যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে : দ্য ডিসগ্রেইস অফ গিহন

যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে : দ্য ডিসগ্রেইস অফ গিহন

আর মাত্র ২৪ দিন বাকী। ২৪ দিন পরেই শুরু হবে বিশ্ব ফুটবলের সর্ববৃহৎ মহাযজ্ঞ – বিশ্বকাপ ফুটবল। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই মহাযজ্ঞের একবিংশতম আসর বসছে এইবার – রাশিয়ায়। বিশ্বকাপ ফুটবলের অবিস্মরণীয় কিছু ক্ষণ, ঘটনা, মুহূর্তগুলো আবারও এই রাশিয়া বিশ্বকাপের মাহেন্দ্রক্ষণে পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য গোল্লাছুট ডটকমের বিশেষ আয়োজন “যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে”!

আজকে যে ঘটনাটা বলবো তা সংঘটিত হয়েছিল ১৯৮২ সালের স্পেইন বিশ্বকাপ এ। সেবার গ্রুপ ২ এ ছিল পশ্চিম জার্মানি, আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া আর চিলি। তখন ম্যাচ জিতলে এখনকার মত ৩ পয়েন্ট দেওয়া হত না। জিতলে ৩, ড্র করলে ১ আর হারলে কোন পয়েন্ট নেই, এরকমই ছিল নিয়ম। প্রথমে আলজেরিয়ার কাছে ২-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট শুরু করা পশ্চিম জার্মানি নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে চিলিকে বিধ্বস্ত করে ৪-১ গোলে। সে সময় আলজেরিয়ার কাছে পশ্চিম জার্মানির হারকে বলা হচ্ছিল ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ এ উত্তর কোরিয়ার কাছে ইতালির পরাজয়ের পর সবচাইতে বড় অঘটন! এই ম্যাচের আগে আফ্রিকার ইতিহাসের কোন দল বিশ্বকাপ এর আসরে কোন ইউরোপিয় দলকে হারাতে পারেনি। তারমানে বুঝতেই পারছেন, প্রতিভার অভাব ছিল না সেই আলজেরিয়া দলটায়। ওদিকে চিলিকে ১-০ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করা অস্ট্রিয়া দ্বিতীয় ম্যাচে আলজেরিয়াকে ২-০ গোলে হারায়। আর আলজেরিয়া পশ্চিম জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও পরে অস্ট্রিয়ার কাছে ২-০ গোলে হেরে যায়, আর গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে চিলিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে চার পয়েন্ট অর্জন করে রাখে। চিলিকে হারানোর মাধ্যমে আরেকটা গৌরবময় রেকর্ডের অংশীদার হয় আলজেরিয়ার খেলোয়াড়েরা। আরব-আফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে তাদের আগে অন্য কোন দল বিশ্বকাপে কখনো দুটো ম্যাচ জেতেনি, যেটা সেবার করে দেখিয়েছিল আলজেরিয়া।

ইতোমধ্যে যে চার পয়েন্ট অস্ট্রিয়া আগেই অর্জন করে রেখেছিল চিলি আর আলজেরিয়াকে হারানোর মাধ্যমে। শেষ রাউণ্ডের ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল আলজেরিয়া-চিলি ও পশ্চিম জার্মানি-অস্ট্রিয়া। তবে এখন যেরকম গ্রুপপর্বের শেষ রাউণ্ডের ম্যাচগুলো সব একসাথে হয়, তখ্যন একসাথে হত না। ফলে, আলজেরিয়া-চিলি ম্যাচটা হয়ে গিয়েছিল আগেরদিন, আর তার পরের দিন আলজেরিয়া-চিলি ম্যাচের ফল জেনেই মাঠে নেমেছিল পশ্চিম জার্মানি আর অস্ট্রিয়া। ফিফা নয়ম করে কেন শেষ রাউণ্ডের ম্যাচগুলো এখন একসাথে করে, সে কারণটা বলছি এখন, শুনুন!

যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে : দ্য ডিসগ্রেইস অফ গিহন
gollachhut.com

আগের দিনে হওয়া আলজেরিয়া-চিলি ম্যাচের ফলাফলটা জানা থাকার কারণে যে জিনিসটা হল, পশ্চিম জার্মানি আর অস্ট্রিয়া মাঠে নামার আগেই জেনে গেল পরবর্তী রাউণ্ডে উঠতে গেলে তাদেরকে কি করতে হবে, কত গোলের ব্যবধানে জিততে হবে কি সমাচার। দুই দলই জানত, ১-০ বা ২-০ গোলের ব্যবধানে পশ্চিম জার্মানি জিতলে অস্ট্রিয়া ও পশ্চিম জার্মানি, দুই দলই উঠবে পরবর্তী রাউণ্ডে। কিন্তু তাঁর থেকে বেশী গোলে জিতলে পশ্চিম জার্মানির সাথে পরবর্তী রাউণ্ডে উঠবে আলজেরিয়া – কেননা অস্ট্রিয়ার থেকে আলজেরিয়া ইতোমধ্যে গোল বেশী দিয়ে রেখেছে, অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার গোল ব্যবধান সমান হলেও অস্ট্রিয়ার জায়গায় আলজেরিয়াই উঠবে পরবর্তী রাউণ্ডে, পশ্চিম জার্মানির সাথে। তাই শেষ ম্যাচের দুই দল পশ্চিম জার্মানি আর অস্ট্রিয়া রচনা করলো বিশ্বকাপ ইতিহাসের এক ন্যাক্কারজনক অধ্যায়!

ম্যাচের প্রথম দশ মিনিট চূড়ান্ত আক্রমণাত্মক খেলে একটা গোল আদায় করে নিল পশ্চিম জার্মানি। পিয়েরে লিটবারস্কির ক্রসে হ্যামবুর্গের সেন্টার ফরোয়ার্ড হোর্স্ট রুবেশ্চ এর গোলে ১-০ গোলে এগিয়ে যায় পশ্চিম জার্মানি। এরপর পশ্চিম জার্মানির সেই দশ মিনিটের ক্ষুরধার আক্রমণ যেন ভোজবাজির মত উবে গেল বাকী আশি মিনিটে! পল ব্রাইটনার, ফেলিক্স ম্যাগাথ, লোথার ম্যাথাউস, কার্ল-হাইঞ্জ রুমেনিগে, পিয়েরে লিটবারস্কি দের মত স্বনামধন্য খেলোয়াড়েরা কেমন যেন গোল করতে অনাগ্রহী হয়ে উঠলেন! নিজেদের অর্ধে টুকটাক করে পাস দিতে থাকলেন, কারোর মধ্যেই আক্রমণ করার বিন্ধুমাত্র ইচ্ছাও দেখা গেল না। বোঝাই গেল, জার্মানি আর অস্ট্রিয়া নিজেদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে ম্যাচের স্কোরলাইনটাকে এরকমই রাখতে, যাতে আফ্রিকান দলকে বাদ দিয়ে দুই ইউরোপীয় দল বিশ্বকাপ এর পরের রাউন্ডে উঠতে পারে! ফেলিক্স ম্যাগাথের চিপ থেকে পাওয়া বল হেলাফেলা করে মিস করলেন রুবেশ্চ, আরও দুটো গোল করার সুযোগ হেলায় হারিয়ে বল কে ইচ্ছা করে বাইরে পাঠালেন পল ব্রাইটনার। শেষ অর্ধে দুই দল মিলিয়ে মোট তিনটা শট করে গোল করার জন্য, প্রত্যেকটা শট লক্ষ্যভ্রষ্ট ছিল। আটটা মত ট্যাকল করে পশ্চিম জার্মানি, আর দুই দলের সফল পাস দেওয়ার হার ৯০% এর বেশী ছিল, যেই সফল পাসের হার দেখলে হয়তোবা ২০১০ সালের বার্সেলোনা দলও লজ্জা পাবে, লজ্জা পাবেন জাভি হার্নান্দেজের মত পাস মাস্টারেরা! নিজেদের অর্ধে পশ্চিম জার্মানির সফল পাস প্রদানের হার ছিল ৯৯%, আর নিজেদের অর্ধে অস্ট্রিয়ার সফল পাস প্রদানের হার ছিল ৯৮%! বুঝতেই পারছেন, কিরকম ঝুঁকিহীন ভাবে সেদিন ম্যাচটা খেলেছিল এই দুই দল! শুধুমাত্র নিজেদের অর্ধে বিপক্ষ দল বল নিয়ে আসলেই শুধুমাত্র একটু তটস্থতা দেখা গেছিল দুই দলের মধ্যে। তাও মেরেকেটে দুই এক বার হবে!

সেই ম্যাচ দেখতে আসা প্রত্যেকটা দর্শক, সাংবাদিক সেদিন বুঝেছিল কি হচ্ছে মাঠে। মাঠে খেলা দেখতে আসা উদগ্রীব আলজেরিয়ার সমর্থকেরা মাঠে টাকার নোট ছুঁড়তে থাকে, “পাতানো ম্যাচ”, “পাতানো ম্যাচ” বলে চিৎকার করতে থাকে। “চুম্বন কর, তোমরা দুই দল একে অপরকে চুম্বন কর” – খেলার মধ্যে “প্রীতিভাব” এতটাই বেশী ছিল সেদিন দর্শকরা এটাও বলতে বাধ্য হয়েছিল! এমনকি বিরক্ত হয়েছিল জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার অনেক সমর্থকও। এক জার্মান ভক্তকে দেখা যায় নিজের দেশের পতাকা পোড়াতে।

ম্যাচ শেষে কোন অস্ট্রিয়া বা জার্মানির খেলোয়াড়কেই এই ঘটনা নিয়ে একটুও দুঃখ প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। জার্মান কোচ ইউপ ডেরওয়াল থেকে শুরু করে অস্ট্রিয়ান কোচ জর্জ শ্মিট, লোথার ম্যাথাউস থেকে শুরু করে অস্ট্রিয়ান স্ট্রাইকার ইয়ান্স ক্র্যাঙ্কল সবাই মোটামুটি একই ধরণের কথাই বলেন – “আমরা পরের রাউন্ডে উঠেছি, আর এটাই সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ!” ইউপ ডেরওয়াল বলেন তাঁর দুই খেলোয়াড় কার্ল হেইঞ্জ রুমেনিগে আর উলি স্টিয়েলিক অসুস্থ ছিলেন তাই বলে ভালোভাবে খেলতে পারেননি! আলজেরিয়ার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন পুরো ব্যাপারটার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে, কিন্তু যেহেতু টেকনিক্যালি অস্ট্রিয়া বা পশ্চিম জার্মানির কেউই কোন নিয়ম ভঙ্গ করেনি তাই জেনেও না জানার ভান করে কাউকেই কোন শাস্তি দেয়নি ফিফা। স্পেইনের পত্রিকা “এল কমার্সিও” এই ম্যাচের রিপোর্ট ছাপায় অপরাধ বিভাগের অধীনে। পশ্চিম জার্মানি পরবর্তীতে ফাইনালে উঠে, ইতালির কাছে হেরে যায় তারা যদিও। আর ওদিকে অস্ট্রিয়া পরের রাউন্ড থেকেই বাদ পড়ে যায় মিশেল প্লাতিনির ফ্রান্সের কাছে হেরে। তবে বিশ্ব একটা দৃষ্টিনন্দন ফুটবল খেলা দল আলজেরিয়ার খেলা দেখা থেকে বঞ্চিত হয়।

আর সেই ঘটনার পর থেকেই ফিফা নিয়ম করে, গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলো এর পর থেকে একই সময়ে শুরু হবে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

4 × four =