দি গুড, দি ব্যাড এন্ড দি আগলি : ২০১৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্স

দি গুড, দি ব্যাড এন্ড দি আগলি : ২০১৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্স

এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে ফেভারিট দলগুলোর একটি ধরা হচ্ছে। কাগজ-কলমে তাদের স্কোয়াড দেখলে ফেভারিট ধরারই কথা, কিন্তু ফ্রান্স গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচে কি ফেভারিটের মতো খেলেছে? নিরপেক্ষ দর্শকরা তা যেমন মানছেন না, ফ্রান্সের ভক্তরাও খুব একটা খুশি নন ফ্রান্সের পারফর্মেন্সে। কিন্তু পারফর্মেন্স যাই হোক, এক ম্যাচ বাকি থাকতেই শেষ ১৬ নিশ্চিত করে ফেলেছে দিদিয়ের দেশামের দল। আর আশানুরূপ খেলা না খেলেও এই সাফল্যের পিছনে কিছু বিষয় তো অবশ্যই কাজ করেছে।

১। ফুলব্যাক নিয়ে সংশয় – ফ্রান্সের যেখানে সকল পজিশনে এক বা একাধিক ওয়ার্ল্ড ক্লাস প্লেয়ার আছে সেখানে লেফটব্যাক এবং রাইটব্যাক পজিশন নিয়ে প্রতি টুর্নামেন্টের আগেই দেশামকে কঠিন এক সমস্যায় পড়তে হয়। ওয়ার্ল্ড কাপ কোয়ালিফাইংয়ে এ পর্যন্ত অনেককে খেলানো হয়েছে এই দুই পজিশনে, কিন্তু ভালো পারফর্মেন্স করতে পারেননি কেউ। এভ্ররা, ক্লিশি এদের পর লেফটব্যাকে লুকাস দিনিয়ে, লাভিন কারযায়া খেলেছেন; সুবিধা করতে পারেননি। রাইটব্যাকেও একই অবস্থা; সানিয়া, করচিয়া অনেকেই এসেছেন আবার চলে গেছেন স্কোয়াডের বাইরে। ফ্রান্সের এই ‘দুর্বল লিংক’ এ ওয়ার্ল্ড কাপ স্কোয়াডে তাই কে কে সুযোগ পাবেন সেটাই দেখার বিষয় ছিল। শেষ পর্যন্ত সুযোগ হলো এটলেটিকো মাদ্রিদের লুকাস হার্নান্দেজ, ম্যানসিটির বেঞ্জামিন মেন্দি, মোনাকোর জিব্রিল সিদিবে এবং স্টুটগার্টের বেঞ্জামিন পাভার। গ্রুপের দুই ম্যাচেই স্টার্ট করেন লুকাস লেফটে এবং পাভা রাইটে এবং তাঁরা কোচের সিলেকশনের মান রেখেছেন বলাই যায়। বিশেষ করে দুই ম্যাচে লুকাস হার্নান্দেজের খেলা বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে পাভা যেনো ঠিক নিজেকে তুলে ধরতে পারছেন না, এক ভয় কাজ করে তাঁর মধ্যে ডিসিশন নেয়ার সময়। এই ভয়টা কাটিয়ে উঠতে পারলে হয়তো তিনি আরো ভালো করবেন, কোচেরও তাই মনে হয়, তাই আস্থা রাখছেন পাভার উপরই। তাহলে কি ফ্রান্সের ফুলব্যাক নিয়ে চিন্তা পুরোপুরি দূর হলো? এখনো তা বলা না গেলেও কিছুটা হলেও দেশামের সংশয় কমেছে বলা যায়।

২। পগবার ফ্রি রোল – ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড রেকর্ড দাম দিয়ে পগবাকে কেনার পরও তাঁর সেরা খেলাটা পাচ্ছে না, এমনটা মিডিয়া বলেই আসছে। এবং এর মূল কারণ ধরা হচ্ছে পগবা নাকি তাঁর সেরা খেলার জন্য যেমন মিডফিল্ড পার্টনার দরকার তা পাচ্ছেন না! কিন্তু ফ্রান্সে পগবার এমন সমস্যায় পড়তে হয়নি বা হচ্ছে না, সেখানে তিনি ঠিকই তাঁর সেরা দিয়ে যাচ্ছেন। তাহলে পার্থক্য কোথায়? মিডফিল্ড পার্টনার, হ্যাঁ সেটাই। ফ্রান্সে পগবাকে মাঝ মাঠে সাপোর্ট দিয়ে থাকেন চেলসির এঙ্গোলো কান্তে। লিস্টার সিটিকে রূপকথার মতো লীগ জেতানো এই মিডফিল্ডার ফ্রান্সকে মাঝমাঠে এক অনন্য শক্তি যোগান দেন, যা স্বীকার করেছেন স্বয়ং পগবা নিজেই। তিনি বলেন, “কান্তে পুরো মাঠে দৌড়ায়, ওর জন্য আমি অনেক ভালো খেলতে পারি, প্রেশার কম থাকে আমার উপর, ওকে দেখলে মনে হয় ওর ফুসফুস ১৫টা !” কান্তের ফুসফুস ১৫টা না হলেও তাঁর এই পারফর্মেন্স যা পগবাকে সেরা খেলতে সাহায্য করছে সেটা ফ্রান্সের জন্য অনেক বড় একটি সুবিধা।

৩। নতুন রুপে মাতুইদি এবং এম্বাপের উত্থান – গতকাল যখন প্রথম একাদশে দেখা গেলো মাতুইদি লেফট উইংয়ে খেলবেন, অনেকেই তখন দেশামের কোচিং যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বসেন। এই পজিশনে যেখানে খেলার মতো আছেন ডেম্বেলে, ফেকির, লেমারের মতো তারকারা সেখানে মাতুইদি ক্যানো! অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে এই পজিশনে ডেম্বেলে খেলেন পরে বদলি প্লেয়ার হিসেবে খেলেন নাবিল ফেকির। দুইজন অ্যাটাকে যথেষ্ট ভালো খেললেও আরেকটি কাজে ভালো করে করেননি তা হলো ডিফেন্সের সময় ফল ব্যাক করে লেফটব্যাক লুকাসকে সাহায্য করা। ম্যাচের বেশিরভাগ সময় লুকাসকে দেখা গেছে একা, সাথে ছিলেন না ডেম্বেলে/ফেকিরের কেউ। এর পরিপ্রেক্ষিতেই মাতুইদিকে লেফটে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেন দেশাম। মাতুইদির মতে তিনি এই পজিশনে খেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না তবে দলের প্রয়োজনে কোচ বললে তিনি খেলবেন। আরেকদিকে রাইট উইংয়ে নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন টিনেজার কিলিয়েন এম্বাপে। শুধু তাই নয়, গতকাল ম্যাচের একমাত্র গোলটিও যে করেছেন তিনি। গড়েছেন সবচেয়ে কমবয়সী ফ্রেঞ্চ প্লেয়ার হিসেবে ওয়ার্ল্ড কাপে গোল করার রেকর্ড। বিশ্বকাপ শুরুর আগে তাকে নিয়ে অনেক আশা ছিল ফ্রান্সের ভক্তদের, সেই আশাই যেনো পূরণ করে যাচ্ছেন তিনি।

দি গুড, দি ব্যাড এন্ড দি আগলি : ২০১৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্স
gollachhut.com

৪। মেইন ম্যান জিরু – এতো প্রতিভাবান একটি ফ্রান্স দলে অলিভিয়ের জিরুকে খেলানোটা অনেকেই তাচ্ছিল্য করে দেখেন, মনে করেন তিনি দেশামের ফেভারিট প্লেয়ার দেখেই দলে সুযোগ পান। কিন্তু প্রথম ম্যাচে তাঁর অনুপস্থিতিতে ফ্রান্সের অ্যাটাক এবং দ্বিতীয় ম্যাচে তাঁর উপস্থিতিতে ফ্রান্সের অ্যাটাক দেখে কারো মনে আর সন্দেহ থাকা উচিত না যে জিরু দলে কেন সুযোগ পান। লিংক আপ অ্যাটাকে তাঁর বিকল্প কেউ নেই ফ্রান্স দলে, প্রতিটি অ্যাটাক হয় তাকে ঘিরে। তবে শুধু তাকে দিয়ে গোল করানোই উদ্দেশ্য নয় ফ্রান্স দলের, তিনি বরং অন্যদের গোল করার সুযোগ তৈরি করে দেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বদলি হয়ে মাঠে নেমে ফ্রান্সের দ্বিতীয় গোলের এসিস্ট তাঁর, আর পেরুর বিপক্ষে ম্বাপের গোলটি তো বলতে গেলে তাঁরই! গতকাল মাঠে সবচেয়ে বেশি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি যা একটি প্লে-মেকারের কাজ। ফ্রান্সের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় তিনি চতুর্থ, তাঁর উপরে আছেন শুধু থিয়েরি অরি, মিশেল প্লাতিনি, ডেভিড ত্রেজেগের মতো লিজেন্ডরা। তাহলে তিনিও কি তাদের মতো লিজেন্ড পর্যায়ে চলে গেছেন? হয়তো না। তিনি কি ফ্রান্সের সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকার ? তাও হয়তো না। কিন্তু মাঠে তাঁর উপস্থিতি উপেক্ষা করার মতো না, বরং তাঁকে ছাড়া ফ্রান্স অ্যাটাক ধারালো হয়ে উঠতে পারে না। গতকালকের ম্যাচ শেষে জিরুর আগের ক্লাব আর্সেনালের ম্যানেজার আর্সেন অয়েঙ্গার এই প্রসঙ্গেই বলছিলেন, “আমি যখন আর্সেনালে জিরুকে খেলাতাম মাঝে মাঝে ও খুব সাধারণ খেলা খেলতো। কিন্তু ম্যাচ শেষে যখন বিপক্ষ দলের ম্যানেজারের সাথে কথা বলতাম তাঁরা বলতো ‘তোমার জিরুতে ডিফেন্ড করতে আমাদের ডিফেন্ডারদের খবর হয়ে গেছে!'” তাই বলাই বাহুল্য সামনের ম্যাচগুলোতে ফ্রান্সের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করবে অলিভিয়ের জিরুর পারফর্মেন্সের উপর।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

5 × 5 =