অবনতির পথে ইতালিয়ান ফুটবল – কেন হল এই অবস্থা?

সপ্তাহ দুয়েক আগে হল্যান্ড। এবার ইতালি। গত কয়েক সপ্তাহেই নিশ্চিত হয়ে গেল সামনের বছর রাশিয়াতে হতে যাওয়া ফুটবলের সবচেয়ে বড় মহাযজ্ঞে বিশ্ব ফুটবলের ঐতিহাসিক এই দুই পরাশক্তি থাকছেনা। ১৯৮৮ সালের ইউরোজয়ী, ইয়োহান ক্রুইফ-ইয়োহান নিসকেন্স-রাইনাস মিশেলস এর টোটাল ফুটবলের আঁতুড়ঘর নেদারল্যান্ড/হল্যান্ডের ফুটবল সেই গত ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার পর থেকেই পড়তির দিকে আছে, ২০১৬ ইউরোতে সুযোগ না পাওয়া খুলিত-বাস্তেন-কোম্যান-রাইকার্ডদের নেদারল্যান্ড ২০১৮ বিশ্বকাপেও খেলার সুযোগ পেলো না। যারা মোটামুটি ফুটবলের এসব খবরাখবর রাখেন, ও যারা মোটামুটি হল্যান্ডের বর্তমান ফর্ম ও স্কোয়াড সম্পর্কে অবগত তারা জানেন ২০১৮ বিশ্বকাপে হল্যান্ডের সুযোগ না পাওয়াটা হতাশাজনক হলেও একদম আশ্চর্যের কিছু নয়।

আশ্চর্যের বিষয় হল ফুটবল বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ দল, চারবারের বিশ্বকাপজয়ী ইতালিরও ২০১৮ বিশ্বকাপে জায়গা করে না নিতে পারাটা। গত কয়েকদিন আগে সুইডেনের বিপক্ষে দুই লেগের প্লে-অফে বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেনি ইতালি, দুই লেগ মিলিয়ে ১-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়েছে তারা।

এর ফলাফল হয়েছে সুদূরপ্রসারী। দলের গোলরক্ষক, ফুটবল ইতিহাসেরই অন্যতম শ্রেষ্ঠ গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফনসহ অবসর নিয়েছেন ইতালির বিশ্বকাপজয়ী ২০০৬ দলের বাকী দুই সদস্য মিডফিল্ডার ড্যানিয়েলে ডি রসি ও সেন্টারব্যাক আন্দ্রেয়া বারজাগলি। এখনও সিদ্ধান্ত নেননি, তবে অবসর নিতে পারেন আরেক সেন্টারব্যাক জর্জো কিয়েল্লিনিও। ব্যর্থতার দায়ে ছাঁটাই করা হয়েছে ইতালি কোচ জিয়ানপিয়েরো ভেনতুরাকে। ইতালিতে তো বটেই, পুরো ফুটবল বিশ্বে হাহাকার রব পড়ে গেছে।

হল কি ইতালির?

ইতালিতে বুফন অধ্যায় শেষ হয়েছে এই ম্যাচের মধ্য দিয়েই

আসলেই, হল কি ইতালির? চারবারের বিশ্বকাপজয়ী এই দল, যুগে যুগে যে দল ফুটবল বিশ্বকে উপহার দিয়েছে জিউসেপ্পে মিয়াজ্জা, সিলভিও পিওলা, ভ্যালেন্তিনো ম্যাজোলা, লুইজি রিভা, পাওলো রসি, জিয়াচিন্তো ফাচেত্তি, সান্দ্রো ম্যাজোলা, জিয়ান্নি রিভেরা, গায়েতানো চিরেয়া, পাওলো মালদিনি, ফ্র্যাঙ্কো বারেসি, অ্যালেসান্দ্রো নেস্তা, ফ্র্যান্সেসকো টট্টি, দিনো জফ, রবার্তো ব্যাজিও, জিউসেপ্পে বার্গোমি, কার্লো অ্যানচেলত্তি, অ্যান্দ্রেয়া পিরলো, জেনারো গাত্তুসো, ফ্যাবিও ক্যানাভারো, জিয়ানলুইজি বুফন, লুকা টনি, ক্রিশ্চিয়ান ভিয়েরি, ড্যানিয়েলে ডি রসি, ফিলিপ্পো ইনজাঘিসহ হাজার হাজার ফুটবল প্রতিভাকে – সে দলের এমন কি হল যে বিশ্বের সেরা ৩২ টা দলের মধ্যে একটা দল হিসেবে জায়গা করে নিতে পারলো না ফুটবলের মহাযজ্ঞে?

সমস্যার মূল খুঁজতে যেতে হবে অনেক গভীরে। ইতালির ফুটবলের এই ক্ষয় কিন্তু আজকে থেকে শুরু হয়নি। সেই ২০০৬ সালে ম্যাচ পাতানো স্ক্যান্ডালে জর্জরিত ইতালি তাঁর পরের দুই বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বই পেরোতে পারেনি। অনেকে বলেন ২০০৬ সালে সেই জিদান-কাণ্ডের পর জিদানের অভিশাপেই ইতালির আজ এই দশা! অভিশাপ কি না জানিনা, তবে ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপে ইতালির প্রথম রাউন্ড পেরোতে না পারা ও ২০১৮ বিশ্বকাপে সুযোগ না পাওয়ার পেছনে বেশ কিছু ভুল সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের অবদান আছে বৈকি।

২০০৬ বিশ্বকাপ জেতে না জেতেই কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়ান সফল কোচ মার্সেলো লিপ্পি। তাঁর জায়গায় নিয়ে আসা হয় কিংবদন্তী উইঙ্গার রবার্তো দোনাদুনিকে। ২০০৮ ইউরোতে স্পেইনের কাছে দ্বিতীয় রাউন্ডে পরাজয়ের পর দোনাদুনিকে বরখাস্ত করে ইতালি ফুটবল ফেডারেশান। তাঁর জায়গায় আবারো বিশ্বকাপজয়ী মার্সেলো লিপ্পির দ্বারস্থ হয় ইতালি। ২০১০ বিশ্বকাপে ইতালি যায় এই লিপ্পির কোচিংয়েই।

এই বিশ্বকাপে লিপ্পি যে সবচেয়ে বড় ভুলটা করেন সেটা হল দলে বয়োজ্যোষ্ঠ খেলোয়াড়দের রেখে। ২০০৬ সালে যাদের নিয়ে লিপ্পি বিশ্বকাপ জিতেছিলেন, তিনি ভেবেছিলেন ২০১০ সালেও তাদের দিয়েই পার পেয়ে যাবেন । ৩৬ বছর বয়সী ফ্যাবিও ক্যানাভারোর উপর অধিনায়কত্বের দায়িত্ব দিয়ে সেবার লিপ্পি দলে রেখেছিলেন জিয়ানলুকা জামব্রোত্তা, মাউরো কামোরানেসি, মরগ্যান ডে স্যাঙ্কটিস, ভিনসেঞ্জো ইয়াকুইন্তা, জেনারো গাত্তুসোদের মত খেলোয়াড়দের, যারা স্বভাবতই তাদের সেরা সময়কে পেছনে ফেলে এসেছিলেন। দলে জায়গা পাননি মার্কো স্টোরারি, আলেসসান্দ্রো মাত্রি, আন্তোনিও কাসানো, জিয়ামপাওলো পাজিনি, ফ্যাব্রিজিও মিকোলিদের মত তরুণ প্রতিভারা। এই ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল ইতালি দেয় প্রথম রাউন্ড থেকে বাদ পড়ে।

লিপ্পির পর ইতালির কোচ হয়ে আসেন সেজারে প্রানদেল্লি। তখন ফিওরেন্টিনার হয়ে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়ে নজরে আসা এই কোচ যেন ইতালির গুমোট ফুটবলে এক স্বস্তির সুবাতাস নিয়ে আসেন। ইউরো ২০১২ কে পাখির চোখ করে দল গঠন করা প্রানদেল্লি দল থেকে প্রাচীন অনেক সেনানীকেই বাদ দিয়ে দেন। দল সাজান অ্যাঞ্জেলো ওগবোন্না, ইগনাজিও আবাতে, ক্লদিও মার্কিসিও, মারিও বালোতেলি, সালভাতোরে সিরিগু, ইম্যানুয়েলে জ্যাক্কেরিনি, রিকার্ডো মন্তোলিভো, সেবাস্তিয়ান জিওভিঙ্কোদের মত নতুন মুখদের নিয়ে। ফলও পায় ইতালি হাতেনাতে। সেমিফাইনালে জার্মানির মত দলকে দোর্দণ্ড প্রতাপে হারানো ইতালি ফাইনালে যদিও সর্বজয়ী স্পেইনের কাছে হেরে যায়, তাও প্রানদেল্লি প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে ইতালিয়ান ফুটবলকে মোটামুটি তিনি লাইনে এনেছেন। ফলে ২০১৪ বিশ্বকাপের দায়িত্বও তাঁর হাতেই পড়ে।

কিন্তু আবারো ২০১৪ বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ড থেকেই বাদ পড়ে ইতালি। দলের দায়িত্ব এবার চলে যায় ইতালিয়ান ফুটবলের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে সেরা কোচ আন্তোনিও কন্তের উপর, জুভেন্টাসকে হ্যাটট্রিক লিগ জিতিয়ে তখন তিনি ফর্মের তুঙ্গে। ইউরো ২০১৬ তে কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে বাদ পড়লেও কন্তে যে প্রজেক্টটা শুরু করেছিলেন নতুন খেলোয়াড়দের নিয়ে, সবাই আশাবাদী ছিল সেই প্রজেক্টটার কাজ এগিয়ে নিতে পারলেই ইতালি আবারো বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তি হতে পারবে। যে চিরনির্ভর ডিফেন্সের উপর নির্ভর করে জুভেন্টাসকে টানা তিনবার লিগ জিতিয়েছিলেন, সেই বুফন-বারজাগলি-বোনুচ্চি-কিয়েল্লিনির ডিফেন্স ছিল কন্তের ইতালি জাতীয় দলেরও মূল ভিত্তি। পাইপলাইনে ছিলেন চিরো ইমোবিলে, লরেঞ্জো ইনসিনিয়া, মার্কো ভেরাত্তি, অ্যালেসসিও রোমানিওলি, জিয়ানলুইজি দোনারুমা, অ্যান্দ্রেয়া বেলোত্তি, অ্যালেসান্দ্রো ফ্লোরেঞ্জির মত প্রতিভারা। শুধুমাত্র তাদেরকে ঠিকভাবে পরিচর্যা করে একটা কার্যকরী একাদশ গঠন করতে পারলেই হত। আন্তোনিও কন্তে ইউরো ২০১৬ এর পর ইতালি ছেড়ে চেলসিতে চলে গেলেন, প্রজেক্টের কাজ সঁপে দেওয়া হল কোচ জিয়ানপিয়েরো ভেনতুরার হাতে।

আর এখানেই ইতালি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশানের প্রধান কার্লো ত্যাভেচ্চিও বড় ভুলটা করলেন। ইতালিয়ান ফুটবল যেরকম যুগে যুগে প্রতিভাধর খেলোয়াড় দিয়েছে বিশ্বকে, দিয়েছে প্রতিভাধর কোচও। যেমন ভিত্তোরিও পোজ্জো, আরিগো সাক্কি, এনজো বিয়ারজোত, জিওভান্নি ত্রাপাত্তোনি, সেজারে মালদিনি, মার্সেলো লিপ্পি, কার্লো অ্যানচেলত্তি, ক্লদিও রানিয়েরি, রবার্তো মানচিনি, আন্তোনিও কন্তে – ইত্যাদি। এদের তালিকায় কোনকালেই জিয়ানপিয়েরো ভেনতুরার নাম আসবেনা, এটা বোধহয় ভদ্রলোক নিজেও ভালো করেই জানেন। চল্লিশ বছরের কোচিং ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ সাফল্য যার ইতালিয়ান ক্লাব লেচ্চেকে সিরি সি থেকে সিরি বি তে তোলা। ২০১১ সাল থেকে সিরি আ এর ক্লাব তোরিনোর ম্যানেজার হিসেবে থাকা এই ভেনতুরা মাত্তেও দারমিয়ান, অ্যালেসসিও সার্সি, অ্যাঞ্জেলো ওগবোন্নার মত বেশ কিছু তরুণ প্রতিভাকে পরিচর্যা করেছেন বটে – কিন্তু তাও ইতালির হটসিটে বসার মত যোগ্য তিনি কোনকালেই ছিলেন না।

মার্কো তাভেচ্চিও সেটা ভাবেননি, ভেবেছিলেন জুয়াটা কাজে লেগে যাবে। ২০১৬ সালের ইউরোর পর ইতালির ম্যানেজারের হটসিটে বসা ভেন্তুরা ক্ষণে ক্ষণে সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন কেন তিনি প্রচণ্ডমাত্রার নেতিবাচক, নৈরাশ্যবাদী এক কোচ যার কোচ হিসেবে উদ্ভাবনী ক্ষমতা নেই বললেই চলে। ইউরো বাছাইপর্বে স্পেইনের সাথে এক গ্রুপে পড়ার পর তিনি পারলে তখনই হার মেনে নেন, “আমি জানতাম আমাদের প্লে-অফ খেলতে হবে যখনই আমি দেখেছিলাম আমাদের গ্রুপে স্পেইন আছে”, সুইডেনের বিপক্ষে প্লে-অফ খেলার আগে ভদ্রলোকের বক্তব্য! যে কোচ হারার আগেই আগে থেকে এভাবে হেরে বসে আছেন, সে কোচ তাঁর দলকে পথনির্দেশনা দিবেন কি আর?

তাভেচ্চিওর একটা ভুল সিদ্ধান্ত, যার কারণে ভেন্তুরার কাঁধে চাপানো হয়েছে ইতালির দায়িত্ব, এই ভেন্তুরা প্রতিমুহূর্তে তাঁর ট্যাকটিক্যাল সীমাবদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন সবাইকে। ৩-৫-২ ফর্মেশানে গোলবারের নিচে বুফন ও তাঁর সামনে তিনজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে বোনুচ্চি-বারজাগলি-কিয়েল্লিনির ব্যবহার তো সেই কন্তেই শিখিয়ে দিয়ে গেছেন, তাই এইখানে ভেন্তুরার অবদান সামান্যই। দুই উইংব্যাক হিসেবে ক্রমাগত খেলিয়ে গেছেন লাজিওর রাইট উইঙ্গার আন্তোনিও কানদ্রেভা ও মাত্তেও দারমিয়ান কে। দুইজনই ডানদিকের খেলোয়াড়, দারমিয়ানকে অনেকটা জোর করে খেলাতেন বাম উইংব্যাক পজিশানে, ফলে নিজের খেলাটা ভালোভাবে খেলতে পারতেন না তিনি, ওদিকে ক্লাবে উইঙ্গার হিসেবে খেলা কানদ্রেভা একটা উইংব্যাকের ভূমিকায় ভালো খেলতে পারেন না কখনই। কারণ একজন উইংব্যাককে আক্রমণের পাশাপাশি রক্ষণের দিকটাও সামলাতে হয় ভালোমত, যেটা কানদ্রেভা পারেন না। অথচ চেলসির মত ক্লাবে ঔজ্জ্বল্য ছড়ানো রাইট উইংব্যাক ডেভিডে জাপাকস্টাকে নিয়মিত সুযোগ দেওয়া হয়না। জর্জিনিওর মত প্রতিভাবান সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারকে এতদিন দলে ডাকেনইনি ভেন্তুরা! ব্রাজিলে জন্ম নেওয়া এই মিডফিল্ডার চাইলে ব্রাজিলের হয়েও খেলতে পারতেন কিন্তু শেষ মুহূর্তে ইতালির প্রতি জর্জিনিওর আনুগত্যের কারণেই এই একেবারে শেষে সুইডেনের বিপক্ষে প্লে-অফে ভেন্তুরা দলে ডাকতে বাধ্য হল জর্জিনিওকে।

কেন, আরো আগে ডাকা যেত না তাঁর মত প্রতিভাবান একটা Deep Lying Playmaker কে? কিন্তু না, ভেন্তুরা ডাকেননি, আগে ডাকলে হয়ত ইতালির ভাগ্যে বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়া লেখা থাকত না।

কোচ জিয়ানপিয়েরো ভেন্তুরা

ভেন্তুরার নেতিবাচক ট্যাকটিকসের বলি হয়েছেন আরো অনেকে। চূড়ান্তভাবে ডিফেন্সিভ এই কোচ দলের সবচেয়ে প্রতিভাধর ফরোয়ার্ড লরেঞ্জো ইনসিনিয়াকে নিয়ে একের পর এক এক্সপেরিমেন্ট করে গেছেন। নাপোলির হয়ে ৪-৩-৩ ফর্মেশানে লেফট ইনসাইড ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলা ইনসিনিয়ার জায়গা হত না ভেন্তুরার ৩-৫-২ ফর্মেশানে একজন ফরোয়ার্ড হিসেবে। জায়গা হলেও দেখা যেত তাঁকে খেলানো হচ্ছে একটা মিডফিল্ডার হিসেবে! এমনকি সুইডেনের সাথে প্লে-অফের দ্বিতীয় লেগে যখন একটা গোলের জন্য হাপিত্যেশ করছে ইতালি, সেই ম্যাচেও এই ফরোয়ার্ডকে খেলাননি ভেন্তুরা। সাবস্টিটিউট হিসেবে নামাতে গেছিলেন আরেকটা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ড্যানিয়েলে ডি রসিকে, যখন একটা গোলের একান্তই দরকার! অথচ গত দুই মৌসুমে ইতালিয়ান ফরোয়ার্ডদের মধ্যে এই লরেঞ্জো ইনসিনিয়াই সবচাইতে উদ্ভাবনী, কার্যকরী ও সফল। কোচের এই সিদ্ধান্তে বেঞ্চে বসা ড্যানিয়েলে ডি রসি এতটাই বিরক্ত হয়েছিলেন যে, পারলে কোচের সহকারীর সাথে ঝগড়াই লাগিয়ে দেন কেন তাঁকে নামানো হচ্ছে, ইনসিনিয়াকে নয়, কারণ ইতালির তখন গোল করার দরকার, গোল আটকানো নয়!

এ তো গেল কোচ ও বোর্ডপ্রধানের নেতিবাচক সিদ্ধান্তের কথা। ইতালির এই দুর্দশার পিছে খেলোয়াড়দেরও কি ভূমিকা নেই। বলতে আপত্তি নেই, ইতালির এই প্রজন্মটা খুব সম্ভবত স্মরণকালের সবচেয়ে কম প্রতিভাধর। গোলরক্ষক পজিশানে এসি মিলানের তরুণ প্রতিভাধর জিয়ানলুইজি দোনারুমা এসেছেন বলে রক্ষা, নাহয় জিজি বুফনের হাত থেকে গোলবারের ব্যাটন নিতে পারেন এরকম গোলরক্ষক ইতালি পেয়েছে কই? মার্কো স্টোরারি, সালভাতোরে সিরিগু, ফেদেরিকো মারচেত্তি, মাত্তিয়া পেরিন – সবাই শুধু এসেছেন আর গেছেন, কেউ গোলবারের নিচের পজিশানটাকে নিজের করে নিতে পারেননি। সেন্ট্রাল ডিফেন্সে বারজাগলি-কিয়েল্লিনির বয়স হয়ে যাচ্ছে। তাদের হাত থেকে সেন্ট্রাল ডিফেন্সের দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার জন্য এসি মিলানের অ্যালেসসিও রোমানিওলি আর জুভেন্টাসের ড্যানিয়েলে রুগানি আর মাত্তিয়া কালদারা ছাড়া কেউ নেই, যদিও তাদেরকে ঘষেমেজে অনেক পরিপক্ক বানাতে হবে এখনো, যোগ্য কোচের হাতে না পড়লে ওগবোন্না, জাক্কার্ডো, আস্তোরির মত ঝরে পড়তে সময় লাগবেনা।

এককালে যে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে অ্যান্দ্রেয়া পিরলো, জেনারো গাত্তুসো, ড্যানিয়েলে ডি রসিদের মত সেন্ট্রাল মিডফিল্ডাররা ছড়ি ঘোরাতেন – এখন সে জায়গায় খেলেন মার্কো পারোলো, ম্যানুয়েলে জাক্কেরিনির মত গড়পড়তা মানের মিডফিল্ডার। মার্কো ভেরাত্তির অনেক প্রতিভাধর হলেও আদর্শ সঙ্গীর অভাবে ঝলসে উঠতে পারেননা ইতালির হয়ে। জর্জিনহো, থিয়াগো মোত্তা – মোটামুটি মানের মিডফিল্ডার, তাদের দিয়ে কাজ চালানো যায়, কিন্তু তারা কি পিরলো বা গাত্তুসোর মত কার্যকরী? অবশ্যই না! ক্লদিও মার্কিসিও, রিকার্ডো মন্তোলিভোরাও ফর্ম হারিয়ে কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছেন। ইতালিয়ান মিডফিল্ডে যে একেবারেই প্রতিভা নেই তা বলছিনা – মার্কো ভেরাত্তি, রবার্তো গ্যালিয়ার্দিনি, লরেঞ্জো পেলেগ্রিনি, জর্জিনিও – এদের নিয়ে ইতালি অবশ্যই স্বপ্ন দেখতে পারে, কিন্তু তাদেরকে জাতীয় দলের কার্যকরী পারফর্মার হয়ে গড়ে তোলার জন্য অনেক খাটতে হবে নতুন কোচের।

সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বোধহয় ইতালির স্ট্রাইকারদের। যে দলে এককালে খেলে গেছেন দেল পিয়েরো, টট্টি, টনি, ভিয়েরি, ইনজাঘি, মাজোলা, রসি, স্কিলাচিদের মত স্ট্রাইকার, এখন তারা এই পজিশানে প্রতিভার জন্য হাপিত্যেশ করে। মারিও বালোতেলি যেরকম ঝড়ের মত এসেছিলেন, সেভাবেই চলে গেছেন। ইতালি এখন চলে এডার, গ্রাজিয়ানো পেল্লে, সিমোনে জাজা, রবার্তো ইংলেসে, অ্যান্দ্রেয়া পেতাগনা, আলবার্তো পালোশচি, মানোলো গ্যাবিয়াডিনির মত মাঝারিমানের স্ট্রাইকার দিয়ে। আগে যেটা বললাম, লরেঞ্জো ইনসিনিয়ার মত প্রতিভার সদ্ব্যবহার করা হয়না এখানে। তবে মিডফিল্ডের মত এখানেও যে একেবারেই প্রতিভা নেই তা বলছিনা – চিরো ইমোবিলে, অ্যান্দ্রেয়া বেলোত্তির মত স্ট্রাইকার থাকলেও তাদের অনেক ভালো পরিচর্যা জরুরি।

প্রতিভার এরকম দৈন্য কেন ইতালি দলে? সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চলে যেতে হবে একটু গভীরে। আশি নব্বইয়ের দশকে, এমনকি বিংশ শতাব্দীর শুরু দিকেও বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সম্মানজনক লিগ ছিল ইতালিয়ান সিরি আ। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সব খেলোয়াড়রা তখন জুভেন্টাস, এসি মিলান, নাপোলি, রোমা, ইন্টার মিলান এমনকি সাম্পদোরিয়া-তোরিনোতে যাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকতেন। জুভেন্টাসে এসে খেলে গেছেন মিশেল প্লাতিনি, ইয়ান রাশ, জিনেদিন জিদান, মাইকেল লাউড্রপদের মত খেলোয়াড় ; নাপোলি এনেছিল ডিয়েগো ম্যারাডোনা, কারেকাদের মত খেলোয়াড়কে ; এসি মিলানের ডাচ ত্রয়ী রুড খুলিত-মার্কো ভ্যান বাস্তেন-ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ড তো ইতিহাসেরই অংশ হয়ে গেছেন, পরে মিলানে খেলে গেছেন কাকা, শেভচেঙ্কো, সিডর্ফদের মত খেলোয়াড়ও। ইন্টারে খেলেছেন লোথার ম্যাথাউস, ইউর্গেন ক্লিন্সম্যান ; ওদিকে রোমা মাতিয়ে গেছেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, রুডি ফলারের মত খেলোয়াড়। আস্তে আস্তে জনপ্রিয়তা ও খেলোয়াড়দের আগ্রহের দিক দিয়ে গত এক-দেড় দশকে ইতালিয়ান সিরি আ কে টপকে গেছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ও স্প্যানিশ লা লিগা। বিশ্বসেরা খেলোয়াড়রা এখন আর ইতালিয়ান ক্লাবগুলোকে প্রায়োরিটি দেন না। কমে গেছে সিরি আ এর জৌলুস, ক্লাবগুলোর টাকাও রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, চেলসি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বা চেলসির মত নেই আর। ফলে নিজেরা আরো বেশী অর্থশালী হবার খায়েশে ইতালিয়ান ক্লাবগুলো লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে কম দামে প্রতিভা ধরে এনে এক-দুই মৌসুম খেলিয়ে চড়া মূল্যে অন্যান্য ক্লাবের কাছে বিক্রি করছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ইতালিয়ান প্রতিভাগুলো। ইতালিয়ান তরুণদের পরিচর্যা করার চাইতে বাইরে থেকে খেলোয়াড় এনে তাদেরকে এক দুই মৌসুম পর বেশী দামে বিক্রি করার পিছেই ক্লাবগুলোর আগ্রহ এখন। হিসাব করে দেখুন, এখনকার বাজারে একটা ব্রাজিলিয়ান বা একটা আর্জেন্টাইন তরুণ প্রতিভার চাহিদা কিন্তু একটা ইতালিয়ান প্রতিভার চেয়ে অনেক বেশী। একজন পাওলো ডিবালা, একজন গঞ্জালো হিগুয়াইন, একজন মাউরো ইকার্দিকে পরিচর্যা করে একটা ক্লাব যত অর্থ কামাতে পারবে, একজন স্টেফান এল শারাউই কিংবা একজন আন্তোনিও কানদ্রেভাকে বেচে সেরকম অর্থ কামাতে পারবেনা।

আগে যেরকম আমরা দেখতাম, প্রত্যেকটা শীর্ষ ইতালিয়ান ক্লাবের মেইন-ম্যান বা মূল খেলোয়াড় থাকতেন একজন ইতালিয়ান। বহুবছর জুভেন্টাসের হাল ধরেছেন দেল পিয়েরো-বুফন, রোমার প্রতিশব্দ হয়ে ছিলেন ফ্র্যান্সেসকো টট্টি, এসি মিলান মানেই লোকে বুঝত পাওলো মালদিনি-ফ্র্যাঙ্কো বারেসির দল। জিনিসটা এখন আর এরকম নেই। বহু বছর ধরেই জুভেন্টাসের হাল ধরেছেন জিদান-নেদভেদ-ভিদাল-ডিবালা-হিগুয়াইন রা, যারা কেউই ইতালিয়ান নন। রোমার মূল খেলোয়াড় এখন এডিন জেকো বা রাজ্জা নাইঙ্গোলান, নাপোলি চলছে ড্রাইস মার্টেন্স-মারেক হামসিকে সওয়ার হয়ে, ইন্টারে আছেন মাউরো ইকার্দি। এদের কেউই ইতালিয়ান না। আগে ইতালিয়ান ফুটবলাররা প্রতিভার ঝলক দেখানো শুরু করলেই মূল দলে সুযোগ পেয়ে খেলতে খেলতে অভিজ্ঞ হতেন – যা আমরা দেল পিয়েরো, টট্টি, বুফন, মালদিনি প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই দেখে এসেছি। এখনকার সময়ে এল শারাউই, ইনসিনিয়া, বালোতেলিদের সে সুযোগ বলতে গেলে দেওয়াই হয়না, হয় বিক্রি করে দেওয়া হয়, নয় একের পর এক ক্লাবে ধারে খেলতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এতে বড় দলের মূল একাদশের খেলার যে অভিজ্ঞতাটা আছে, সেটা পাননা ইতালির খেলোয়াড়েরা। বালোতেলির কথাই ধরুন, ইন্টার মিলানে ঠিকমত মেলে উঠার আগেই তাকে বিক্রি করে দেওয়া হল ম্যানচেস্টার সিটির কাছে, ফোজ্ঞিয়া-পেসকাররা মত ক্লাবে খেলতে খেলতে এতদিনে নাপোলির মূল দলে নিয়মিত সুযোগ পেয়েছেন লরেঞ্জো ইনসিনিয়া। কালদারা-রুগানিদের মত ডিফেন্ডারকে জুভেন্টাস নিজের দলে না খেলিয়ে ছোট দলে খেলতে পাঠিয়ে দিচ্ছে প্রায়শই। ফলে বড় দলে নিয়মিত খেলার অভিজ্ঞতাটা পাচ্ছেনা তারা। একটা বড় দলের গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের মত বড় প্ল্যাটফর্মে খেলে একটা খেলোয়াড় যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, সেটা অবশ্যই সিরি বি বা সি এর বেনেভেন্তো বনাম শিয়েভো ম্যাচে খেলে অর্জন করতে পারবেন না – তাই নয় কি?

বার্সেলোনার দিকে তাকান, আজকের মেসি-জাভি-ইনিয়েস্তা-পুয়োল, নিজেদের একাডেমির সবাইকে তারা প্রথম থেকেই সুযোগ দিয়েছিল দেখে সেই সুফলটা তারা পেয়েছে। রিয়াল মাদ্রিদ এখন যে সুফলটা পাচ্ছে মার্কো অ্যাসেনসিও, আলভারো মোরাতার মত খেলোয়াড়দের বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করিয়ে।

ইতালির পাইপলাইনে যে একেবারেই খেলোয়াড় নেই সেটা বলব না। অবশ্যই আছে। সঠিক পরিচর্যা পেলে দোন্নারুমা, কালদারা, কাতালদি, কন্তি, গ্যালিয়ার্দিনি, জর্জিনহো, পেল্লেগ্রিনি, ইনসিনিয়া, বার্নার্দেসকি, ইমোবিলে, ভেরাত্তি, রুগানি, রোমানিওলি, লোকাতেল্লি এসব খেলোয়াড়েরাও বিশ্ব কাঁপানোর ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু তাঁর জন্য প্রয়োজন সঠিক কোচ, সঠিক অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা পরিষদের সঠিক সিদ্ধান্ত।

এগুলো ঠিক না করতে পারলে ইতালির ফুটবল নামতেই থাকবে – উঠবে না। ইতালির ফুটবলই পারে ইতালি দেশটাকে বাঁচাতে, তবে তার জন্য আগে ইতালির ফুটবলকে বাঁচাতে হবে, যা কেবল ইতালিই বাঁচাতে পারে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

twelve − 9 =