লিওনেল মেসি : কিংবদন্তী হওয়ার গল্প – ৩

মূল – লুকা কাইওলি

ভাষান্তর – সাজিদ মাহমুদ 

 

 

সবই ঠিক আছে, কিন্তু এত বড় একজন তারকার মা হতে পেরে আপনার কেমন লাগছে?

ওর মা হতে পেরে আমার গর্ব হয়, খুব গর্ব হয়। আর্জেন্টিনা বা স্পেন যেখানেই ওকে দেখি বা যখন ওর জার্সি নাম্বার দেখি অথবা যখন কোন ছোট বাচ্চা ওর জার্সি পড়ে হাঁটে তখন আমি তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি এবং এ দৃশ্য দেখে আমার প্রাণ জুড়িয়ে যায়। এ কারণে ওর খেলা নিয়ে কোন খারাপ সমালোচনা বা ওর জীবন নিয়ে কোন মিথ্যে কথা শুনলে আমার খুব খারাপ লাগে। যখন আপনাকে কেউ ওর সম্পর্কে খারাপ কিছু দেখিয়ে বলে যে এটা দেখেছেন বা ওটা দেখেছেন? তখন তা বুকের গভীরে আঘাত করে এবং সে আঘাতের ব্যথা খুবই কষ্টের।

লিও’র কি এমন হয়?

ও এগুলো খুব কমই পড়ে। যদিও কোন কারণে পড়ে থাকে তবে এটা ওকে খুব একটা ভাবায় না। কিন্তু তাই বলে এমন ভাববেন না যে এ নিয়ে ওর কখনো খারাপ সময় কাটে নাই। যখন ও ইনজুরিতে পড়েছিলো এবং মাসের পর মাস দলের বাইরে ছিলো, যখন ও চাইলেও সব ঠিক মত করতে পারত না, তখন ওর সময় খুব ভালো যায় নি। জীবনের সবচেয়ে খারাপ মুহুর্তগুলোর একটি পার করেছে ও। তখন আমি কোন কিছু না ভেবে ওর কাছে থাকতে, ওকে ঠিকমত দেখাশুনা করতে সোজা এখান থেকে বার্সেলোনায়  গিয়েছিলাম। যদিও লিও ওর বয়সের চেয়ে যথেষ্ট পরিপক্ক ছিলো কিন্তু তারপরেও নিজের সমস্যাগুলো সব সময় নিজের কাছে গোপন রাখত। আমার মনে আছে যখন ওকে আমাদের সাথে আর্জেন্টিনায় যাবার কথা বলেছিলাম, তখন ও আমাকে বলেছিলো, “আম্মু, চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি যাও, আমি বার্সেলোনায় থাকবো। ঈশ্বর সবকিছু দেখবেন”। লিও অনেক শক্ত মানসিক ক্ষমতার অধিকারী।

সেলিয়া আবার আটলান্টিকের দু’পারে সকলের কৌতুহলের বিষয় বিস্ময়কর এ ‘ছোট্ট বালক’ এর সাফল্যের কথায় ফিরে এলেন। সেলিয়া বললেন যে,  মুল কথা হচ্ছে সবাই ওকে ভালোবাসে। লিও খুব সাধারণ, বিনয়ী এবং ভালো মানুষ দেখে সবাই ওকে ভালোবাসে বলে আমি মনে করি। ও সবার কথা ভাবে এবং ওর চারপাশে মা-বাবা, ভাই বোন, আত্মীয়স্বজন সবাই কেমন আছে সে বিষয়ে সব সময় খেয়াল রাখে, পরিবারের কথা চিন্তা করে। আমি ওর মা এবং একজন মায়ের কাছে তার ছেলে সর্বদাই হীরার টুকরা কিন্তু তারপরেও বলবো লিও আসলেই মহান হৃদয়ের অধিকারী একজন মানুষ।

messi_mom_0

একজন মা হিসেবে আপনি আপনার ছেলের ভবিষ্যৎ কেমন দেখেন? 

ফুটবলের কথা বললে আমি বলবো লিও পেলে ও ম্যারাডোনার মত ইতিহাস তৈরি করবে। আমি আশা করি লিও অনেক দূর পর্যন্ত যাবে, বহু দূরে যাবে। কিন্তু একজন মা হিসেবে আমি ঈশ্বরের কাছে এটাই বলবো যে, ও যেনো সব সময় সুখে থাকে। কারণ ওর একটি পরিবার আছে, জীবন আছে কিন্তু অন্য সবার মত  জীবনকে  উপযোগ করতে পারে না; কারণ ও নিজের দেহ ও মন দুটোই ফুটবলকে উৎসর্গ করেছে। ও কখনো বাইরে যেতে পারে না, তার বয়সী অন্যান্য ছেলেদের মত দৈনন্দিন কাজ করতে পারে না। তাই আমি ওর সুন্দর একটি জীবন কামনা করি। ও সুন্দর জীবনের যোগ্য।

আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যাচ্ছে, চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। চলছে। লা টিয়েন্ডা বারের জানালা দিয়ে এ সকল দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। রাস্তার যানবাহনগুলো দ্রুত গন্তব্যে যাবার জন্য ছুটছে। বাস, গাড়ি, ভ্যান কালো ধোয়া ছেড়ে সাই সাই করে চলছে। এদের পিছনে একটি ঘোড়া ময়লা ভর্তি একটি ভ্যান নিয়ে যাচ্ছে। নানা ধরণের মানুষ তাদের নিজ নিজ পথে হেঁটে চলছে।

বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সেলিয়াকে বাড়ি ফিরতে হবে; সেলিয়ার ছোট বোন তাঁর জন্য নিচে অপেক্ষা করছেন। মার্সেলাকে ব্রুনোর ফুটবল স্কুল থেকে বাসায় নিয়ে যেতে হবে। বৃষ্টি দেখে সেলিয়া আমাকে তাঁর সাথে যাবার জন্য জোর করলেন এবং গাড়িতে উঠার সময় তিনি তাঁর ছেলে সম্পর্কে শেষ কিছু কথা বললেন, “ইনজুরি, অর্থের দম্ভ এটা যে কারো জীবনে আসতে পারে। কিন্তু তারপরেও আমার বাকি ছেলেরা এবং লিও কেউই বাস্তব জীবনকে ভুলে যায় নি। আমি, আমার পরিবার এবং আমার বোনের পরিবার এ শহরেই থাকি, আমরা এখানেই জন্মেছি। কেউ কাউকে ছেড়ে অন্য কোথাও যাই নি। আমরা কখনোই আমাদের পরিবারকে ভুলে থাকি নি এবং আমাদের সন্তানেরাও আমাদের মতই হয়েছে। আমি মনে করি তারা কখনো পাল্টাবে না। পৃথিবীতে অনেক খেলোয়াড় আছে যারা খ্যাতির গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, আমি আশা করি ওদের জীবনে কখনো এমনটি ঘটবে না।

রোজারিও শহরের দক্ষিণ দিক দিয়ে সেলিয়া দ্রুত গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন। লিও’র স্কুলের পাশ দিয়ে যাবার সময় তিনি বললেন, “ ও কখনো ভালো ছাত্র ছিলো না। ছাত্র হিসেবে খুবই অলস ছিলো”। ১৮৮৯ সালে প্রবাসীদের দ্বারা তৈরী একটি ক্লাবের পাশ দিয়ে তিনি ডানে মোড় নিলেন। এ সময় দুটো ছোট ছেলে ফুটবল খেলছিলো। বল পায়ে অন্যদিকে কোন খেয়াল ছিলো না তাদের, যে কোন সময় গাড়ির নিচে পড়তে পারত।

তাদের দেখিয়ে সেলিয়া বললেন, “লিওনেল ছোট বেলায় ওদের মতই অদম্য ছিলো”…

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

4 − three =