একদম কাকতালীয় কিছু ঘটে না গেলে কেভিন পিটারসেন এখন ইংল্যান্ড দলের সাবেক খেলোয়াড় । বোর্ড আর প্রভাবশালী খেলোয়াড়দের সাথে মনোমালিন্যের কারণে আর শৃঙ্খলাজনিত কারণে ক্যারিয়ার পাট চুকিয়ে ফেলতে হলো বেশ সকাল সকাল । চলছে এশেজ । ক্রিকেটের সবচাইতে বড় দ্বিপাক্ষিক মহারণ । আর আধুনিক এশেজে ৫ জন ধ্বংসাত্মক সফল ব্যাটসম্যানের নাম বলতে বললে ৯০ ভাগেরই তালিকায় থাকবেন দক্ষিণ আফ্রিকান বংশোদ্ভুত এই ইংলিশ টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান । তাই এশেজ চলে আসায় তাকে নিয়ে শুরু হয়ে গিয়েছে স্মৃতিরোমন্থনও । অস্ট্রেলিয়ান ফটো সাংবাদিক ফিলিপ ব্রাউনও সেই দলে । লিখেছেন কেভিন পিটারেসেনকে নিয়ে । তার স্মৃতি , পিটারসেনের ভালো দিক , পিটারসেনের খারাপ দিক সবকিছু নিয়ে । আর গোল্লাছুটে থাকছে পিটারসেন ভক্তদের জন্যে সেই লেখারই বাংলা অনুবাদ)

মূল-ফিলিপ ব্রাউন
অনুবাদ- আসাদুজ্জামান হিমু

আমার জন্যে পিটারসেন আসলে কি ?
আপনি ক্রিকেটের ভক্ত হিসেবে তাকে ঘিরে গজিয়ে উঠা হাজারো বিতর্কে যে পক্ষেই থাকুন না কেন , আমার মত একজন পেশাদার ফটোগ্রাফারের জন্যে পিটারসেনের মত স্টাইলিশ একজন ক্রিকেটার হলো এক সত্যিকার প্রাশান্তির নাম । পিটারসেন আর ইংলিশ ক্রিকেটকে পাশাপাশি রাখলে আপনার কাছে মনে হবে একই ফ্ল্যাটে বসবাস করা একটি দম্পতি । কিন্তু তাদের মধ্যে ঝড় ঝাপটা লেগেই আছে । আর তাদের ডিভোর্সেরও আর বেশি বাকি নেই । প্রত্যেকটা গল্পের দুটো সাইড থাকে । কিন্তু আমি বিশাস করি , পিটারসেনের এই গল্পের পঞ্চাশ, ষাট , সত্তরটা সাইড । ইসিবির আলাদা সাইড, পিটাসেনের নিজের আলাদা সাইড, প্রভাবশালী কর্তা হিসেবে স্ট্রসের আলাদা সাইড, এশলি জাইলসের আলাদা সাইড , সাবেক কোচ এন্ডি ফ্লাওয়ারের আলাদা সাইড, দলের অন্যান্য খেলোয়াড়দের আলাদা সাইড, বর্তমান কোচ ট্রেভর বেলিজের আলাদা সাইড , সাংবাদিকদের আলাদা সাইড, ব্রডকাস্টারের আলাদা সাইড, ইলেকট্রিক মিডিয়ার আলাদা সাইড … এ গল্প শেষ হবার নয় ।

পিটারসেনের প্রথম ছবি তুলি ২০০৫ সালে । তখনো সে টেস্ট ক্রিকেটার না । মাঝের ১০ বছরে ওর হাজারের উপরে ছবি আমি তুলেছি এবং একটা কথা বারবারই বলেছি ওর চলন-বলন , স্টাইল সবকিছুই দারুন ফটোজেনিক । আশির দশকে শুরু করা ফটোগ্রাফি ক্যারিয়ারে আমার কাছে সবচেয়ে ফটোজেনিক আর স্টাইলিশ ক্রিকেটারের ছোট তালিকাটা মাত্র তিনজনের । কেভিন পিটারসেন, এন্ড্রু ফ্লিনটফ আর শেন ওয়ার্ন ।

খেলোয়াড়েরা এক্সখন বুঝে যায়, আপনি তার দিকে ক্যামেরার লেন্স রাখবেন আর শুধুমাত্র তার আউট হবার দৃশ্যের জন্যে অপেক্ষা করছেন না , তাহলে তারা আপনাকে বিশ্বাস করা শুরু করে । একদম প্রথম দিন থেকেই ওর সাথে আমার দারুন সম্পর্ক । এমনকি কলম্বোতে ও যখন স্টার ক্রিকেটের বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করত , তখনও আমাকে সে ছবি তোলার কথা মানা করে নি । এমনকি পরের দিন স্টুডিও ক্রুদের সাথে ওর একটা পিকনিক ম্যাচ ছিলো, সেখানেও আমাকে আমন্ত্রণ করে ।

কেভিনের ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো দিক হলো আপনি যদি তাকে চেনেন , সে আউট হবার পরেও তার বেশ ভালো কিছু ছবি তোলা যায় । পিটারসেন অভ্যাসের দাস । আউট হবার পরে রোজ সেই একই ভঙ্গি। দারুন স্টাইলিশ ভঙ্গি । খুব দ্রুত হেলমেটটা খুলে নেয়, ডান হাত দিয়ে মুখ মোছে , তারপর নিজের চুলগুলোয় হাত বুলোয় । ছবি হিসেবে সেগুলো একদম আহামরি কিছু হয় না । তবে ঐসব খেলোয়াড়দের চেয়ে তো ভালো … যারা আউট হবার পরে হেলমেটটা মাথায় দিয়েই মাথা নিচু করে হনহন করে হেঁটে চলে যায় । আর ব্যাটিং করার সময়েও দারুন সব বাহারি শট খেলে । এগুলো দিয়ে দারুন সব ছবি হয় । তার রিভার্স সুইপ, দিলস্কুপ আর ফ্ল্যামেঙ্গো শট ক্যামেরায় ধরা যেকোনো সাংবাদিকের জন্যেই পরম সুখের মুহূর্ত ।

২০১২ সালের আমিরাত সফরে পিটারসেনের সময়টা ভালো যাচ্ছিলো না । এই সময়গুলোয় পিটারসেন কিছুটা অন্যরকম । তার মুখাবয়ব আরা কথাবার্তাই তার খারাপ সময়গুলোর কথা মানুষকে বলে দেইয় । এই সময়টায় তার সাথে কাজ করাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং । তবে কেপি প্রফেশনাল ও বন্ধুত্বপূর্ণ । ২০০৬ এ ওর প্রথম বই লঞ্চ হয় । তাতে আমি তাকে বেশ কিছু ছবি দেই বইয়ের ভেতরে ব্যবহার করার জন্যে । সে আমাকে বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের অনুষ্ঠানেও ইনভাইট করেছিলো । আমি পিটারসেনের প্রায় সব সেঞ্চুরিই মাঠে বসে দেখেছি । পাকিস্তানে একটা আর নিউজিল্যান্ডে একটা বাদে । কিন্তু সেই মিস করা সেঞ্চুরিগুলোর কথা ভুলে যাই যখন ভাবি আমি তো মুম্বাই বা কলম্বোতে ওর দারুন ইনিংসগুলো নিজের চোখে দেখেছি । এই সৌভাগ্যই বা কয়জনের ?? ওর সেঞ্চুরি সেলিব্রেশনগুলো কখনো উন্মত্ত , কখনো চুলগুলো এলোমেলো আবার কখনো সেঞ্চুরি সেলিব্রেশনে ওর হাসিটা সবাইকে ছোঁয়া দিয়ে যায় । পিটারসেন এমনই ।

196793

এই ছবিটা ২০০৬ এর তোলা । উইজডেনের তখনকার এডিটর ম্যাথিউ এনজেল পিটারসেনকে এক সকালে উইজডেনের কপি তুলে দেবার পরে আমি তাকে একটি ছবি তুলতে রাজি করাই । পিটারসেন বাইরে কোথাও যেতে রাজি হলো না । তাকে আমি শেষমেষ ট্রাফালগার স্কয়ারে আসাতে রাজি করাতে পেরেছিলাম …

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

17 − two =