ইনিয়েস্তার সিংহাসন চলে যাচ্ছে ইস্কোর হাতে

স্পেইন থেকে শুরু করে বার্সেলোনা। লুইস আরাগোনেস, ভিসেন্তে দেল বস্ক কিংবা ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ড, পেপ গার্দিওলা, টিটো ভিয়ানোভা, লুইস এনরিকে – এদের অধীনে খেলা দুর্দমনীয় এই দুই দলের অন্যতম প্রধান নিয়ামক ছিলেন স্প্যানিশ মিডফিল্ডার অ্যান্দ্রেস ইনিয়েস্তা। ড্রিবলের মায়াজালে আক্রমণভাগে একের পর এক গোলের সুযোগ তৈরি করা ছোটখাট গড়নের এই ম্যাজিকম্যানের অবদানেই বার্সা আর স্পেইন হতে পেরেছে বিশ্বজয়ী। অনেকের মতে সতীর্থ জাভি হার্নান্দেজের চেয়েও তাঁর কারিগরি দক্ষতা ও অবদান বেশী। স্পেন জাতীয় দলের স্বর্ণযুগের চিন্তা করুন। ২০০৮, ২০১২ এর ইউরো আর ২০১০ এ পরম আরাধ্য বিশ্বকাপ জয়ী স্পেনের সেই অপ্রতিরোধ্য দলে ফার্নান্দো টরেস, ডেভিড ভিয়া গোল করলেও দলের মূল প্লেয়ার ছিলেন ইনিয়েস্তা। বার্সেলোনা আর স্প্যানিশ জাতীয় দলের নিউক্লিয়াস হিসেবে দুই দুইটি দলের সোনালী সময়ের কারিগর হবার বিরল কৃতিত্ব আর কয়জনেরই বা আছে? ২০০৮ ইউরো ফাইনাল ম্যান অফ দ্য ম্যাচ, ২০১০ বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যান অফ দ্য ম্যাচ, ২০১২ ইউরো ফাইনালের ম্যান অফ দ্য ম্যাচ, ২০১৫ চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনালের ম্যান অফ দ্য ম্যাচ – অকল্পনীয় পাসিং দক্ষতা, মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, সতীর্থদের দিয়ে অনবরত গোল করানোর সুযোগ সৃষ্টি করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা, চোখ ধাঁধানো বল কন্ট্রোল, বল পায়ে ম্যাজিকের মাধ্যমে মূল ম্যাচে কিংবা মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জ্বলে ওঠাটাকে যেন অভ্যাসের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন সবার প্রিয় ডন অ্যান্দ্রেস।

কিন্তু গতবছর ধরেই দেখা যাচ্ছে, ইনিয়েস্তা আর সেই আগের ইনিয়েস্তা নেই। দলের প্রয়োজনে সেরকম জ্বলে উঠতে পারেন না, বার্সার মূল একাদশের তাঁর অবিচ্ছেদ্য উপস্থিতিটা নেই আর। বয়স হয়েছে তেত্রিশ, বয়সের ভার নিঃসন্দেহে তাঁর পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলছে। এবারে রিয়াল মাদ্রিদের সাথে সুপারকাপটাই দেখুন। প্রথম লেগে পুরোটাই নিষ্প্রভ ইনিয়েস্তা। আর দ্বিতীয় লেগে ত খেলেনইনি।

কিন্তু তাতে কি চিরাচরিত স্প্যানিশ জাদু-দর্শন থেকে বঞ্চিত হয়েছে ন্যু ক্যাম্প কিংবা সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর দর্শকেরা? উত্তর হবে – না। হয়নি কেবলমাত্র একজনের কারণে। তিনি ইস্কো আলারকন। সমর্থকদের প্রিয় ‘ইস্কো’। রিয়াল মাদ্রিদের সাদা জার্সি গায়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন যিনি, সবার মনে বিভ্রম সৃষ্টি করেছেন এই যে – সাদা জার্সি পরে ইনিয়েস্তা আবার কখন খেলা শুরু করলেন?

প্রতীকি ছবি?

প্রথম লেগে ইনিয়েস্তা ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে, উল্টো ইস্কোই তাঁর খেলা, জাদুকরি ড্রিবল ও ভীতিকর আক্রমণ শানিয়ে সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছেন আগের সেই ফর্মে থাকা ইনিয়েস্তাকে। মাদ্রিদের ৪-৩-১-২ ফর্মেশানে ইস্কোর ভূমিকাটা ছিল মুক্ত, অ্যাটাকিং মিডে মুক্তভাবে খেলার সুযোগ করে দিয়েছিলেন জিদান ইস্কোকে। যখনই বল পেয়েছেন, খেলার গতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন সেই আগের যুগের ইনিয়েস্তার মত ; পার্থক্য এটাই, আগের ইনিয়েস্তা খেলা বানিয়ে দিলে খেলার নিয়ন্ত্রণ চলে যেত বার্সেলোনার হাতে, আর এই যুগের ইনিয়েস্তা খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করলে খেলার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বার্সেলোনার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের হাতে। এ যুগের ইনিয়েস্তার অধিকার যে রিয়াল মাদ্রিদেরই!

ওদিকে খেলার ২২ মিনিট বাকী থাকতে কোচ আর্নেস্ট ভালভার্দে উঠিয়ে নেন ইনিয়েস্তাকে। ভাবা যায়? একটা মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ যেখানে বার্সেলোনা পিছিয়ে আছে, গোল করার প্রয়োজন, সেখানে ইনিয়েস্তাকে উঠিয়ে নেওয়া হচ্ছে! ওদিকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দ্বিতীয় গোলের পেছনেও প্রত্যক্ষভাবে ছিল ইস্কোর অবদান।

গত মৌসুমে স্পোর্টিং গিহনের সাথে রিয়াল মাদ্রিদের ম্যাচটার কথাই চিন্তা করুন, এক লা লিগা ম্যাচে সবচেয়ে বেশী সফল ড্রিবল করেছিলেন সেখানে ইস্কো, ২১টি! খোদ ইনিয়েস্তারও যে কীর্তি নেই!

এভাবেই কি তাহলে ইনিয়েস্তার সিংহাসনের ব্যাটনটা উঠে যাচ্ছে ইস্কোর হাতে?

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

10 + eight =