দুজনই সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন

“গড, ইটস কিলিং মি…”

গাল বেয়ে নামছিল জল। কামড়ে ধরা ঠোঁট। নিজেকে সামলানোর অনেক চেষ্টা করেও পারেননি। এই রড লেভার অ্যারেনার হার্ড কোর্ট সিক্ত হয়েছিল তার অশ্রু ফোটায়। ১৩টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জেতা হয়ে গেছে ততদিনে। কিন্তু রাফায়েল নাদালের কাছে টানা তিনটি ফাইনাল হারার পর ভেঙে পড়েছিলেন রজার ফেদেরার। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে শুধু বলতে পেরেছিলেন, “ঈশ্বর, আর পারছি না আমি…!”

গ্যালারিভরা দর্শক, টিভি পর্দার সামনে কোটি কোটি দর্শক তখন স্তব্ধ। পাশেই ভীষণ বিব্রত চেহারায় দাঁড়িয়ে নাদাল। যেন ফেদেরারকে হারিয়ে, নিজে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বড় কোনো অপরাধ করে ফেলেছেন! ফেদেরারের কান্না আর চারপাশের আবহ দেখে পারলে নিজেই কেঁদে ফেলেন। সুযোগ থাকলে তখনই যেন বলে উঠবেন, আমি চ্যাম্পিয়ন হতে চাই না!

শুধু ওভাবেই দাঁড়িয়েই চুপ থাকেননি নাদাল। গিয়ে ফেদেরারের সঙ্গে গলাগলি ধরলেন। সান্ত্বনা নয়, পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন চ্যাম্পিয়নের মতোই। ফেদেরারকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন মাইক্রোফোনের সামনে, অফিসিয়াল স্পিচ শেষ করতে। তার পর নিজের বক্তব্যে বলেছিলেন, “স্যরি ফর টুডে রজার… জানি তোমার কেমন লাগছে। জানি এটা মেনে নেওয়া কঠিন। তবে মনে রেখো, তুমিই সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন…।”

আমরা ক্রিকেট সম্পর্কে বলি, “দা গেম ইজ আ গ্রেট লেভেলার।” খেলাটা সবাইকেই সমতায় আনে। টেনিসও কম কিসে! ২০১৪ সালে এই অস্ট্রেলিয়ান ওপেনেই ফাইনালে হারার পর কেঁদে ফেলেছিলেন নাদাল। প্রতিপক্ষ যদিও ফেদেরার ছিলেন না। এবার সেই চক্রও পূর্ণ। ২০০৯ সালের ৮ বছর পর আবার রড লেভার অ্যারেনা সিক্ত হলো ফেদেরারের চোখের জলে। তবে এবার সেই অশ্রু ফোটায় ফুটছে খুশির ফুল। সেই নাদালকে হারিয়েই চ্যাম্পিয়ন। রূপকথাও নিশ্চয়ই এতটা রূপকথাময় হয় না!

২০০৮ সালে কেউ যদি বলত, ৮ বছর পরও খেলে যাবেন ফেদেরার, পাগলের প্রলাপ বলে মনে করতেন অনেকে। ফেদেরার শুধু খেলছেন না, এই ৩৫ বছর বয়সে গ্র্যান্ড স্ল্যাম চ্যাম্পিয়নও হতে পারেন।

গত কয়েক বছর ধরে কত কত বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে! একটা সময় হিসাব হতো, টানা ‘এতগুলো’ গ্র্যান্ড স্ল্যামে সেমিফাইনালের আগে বাদ পড়েননি ফেদেরার। পরে সেটা নেমে এলো, টানা এতগুলি টুর্নামেন্টে কোয়ার্টার ফাইনালের আগে বাদ পড়েন না… আস্তে আস্তে কমতে থাকল। এক নম্বর জায়গা হারিয়েছেন তো সেই কবে। ইতিহাসের সফলতম সমর নায়কের জন্য সাধারণ এক সৈনিক হয়ে থাকার চেয়ে কঠিন বাস্তবতা আর কী আছে! বয়সের সঙ্গে চোটও জোর করে বাধিয়েছে বন্ধুত্ব। গোটা দুনিয়ার প্রশ্ন, “এখনও খেলে যাওয়ার দরকারটা কী! কি লাভ অতীতের কঙ্কাল হয়ে পড়ে থাকার!”

১৮ গ্র্যান্ড স্ল্যাম বা রেকর্ড সপ্তাহ শীর্ষে থাকা, এসব কিছু সংখ্যা মাত্র। ফেদেরার সেরা তার এই হার না মানা মানসিকতার জন্য। বয়স, হাজারো বাস্তবতা আর গোটা দুনিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখানোর জন্য। ফেদেরার এমনই এক চ্যাম্পিয়ন, যার কঙ্কালও এই পাওয়ার টেনিসের যুগে গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিততে পারে! একসময় লোকে ভাবত, পিট সাম্প্রাসের চেয়ে ভালো কেউ হতে পারে না। এখন সবাই জানে, ফেদেরার একজনই!

ফেদেরার-নাদাল মিলেও কিন্তু অনন্য “জুটি।” ফেদেরারে কান্না দেখে নাদাল অপরাধী হন। আবার আজকে জয়ের পর ফেদেরার বলেন, পারলে কাপটা নাদালের সঙ্গে ভাগাভাগি করতেন। ক্যারিয়ার জুড়েই দুজনের এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধটা দেখা গেছে বারবার। ফেদেরারের রাজ্যে নাদাল হানা দিয়েছেন। একসময় মনে হচ্ছিলো, ফেদেরারের সব রেকর্ডই ছাড়িয়ে যাবেন নাদাল। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীতা। কিন্তু সেটা শুধু কোর্টেই, খেলার সময়। কখনই মুখের কথায় নয়, কোর্টের বাইরে কোনো লড়াইয়ে নয়। এত বছরেও কোনো খোঁচাখুঁচি নেই, এমননিক ইঙ্গিত করেও নয়! খেলা শেষ হতেই দুজন পরস্পরের গুণমুগ্ধ। দুজন প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী, খেলাধুলার ভাষায় আমরা বলি ‘চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী।’ এরকম দুজনের পরস্পরের প্রতি এত বেশি শ্রদ্ধাবোধ, এত সুসম্পর্ক, এত বিনয়… খেলাধুলার ইতিহাসে আর আছে বলে জানা নেই। শুধু সর্বকালের সেরা দুজন টেনিস খেলোয়াড়ই নন, দুজনেিই পরিচিতি অসম্ভব ভালো মানুষ হিসেবে। দুজনের লড়াইয়ে একজন জিতলে ভালো লাগে, আরেকজনের জন্য প্রচণ্ড খারাপও লাগে! এবং সেটা শুধু আমাদের মতো আবেগপ্রবণ জাতিই নয়, গোটা দুনিয়াতেই ফেদেরার-নাদালকে নিয়ে একই আবেগের ঢেউ।

ফেদেরার-নাদাল লড়াইয়ে তাই কেউ হারে না। জয়-পরাজয়ের সীমানা দুজন অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছেন। জয়-হার রেকর্ডের পাতায় লেখা থাকবে। মানুষের মনে, দুজনই সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

twenty + three =