ফুটবল, ব্লাডি হেল

রাশিক ইসলাম

৪৮ ঘন্টা হয়েছে..অবিশ্বাস্য এবং বিস্ময়কর সেই ম্যাচ শেষ হয়েছে ঠিক ৪৮ঘন্টা আগে, কিন্তু আমার ঘোর এখনও কাটেনি…

স্পেনের কাতালুনিয়া অঙ্গরাজ্যের আন্ডারঅ্যাচিভিং ক্লাবটি ফলো করা শুরু করি যখন ফুটবলের ‘ফ’ টাও বুঝি নাহ, মাত্র ক্লাস ৭ এ পড়ি..টিভিতে খেলা দেখাইতোনা, দেখালেও এত রাতে খেলা দেখার পারমিশেন ছিলো নাহ..খেলার পরদিন পেপার পত্রিকায় খবরগুলা পড়ে নিজের কল্পনায় ম্যাচগুলা একে নিতাম..ডেইলি স্টারের খেলার দুটি পাতার ছোট্ট কোনায় ট্রান্সফার রিউমারগুলোর জন্য মুখিয়ে থাকতাম…

মনে আছে, ২০০৬ সালে অনেক কষ্ট করে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনালটা দেখার পারমিশেন পাইসিলাম..কার্লোস পুয়োলের ঝাকড়া চুল উড়িয়ে রোনালদিনহো নামের এক ম্যাজিশিয়ানের হাত ধরে ট্রফি জয়ের সেই প্রথম স্বাদ..প্যারিসের সেই রাত, সুপার সাব হেনরিক লারসনের কল্যানে স্যামুয়েল ইতো এবং জুলিয়ান বেলেত্তির সেই গোলগুলো…

বড় হতে থাকলাম..আমার সাথেই বড় হতে থাকলো লিওনেল আন্দ্রেস মেসি নামের আরেকজন..সবেমাত্র স্কুলের কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছি, রাত জেগে খেলা দেখা শুরু..মনে থাকবে হতাশায় চ্যানেল বদলিয়ে ফেলে এল ক্লাসিকোর ৯০মিনিটে মেসির ৩-৩ সমতা আনার সেই গোলটা মিস করার দুঃখ..মনে থাকবে ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ডের ০৬-০৭ সিজনের শেষ ম্যাচে বেটিসের সাথে ১-১ ড্র করে লা লীগা হাতছাড়া করা, মনে থাকবে ক্যাম্প ন্যুতে রিয়েল মাদ্রিদকে গার্ড অফ অনার দেওয়ার অসহ্য স্মৃতি, মনে থাকবে গুফি দাঁতের প্রিয় রোনালদিনহোর বিদায়..মনে থাকবে পেপ গার্ডিওয়ালা নামের রুকি একজন ম্যানেজারের বিশ্ব জয়..আন্ডারঅ্যাচিভিং একটা ক্লাবের নাম পৃথিবীর কোনায় কোনায় ছড়িয়ে দেওয়া..মনে থাকবে স্ট্যামফরড ব্রীজে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার লাস্ট কিকে রোম ফাইনালে নিয়ে যাওয়ার সেই ম্যাচটা..মনে থাকবে এইচএসসি অ্যাকাউন্টিং পরীক্ষার আগে রাতে আম্মুর টিভি রুমে তালা লাগিয়ে দেওয়া, সেই তালা ভেঙ্গে ক্যাম্প ন্যু’তে কুৎসিত কিন্তু এফিশিয়েন্ট ইন্টার মিলানের জয় এবং অপ্রিয় হোসে মরিনহো’র সেই দৌড় দেখা, মনে থাকবে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স তছনছ করে মেসি স্যান্টিয়াগো বার্নাবুর সেই ওয়ান্ডারগোলখানা…

পরশু রাতে সারজি রোবারতোর গোলটির পর প্রথম দুই সেকেন্ড রেফারীর অফসাইড ফ্ল্যাগের জন্য অপেক্ষা করছিলাম..এও কি সম্ভব ? এক মুহূর্তের জন্য পৃথিবীটা থমকে গিয়েছিলো আমার..রেফারী গোলের বাশি বাজানোর পর কি করবো বুঝতে পারছিলাম নাহ..ইনিয়েস্তার স্ট্যাম্ফোরড ব্রীজের সেই গোলটার পর দাঁত দিয়ে কামড়াই বালিশ ছিড়ে ফেলসিলাম, এখন এত্ত ধামড়া ছেলে হয়ে তো এইগুলা করা যায়না..খুব পুরুষালী একটা কাজ করলাম, হু হু করে কান্না..চোখের জল নাকের জল মিশে একেকার..বাসায় ডাকাত পড়ছে মনে করে আব্বু আম্মু যাতে বাঁশ নিয়ে চলে না আসে এই জন্য কম্বলের তলায় ঢুকে অমানবিক জান্তব চীৎকার..তীব্র আনন্দ..এই ক্ষনস্থায়ী মানবজীবনে এইরকম দুঃসহ অসহ্য আনন্দও যে পাওয়া সম্ভব তা কখনও কল্পনা করতে পারি নাই..কিছুক্ষন পর পর ভিলেন জাম্বুর মত হো হো করে হাসতেসিলাম, আবার কিছুক্ষন পর পর নব্য প্রেমে পড়া কিশোরীদের মত হু হু কান্না..কান্নার মধ্যেও যে অসহ্য আনন্দ আছে কে জানতো ? আলো হওয়ার সাথে সাথে রাস্তায় বের হলাম..নিজেকে সামলাতে পাড়ছিলাম নাহ, বলদের মত ভ্যাক ভ্যাক করে হেসেই যাচ্ছিল আর রাস্তার গুটিকয়েক লোকজন আমার আমার দিকে হা করে তাকাইছিলো, উন্মাদ ভাবতেসিলো সিউর..এইরকম অসহনীয় সুন্দর ভোর আমার জীবনে আসে নাই, আর কখনও আসবে বলেও মনে হয়নাহ…

৪৮ঘণ্টা হয়ে গেছে, আমি এখনও সেই ঘোর থেকে বের হতে পারিনি..গত ৪৮ঘন্টায় ফলপ্রসু কোনও কাজ করি নাই..এই ম্যাচ সম্পর্কিত ইউটিউবে এমন কোনও ভিডিও নাই যা দেখি নাই..পক্ষে বিপক্ষে অপ্রিয় লেখক কার্লো গারগাঁনেজ থেকে শুরু করে প্রিয় সিড ল’র না হইলে দুইশোটার উপর আর্টিকেল পড়ছি..৪৮ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা উচিত, কিন্তু আমি তো ঘোর থেকে বের হতে পারছি নাহ…

বন্ধু বান্ধব মাঝে মধ্যেই আমাকে আর Leon Diznasকে জিজ্ঞেস করে ফুটবল দেখে প্রডাক্টিভ কি কাজ হয় ? ফুটবল দেখে কি লাভ ? অর্থ ও সময়ের অপচয় বাদে আর কিছু কি হয় ?

এইরকম অসম্ভব অস্বাভাবিক অসহনীয় আনন্দ ফুটবল বাদে আর কিছু দিতে পারে বলে আমার মনে হয়নাহ..অন্য কিছু জানিনা কষ্ট করে কামানো এক মিলিয়ন ডলারের ব্রিফকেসও যে আমাকে এই আনন্দ দিতে পারবে নাহ এই বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহ নাই..ফুটবল আমাকে শিখায় অসম্ভব বলে কিছু নাই, আশা ছেড়ে দেওয়া ম্যাচে ৭মিনিট ১৭ সেকেন্ডে ৩ গোল যদি দেওয়া সম্ভব হয়, লেস্টার সিটির মত রেলিগেশন ক্যান্ডিডেট যদি ইংলিশ চ্যাম্পিয়ন হতে পারে তাহলে জীবনের মানেও খুজে বের করা সম্ভব..মহাকবি নেইমার দ্যা সিল্ভা এইকারনেই বলে গিয়েছেন- “হোয়াইল দেয়ার ইজ অ্যা ১% চান্স, উইল হ্যাভ ৯৯% ফেইথ” ❤

ফুটবল সম্পর্কিত যে কোনও লেখায় স্যার অ্যালেক্স ফারগুসেন একটা কোটেশন সবাই ব্যবহার করে, আমিও করলাম, তিনটি সহজ শব্দে এরচেয়ে সুন্দরভাবে আসলে ফুটবলকে ব্যাখ্যা করা যায়নাহ…
“ফুটবল, ব্লাডি হেল”

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

20 + nineteen =