১৩ এপ্রিল, তুমি অবিস্মরণীয় হে!

১৩ এপ্রিল, ১৯৯৭। আইসিসি ট্রফির ফাইনাল। কেনিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের জিততে দরকার এক বলে এক রান। স্ট্রাইকে হাসিবুল হোসেন শান্ত। এদিকে রেডিওতে কান পেতে আছে কোটি কোটি বাঙালি। রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় যেন দম বন্ধ হয়ে যায়। রানটি হবার সঙ্গে সঙ্গেই মিছিলে ছুট। রঙ গোলা ছিল বালতিতে। দু’দিন আগেই সেমিফাইনালে স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জনের পর মিছিল করেছি। গলা ভাঙা তখনও। অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হবার আনন্দের মতো তো আর কিছু হয় না! তাই আবারো মিছিলে পুরো বাংলাদেশ। আবারো রঙের ছিটায় রঙিন শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ-বনিতা। দেখতে দেখতে আইসিসি ট্রফি জয়ের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটির আঠার বছর হয়ে গেল! মনে হয় এই তো সেদিন।

তখনকার বিশ্বকাপ ক্রিকেটের বাছাইপর্বের টুর্নামেন্ট আইসিসি ট্রফি নিয়ে বাংলাদেশের কত হতাশা, উত্থান-পতন আর স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নান্নু-বুলবুলদের। ৯৪ আইসিসি ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ৯৬ সালে উপমহাদেশের বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন ছিল। খুব কাছে গিয়েও সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কোচ আনা হল ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে। তাও কিংবদন্তী ক্রিকেটার গর্ডন গ্রিনিজকে। নতুন করে স্বপ্নের ডালপালা ছড়ানোর শুরু গ্রিনিজের কোচিং আর আকরাম খানের অধিনায়কত্বে।

icc_1

৯৯ বিশ্বকাপে খেলতে হলে মালয়েশিয়ায় ৯৭ আইসিসি ট্রফিতে অন্তত তৃতীয় হতে হবে বাংলাদেশকে। কিন্তু স্বপ্নটা তো আরো অনেক বড়। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলে কোয়ার্টার ফাইনালে দিতে হলো কঠিন পরীক্ষা। নেদারল্যান্ডসের করা ১৭১ রানের জবাবে ১৫ রানে ৪ উইকেটের পতন বাংলাদেশের। হুমকির মুখে ১২ কোটি মানুষের বিশ্বকাপ স্বপ্ন। তখনই নামে বৃষ্টি। নতুন টার্গেট দাড়ায় ৩৩ ওভারে ১৪১। সেদিন ছিল শুক্রবার। জুম-আ নামাযে মসজিদে মসজিদে টাইগারদের জন্য দোয়া। সেই দোয়া বিফলে যায়নি। বাঙালির আবেগ আর স্বপ্নসারথী হয়ে ক্রিজে দাড়িয়ে যান আকরাম খান। তাকে সঙ্গে দেন মিনহাজুল আবেদীন আর সাইফুল ইসলাম। হার না মানা ৬৮ রানের ইনিংস খেলে সেমিফাইনালের টিকিট নিয়ে ফেরেন দলনেতা আকরাম। ওই ইনিংস না খেলা হলে কোয়ার্টার ফাইনালেই থেমে যায় বাংলাদেশের আইসিসি ট্রফি অভিযান। বিশ্বকাপেও খেলা হতো না। হয়তো টেস্ট খেলাও হতো না এখনও। আকরাম খানের ওই ৬৮ রানের ইনিংসের উপরেই দাড়িয়ে আছে বাংলাদেশের আজকের ক্রিকেট।

সেমিফাইনালে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৭২ রানের সহজ জয়ে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে মাতে সারা দেশ। ১২ এপ্রিল ফাইনাল। প্রথমে ব্যাট করে স্টিভ টিকোলোর ১৪৭ রানে ভর করে ২৪১ রানের পাহাড়ে চড়ে বসে কেনিয়া। দুরুদুরু মনে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের শঙ্কা, তাহলে কী চ্যাম্পিয়ন হবে না টাইগাররা? আকরামের দল ব্যাটিংয়ে নামার আগে বৃষ্টির হানা। ফাইনাল গড়ায় রিজার্ভ ডে-তে। ১৩ এপ্রিল সকালেও বৃষ্টি। কিলাত ক্লাব মাঠে খেলা দেখতে আসা প্রবাসী বাংলাদেশীরা নেমে যান মাঠ শুকাতে, তাদের সঙ্গে যোগ দেন দলের কর্মকর্তারাও। যাতে নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার গাজী আশরাফ হোসেন লিপু। নিজেদের জামা খুলে তা দিয়ে পানি মুছে মাঠকে খেলার উপযুক্ত করেছেন তারা। রেডিওর ধারাবিবরণীতে আমরা তা শুনেছি। দেশের জন্য এতো আবেগ বিফলে যায়নি। ২৫ ওভারে ১৬৬ রানের টার্গেট ঠিকই ছুঁয়েছেন রফিক, বুলবুল, পাইলট, শান্তরা। আর বিশ্ব ক্রিকেটকে সেদিন বার্তা দিয়েছিল, বাংলাদেশ আসছে।

১৩ এপ্রিল, তুমি অবিস্মরণীয় হে!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

five × 4 =