কেনি ডালগ্লিশ – বাস্তবিক রূপকথা

লিভারপুল ফুটবল ক্লাবের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যে নাম সেটি কেনি ডালগ্লিশ। স্কটল্যান্ড থেকে উড়ে আসা হাল্কা সোনালী চুলের এই যুবা পুরুষ যে একদিন ইংল্যান্ডের সবচাইতে সফল ক্লাবের হল অফ ফ্যামে জায়গা করে নিবেন তা কল্পনা করেছিলেনই বা ক’জন? তবে তার মধ্যে যে বব পেইসলি ছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই।

স্কুল জীবনে গোলকিপার হিসেবে শুরু করলেও শেষতক ফরোয়ার্ড হিসেবে যে সারা ফুটবল বিশ্ব শাসন করবেন তা অনুমান করেছিলেন খুব কম মানুষই। স্কটল্যান্ডের বিখ্যাত ক্লাব রেঞ্জার্সের সমর্থক হিসেবে বেড়ে উঠলেও মাত্র ষোল বছর বয়সে সেল্টিকের হয়ে নাম লেখান এই কিংবদন্তী। লিভারপুল এবং ওয়েস্ট হ্যামে ব্যর্থ ট্রায়ালের পর সেল্টিকই হয়ে ওঠে তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সেল্টিকে ডালগ্লিশ

সেল্টিকের হয়ে কন্ট্র্যাক্ট সাইন করার পর লোনে চলে যান কামবারনল্ড ইউনাইটেডে। সেখানে এক সিজনে ৩৭ গোল করে সবার নজরে আসেন। দ্বিতীয় সিজনেও লোনে রাখার সেল্টিক কোচের প্ল্যানকে স্বাগত জানাননি কেনি। চোখে তার প্রফেশনাল ফুটবলে নিজের নাম প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। থেকে গেলেন সেল্টিকে। রিজার্ভ টিমের সাথে এক সিজন কাটালেন। এরপর থেকে নিয়মিত হতে থাকে মূল একাদশে তার জায়গা। ঐ সিজনে ৫৩ ম্যাচে ২৯ গোল করে নিজের জাত চিনিয়ে দিলেন আবারও।

৭৫-৭৬ সিজনে হলেন সেল্টিকের ক্লাব ক্যাপ্টেন। ঘরে তুললেন ১২ বছর পর সেল্টিকের হয়ে প্রথম শিরোপা। সেল্টিকের সমর্থকদের কাছে তখন এক ভরসার নাম এই সোনালি চুলের যুবা, কেনি ডাল্গলিশ। সেই সিজনে গোল করলেন ২৭। দলকে জেতালেন লিগ আর লিগ কাপ।

১৯৭৭ সালের ১০ আগস্ট, সেল্টিকের হয়ে ৯ সিজনে ৩২২ এপিয়ারেন্সে ১৬৭ গোল করে রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে যোগ দিলেন ইংলিশ জায়ান্ট লিভারপুলে। শুরু হল এক অনন্য গল্প, এক বাস্তবিক রূপকথা।

লিভারপুলের কেভিন কিগানের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে বব পেইসলি দলে ভেড়ালেন কেনি ডাল্গলিশ কে। দিলেন ৭ নম্বর জার্সি। চ্যারিটি শিল্ডে লিভারপুলের হয়ে প্রথম ম্যাচে ওয়েম্বলি তে গোল করলেন ম্যানচেস্টার এর বিপক্ষে। সমর্থকরা বুঝল- বব পেইসলি ভুল করেননি। ডেব্যু হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ পর লিগে নিজের একাউন্ট খুলেন মিডলেসবোরো’র বিপক্ষে। ঐ সিজনে করলেন ৩১ গোল ৬২ ম্যাচে। ব্রুজেসের বিপক্ষে ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালের জয়সূচক গোল।

চারদিকে নাম ছড়িয়ে পড়ল এই তরুন তুর্কির। পরের সিজনে লীগে করলেন ২১ গোল যা লিভারপুলের হয়ে তখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। হলেন ফুটবল রাইটার্স এসোসিয়েশানের জরিপে সেরা ফুটবলার। ইয়ান রাশ কে নিয়ে গড়ে তুললেন লিভারপুলের ইতিহাসে অন্যতম ভয়ংকর স্ট্রাইকিং পার্টনারশিপ। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি লিভারপুলকে। তেরোতম লিগ শিরোপা ঘরে তুললেন আর নিজেকে নিয়ে গেলেন অনন্য এক উচ্চতায়। ইউরোপ জুড়ে লিভারপুলের সাফল্যের এক উজ্জ্বল সাক্ষী এই স্কটিশ।

৮৫-৮৬ মৌসুমে জো ফাগানের অনুপস্থিতিতে নাম লেখালেন প্লেয়ার কাম ম্যানেজার হিসেবে। জিতলেন এফ এ কাপ, জেতালেন লিভারপুলের ষোলতম লীগ শিরোপা। যেখানে হাত দিচ্ছেন সেখানেই সোনা ফলছে। কেনি ডাল্গলিশ ছিলেন লিভারপুলের জন্য এক যাদুর কাঠি। ডমেস্টিক লিগ ছাড়াও ইউরোপেও তিনি ছিলেন সমান সফল। তিনটি ইউরোপিয়ান কাপ যা বর্তমানে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ নামে পরিচিত আর একটি উয়েফা সুপার কাপ জিতিয়ে জীবন্ত কিংবদন্তী’র আখ্যা পেলেন ঐ সময়েই।

১৯৮৭ সালে ইয়ান রাশের ইয়ুভেন্তাসে চলে যাওয়ার পর তিনি গড়লেন নতুন এক স্ট্রাইকিং জুটি। নিউক্যাসল থেকে আনলেন পিটার বেয়ার্ডস্লি আর ওয়াটফোর্ড থেকে আরেক ক্লাব লেজেন্ড জন বার্ন্সকে। ঐ সিজন শিরোপাহীন থাকলেও ট্র্যাকে ফিরতে সময় নেয়নি লিভারপুল। ১৯৮৮ সালে জিতলেন লিগ শিরোপা। নতুন কেনা প্লেয়ারদের নিয়ে গড়লেন অনন্য এক দল – যার খেলা মন্ত্রমুগ্ধের মতো উপভোগ করেছে পুরো ফুটবল বিশ্ব। ১৯৮৯ সালে হিলসবোরো ডিজাস্টারে ৯৬ জন সমর্থকের মৃত্যু কেনি ডাল্গলিশ কে গভীরভাবে নাড়া দেয়। বাকি জীবন এই সংগঠনের অংশীদার হিসেবে থাকার অঙ্গীকার করে পুরো ডাল্গলিশ পরিবার।

১৯৯১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ছিলেন লিভারপুলের ম্যানেজার। পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন লিভারপুলের ইতিহাসে অন্যতম সফল প্লেয়ার, ম্যানেজার। ঐ বছরই ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পান ব্ল্যাকবার্ন রোভার্স। যাদু হারাননি- জেতালেন। এরপর সেল্টিক হয়ে আবার লিভারপুলে এসেছিলেন ম্যানেজার হিসেবে ২০১১-১২ মৌসুমে। জেতালেন লীগ কাপ। এভাবেই শেষ হয় এক জাদুময় বাস্তবতা, রুপকথার অনন্য গল্প!

এখনো লিভারপুলের প্রতি ম্যাচে স্ট্যান্ড থেকে সদা হাস্যোজ্জল যে মানুষটিকে দেখা যায় তিনি কেনি ডাল্গলিশ। আমাদের কিং কেনি, এককালের হাল্কা সোনালী চুলের স্কটিশ তরুন, আমাদের কিং কেনি ডাল্গলিশ। বেঁচে থাকুন আরো বহু বছর। জন্মদিনে আপনাকে জানাই হৃদয় নিংড়ানো লাল ভালোবাসা!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

10 + two =