লিওনেল মেসি : কিংবদন্তী হওয়ার গল্প – ৫

মূল – লুকা কাইওলি

ভাষান্তর – সাজিদ মাহমুদ 

বিশ্বকাপের দুই বছর পরেও সেখানে অস্থিরতা বিরাজ করছিলো কিন্তু তারমধ্যেও মানুষ তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চেষ্টা করে। এ অস্থিরতার মধ্যে জর্জ ও সেলিয়া তাদের প্রথম সন্তানের মুখ দেখেন। বড় ছেলে রদ্রিগো মার্টিন ১৯৮০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এবং মেজো ছেলে ম্যাটিয়াস হোরাকিও জন্মগ্রহণ করেন দেশের গত শতাব্দীর সবচেয়ে বড় সংকটের মুহুর্তে। দিনটি ছিলো ২৫ জুন; এর ঠিক দশ দিন আগে প্রায় আড়াই মাসব্যাপী ফকল্যান্ড যুদ্ধের তাণ্ডবলীলা শেষ হয়। এ যুদ্ধে আর্জেন্টিনার  প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। আর্জেন্টিনার ৬৫৯ জন সামরিক ও বেসামরিক মানুষ নিহতের পাশাপাশি প্রায় এক হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। যিনি এ সময় বেঁচে ছিলেন তিনি কখনো এ তাণ্ডবলীলার কথা ভুলবেন না। জেনারেল লিওপোলদো গালিতেরি ১৯৮২ সালের ২ এপ্রিল ব্রিটিশ কর্তৃক ১৮৩৩ সালে দখলকৃত আর্জেন্টিনার ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে  ‘অপারেশন রোজারিও’ নাম দিয়ে এ সামরিক অভিযান শুরু করেন। এ অভিযানটি সমগ্র আর্জেন্টিনার মানুষের মধ্যে দেশপ্রেমের আবেগ ছড়িয়ে দেয়। যদিও এটি ছিলো সামরিক জান্তার পূর্ববর্তী কয়েক বছরের সামরিক শাসনের ব্যর্থতা থেকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেয়ার একটি চাল। কারণ, অর্থনৈতিক মন্দা, মূদ্রাস্ফীতি, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্টানের ঋণখেলাপি, বেতন কমে যাওয়া এবং সর্বোপরি মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের জীবনযাপনের ক্রমশ অবনতি হচ্ছিলো। যুদ্ধে গেলেও সামরিক জান্তা সরকার লৌহ মানবী খ্যাত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রি মার্গারেট থ্যাচারের বাহিনীর রণকৌশলের বিরুদ্ধে প্রস্তুত ছিলো না। ফলে, অল্প কিছু দিনের মধ্যে ব্রিটিশ বাহিনী আর্জেন্টাইন বাহিনীকে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা প্রদান করে। এ যুদ্ধে পরাজয়ের এক বছরের মাথায় স্বৈরশাসকের পতন ঘটে এবং আর্জেন্টিনা তাদের ইতিহাসের এক তীক্ত অধ্যায় পার করে নতুন করে গণতন্ত্রের স্বাদ গ্রহণ করে। কিন্তু মালভিনাস ( ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের আর্জেন্টাইন নাম) এখনো আর্জেন্টিনা তাদের নিজেদের বলে দাবি করে আসছে; যারা মালভিনাসে বাস করে তাদের সম্মানের রোজারিওতে একটি সমাধি নির্মিত হয়েছে এবং ১৯৯৪ সালের সংবিধানে মালভিনাস পুনরুদ্ধারকে আর্জেন্টিনার জাতীয় উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে।

featured-malvinas

১৯৮৩ সালের নির্বাচনে রাউল আলফনসিন জয়ী হন; তিনি অল্প কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তির একজন যিনি সামরিক বাহিনী থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন। তিনি মনে করতেন যুদ্ধে যাওয়া মানে হলো স্বৈরশাসকের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এর চার বছর পরে সেলিয়া তৃতীয়বারের মত গর্ভবতী হন কিন্তু তখন দেশের অবস্থা আবার নাটকীয় রূপ নেয়। ‘সেমেন সান্তা (পবিত্র সপ্তাহ)’ এর দিন আর্জেন্টিনা একটি গৃহযুদ্ধের সম্মুখে দাঁড়িয়ে ছিলো। তরুন সেনা অফিসাররা কর্ণেল আলদো রিকোর নেতৃত্বে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা করেন। তাঁরা স্বৈরশাসনের সময়ে মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে করা বিচার বন্ধের দাবি জানান। সামরিক কমান্ডাররা প্রেসিডেন্টকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তখন সাধারণ জনগণ গণতন্ত্র রক্ষার জন্য সামরিক কর্তাদের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসেন এবং শ্রমিক ইউনিয়ন স্বর্বাত্মক হরতালের ডাক দেয়। ৩০ এপ্রিল রাউল আলফনসিন প্লাজা দি মায়োর সামনে জড়ো হওয়া জনসমুদ্রের মাঝে ঘোষনা দেন, ‘সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে, সবাইকে ইস্টারের শুভেচ্ছা’। কিন্তু তার এ কথা ইতিহাসে বারবার আবর্তিত হতে থাকবে, কারণ সত্য থেকে এত দূরে অবস্থান করা আর কোন কথা থাকতে পারেনা। সামরিক বাহিনীর উপর কোন নিয়ন্ত্রণ না থাকায় শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট বিদ্রোহী সেনাদের দাবি মেনে নেন; কারণ এ ছাড়া তাঁর আর কোন উপায় ছিলো না। পরে সরকার সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্টার জন্য একটি আইন প্রণয়ন করা হয়; যাতে বলা হয়, অফিসার ও তাদের অধিনস্থ সেনা কর্মকর্তারা আইন বহির্ভূত কোন কাজের জন্য অভিযুক্ত হলে তাঁর দায়ভার তাদের উর্ধ্বতম সিনিয়র অফিসারকে নিতে হবে। এ আইনটি ২৩ জুন পাশ করা হয়; এ দিনই সেলিয়া গ্যারিবাল্ডি হাসপাতালের নারী ও প্রসূতি বিভাগে ভর্তি হন। জর্জ মেসি তাঁর সাথে হাসপাতালে যান; বড় দুই ছেলে রদ্রিগো ও ম্যাটিয়াস বাড়িতে থাকেন তাঁদের দাদীর সাথে। রদ্রিগো তখন ছিলো সাত বছর বয়সী ও ম্যাটিয়াস ছিলো পাঁচ বছরের। দুই ছেলের পরে তাঁরা দুজনে এবারে একটি মেয়ে সন্তানের আশা করেছিলেন; কিন্তু ক্রমোজোম নির্ণয়ের পরে তাদের জানানো হয় এবারও তাদের ছেলে হচ্ছে। পরে সেলিয়াকে অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হয়। প্রেগন্যান্সির সময় তেমন জটিল কিছু না ঘটলেও, অপারেশনের সময়ে কিছু জটিলতা দেখা দেয়। গাইনী বিশেষজ্ঞ নরবার্তো ওদেত্তো ভ্রুনের মধ্যে কিছু সমস্যা দেখতে পান এবং প্রসবকালীন বেদনা যাতে শিশুর উপর প্রভাব ফেলতে না পারে সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকেন। জর্জ মেসি সেই ভয়ার্ত মুহুর্তের কথা স্মরণ করে বলেন যে, যখন আমি শুনলাম ডাক্তার অপারেশনে ‘সাঁড়াশি’ ব্যবহার করবেন তখন খুব ভয় পেয়েছিলাম; কারণ সাঁড়াশি ব্যবহার নিয়ে অনেক ভীতিকর কাহিনী প্রচলিত আছে, এটি ব্যবহারের ফলে অনেক সময় শিশুর অঙ্গহানি ঘটতে পারে এমনকি শিশু বিকলাঙ্গ হয়ে জন্ম নিতে পারে বলে শোনা যায়। ডাক্তার আমাকে বলেছিলেন যে, তিনি যথাসম্ভব সাঁড়াশি ব্যবহার থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করবেন এবং শেষে তিনি সাঁড়াশি ছাড়াই সফলভাবে অপারেশন শেষ করলেন। ভোর ছয়টা বাঁজার মিনিটখানেক আগে লিওনেল অ্যান্দ্রেজ মেসি পৃথিবীর মুখ দেখেন; জন্মের সময় মেসির ওজন ছিলো তিন কিলোগ্রাম এবং উচ্চতা ছিলো ৪৭ সেন্টিমিটার; চেহারা দেখতে পাকা টমেটোর মত লাল টুকটুকে হয়েছিলো, তাঁর একটি কান সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া অন্যান্য শিশুদের মত ভাঁজ হয়েছিলো ছিলো, যেটি কয়েক ঘন্টা পরে অবশ্য চলে গিয়েছিলো। ছোট্ট মেসিকে দেখার সাথে সাথে জর্জের সমস্ত আতঙ্ক স্বর্গের সুখে রূপ নিয়েছিলো।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

nineteen − thirteen =