লন্ডনের এক জুডাস

২০০১ সালের জুলাই মাসের তিন তারিখ। আর্সেনালের লন্ডন কলোনি ট্রেনিং গ্রাউন্ডে ডাকা হল প্রেস সাংবাদিকদের, কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার তলব করেছেন। বেশ কয়েকমাস ধরেই ইপসউইচ টাউনের উদীয়মান ইংলিশ গোলরক্ষক রিচার্ড রাইটের প্রতি আগ্রহী আর্সেনাল, তাই সাংবাদিকেরা ভাবলেন হয়তো রাইটকেই দলে নিয়ে এসেছেন ওয়েঙ্গার, তাঁকে আর্সেনালের খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার জন্যই বোধহয় প্রেস কনফারেন্স।

কিন্তু কনফারেন্সে এসে সাংবাদিকেরা যা দেখলেন, সেটার জন্য বোধহয় কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। আর্সেনাল কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারের পাশে হাসিমুখে বসে আছেন ইংল্যান্ডের তৎকালীন সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেন্টারব্যাক, আর্সেনালের নগর-প্রতিদ্বন্দ্বী টটেনহ্যাম হটস্পারের ইংলিশ সেন্টারহাফ সল ক্যাম্পবেল! কিভাবে কি! টটেনহ্যামের সাথে ক্যাম্পবেলের চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ার কথা এই দুইদিনে, চুক্তি শেষ হলেই যেকোন ক্লাবে ফ্রি তে যেতে পারবেন ক্যাম্পবেল, তাহলে কি বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, লিভারপুলের মত বাঘা বাঘা ক্লাবকে বাদ দিয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্সেনালেই যোগ দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন ক্যাম্পবেল? এও কি সম্ভব? যে খেলোয়াড় তৎকালীন সময়ে তর্কাতীতভাবে টটেনহ্যামের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়, নয় বছরে আড়াই শতাধিক ম্যাচ খেলেছেন যিনি, দু বছর আগেই লেস্টার সিটিকে হারিয়ে স্পার্সদের অধিনায়ক হিসেবে লিগ কাপের শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছেন যিনি, স্পার্সের এক ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন কখনই আর্সেনালের হয়ে খেলবেন না, তাহলে কি সবকিছু আজ মিথ্যা হয়ে গেল? সেই আর্সেনালেই চলে আসলেন ক্যাম্পবেল?

স্পার্স ফ্যানদের কাছে এখনও ‘জুডাস’ হিসেবে ঘৃণিত ক্যাম্পবেল

তখন ইন্টারনেটের এমন রাজত্ব ছিল না। আজকে টেরি-ইব্রাহিমোভিচ-লেফান্ডোফস্কিদের চুক্তির বারোমাস বাকী থাকতেই এক বছর আগে থেকে ট্যাবলয়েড বা স্পোর্টস ওয়েবসাইটগুলো কাউন্টডাউন শুরু করে দেয় তারা কোথায় যেতে পারেন পরবর্তীতে। কিন্তু তখন ফুটবল বিশ্বের তথ্য এরকম এক ক্লিকেই পাওয়া যেত তা, এতটা সহজলভ্য ছিল না। তাই কোন সাংবাদিক ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি ক্যাম্পবেলের আর্সেনালে আসার কথা!

নয় বছর থাকার পর টটেনহ্যামের সাথে ক্যাম্পবেলের চুক্তি শেষ হয়ে যায়। নতুন চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিল টটেনহ্যাম, যে চুক্তিতে স্বাক্ষর করলে ক্লাবের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশী বেতন পাওয়া খেলোয়াড় হতেন তিনি। কিন্তু না, ক্যাম্পবেল তাতে সন্তুষ্ট হলেন না। ক্লাবের কাছে চেয়ে বসলেন অবিশ্বাস্য অঙ্কের বেতন। তিন বছরের চুক্তিতে ২০ মিলিয়ন পাউন্ড বেতন চেয়ে বসলেন তিনি। এখনকার পেট্রোডলারের ঝনঝনানির যুগে এই টাকা হয়তোবা কিছুই না, কিন্তু তখন, আজ থেকে প্রায় ১৬ বছর আগে টটেনহ্যামের মত একটা মাঝারি সারির ক্লাবের জন্য এই অংকটা আকাশছোঁয়াই ছিল। যেটা দিতে স্বাভাবিকভাবেই অস্বীকৃতি জানিয়েছিল টটেনহ্যাম, আর যে সুযোগটা লুফে নিয়েছিলেন আর্সেন ওয়েঙ্গার।

আর্সেনালে যোগ দেওয়ার পর দুইবার প্রিমিয়ার লিগ, তিনবার এফএ কাপ আর একবার চ্যাম্পিয়নস লিগে ফাইনালে উঠে ক্যাম্পবেল স্পার্স সমর্থকদের মনে বিদ্বেষের আগুনে আরও সলতেই দিয়েছেন বরং। আজকের এই দিনে, ৩ জুলাইতে, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত-সমালোচিত এই দলবদলের ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল। উত্তর লণ্ডনের এক অংশে একই মানুষ যেখানে দেবতার মর্যাদা পেয়েছিলেন, আরেক অংশের কাছে সারাজীবন পেয়ে গেছেন ‘জুডাস’ সম ঘৃণা!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

nineteen + eight =