দ্বিতীয় হয়েই দম ফুরালো – ২

(প্রথম পর্বের পর)

বলছিলাম প্রত্যেকবার দ্বিতীয় হয়েই থেমে যাওয়া লিভারপুলের ব্যর্থতার গল্প। কেন দ্বিতীয় হয়ে প্রথম না হয়ে পিছিয়ে যায় ক্লাবটি আরও কয়েক বছর। পঁচিশ বছর আগে জেতা লিগ শিরোপার পর এই পঁচিশ বছরে লিভারপুল যে লিগ জয়ের কাছাকাছি যায়নি, সেটা বলা যায়না। আমি যতদিন থেকে ফুটবল দেখছি, ততটুকু সময়ের কথা হিসাব করলে এই সহস্রাব্দ শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মোটমাট তিনবার লিগে দ্বিতীয় হয়েছে তারা, মানে শিরোপা জয়ের কাছাকাছি গেছে। ২০০১-০২ মৌসুমে, ২০০৮-০৯ মৌসুমে, আর কিছুদিন আগে এই ২০১৩-১৪ মৌসুমে। অন্যান্য ক্লাবের জন্য মৌসুমে দ্বিতীয় হওয়া মানে পরের মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন হবার প্রথম সোপান। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, এই তিনবার নিজেদের দ্বিতীয় হওয়াটাকে কাজে লাগিয়ে লিভারপুল পরের মৌসুমে কিছুই করতে পারেনি। ২০০২-০৩ মৌসুমে হয়েছিল পঞ্চম, ২০০৯-১০ এ সপ্তম, আর এই মৌসুম এখনো শেষ না হলেও মেরেকেটে পঞ্চম হবার বেশী যেতে পারবে না তারা, একথা বলেই দেওয়া যায়। আজ দেখব ২০০৯-১০ সালের ব্যর্থতার কাহিনী।

মাদ্রিদকে ৪-০ গোলে হারানো সেই লিভারপুল দল
মাদ্রিদকে ৪-০ গোলে হারানো সেই লিভারপুল দল

# ২০০৯-১০

রাফায়েল বেনিতেজের আমলে লিভারপুল লিগে নিয়মিত ৩-৪ পজিশানে থেকে শেষ করলেও বেনিতেজ সবচে বড় যে উপকারটা করে দিয়ে গিয়েছিলেন, সেটা হল বিভিন্ন কাপ প্রতিযোগিতায় লিভারপুলের সাফল্য। জেরার্ড হুলিয়ারের পর এই বেনিতেজই আসেন অ্যানফিল্ডের হাল ধরতে। রাফায়েল বেনিতেজ তখন ইউরোপের অন্যতম জনপ্রিয় ম্যানেজার, রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনা ডুয়োপলি ভেঙ্গে ভ্যালেন্সিয়াকে নিয়ে দুই-দুইবার লা লিগা জেতার স্পর্ধা কেবলমাত্র দেখিয়েছিলেন তিনিই তখন। লিভারপুলে আসার পর প্রথম মৌসুমেই জিতেছিলেন সেই ২০০৫ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ। সাথে জিতেছিলেন এফএ কাপটাও, যেটা কিনা চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের থেকেও কম উত্তেজনাপূর্ণ ছিল না। জিতেছিলেন কমিউনিটি শিল্ড ও ইউয়েফা সুপারকাপও। কিন্তু ঐযে, পূর্বসূরির মত তিনিও আটকে গেছিলেন দ্বিতীয়-পরবর্তী গেরোয়!

image-18-for-steven-gerrard-s-liverpool-fc-career-in-pictures-gallery-722589531

২০০৮-০৯ সালে মাত্র চার পয়েন্টের জন্য ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে লিগ খোয়াতে হয় লিভারপুলকে। পুরো মৌসুমে মাত্র ২ ম্যাচ হারলেও ১১ ম্যাচ ড্র করার খেসারত দিতে হয় তাদের। এই মৌসুমেই লিভারপুল ফুটবলবিশ্বকে দেখিয়েছিল এই দশকের অন্যতম সেরা সেন্ট্রাল মিডফিল্ড পার্টনারশিপ স্টিভেন জেরার্ড-জাবি আলোনসো-হাভিয়ের ম্যাশেরানোকে। সামনে ছিলেন চিরনির্ভর ফার্নান্দো টরেস। তাই চার পয়েন্টের জন্য লিগ খোয়ালেও সমর্থকেরা আশাবাদী ছিলেন, এবার যেহেতু একটুর জন্য হয়নি, পরেরবার হবেই!

কিন্তু ঐযে, দ্বিতীয়-পরবর্তী গেরো! আগেরবার ভিরমি ধরেছিল হুলিয়ারের, ছেড়ে দিয়েছিলেন নিকলাস আনেলকাকে, এবার ভিরমি ধরলো রাফায়েল বেনিতেজের, ছেড়ে দিলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার জাবি আলোনসোকে, যাকে তিনিই এনেছিলেন রিয়াল সোসিয়েদাদ থেকে, বানিয়েছিলেন স্টার। কিন্তু পাঁচবছর পর এই আলোনসোকেই কেন যেন পছন্দ হল না বেনিতেজের, মজে গেলেন অ্যাস্টন ভিলার ইংলিশ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার গ্যারেথ ব্যারির ওপর। অনেক চেষ্টাচরিত্র করলেন ব্যারিকে লিভারপুলে আনার, কিন্তু পারলেন না, ছাড়লো না ভিলা। কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হবার হয়ে গেছে। জাবি আলোনসো’র মনে ধারণা হয়ে গেল লিভারপুল বোধহয় আর তাঁকে চায় না। ফলাফল – ছাড়তে চাইলেন লিভারপুল। ওদিকে রিয়াল মাদ্রিদও তক্কে তক্কে ছিল, ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে লিভারপুলের অমূল্য সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারকে নিয়ে গেলেন ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ! পিছু পিছু মাদ্রিদে গেলেন আরেক স্প্যানিয়ার্ড, রাইটব্যাক আলভারো আরবেলোয়াও।

চলে গেলেন জাবি
চলে গেলেন জাবি
ভিলার তৎকালীন অধিনায়ক, গ্যারেথ ব্যারি
ভিলার তৎকালীন অধিনায়ক, গ্যারেথ ব্যারি

শুরু হল ‘পটেনশিয়াল ইংলিশ লিগ চ্যাম্পিয়ন’ লিভারপুলের স্কোয়াডে ঘুণ ধরা। জাবি আলোনসো’র রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে দলে আনা হল এএস রোমা’র তরুণ ইতালিয়ান মিডফিল্ডার অ্যালবার্তো অ্যাক্যুইলানিকে। ইনজুরি-জর্জর এই মিডফিল্ডারকে পাওয়ার জন্য ১৮ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করলো লিভারপুল। পরের তিন বছর গুণে গুণে মিলিয়নপ্রতি একটি করে ম্যাচ খেললেন ইতালিয়ান সম্রাট। মানে ১৮ ম্যাচ আরকি। বেনিতেজেরও দোষ ছিল। তিন বছরে প্রচুর চেষ্টাচরিত্র করেও অ্যাক্যুইলানিকে কোন নির্দিষ্ট পজিশানে সেটল হতে দেননি তিনি। এমনও দিন দেখা গেছে, লিভারপুলের ব্যাকআপ কোন স্ট্রাইকার ইনজুরিগ্রস্থ থাকলে স্ট্রাইকার হিসেবেই অ্যাক্যুইলানিকে টরেসের সাথে খেলিয়েছেন বেনিতেজ। সাথে অ্যাক্যুইলানির নিজের ইনজুরির অভিশাপ ত ছিলই।

লিভারপুলে অ্যাক্যুইলানির সময়টা ভালো যায়নি মোটেও
লিভারপুলে অ্যাক্যুইলানির সময়টা ভালো যায়নি মোটেও

আরবেলোয়ার রিপ্লেইসমেন্ট হিসেবে দলে আসেন উদীয়মান ইংলিশ রাইটব্যাক গ্লেন জনসন, যে সাইনিংটা ভালোই ছিল বলা যায়। কিন্তু এক ভালো রাইটব্যাক সাইনিং দিয়ে কিই বা আসে যায়! শীতকালীন দলবদলের বাজারে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ থেকে ফ্রি ট্রান্সফারে দলে আসেন আর্জেন্টাইন ম্যাক্সি রড্রিগেজ, যে ট্রান্সফারটাও ফ্লপ ছিল – বলা যাবে না।

আরেকটা হাস্যকর সাইনিং ছিল সটিরিওস কিরিয়াকোস। লেজেন্ডারি স্যামি হুপিয়ার রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে আনা হয়েছিল তাঁকে। দলের বোঝা বাড়ানো ছাড়া অন্যকোন কাজ তিনি করেছেন বলে জানা যায়নি।

কপাল খারাপ ছিল ফার্নাদো টরেসেরও। মৌসুমের অনেক সময় ইনজুরিতে ছিলেন তিনি, আর খেললেও মিডফিল্ডে জাবি আলোনসোর সেই নির্ভরযোগ্য সাপোর্টটা পাননি তিনি।

এধরণের হাজারো সমস্যার বলি হয়ে দ্বিতীয় হবার পরের মৌসুমেই সপ্তম হল লিভারপুল। যেটা কিনা তার আগের ১১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে জঘন্যতম মৌসুম ছিল তাদের জন্য। মৌসুম শেষে ছাঁটাই হন কোচ রাফায়েল বেনিতেজ, কোচ হিসেবে আসেন রয় হজসন। তিনি ছিলেন আরেক চিড়িয়া। সে কথা নাহয় তোলা থাক আজ!

 

প্রথম পর্বের লিঙ্ক – http://bit.ly/1FiO0PL

(চলবে)

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

fifteen + seven =