গা ছেড়ে খেলার মাশুল!

গতরাত্রে কোপা আমেরিকাতে নিজেদের প্রথম ম্যাচে প্যারাগুয়ের সাথে ২-২ গোলে ড্র করে হোঁচট খেয়েছে ফেভারিট আর্জেন্টিনা। এটা এখন পুরনো খবর। কোপা জিতার আশা নিয়ে চিলি যাওয়া আর্জেন্টিনা প্রথম ম্যাচে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্যারাগুয়ের সাথে জয় দিয়েই শুভসূচনা করবে, এটাই মোটামুটি সবাই ধরে নিয়েছিল। কিন্তু তা আর হল কই!

ম্যাচের প্রথমার্ধে ২৯ মিনিটে প্যারাগুইয়ান ডিফেন্সের ভুলের সুযোগ নিয়ে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন ম্যানচেস্টার সিটি ফরোয়ার্ড সার্জিও অ্যাগুয়েরো। কিছুক্ষণ পর অ্যানহেল ডি মারিয়াকে প্যারাগুইয়ান লেফটব্যাক মিগুয়েল সামুদিও ডিবক্সের মধ্যে ফেলে দিলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। সেখান থেকে ঠাণ্ডা মাথায় আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। প্রথমার্ধ দোর্দণ্ড প্রতাপের সাথে খেলা আর্জেন্টিনা হাফটাইমে ২-০ গোলেই এগিয়ে থাকে, যেভাবে খেলছিলো যে কেউই বলত দ্বিতীয়ার্ধেও আর্জেন্টিনার গোল ব্যবধান বাড়ত বৈ কমত না।

ডিফেন্সের ভুলের সুযোগ নিয়ে গোল করছেন অ্যাগুয়েরো
ডিফেন্সের ভুলের সুযোগ নিয়ে গোল করছেন অ্যাগুয়েরো

কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের পর প্যারাগুয়ে জেগে ওঠে। প্রথমার্ধের হালকাপাতলা ভুলগুলো শুধরে নিয়ে আর্জেন্টিনার আক্রমণের তুলনায় চিরকাল দুর্বল ডিফেন্সে প্রেস করতে থাকে তারা। যার ফলাফল গোল দুইটি। নেলসন হায়েদো ভালদেজ ও লুকাস ব্যারিওসের দুই গোলে পয়েন্ট ভাগাভাগি করেই মাঠ ছাড়তে হয় অ্যালবিসেলেস্তিদের।

পেনাল্টি থেকে মেসি'র গোল
পেনাল্টি থেকে মেসি’র গোল

৪-৩-৩ ফর্মেশানে খেলা শুরু করে আর্জেন্টিনা। গোলবারের নিচে সার্জিও রোমেরো, রাইটব্যাক ফাকুন্দো রনক্যাগলিয়া, লেফটব্যাক মার্কোস রোহো, দুই সেন্টারব্যাক নিকোলাস ওটামেণ্ডি ও এজেকিয়েল গ্যারায়, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হাভিয়ের ম্যাশেরানো, সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হাভিয়ের পাস্তোরে ও এভার বানেগা, দুই উইঙ্গে লিওনেল মেসী ও অ্যানহে ডি মারিয়া এবং স্ট্রাইকে সার্জিও অ্যাগুয়েরো। ফলে শুরু একাদশে জায়গা পাননি কার্লোস তেভেজ ও গঞ্জালো হিগুয়াইনের মত খেলোয়াড়েরা।

প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার খেলায় ভুল বলতে সেরকম কিছুই ছিল না। চাইলে ২ গোলের জায়গায় যদি ৫-৬ গোলও হত আশ্চর্যের কিছু থাকত না। কি পাসিং, কি পজেশান, কি নিচ থেকে পরিকল্পনাবদ্ধভাবে আক্রমণে ওঠা – আর্জেন্টিনা একচ্ছত্রভাবে প্যারাগুয়ের উপর ছড়ি ঘুরিয়েছে এই অর্ধে। শুধু ছিল একটু ফিনিশিং টাচ বা ফাইনাল প্রোডাক্টের অভাব। এটা অবশ্য পুরো ম্যাচ ধরেই সমস্যা ছিল আর্জেন্টাইনদের। বর্তমান আর্জেন্টিনা স্কোয়াড বিবেচনা করলে একাদশটাও ছিল মানানসই, শুধুমাত্র চোটের কারণে নিয়মিত রাইটব্যাক পাবলো জাবালেতার জায়গায় ফাকুন্দো রনক্যাগলিয়া খেলেছেন এই যা।

এবং এইটাই হয়েছে ম্যাচে আর্জেন্টাইনদের অন্যতম দুর্বল একটা দিক। লেফট ফ্ল্যাঙ্ক থেকে মার্কোস রোহো যেরকম নিয়মিতই ওভারল্যাপ করে ডিফেন্সের সাথে সাথে আক্রমণেও সঙ্গ দিচ্ছিলেন, রনক্যাগলিয়া পুরো ম্যাচধরেই ছিলেন একটা ভজঘট অবস্থায়। এমনিতেও নিয়মিত রাইটব্যাক জাবালেতার মত তিনি অতটা অ্যাডভেঞ্চারাস না, ক্লাব লেভেলেও মোটামুটি সেন্টারব্যাক হিসেবেই খেলেন, তাই মনেহয় আক্রমণে উঠতে একটু দ্বিধায় ছিলেন। এই আক্রমণে উঠব কি উঠব না দ্বিধায় না ভালোমত করতে পেরেছেন আক্রমণ, না করতে পেরেছেন ডিফেন্স, অনর্থক ট্যাকল করতে গিয়েছেন কিছু, খেলেছেন হলুদকার্ড – যেটার ফল পায় আর্জেন্টিনা দ্বিতীয়ার্ধে।

এবার সেন্টারব্যাকদ্বয়ের দিকে আসা যাক। ক্লাব লেভেলে এই মৌসুমে দুর্দান্ত খেলা নিকোলাস ওটামেন্ডি বহুকাল পর ডাক পেয়েছেন আর্জেন্টিনা দলে, এসেই এজেকিয়েল গ্যারায়ের সাথে জুটি বাঁধার দায়িত্ব পেয়েছেন। দুজনের জুটির এই ম্যাচ খারাপ হয়েছে বলবো না। তাঁর ও গ্যারায় থেকেই আর্জেন্টিনার মোটামুটি সকল আক্রমণের সূচনা হয়েছে। ওটামেন্ডি, গ্যারায়, ম্যাশেরানো, বানেগা – অন্তত প্রথমার্ধে নিজেদের মধ্যে ধীরে ধীরে পজেশান বিল্ডআপ করে সামনে জায়গা সৃষ্টি করতে চেয়েছেন বারংবার। ফলে মোটামুটি অনেক জায়গা নিয়ে খেলতে পারার সেই সুবিধাটুকু পেয়েছেন মেসি-পাস্তোরে-ডি মারিয়ারা। ওটামেন্ডির খেলা ব্যক্তিগতভাবে আমার খারাপ লাগেনি, যদিও প্যারাগুয়ের প্রথম গোলটায় একটু দায় তাঁর উপর বর্তায়। তাছাড়া বল-প্লেয়িং সেন্টারব্যাক হিসেবে যথেষ্ট ভালো খেলেছেন ওটামেন্ডি, যথেষ্ট কমান্ডিং সেন্টারব্যাক। দোষের মধ্যে দোষ (বা গুণ, কে জানে!) একটাই লাগলো, ফাইনাল ট্যাকল খুব তাড়াতাড়ি করে ফেলেন। সতীর্থ এজেকিয়েল গ্যারায় যেরকম বলতে গেলে কেতাবী ডিফেন্সে বিশ্বাসী, ভেবেচিন্তে ঠান্ডা মাথায় ক্যালকুলেইটেড ট্যাকল করার চেষ্টা করেন সবসময়, সে তুলনায় ওটামেন্ডিকে যথেষ্ট অ্যাডভেঞ্চারাস বলা যেতে পারে।

ম্যাশেরানো-বানেগা-পাস্তোরে ; মিডফিল্ড কম্বিনেশানটা যথেষ্ট ভালো ছিল। ভালো বলব এই কারণে কারণ ইন ফর্ম পাস্তোরে শুরু থেকেই মাঠে নামার ফলে অ্যানহেল ডি মারিয়া আরও বেশী আক্রমণাত্মক খেলার লাইসেন্স পেয়েছিলেন কোচ টাটা মার্টিনোর কাছে, মোটামুটি পুরো বিশ্বকাপে লেফট মিডে খেলা মারিয়া লেফট মিড থেকে লেফট উইঙ্গে শিফট করেছেন কালকের ম্যাচে। ট্যাকটিক্যালি এই পরিবর্তনটা তাঁর জন্য দরকার ছিল, কারণ লেফট মিডে খেলার জন্য বল হোল্ড করে রাখার দরকার পড়ে, যেটা মারিয়া খানিক পারেন কম। এই বল ধরে রাখার কাজটা কালকে বেশ ভালোভাবেই করেছেন বানেগা-পাস্তোরে। ফলে চিন্তাহীনভাবে মেসি-অ্যাগুয়েরোদের সাথে আক্রমণে সঙ্গ দিয়ে গেছেন ডি মারিয়া।

মিডফিল্ডে এভার বানেগা-হাভিয়ের পাস্তোরের আগমন, ডি মারিয়ার উইঙ্গে শিফট করার ফলে সবচেয়ে বেশী যার উপকার হয়েছে, তিনি বোধহয় লিওনেল মেসি। খেলছেন বার্সার পজিশানেই, রাইট উইঙ্গে ; যথেষ্ট জায়গা নিয়ে। কালকেও ছিলেন যথেষ্ট সপ্রতিভ পুরো ম্যাচজুড়েই। আর্জেন্টিনার দুই গোলের পেছনেই রয়েছে তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান। প্রথম গোলে তাঁকে আটকাতে গিয়েই ভুল ব্যাকপাস দিয়ে বসেন মিগুয়েল সামুদিও, যে ব্যাকপাস ধরেই গোল করে এগিয়ে দেন অ্যাগুয়েরো। দ্বিতীয় গোলটার আগে অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে চারজনকে কাটিয়ে ডিবক্সে ঢুকে ডানে থাকা ডি মারিয়াকে পাস দেন মেসি, সেখানে ডি মারিয়া সেই সামুদিও কর্তৃক ফাউল হলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। যদিও ওপেন প্লে তে কোন গোল না করার ফলে এবং আর্জেন্টিনা ম্যাচ ড্র করার জন্য নিন্দুকেরা বলবেই যে মেসি আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে অতটা সপ্রতিভ না ; কিন্তু আসলে জিনিসটা তা না। তবে কয়েকটা ওপেন মিস করার দায় তাঁর ঘাড়ে পড়েই ; যেগুলো গোলে রূপান্তরিত হলে মনে হয়না ম্যাচ আর্জেন্টিনার ড্র করতে হত।

ম্যাচ শুরুর ট্যাকটিকসের কথা মাথায় রাখলে দশে দশ না হোক, দশে অন্তত নয় পাবেন মার্টিনো। ঝামেলা বাঁধিয়েছেন তিনি মূলতঃ সাবস্টিটিউশান করতে গিয়ে। ম্যাচের ষাট মিনিটের পর এমনিতেই দুই গোলে এগিয়ে থাকার ফলে লাটসাহেবের মত গা ছাড়া খেলা শুরু করে আর্জেন্টাইনরা। যার ফলাফল প্রথম গোল। প্যারাগুয়ে কোচ র‍্যামন দিয়াজ প্রথমার্ধের ভুলগুলো শুধরে দলকে মোটামুটি যথেষ্ট প্রেস করে খেলতে বলেন ; ফলে প্রথমার্ধ একেবারে শান্তিতে কাটানো আর্জেন্টাইন ডিফেন্সের মূল পরীক্ষাটা শুরু হয় তখনই। সেই চাপেই কিনা, খানিক ভেঙ্গেও পড়ে তারা, বক্সের বাইরে একরকম আনমার্কড থাকা সাবেক বরুশিয়া ডর্টমুন্ড ও ভ্যালেন্সিয়া স্ট্রাইকার নেলসন হায়েদো ভালদেস দুর্দান্ত শটে গোল করে ব্যবধান কমান।

ভালদেজের গোলে ব্যবধান কমায় প্যারাগুয়ে
ভালদেজের গোলে ব্যবধান কমায় প্যারাগুয়ে

ব্যবধান মাত্র এক গোলে নেমে এসেছে, প্রতিপক্ষ প্রেসের উপর প্রেস করে খেলছে, ফলে সামান্য কাউন্টার আক্রমণও নিজেদের ডিবক্সের আশেপাশে চলে আসছে, এই অবস্থায় দরকার ছিলো আরও রক্ষণাত্মক মানসিকতার মিডফিল্ডার যিনি কিনা ম্যাশেরানোর সাথে যোগ্য সঙ্গ দিতে পারবেন ও লিডটাকে ইনট্যাক্ট রাখতে পারবেন। কিন্তু মার্টিনোর মনে বোধহয় হয়েছিল, এত অ্যাটাকিং তারকারাজি থাকতে আমি ডিফেন্সিভ খেলাব কেন? আরও গোলের আশায় মাঠে নামালেন তেভেজ ও হিগুয়াইনকে। এবং এখানেই ভুলটা করে বসেন মার্টিনো। পাস্তোরে-অ্যাগুয়েরোকে উঠিয়ে মাঠে নামান আরও দুই স্ট্রাইকার তেভেজ ও হিগুয়াইন কে। সবচে ভালো খেলা মিডফিল্ডার বানেগাকে নামিয়ে মাঠে নামান বিলিয়াকে। বিলিয়াও রক্ষণাত্মক, মাঠে নামার সাথে সাথে বিলিয়া আর ম্যাশেরানো বলতে গেলে দুই সেন্টারব্যাকের মধ্যে সেঁধিয়ে যান। ওদিকে তেভেজ হিগুয়াইন মাঠে নামার ফলে মেসি ও ডি মারিয়া একটু নিচে নেমে তাদের উপরে জায়গা করে দেন, ফলস মিড হিসেবে খেলতে থাকেন। ফলে সেন্টার মিড একরকম ফাঁকা হয়ে যায় আরও, হিতে বিপরীত হয়ে পড়ে আর্জেন্টাইনদের জন্য, মিডফিল্ডে আরও বেশী ফাঁকা জায়গা পেয়ে ডিফেন্সে ভালোমত প্রেস করা শুরু করে প্যারাগুইয়ানরা। উলটাপালটা খেলতে থাকেন আর্জেন্টাইনরা। ভুল ক্লিয়ারেন্স করে আরেকটু হয়ে গোলই খেয়ে বসেছিলেন অ্যানহেল ডি মারিয়া। ফল পেতেও বেশী দেরি হয়নি। এবার মুহুর্মুহু আক্রমণ করা শুরু করে তারা শেষ কয় মিনিটে, সার্জিও রোমেরোকে বেশ কয়েকটা ভালো সেভ করতে হয়। কিন্তু শেষরক্ষা আর হয়নি, প্রেসের কারণে আর্জেন্টাইন ডিফেন্স যথেষ্টই ছন্নছাড়া হয়ে গেছিল, ওটামেন্ডি ভুল করছিলেন কয়েকটা, ফলে ওর্টিগোজার এক ফ্রিকিক বক্সে এসে পৌঁছুলে লুকাস বিলিয়ার মুহূর্তের ভুলে সুযোগ পেয়ে মাটি কামড়ানো শটে ম্যাচের একেবারে শেষমুহূর্তে সমতা ফেরান আরেক সাবেক বরুশিয়া ডর্টমুন্ড স্ট্রাইকার লুকাস ব্যারিওস।

লুকাস ব্যারিওসের গোলে সমতায় ফেরা
লুকাস ব্যারিওসের গোলে সমতায় ফেরা

পরের দুই ম্যাচ উরুগুয়ে ও জ্যামাইকার বিপক্ষে। কালকের ভুল থেকে যদি মার্টিনো ভালোমত শিক্ষা নেন তবে লুইস সুয়ারেজবিহীন উরুগুয়ে আর দুর্বল জ্যামাইকার বিপক্ষে জয় তুলে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে যাওয়াটা ব্যাপারই না আর্জেন্টিনার জন্য। কিন্তু নিজেদের গ্রুপ থেকে পরের রাউন্ডে শীর্ষ দল হিসেবে না গেলেই ঝামেলা, সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় রাউণ্ডেই দেখা হতে পারে ব্রাজিলের সাথে!

দেখা যাক, আর্জেন্টাইনদের শিক্ষা হয় নাকি!

 

ছবি – ডেইলি মেইল

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

1 + 9 =