যে ম্যাচে ৬০ ভাগ আবেগ আর ৪০ ভাগ মাত্র ক্রিকেট

Bangladesh Vs India, Only Test Match, 10 June 2015
Khan Shaheb Osman Ali Stadium, Fatullah, Narayanganj, Bangladesh

একটা ক্রিকেট ওয়েবসাইটে ঢুকলাম । আপকামিং ম্যাচের তালিকায় বাংলাদেশ আর ভারতের ম্যাচের নামটা সবার উপরেই দেওয়া । ফতুল্লায় টেস্ট – কথাটা জেনেছি বেশ কয়েকদিন আগেই । ব্যস্ততার মধ্যে থাকায় ব্যাপারটা মাথাতেই আসে নি । একটু অবসর হয়ে ভাবতেই মুখ দিয়ে মনের অজান্তেই বেরিয়ে এলো “আহ ফতুল্লা ! ওহ ফতুল্লা ! ” ক্ল্যাসিক ২০০৬ ! ক্ল্যাসিক শাহরিয়ার নাফিস । ক্ল্যাসিক ফতুল্লা স্টেডিয়াম ! ক্ল্যাসিক সেই ফতুল্লার বিকেল । ১০০ রানের আগেই সিক্স ডাউন অস্ট্রেলিয়া । তখনকার অস্ট্রেলিয়া মানে অস্ট্রেলিয়া । ১ম এই ছয়ের মধ্যে ছিলো হেইডেন, হাসি, ক্লার্ক, পন্টিং, মার্টিন ।
কী একেকটা নাম !
নামের ভারেই স্কোরবোর্ডে তাকিয়ে চোখে শান্তি ।

ফতুল্লা ! আহ ফতুল্লা !
ফতুল্লা ! আহ ফতুল্লা !

এর মধ্যে সেই ফতুল্লায় আর কোনো টেস্ট হয় নি । মাঝে কেটে গেছে নয়টি বছর । সময় আসলেই কত দ্রুত যায় ! না হয় , মানুষ সবচেয়ে ভালো মেমোরিগুলো ভুলতেই চায় না । কই ? ২০০৬ সালের আর কোন টেস্টের কথা তো সেভাবে মনে নেই । শাহরিয়ার নাফিসের দারুন হান্ড্রেড , মোহাম্মদ রফিক … শাহাদাতের বলে পন্টিং এর সেই লেগবিফোর… ফতুল্লা তো আসলেই আলাদা … আসলেই স্পেশ্যাল ।

ভাজ্জির ফেরাটা দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠুক
ভাজ্জির ফেরাটা দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠুক

ভারতের টেস্ট দলটায় হরভজন সিং ফিরছে , অনেকটাই নিশ্চিত ছিলাম । একজন হরভজন সিংকে নিয়ে আমার আলাদা করে কথা বলা শুরু করার রহস্যটা জানেন ? ২০১১ সালের বিশ্বকাপের ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচটায় সাকিবের ক্যাচটা ধরে ও গ্যালারিভর্তি টাইগার সমর্থকদের কীভাবে চুপ করতে বলেছিলো মুখে আঙুল দিয়ে । এর বাইরে বোলার হিসেবে হরভজন সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন হলো, ক্রিকেট বলের খুব ভালো টার্নার । ওর সাথে অশ্বিনের জুটি বাংলাদেশকে ভোগানোর ক্ষমতা রাখে । ভারতের সর্বেশেষ চারটি টেস্ট সিরিজ খেলেছে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড আর দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে । হেরেছে চারটে সিরিজই । এই চার সিরিজে মোট খেলা ১৩ টি টেস্টে তাদের ভাগ্যে জয় জুটেছে মাত্র একবার । এবার আসি উলটো কথায় । এই সাবকন্টিনেন্টে ভারত তাদের শেষ ২টা সিরিজ খেলেছে অস্ট্রেলিয়া আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে । দুটোতেই হোয়াইটওয়াশ করেছে প্রতিপক্ষকে । এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ারটা একদম ৪-০ । আর শচীন টেন্ডুলকারের বিদায়ী সিরিজে ক্যারিবীয়দের সাথে ২-০ ! এই ৬ টেস্টের মধ্যে ৩টাতে আবার ইনিংস ব্যবধানে জয় ।

গতি পাবে কি রুবেলের টেস্ট ক্যারিয়ারটাও?
গতি পাবে কি রুবেলের টেস্ট ক্যারিয়ারটাও?

এই ভারত বাইরে যতোটা নাজুক , দেশের মাটিতে ততোটাই শক্ত টেস্টে । আর বাংলাদেশকে আপনি ভারতের জন্যে অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকার মত ‘বিদেশ ‘ বলবেন কীভাবে ? ভারতকে ভোগানোর জন্যে আমাদের জনসন-স্টেইন কই ? রুবেল-শহীদদের দেবার মতো কন্ডিশনই বা কই ? এ দেশের সবচেয়ে হেইটেড ক্রিকেট টীম হওয়ায় ভারতের কাছে বাংলাদেশ গ্যালারির অংশটায় ‘অনেকটাই বিদেশ’… তবে মাঠের খেলায় আর বিদেশ রইলো কই? উলটো আমাদের হাতে থাকা সব রকমের সুবিধা উলটো করে কাজে লাগানোর মত সুযোগ আছে ভারতেরও ।

740(2)

ধাওয়ান-কোহলি-মুরালি বিজয়-রাহানে-রোহিত আর পূজারার ভারত ব্যাটিংটাকে বরং এখানকার জন্যে ভয়ংকরই মনে হয় । আর বাংলাদেশের জন্যে বড় চ্যালেঞ্জটা হবে তাদের পেইস এটাক । উইকেট টেকার কোথায় ? রুবেলের গড় ৭৫ এর উপরে । শহীদকে লেগেছে ওয়ার্ক হর্স । তারসাথে যোগ করে রাখুন , গেলো কয়েকদিন ধরে সব জায়গাতেই ওয়াদারটা যা যাচ্ছে ! খুব বড় মাপের প্রফেশনাল না হলে আসলে পেসারদের জন্যে কাজটা এখানে অনেক কঠিন । তবে ম্যাচের আগের যা খবর তাতে ফতুল্লার উইকেট অবশ্যই মীরপুর বা খুলনার চাইতে অনেক বেশি স্পোর্টিং । দারুন ঘাস থাকার খবরও আসছে বেশ বিশ্বস্ত সূত্র থেকেই ।

বাংলাদেশ ব্যাটিং লাইন আপের ফিয়ার ফ্যাক্টর মুশি
বাংলাদেশ ব্যাটিং লাইন আপের ফিয়ার ফ্যাক্টর মুশি

বোলার সাকিবের অফফর্ম গেছে পাকিস্তানের সাথে টেস্ট সিরিজটায় । নিয়মিত উইকেট পেলেও তাইজুল সাদামাটা আর রক্ষণাত্মক । বড্ড প্রেডিক্টেবল । লাস্ট পাকিস্তান সিরিজেই তো দেখলাম , মিসবাহ ওকে বেরিয়ে এসে মারছে । একদম অনেক আগে থেকে টেস্ট ক্রিকেটে স্পিন বোলিংটা অনেকাংশে আবার ইম্প্রোভাইজেশন । আলাদা কিছু করা । দিনের শেষে আপনার সেই জায়গাটায় সাকিব আল হাসানের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে । তবে মুশফিক-মমিনুল-তামিম … ফ্লোটা রাখতে পারলে ওদের চাইতে খুব পিছিয়ে নেই আমরাও । আগের চাইতে গেইম চেঞ্জার বাড়লেও ৫০-৬০ রানের ইনিংসগুলো আমাদের মিডল অর্ডারে ১৫০-২০০ হয়ে উঠে না সহজে । শেষ সিরিজেও পার্থক্যটা এখানেই ছিলো পাকিস্তানের সাথে । ভালো স্টার্ট পেয়ে টেস্টে বড় ইনিংস না খেলে আউট হওয়া ডাক মারার চাইতেও বড় ক্রাইম – এটা আপনি বুঝে যাবেন ম্যাচের শেষেই । তবে, ভারতের সাথে ম্যাচ হওয়াতে তামিম ইকবালের কথা আলাদা করে মাথায় রাখুন । ২০১০ এর মিরপুরের ১৫১ রানের নক ভোলার কথা না কোন ক্রিকেট রোমান্টকেরই । ২০১০ এর সেই দুরন্ত টাচে থাকা বুনো তামিম সে বছরেই পেয়ে যায় আরো দুটো শতক । আর দুটো ইংল্যান্ডের সাথে । দেখার মতো শতক ছিলো তিনটিই । সেই বন্য সুন্দর তামিমকে যেনো আবার বাংলাদেশ পেয়েছে ২০১৫ তে । বি স্কেয়ার্ড ইন্ডিয়া ! বি স্কেয়ার্ড !

তামিম খেলুক তামিমের মতোই !
তামিম খেলুক তামিমের মতোই !

তবে কি … ভারত বাংলাদেশ ম্যাচ কখনোই শুধু ইকুয়েশন আর কাগজ কলমের খেলা না । ২০১১ এর বিশ্বকাপের ম্যাচটায় গোহারা হারলেও ৪ বছর পরের বিশ্বকাপে এসে আমাদের লেগেছে আমরা ভালো কিছু করলে এদের সাথেই করে ফেলতে পারবো । বাস্তবে হতে যাচ্ছিলোও তাই । এই দলটার মেইনম্যানের নাম বিরাট কোহলী…তাহলে তো বাংলাদেশেরও আছে রুবেল যার সাথে কোহলির হিসাবনিকাশ অনেক পুরোনো । মমিনুল হয়তো উড়তে থাকা টেস্ট ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ব্রেকথ্রুটাও পেয়ে যেতে পারেন এই ভারত ম্যাচটাতেই । কেন জানি মনে হচ্ছে , হয়ে যাবে । কেন হবে সেটা জানি না । তবে ভারতের সাথে ম্যাচগুলো এমনই । এক্সেল ফাইলে ভারতের আর আমাদের ব্যাটারদের খেলা টেস্ট ম্যাচ আর টেস্ট এভারেজ পাশাপাশি রাখলে হয়তো ওদের ভারি লাগবে । কিন্তু আপনার মনে হবে , ভারতের সাথে ম্যাচে তো আমাদের শাহাদাতই ইয়র্কারে রাহুল দ্রাবিড়ের স্ট্যাম্প ছত্রখান করে দেয় । তাহলে এই রাহানেটা আবার কে ? এই ফিলিংটা কেন জানি না অন্য কারো সাথে খেলার আগে কাজ করে না । শুধু ভারতের জন্যেই কাজ করে । ম্যাচটা তাই মাঠের ক্রিকেটের চেয়েও আলাদা কিছু ।

মমিনুল হাক টেস্টে রান পাচ্ছেন রেগুলার
মমিনুল হাক টেস্টে রান পাচ্ছেন রেগুলার

বাইরে গিয়ে ৪ টেস্ট ৫ টেস্টের সিরিজ খেলা ভারত বাংলাদেশের সাথে টেস্ট রাখলো মোটে একটা । বাংলাদেশের অহমেই বা কেন লাগবে না ?
অস্ট্রেলিয়া ওদের ওখানে নিয়ে টেস্ট খেলালেও ভারত ডাকে নি । বাংলাদেশের অহমেই বা কেন লাগবে না ?
পেশায় স্ট্রীট কমেডিয়ান হলেও নভোজত সিং সিধু তো ভারত জাতীয় দলেও একসময় খেলেছেনও … বাংলাদেশ ক্ষেপে কেন থাকবে না ?

ম্যাচটার আগে তাই আমার চিন্তাভাবনায় ৬০ ভাগ আবেগ আর ৪০ ভাগ মাত্র ক্রিকেট !

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

two × 1 =