লিওনেল মেসি : কিংবদন্তী হওয়ার গল্প – ১

লিওনেল মেসি : কিংবদন্তী হওয়ার গল্প

মূল – লুকা কাইওলি

ভাষান্তর – সাজিদ মাহমুদ 

 

                                                                   প্রথম অধ্যায়ঃ রোজারিও

আজকের রোজারিও

“আমি দোকান থেকে গরুর পাঁজরের মাংস কিনেছিলাম। বার্সেলোনাতেও আমি তা দেখেছি কিন্তু আমি জানি না এখানে একে কি বলা হয়? আমি প্রতি খণ্ডে হালকা লবণ দিয়ে ডিমে চুবিয়ে তা রুটির মত করে কাটলাম। তারপরে তা বাদামী রঙ না আসা পর্যন্ত সুন্দর করে ভাজলাম এবং তা থালায় করে ওভেনে দিলাম। পিয়াজগুলো সুন্দর করে কাটলাম এবং সাদা না হওয়া পর্যন্ত তেলে ভাজলাম। যখন পিয়াজ সাদা হলো তখন তাতে টমেটো কুচি, হালকা পানি, লবণ, ওরেগানো ও হালকা চিনি দিলাম এবং একসাথে বিশ মিনিট তাপ দিলাম। সস তৈরি হবার পরে তা প্রতিটি মাংসের টুকরোর উপর এমনভাবে দিলাম যাতে করে পুরো মাংস ঢেকে যায়। পরে মাংসের উপর ফ্রিজ থেকে শক্ত পনির ও পনিরের ক্রিম হালকা করে দিলাম এবং সর্বশেষ তা পনির গলে যাওয়া পর্যন্ত চুলায় রাখলাম। পরে বাকি ছিলো শুধুমাত্র আলু ভাঁজতে এবং আলু ভাঁজার সাথে সাথে ‘সিনিৎযেল নাপোলিটানা’ তৈরি হয়ে গেলো”।

বেশ উষ্ণ আবেগ নিয়ে একজন অভিজ্ঞ রাধুনীর মত সেলিয়া,  লিওনেল মেসির মা তাঁর ছেলের প্রিয় খাবারের বর্ণনা দিলেন।

মা সেলিয়া মারিয়া কুচিত্তিনির সাথে লিওনেল মেসি
মা সেলিয়া মারিয়া কুচিত্তিনির সাথে লিওনেল মেসি

“আমি যখন বার্সেলোনায় গেলাম, তখন আমাকে মাঝারি আকারের নুন্যতম তিন টুকরা মাংস দিয়ে সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার সিনিৎযেল নাপোলিটানা রান্না করতে হতো। আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলতামঃ “আমার হাতের তৈরি সিনিৎযেল নাপোলিটানা এবং মেটের (আর্জেন্টিনার এক ধরনের ঐতিয্যবাহী চা)জন্যই তুমি এত গোল করতে পারো”। এটাও সত্য যেদিন ও রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে প্রথম হ্যাট্রিক করেছিলো, সেদিন সন্ধ্যায় আমি ওর জন্য ওর প্রিয় খাবার এবং চা বানিয়েছিলাম। লিওনেলের খাবারের স্বাদ খুবই সাধারণ।  সিনিৎযেল ওর খুবই পছন্দ কিন্তু তা যেন হয় মুরগীর মাংসের সাথে সস, মরিচ, পিয়াজ, টমেটো ও ওরেগানো দিয়ে।; ও গরুর উরুর মাংস ও ঘোড়ার মাংস বিশেষ পছন্দ করে না। তাছাড়াও ও বাড়তি কিছু খুব একটা পছন্দ করে না, কিন্তু ওর বড় ভাই রদ্রিগো তা তৈরি করলে পছন্দ করে; কারণ তা খুবই সুস্বাদু। রদ্রিগো একজন বাবুর্চী এবং আজ বা কাল ওর রেস্টুরেন্ট দেবার ইচ্ছে আছে। তাই ওর জন্য নতুন রেসিপি পরীক্ষা করা অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু ওদের সবার ছোট ম্যাটিয়াস এগুলো একদম পছন্দ করে না”।

তাঁর কি মিষ্টি জাতীয় খাবার পছন্দ?

হ্যা, লিও চকলেট ও আলফাহোরেস (এক ধরনের বিস্কুট) খুব পছন্দ করে; স্পেনে যাবার সময় আমাদের সাথে করে এগুলোর অনেক প্যাকেট নিয়ে যেতে হয়েছিলো, যাতে করে চাইলেই ওকে আমরা দিতে পারি। তিনি তখন একটা গল্প বললেনঃ যখন ও খুব ছোট,  তখন ওর এক কোচ ওকে বলেছিলেন, ‘তোমাকে প্রতিটা গোলের জন্য একটি করে আলফাহোরেস দিবো’। সে দিন লিও আট গোল করেছিলো।

রোজারিওর সান মার্টিন অ্যাভিনিউয়ের লা টিয়েন্ডা বারে বসে এক কাপ কফি হাতে বেশ স্বাচ্ছন্দেই সেলিয়া তার বিশ্বখ্যাতি অর্জন করা ছেলের কথা বলে চললেন। কালো চুল, মৃদু হাসি ও চেহারার গঠনের কথা বলতেই মেসির মা হেসে বললেন, সত্যি বলতে ও দেখতে ঠিক ওর বাবার মত হয়েছে। মেসির মা সেলিয়া মারিয়া কুচিত্তিনি অলিভেরা দে মেসি নরম ও মার্জিত কণ্ঠের অধিকারী; যখন তিনি আমার সাথে কথা বলছিলেন তখন তিনি তার বোন মার্সেলার দিকে বারবার তাকাচ্ছিলেন। মার্সেলা ঠিক উল্টো পাশে বসে ছিলেন। মার্সেলা, কুচিত্তিনি পরিবারের সর্বকনিষ্ঠা; মার্সেলার দুই ছেলেও পেশাদার ফুটবলার। ম্যাক্সিমিলানো প্যারাগুয়ের অলিম্পিয়ানো, এমান্যুয়েল স্পেনের জিরোনা ফুটবল ক্লাবে খেলেন এবং ছোট ছেলে ব্রুনো রেনেটা সিজারিনি ফুটবল স্কুলে যান, যেখানে থেকে উল্লেখ্যযোগ্য খেলোয়াড় হিসেবে বের হয়েছিলেন ফার্নান্দো রেদোন্দো ও সান্টিয়াগো সোলারি।  মার্সেলা ছিলেন লিও’র ধর্মমাতা ও সবচেয়ে প্রিয় খালা। সেলিয়া বললেন, ‘রোজারিও আসলে ও মার্সেলার কাছে থাকতে বেশি পছন্দ করে। আমাদের ওখানে গিয়ে বা ফোন করে জানতে হয় ও কেমন আছে; কারণ আমার বোন ওকে মায়ের মত আপন করে নিয়েছে। এ ছাড়াও সেখানে এমান্যুয়েল আছে; লিও এবং তাকে কখনো আলাদা করা যায় না। খুব অল্প বয়স থেকেই ওরা একসাথে থাকে এবং একসাথে ফুটবল খেলে।

ভাই বোনের সাথে লিও
ভাই বোনের সাথে লিও

ওরা ছিলো পাঁচজন আমার তিন ছেলে ম্যাটিয়াস, রদ্রিগো, লিও এবং আমার বোনের দুই ছেলে ম্যাক্সিমিলানো ও এমান্যুয়েল। প্রতি রবিবারে যখন আমরা আমার মায়ের বাড়িতে যেতাম তখন দুপুরের আগেই ওরা সবাই রাস্তায় খেলতে নেমে যেত। ওরা নানা ধরনের আঞ্চলিক খেলা, ফুটিবল, টেনিস খেলত। কিন্তু প্রায়ই লিও হারত বা সবাই জোর করে ওকে ঠকাত দেখে লিও প্রায়ই কাঁদতে কাঁদতে আমাদের কাছে আসত’। এভাবেই সেলিয়া পুরানো কথা মনে করলেন। তিনি আরও বললেন যে, এই তো আগের দিনই ম্যাক্সি এ কথাগুলো আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছিলো যে, মেসি রোজারিও আসলে সে ওর সাথে আগের মত ফুটবল খেলবে।

লিও’র দাদীর কথা খুব মনে পড়ে। তাঁর বানানো সুস্বাদু খাবার, পেস্ট্রি, রবিবারে সবার একসাথে মিলিত হওয়া এবং ফুটবলের প্রতি তাঁর আবেগ আরও বেশি মনে পড়ে। তিনি ছিলেন বাচ্চাদের সঙ্গী, প্রতিটা সময় তিনি ওদের সঙ্গে থাকতেন। লিও খুব ছোট থাকায় কেউ দলে নিতে চাইত না কিন্তু তিনিই ওকে দলে নেবার জন্য সবাইকে জোর করতেন। লিও সবার চেয়ে কেবল বয়সেই ছোট ছিলো না, ও লম্বায়ও অনেক খাটো ছিলো। পড়ে গিয়ে পা ভেঙ্গে যেতে পারে অথবা ব্যথা পেতে পারে দেখে ওকে কেউ দলে নিতে চাইত না। কিন্তু তারপরেও তিনি লিও’কে দলে নিতে বলতেন এবং বলতেন, ‘বলটি লিওনেলকে পাস দাও, বাচ্চাটাকে দাও, ছোট হলেও ও গোল করতে পারবে’। তিনিই আমাদের সবাইকে বুঝিয়ে লিও’র খেলার জন্য জুতা কিনিয়েছিলেন। লিও’র বয়স যখন দশ তিনি তখন মারা যান। এটি আসলেই অনেক কষ্টের বিষয় যে তিনি এখন ওর খেলা দেখতে পারেন না। হয়ত তিনি এখন উপর থেকে তার প্রিয় নাতি যাকে তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন তাঁর বিশ্বখ্যাতি দেখছেন এবং মনে মনে খুব আনন্দ পাচ্ছেন!

কমেন্টস

কমেন্টস

One thought on “লিওনেল মেসি : কিংবদন্তী হওয়ার গল্প – ১

মন্তব্য করুন

thirteen − 9 =