লিওনেল মেসি : কিংবদন্তী হওয়ার গল্প – ৪

মূল – লুকা কাইওলি

ভাষান্তর – সাজিদ মাহমুদ 

 

                                                              দ্বিতীয় অধ্যায়ঃ গ্যারিবাল্ডি হাসপাতাল

২৪ জুন ১৯৮৭

 

গ্যারিবাল্ডি ছিলেন ইতালির স্বাধীনতার নায়ক। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁকে আটলান্টিকের দু’পারের নায়ক বলা হয়; কারণ তিনি যখন দক্ষিণ আমেরিকায় নির্বাসিত ছিলেন তখন প্রাণা নদীর আশে পাশে যুদ্ধ করেছেন অনেক দিন। তিনি যেখানে গেছেন সেখানেই তাঁর বিপ্লবের লাল রঙ এঁকে দিয়েছেন সুনিপুণ শিল্পীর মত। আর এর ফলেই, গ্যারিবাল্ডি ও মাজ্জিনির রাজনৈতিক আদর্শের সমার্থকরা তাদের দু’জনের সম্মানে রোজারিও ও বুয়েন্স আয়ার্সে দুটি হাসপাতাল নির্মাণ করেছিলেন। রোজারিওর গ্যারিবাল্ডি হাসপাতাল ইতালিয়ান সম্প্রদায়কে সাহায্যের জন্য ১৮৯২ সালের ২ অক্টোবর উদ্বোধন করা হয়। তখন ৭০ ভাগ অভিবাসী আটলান্টিকের ওপার থেকে এসে এখানে বসতি গড়তো। ঊনবিংশ শতাব্দীর নির্মাণ শৈলীর মত দেখতে আয়তাকার এ হাসপাতালটি রোজারিও শহরের ১২৪৯ নাম্বার ভিসাসরো স্ট্রিটে অবস্থিত। এখন এ হাসপাতালটি শহরের সবচেয়ে ভালো মাতৃসেবা প্রদানকারী কেন্দ্র এবং এখান থেকেই ১৯৮৭ সালের জুন মাসের এক শীতের সকালে মেসি-কুচিত্তিনি পরিবারের তৃতীয় সন্তান লিওনেল মেসির জীবনের গল্প শুরু হয়েছিলো।

২৯ বছর বয়সী জর্জ মেসি, লিওনেল মেসির বাবা রোজারিও শহর থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে একটি ইস্পাত তৈরির কারখানায় বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং ২৭ বছর বয়সী সেলিয়া একটি চুম্বক নির্মাণ কারখানায় কাজ করতেন। তাদের দু’জনে রোজারিও দক্ষিণাংশের লাস হেরাস বর্তমানে সান মার্টিনে থাকতেন এবং খুব অল্প বয়সে তাদের দু’জনের পরিচয় হয়েছেলো। সেখানের লোকজন সবাই খুব বিনয়ী ও কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন। সেলিয়ার বাবা অ্যান্তোনিও একজন ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি ছিলেন; তিনি ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনসহ আরো অন্যান্য জিনিসপত্র মেরামত করতেন। সেলিয়ার মায়ের নামও ‘সেলিয়া; তিনি অনেক বছর ধরেই পরিচ্ছন কর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। জর্জ মেসির বাবা ইউসেবিও ছিলেন একজন নির্মাণ কর্মী এবং মা রোজা মারিয়া নিজেও একজন পরিচ্ছন কর্মী ছিলেন।। দুই বাড়ির মাঝে ব্যবধান ছিলো মাত্র ১০০ মিটার। অন্যান্য স্থানীয় পরিবারের মতই তাদেরও ইতালিয়ান ও স্প্যানিশ পূর্বপুরুষ আছে। ইতালির মাসেরাত্তা প্রদেশের ছোট্ট একটি শহর পোর্তো রেকানাত্তি থেকে ‘মেসি’ নামটির উৎপত্তি। এ শহরেই জন্মেছিলেন বিখ্যাত কবি জিওকিমো লিওপার্দি। এ শহর থেকে অ্যাঙ্গেলো মেসি নামে একজন ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য একটি জাহাজের তৃতীয় শ্রেণিতে বসে অন্যান্য অভিবাসীদের মতই আটলান্টিকের অপর পাশে পাড়ি জমান। বাবার দিক দিয়ে কুচিত্তিনি পরিবারেরও ইতালিয়ান বংশধর আছে। মোটকথা, একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্যই এ দুই পরিবারের পূর্বপুরুষ আটলান্টিকের এ পারে পাড়ি জমিয়েছিলেন।

রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্স থেকে ৩০৫ কিলোমিটার দূরে প্রাণা নদীর তীরে সান্তা ফে প্রদেশের সবচেয় বড় শহর রোজারিও’তে প্রায় দশ লক্ষ লোকের বসবাস। প্রাণা নদী ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সব সময় সুবিধাজনক ছিলো; যার ফলে এ নদী দিয়েই সারা মারকোসরে কৃষিদ্রব্য সরবারহ করা হয়। এর মধ্য বিখ্যাত হলো ‘সয়া’; যা বর্তমানে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। নদীর তীরে সুন্দর সুন্দর প্রাসাদ, সুউচ্চ অট্টালিকা ও নতুন নতুন দালান নির্মিত হয়েছে। এটি এমন একটি শহর যেখানে নানান ধরনের নানান বর্ণের নানান সংস্কৃতির নানান ভাষার মানুষ বসবাস করে। এ শহরে বসেই অনেক অল্প বয়সে লিও মেসির বাবা জর্জ মেসি তাঁর মা সেলিয়ার প্রেমে পড়েন এবং ১৯৭৮ সালে তাঁরা দুজনে কোরাদোনা দে মারিয়া চার্চে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তখন আর্জেন্টিনায় বিশ্বকাপ ফুটবল চলছিলো, ফলে সবাই বিশ্বকাপের উন্মাদনায় ছিলো। নতুন বিবাহিত দম্পতি জর্জ ও সেলিয়াও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তাঁরা বারিলোচেতে তাদের মধুচন্দ্রিমার শেষ করার পরপরই রোজারিওতে ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনার ম্যাচটি দেখেছিলেন। যদিও ম্যাচটি গোল শূণ্য ড্র হয়েছিলো। এর ঠিক আটদিন পরে বুয়েন্স আয়ারর্সের রিভার প্লেতের মাঠ ম্যানুমেন্টাল স্টেডিয়ামে নেদারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সাদা-আকাশী জার্সিধারী আলবিসেলেস্তেরা চ্যাম্পিয়ন হয়।

download

তখন আর্জেন্টিনায় কুখ্যাত জেনারেল জর্জ রাফায়েলের স্বৈরশাসন চলছিলো। তিনি তার ভিন্নমতালম্বী প্রায় ত্রিশ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছিলেন অথবা নির্বাসন দিয়েছিলেন। তাই তখন সে দেশে এক ভয়ার্ত অবস্থা বিরাজ করছিলো। ফলে, এ সময়ে কেম্পেস, তারান্তিন্নি, অর্তিজ, পাসারেল্লা, রিল্লোলের বিশ্বকাপের এ মহাঅর্জন বিবর্ণ থেকে যায়। এখনো রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সের রাস্তায় ‘ইনমুন্ডো মুন্দিয়া’ বা ‘নোংরা বিশ্বকাপ’ লেখা দেখতে পাওয়া যায়।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

twenty − ten =