জুনিনহো কে চেনেন ত, নেইমার?

দিন যতই যাচ্ছে, অসাধ্যটা সাধন হবার সম্ভাবনাটা ঠিক ততটাই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্ভাবনাটা নেইমারের বার্সেলোনা ছাড়ার সম্ভাবনা, সম্ভাবনাটা নেইমার ডা সিলভা জুনিয়রের বার্সেলোনা ক্লাব ছেড়ে ফরাসী ধনকুবের ক্লাব প্যারিস সেইন্ট জার্মেইয়ে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা। ২২২ মিলিয়ন ইউরোর বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফার ফি তে ব্রাজিলিয়ান রাজপুত্র যোগ দিচ্ছেন বর্তমান সময়ে ফরাসী ফুটবল-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে সাড়া জাগানো ক্লাব পিএসজিতে।  বার্সেলোনায় থাকলে লিওনেল মেসির ছায়াতলেই থাকতে হবে সারাজীবন, কখনো নিজেকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে প্রমাণ করার জন্য সেই মঞ্চটা পাবেননা, কেননা সেই লাইমলাইটটা সবসময় মেসির উপরেই থাকবে। এই ভাবনা থেকেই বলে বার্সেলোনা ছাড়ার জন্য উতলা হয়ে উঠেছেন নেইমার ডা সিলভা সান্তোস জুনিয়র! এসব কথাগুলো সত্যি হয়ে থাকলে নেইমার এমন একটা ক্লাব চাচ্ছেন যেখানে তাঁকে ঘিরেই সকল রণপরিকল্পনা সাজানো হয়, যে ক্লাবে তিনিই থাকবেন মূল খেলোয়াড়। আর বর্তমানে নেইমারকে পাওয়ার মত সামর্থ্য আছে মাত্র দুটো-তিনটা ক্লাবের ; যাদের মধ্যে প্যারিস সেইন্ট জার্মেই অন্যতম।

যাইহোক, এসব কথা সবারই জানা হালকা পাতলা। একটু গভীরে ভেবে দেখা যাক, নেইমার যে অভিলাষে বার্সার মত বিশ্বশ্রেষ্ঠ একটা ক্লাব ছেড়ে ফ্রান্সে পাড়ি জমাচ্ছেন, সে অভিলাষ কি আদৌ পূরণ হবে তার? পূরণ কি হবে নেইমারের বিশ্বের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হবার স্বপ্ন? তিনি যে ভয়টা করছেন, সারাজীবন মেসির আড়ালে পড়ে থাকার ভয় – মানলাম সেটা, কিন্তু তাই বলে বার্সেলোনার মত একটা ক্লাব ছেড়ে অন্য যেকোন ক্লাবে যাওয়াটা তাঁর জন্য কতটুকু যুক্তিপূর্ণ? আজকে ব্রাজিল সমর্থকেরা অনেক খুশি, তাঁরাও চায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার সর্বশ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়, সময়ের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় লিওনেল মেসির ছায়াতলে যেন তাঁদের সময়ের শ্রেষ্ঠ খেলোয়ড়টা না হারিয়ে যায়। খুবই যুক্তিপূর্ণ চিন্তা। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছেন যে সেই ইচ্ছা পূরণের জন্য পিএসজি কি আদৌ আদর্শ কোন ক্লাব?

শেষ কবে কোন ফরাসী ক্লাবের খেলোয়াড় ব্যালন ডি অর জিতেছেন মনে পড়ে? কিংবা ফিফার বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের খেতাব? ব্যালন ডি অরের হিসাবটা দেখতে চাইলে আপনাকে চলে যেতে হবে সেই আজ থেকে ২৬ বছর আগে, ১৯৯১ সালে। ফরাসী ক্লাব অলিম্পিক মার্শেইয়ের ফরাসী স্ট্রাইকার জ্যাঁ-পিয়েরে পাপাঁ জিতেছিলেন সেবার ব্যালন ডি অর। এখনও পর্যন্ত ফরাসী ক্লাবে খেলা একমাত্র খেলোয়াড় এই পাপাঁ, যিনি কিনা জিতেছেন এই ব্যালন ডি অর।

ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরষ্কারের হিসাবটা করলে সেখানে আরও পাওয়া যাবেনা ফরাসী লিগে খেলা কোন খেলোয়াড়ের নাম, যিনি কিনা এ পুরষ্কারটা জিতেছেন। সহজ ভাষায়, ফরাসী কোন ক্লাবে খেলা অবস্থায় কোন খেলোয়াড়ই ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ই হননি। কিন্তু কি এর কারণ?

মূল কারণ হল স্বাভাবিকভাবেই ফরাসী লিগ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, স্প্যানিশ লা লিগা, জার্মান বুন্দেসলিগা কিংবা ইতালিয়ান সিরি আ এর মত অতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কোন লিগ নয়। সেটার প্রতিফলন দেখা যায় ইউরোপিয়ান ক্লাব প্রতিযোগিতায় ফরাসী ক্লাবগুলোর পারফরম্যান্সের দিকে নজর দিলেই। সেই ১৯৫৫-৫৬ সালে শুরু হওয়া ইউরোপিয়ান কাপ/ইউয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ প্রতিযোগিতায় এই পর্যন্ত কেবলমাত্র একটা ফরাসী ক্লাব একবার মাত্র সফল হয়েছে, জিতেছে ইউরোপিয়ান কাপ। তাও সেই ১৯৯২-৯৩ মৌসুমের কথা, যখন পরাক্রমশালী এসি মিলানকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছিল সেই অলিম্পিক মার্শেই।

তাঁর মানে কি এইটা যে ফরাসী লিগে কখনো কোন ভালো খেলোয়াড় খেলতে যান না? কিছুক্ষেত্রে এই কথাটা সত্যি ত বটেই। সেই আদিকাল থেকেই ফুটবলের সেরা সেরা খেলোয়াড়েরা সবসময় স্প্যানিশ, ইংলিশ, জার্মান কিংবা ইতালিয়ান লিগেই খেলতে বেশী পছন্দ করেছেন। সেরা খেলোয়াড়দের সমারোহ সবসময় ঘটে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, এসি মিলান, ইন্টার মিলান, জুভেন্টাস, নাপোলি, বায়ার্ন মিউনিখ, এএস রোমা, লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, আর্সেনাল – এসব ক্লাবগুলোতেই। কয়জন সেরা খেলোয়াড় তাঁদের সেরা সময়ে ফরাসী ক্লাবে খেলেছেন? আর খেললেও, বিশ্ববাসীর নজর কাড়তে পেরেছেন কতটুকু? আজকে যারা নেইমারের বার্সা ছাড়ার আনন্দে বিমোহিত, তারা কি বলতে পারবেন গত পাঁচ মৌসুমে ফরাসী লিগের সেরা খেলোয়াড়টার নাম কি?

জলাতান ইব্রাহিমোভিচের কথাই ধরুন। বোহেমিয়্যান সুইডিশ সুপারস্টার এই স্ট্রাইকার ক্লাবজীবনে খেলেছেন আয়াক্স, ইন্টার মিলান, এসি মিলান, জুভেন্টাস, বার্সেলোনা, প্যারিস সেইন্ট জার্মেই, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মত বড় বড় ক্লাবগুলোতে। এই সুপারস্টার স্ট্রাইকার এসব ক্লাবগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশী সময় ধরে খেলেছেন এই প্যারিস সেইন্ট জার্মেইতেই – যেখানে নেইমার যোগ দিচ্ছেন। এই পিএসজিতেই জীবনের সবচেয়ে ফলপ্রসূ সময়টা কাটিয়েছেন ইব্রা, ১২২ ম্যাচ খেলে প্রায় প্রতি ম্যাচেই একটা করে গোল করে গোল করেছেন ১১৩ টা। ফরাসী ক্লাবটির হয়ে চারবার জিতেছেন লিগ ওয়ান, তাছাড়া আরও অজস্র কাপ, ট্রফি ত জিতেছেনই। যেকোন স্ট্রাইকারের জন্যেই ১২২ ম্যাচে ১১৩ গোল অনেক ঈর্ষা করার মত একটা রেকর্ড, তাঁর জেতা অজস্র ট্রফির কথা নাহয় বাদই দিলাম। ফরাসী ক্লাবটার রেনেসাঁর প্রধানতম সারথিই ছিলেন ইব্রা। তাতে কি তিনি একবারের জন্যেও ব্যালন ডি অর বা ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরষ্কারটা বগলদাবা করতে পেরেছেন?

পিএসজি’র ইব্রা

উত্তর হবে, না। কেবলমাত্র ২০১৩ সালেই ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের তালিকায় চতুর্থ হতে পেরেছিলেন, এটাই তাঁর সর্বোচ্চ সাফল্য। পিএসজি ছেড়ে সেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডেই চলে আসতে হয়েছে তাঁকে, যে ক্লাবটা কিনা পিএসজি থেকে যশ-খ্যাতি-সম্মান-প্রতিপত্তি ; সব দিক দিয়েই বড়।

জুনিনহো পারমানবুকানোর কথা মনে পড়ে নেইমার? আপনার মত তিনিও ব্রাজিলিয়ানই ছিলেন। তাঁর আসার আগে অলিম্পিক লিওঁ তাঁদের ইতিহাসে কখনই ফরাসী লিগ জেতেনি। ব্রাজিলিয়ান ক্লাব ভাস্কো ডা গামা থেকে জুনিনহো পারমানবুকানো লিওঁতে যোগ দেওয়ার পরেই টানা সাত-সাতবার ফরাসী লিগ জেতে লিওঁ। এটা কি যেমন তেমন কোন অর্জন? লিওঁতে থাকাকালীন সময়েই নিজেকে সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন জুনিনহো। অনেকের মতেই জুনিনহো ফুটবল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ফ্রি-কিক স্পেশালিস্ট ; ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, ডেভিড বেকহ্যাম, রোনালদিনহো কিংবা আন্দ্রেয়া পিরলো নন।

এতকিছুর পরেও জুনিনহো একবারের জন্যেও কি ব্যালন ডি অর বা ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড় পুরষ্কারের ধারকাছেও যেতে পেরেছেন?

লিওঁর ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় কি বলা যায় না জুনিনহোকে?

উত্তর হবে, না। কারণটা স্বাভাবিক, ফরাসী লিগে খেললে সেখানে আপনাকে খেলতে হবে বাস্তিয়া, অ্যাঙ্গার্স, কায়েন, দিওন, মেতজ, রেনেঁ – এইসব ক্লাবের বিরুদ্ধে। শক্তির দিক দিয়ে যেসব ক্লাব অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ, ভ্যালেন্সিয়া, সেভিয়া, ভিয়ারিয়াল, অ্যাথলেটিক বিলবাও, দেপোর্তিভো, মালাগা – এসব ক্লাবগুলোর থেকে যোজন যোজন পিছিয়ে ; যাদের সাথে বার্সেলোনা লা লিগাতে খেলে প্রতি সপ্তাহে। কোনভাবেই স্প্যানিশ লা লিগার সাথে ফরাসী লিগ ওয়ানের তুলনা হয় না, হতেই পারেনা।

আরেকজন ব্রাজিলিয়ানের কথা বলি। নাম তাঁর সনি অ্যান্ডারসন। নব্বইয়ের দশকে ব্রাজিল দলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধর স্ট্রাইকার মানা হত তাঁকে। মোনাকোতে নজর কাড়ার পর সাতানব্বইয়ে যোগ দিয়েছিলেন বার্সেলোনায়। বার্সেলোনার হয়ে মোটামুটি সফলই ছিলেন, পরে কোচ লুই ভ্যান হালের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে অলিম্পিক লিওঁতে যোগ দেন। একটু আগে যে বললাম, লিওঁর টানা সাত চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম দুইটায় তাঁর অনেক অবদান ছিল। কিন্তু বার্সা ছাড়ার পর তাঁর মত প্রতিভাধর স্ট্রাইকারের কথা কেউ কি মনে রেখেছে?

পিএসজির মালিকানা কাতারি ধনকুবেরদের হাতে যাওয়ার পর গত ছয়-সাত মৌসুমে থিয়াগো সিলভা, ইব্রাহিমোভিচ, হাভিয়ের পাস্তোরে, অ্যানহেল ডি মারিয়া, ডেভিড লুইজ, এডিনসন কাভানি, ইজেক্যিয়েল লাভেজ্জি, মার্কো ভেরাত্তি, মার্ক্যুইনহোস, ব্লেইজ মাতুইদি, ডেভিড বেকহ্যাম, ইয়োহান কাবায়ে, থিয়াগো মোত্তা, সালভাতোরে সিরিগুদের মত তারকারা গিয়েও একবারের জন্যেও পিএসজিকে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে পর্যন্ত তুলতে পারেননি তারা। ফরাসী লিগ এমনিতেই অন্যান্য লিগের তুলনায় মানুষের নজরে পড়ে কম, তার উপরে চ্যাম্পিয়নস লিগও যে ক্লাব সহজে জিততে পারবেনা, সেখানে যত ভালো পারফর্মই করুন না কেন, নেইমারের পারফরম্যান্সের দাম কি আদৌ থাকবে?

ডিয়েগো ম্যারাডোনা বা লিওনেল মেসির পাশাপাশি অনেকের মতেই আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধর খেলোয়াড় হল হুয়ান রোমান রিকেলমে – অলস জাদুকর বলা হত যাকে। বোকা জুনিওর্সের হয়ে নজর কাড়ার পর ডাচ কোচ লুই ভ্যান হালের অধীনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি বার্সাতে। কোচ-ম্যানেজমেন্টের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে বার্সা ছাড়ার পর বোকা জুনিয়র্সে ফেরত গিয়ে নিজেকে বোকার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে প্রমাণ করেছেন। কিন্তু তাতে কি ব্যালন ডি অর রিকেলমের হাতে ধরা দিয়েছে? মনে হয় না! কারণটা স্বাভাবিক, আর্জেন্টাইন লিগ সব দিক দিয়েই স্প্যানিশ লা লিগার থেকে যোজন যোজন পিছিয়ে, সেখানে যত যাই করুন না কেন – লাভ নেই!

বার্সা ছাড়ার আগে তাই আরেকবার ভেবে দেখুন নেইমার, টাকাই সব নয়।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

17 − 1 =