শুভ জন্মদিন, সিআর৭!

১৯৮৪ এর মাঝামাঝি কোন এক সময় ।
ভাস্কো দা গামার দেশ পর্তুগালের মাদেইরা শহরের এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা-কর্ত্রীর মাঝে বেশ উচ্চ বাক্যলাপ চলছে । কর্তা জোসে দিনিস অ্যাভেইরো এক স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে স্ত্রী মারিয়া দস সান্তোসের সাথে মোটামুটি হট্টগোলই পাকিয়ে ফেলেছেন । তিন সন্তানের জননী মারিয়া আবারও সন্তানসম্ভবা ।
আর এতেই হট্টগোল দিনিসের ।
পৌরসভায় সামান্য মালীর চাকুরী করা দিনিস তার অনাগত সন্তানের আগমন রুখতে চান ।
সোজা কথায় স্ত্রীকে গর্ভনষ্ট করতে হবে ।
দারিদ্রতার ছোবলে এমনিতেই দংশিত এ্যাভেইরো পরিবার । তাই দিনিসের এমন সিদ্ধান্ত ।
তবে মিসেস অ্যাভেইরো তার মদ্যপ স্বামীকে সাফ জানিয়ে দিলেন তিনি কোনমতেই গর্ভনষ্ট করবেননা । শেষ পর্যন্ত মাতৃত্বের শক্তির কাছে হার মানতেই হলো অ্যালকোহল আসক্ত দিনিস অ্যাভেইরোকে ।
দারিদ্রতায় দিন গড়ালো ।
পরের বছর ভালোবাসার মাস ফেব্রুয়ারীর পঞ্চম দিবসে মারিয়ার কোল জুড়ে এলো তাদের ভালোবাসার চতুর্থ ফসল ।
বাবা হওয়ার আনন্দ দিনিসকে যেন দারিদ্রতা ভুলিয়ে দিলো মিনিট কয়েকের জন্য ।
শুভ্র-তামাটে শিশুটির নাম তিনিই দিলেন ।

রোনাল্ড রিগ্যান ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪০তম এই প্রেসিডেন্টের আরেকটি পরিচয় ছিলো ‘অভিনেতা’ ।
আর হলিউড অভিনেতা রোনাল্ড রিগ্যানের নামের সাথে মিলিয়ে ভক্ত দিনিস তার নতুন অতিথির নাম রাখলেন রোনালদো ।
কিন্তু দিনিস কি জানতেন যে জনপ্রিয়তায় তার এই রোনালদোই একদিন রোনাল্ড রিগ্যানকে ছাড়িয়ে যাবেন ?

পুত্র খ্যাতির পুরোটুকু হয়ত জানার সৌভাগ্য হয়নি দিনিসের । তবে পুত্রের রাজকীয় উত্থানের প্রাথমিক স্বাক্ষী ছিলেন তিনি ।
২০০৫ সালে পুত্র রোনালদোর কর্মস্থল ইংল্যাণ্ডে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন দিনিস ।
আর ৩টা বছর বেঁচে থাকলেই হয়ত দেখে যেতে পারতেন তার একসময়ের অবহেলিত সেই ভ্রুণের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন ও জনপ্রিয়তার হিমালয় স্পর্শ ।

দিনিস দেখে যেতে পারেনি । তবে আমরা দেখছি ।
দেখছি ছোটবেলায় বাংলা ব্যাকরণে পড়া ‘পরিশ্রম সাফল্যর চাবিকাঠি’ শিরোনামের আশ্চর্য সফল চিত্রায়ন ।
দেখছি দরিদ্রকে জয় করা এক বিত্তশালী ভদ্রলোককে ।
যে রোনালদোর ভ্রুণ মিশে দিতে চেয়েছিল তার বাবা সেই রোনালদোর লক্ষ টাকায় শিশুর মস্তিস্ক অস্ত্রপচার হয় এখন । সেই রোনালদোর কোটি অর্থে চলে ক্যান্সার চিকিত্‍সালয় ।
একদিন যে রোনালদোর আগমণে তার বাবাকে অন্ন-বস্ত্রের কথা ভাবতে হয়েছিল সে রোনালদো এখন বিশ্বের অন্যতম বিলাস-বহুল জীবন যাপন অধিকারী ।
যে রোনালদোর স্কুল যাওয়ার অর্থ সন্কট ছিল সে রোনালদোর গ্যারেজে এখন ল্যাম্বরগিনি, বুকার্ত্তি ভেরনের মত বিশ্বের দামী গাড়িগুলো শোভা পায় । তার নামে নামাংকিত স্বদেশের একটি বিমান বন্দর ।
যে রোনালদোকে ভাই হুগোর সাথে ঘর শেয়ার করতে হত সেই রোনালদো এখন নিউইয়র্কে আলিশান এ্যাপার্টমেন্ট, আলিশান হোটেল-রেস্তোরার মালিক । সেই রোনালদোই এখন সবচেয়ে আয়কারী ও ধনী ফুটবলার ।
সান্তো এন্তোনিওর সেই স্কুল তারকা ছেলেটি এখন বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব । সেই ছেলেটির নামে এখন মহাজগতের এক গ্যালাক্সি ।
সেদিনের সেই অবহেলিত রোনালদোর মূর্তি এখন বিখ্যাত মাদাম তুসো জাদুঘরে । সেই রোনালদোর মূর্তি দেশের মাটিতে গৌরবে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে । তার নামে অলংকৃত স্বদেশের একটি বিমান বন্দর । শৈশব স্কুলের সেই প্রহৃত রোনালদো এখন জাতীয় বীর ।
দারিদ্র্যর ছোবলে আক্রান্ত সেদিনের সেই অসুস্থ রোনালদো এখন অন্যতম সেরা ফিট অ্যাথলেট ।
একবিংশ শতাব্দীর সর্বোচ্চ গোলদাতা রিয়াল মাদ্রিদ এফসির পর্তুগীজ ফুটবল সুপারস্টার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো দস সান্তোস অ্যাভেইরোর আজ জন্মদিন ।

শুভ জন্মদিন সিআর সেভেন !
কথায় বলে, জার্সি ফুটবলারদের ট্রেডমার্ক আর তুমি জার্সির ট্রেডমার্ক ।
তাই 9, 10, 11 এর ভীড়ে তোমার ম্যাজিকাল 7 অনন্য মাত্রায় ।
অনন্য তুমি তোমার ফুটবল দর্শনে, অনন্য তুমি তোমার প্রতিভা প্রষ্ফুটনে ।
অভিনব তুমি যোগ্যতায়, দৃষ্টান্ত তুমি পরিশ্রমে ।

তোমার আগমন দিবসের শুভেচ্ছা হাজার কিলোমিটার পথের দুরত্বে এক ব-দ্বীপ থেকে ।
দীর্ঘায়ূ হও তুমি ।
দানবীয় দুই পা আর পাথর শক্ত মাথাতে বিমোহিত করে রাখো ফুটবল জগতকে আরও অনেক বছর, অনেক বসন্ত ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

nine + fourteen =