ডাকওয়ার্থ-লুইস মেথডের ইতিকথা : কি এবং কেন

বর্তমানে ক্রিকেট দুনিয়াতে সবথেকে বেশি উচ্চারিত শব্দ দুটির নাম বলুন তো? দুই সাহেবের নাম, অঙ্কের জটিল ফর্মুলায় যারা বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচের জয়-পরাজয় নির্ধারণ করার স্কোর বের করেন। তারা দুজন হচ্ছেন ফ্রাঙ্ক ডাকওয়ার্থ আর টনি লুইস। বিশেষ করে এবারের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে প্রায় প্রত্যেকটা ম্যাচেই বৃষ্টি হানা দেওয়ার কারণে এই দুই ভদ্রলোক দ্বারা উদ্ভাবিত নিয়মটার কদর হচ্ছে বেশ। এবারে আপনাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবার কথা আমি কি বলতে চাচ্ছি। ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতি।
পদ্ধতিটাকে ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতি বলা হলেও আসলে পদ্ধতিটার নাম ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন পদ্ধতি। এ পদ্ধতির কথা বললেই ১ বলে ২২ রান দরকার- এমন একটা ছবি চলে আসেনা মনের মধ্যে? বৃষ্টি আর দক্ষিণ আফ্রিকার চিরবৈরী সম্পর্কের প্রথম উদাহরণ এটি হলেও একটি ভুল ভাঙিয়ে দেই আপনাদের- ঐ অবাস্তব স্কোর ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে করা হয়নি।

বরং বলা যায়, ঐ স্কোর, বর্তমান ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতি তৈরির পথ সুগম করেছিলো।

অঙ্কের সমাধান অঙ্কের সূত্র ব্যবহার করেই হওয়া উচিত- এই মূলনীতি মেনে ডিএলএস পদ্ধতি তৈরি হয় ১৯৯৬ সালে আর আইসিসি এটাকে অনুমোদন করে গত শতাব্দীর শেষ বছরে, অর্থাৎ, ১৯৯৯ সালে। আর ১ বলে ২২ রান- এই অবাস্তব সমীকরণ ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপের। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে এই দুই সাহেব ডি এল পদ্ধতি আবিষ্কারের আগে কিভাবে বৃষ্টি বিঘ্নিত ম্যাচের ফয়সালা হতো?

তিষ্ঠ ক্ষণকাল, পাঠকবর,
পেয়ে যাবেন উত্তর।

প্রথমে গড় রান রেট পদ্ধতিতে হিসাব করা হতো। এখানে উইকেট পতনের কোন হিসাব করা হতো না। অস্ট্রেলিয়া ১৯৮৯ সালে এই পদ্ধতির কারনে জেতা ম্যাচ হেরে বসে। এরপর সেটা পরিবর্তন করে এলো Most Productive Overs Method. এখানে পরে ব্যাটিং করা দল তাদের ভালো বোলিং এর জন্য শাস্তি পেত! হ্যাঁ, সত্যি। এই Most Productive Overs Method এর কারণেই ১৯৯২ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার ঐ ১ বলে ২২ রানের হাস্যকর লক্ষ্যের জন্ম।

ডি এল পদ্ধতিতে দুই দলের কাছে Available Resources এর হিসাব করা হয়। মানে দুটি জিনিস- কত বল আছে আর কত উইকেট আছে। এরপর নির্ধারণ করা হয় পার স্কোর। মানে এখানে বল আর উইকেট- দুটোরই হিসাব হচ্ছে। তাই এটাকে ন্যায্য বিচার বলা যায়।

ডি এল পদ্ধতিতেও দক্ষিণ আফ্রিকার দুর্দশা কাটেনি। ২০০৩ বিশ্বকাপে হিসাবে ভুল করে শন পলকের হতবিহ্বল ছবিটা নিশ্চয় আপনাদের মনে আছে। বাংলাদেশ দল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এই পদ্ধতিতে ২০১৩ সালে একটি ওয়ানডে জেতে, তার আগে ২০১০ সালে কিউই দের বাংলাওয়াশ এর প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে প্রথম ওয়ানডে ডি এল পদ্ধতিতে জেতে ৯ রানে।

ম্যাচের শুরুতে ব্যাটিং টিমের কাছে দুটি সম্পদ থাকে –
  • ৩০০ বল
  • ১০ উইকেট
খেলতে খেলতে এগুলো শেষ হয়ে যায়, হয় ৩০০ বল শেষ হবে নয়তো সবাই প্যাভিলিয়নে ফিরে যাবে। ব্যাটিং টিম ওভার হারানো মানে, তারা তাদের সম্পদের পূর্ণ ব্যবহার থেকে বঞ্চিত হল। ডিএলএস মেথডে তাই তাদের টার্গেট পুনঃনির্ধারণ করা হয় দুই দলের কাছেই কত সম্পদ বাকি আছে তার ভিত্তিতে। সব সময় এই সম্পদের ব্যবহার একভাবে হয় না। তাই টার্গেট পুনঃনির্ধারণের সময় দেখা হয় –
  • কত ওভার নষ্ট হয়েছে
  • কত উইকেট হাতে আছে
  • ইনিংসের কোন পর্যায়ে বৃষ্টির হানা এসেছে
এটা সাধারণ হিসাব যে, প্রথমে ওভার নষ্ট হবার থেকে, শেষের দিকে খেলা বিঘ্নিত হলে সেই ওভারের মুল্য বেশি হবে – কারণ প্রথমে ওভার নষ্ট হলে পুনঃপরিকল্পনা করে সময় নিয়ে খেলতে পারে, শেষের দিকে হলে সে সুযোগ কম থাকে। আর এটা ক্রিকেটের প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, ইনিংসের প্রথম ১০ ওভার থেকে শেষ ১০ ওভারে রান বেশি হয়। প্রথম ২০ ওভার খেলার পর, বৃষ্টি এলো। এখন ডি এল এস দেখবে, কত সম্পদ আছে হাতে এই মুহূর্তে। যে দল ৭ উইকেট হারিয়ে ফেলেছে এই বিশ ওভারে, আর যে হারিয়েছে ৩ উইকেট, তাদের মধ্যে নিশ্চয় বাকি সম্পদের পরিমাণের পার্থক্য আছে। একজনের আছে মোটে তিন উইকেট আরেকজনের আছে সাত-সাতটি উইকেট। তবে ব্যাটসম্যানের নামের কোন বিবেচনা নেই এখানে। মানে প্রথম ৭ জন যদি ব্যাটিং অর্ডার উল্টে বোলার খেলানো হয়, তাও একই হিসাব। যার হাতে ঐ মুহূর্তে যত বেশি উইকেট থাকবে, তার পুনঃনির্ধারিত টার্গেট তত বেশি হবে, কারণ তার হাতে সম্পদ বেশি আছে। ইনিংস ব্রেকে বৃষ্টি হলে টার্গেট পুনঃনির্ধারিত হতে পারে। কারণ পরে ব্যাট করা দল তার সম্পূর্ণ ওভার খেলা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জয়ী দলের নেট রান রেট পরাজিত দলের থেকে বেশি হবে – এই যুক্তি দিয়ে নেট রানরেটের হিসাব পুনঃনির্ধারিত হয়। এবং জয়ী দলের নেট রানরেট সব সময় পজিটিভ হবে, এই নীতি মাথায় নিয়ে এই কাজ করা হয়। এর জন্য প্রথমে ব্যাটিং করা দলের স্কোর সমন্বয় করা হয় – ডি এল এস পদ্ধতিতে হিসাব করা “পার স্কোর” এর সমান করে, নেট রান রেট হিসাব করার জন্য।
পার স্কোরটা কি?
পার স্কোর হল সেই রান, যেটা কিনা পরবর্তীতে ব্যাট করা দলটা অর্জন করতে পারত বৃষ্টি যদি হানা না দিত, সেই ক্ষেত্রে। খেলায় কোন বিঘ্ন করার আগেই এই পার স্কোরের হিসাবটা করা যায়, যেখানে বৃষ্টি হানা দেওয়ার পরেই মূলত হিসাব করা হয় পরবর্তী ব্যাট করা দলের লক্ষ্যটা কত রান হবে। রানের লক্ষ্য স্থির থাকলেও তাই এই পার স্কোরটা কয়টা উইকেট পড়েছে সেটার উপর ভিত্তি করে বারবার পরিবর্তিত হতে পারে।
এইরকম জটিল এক নিয়মের বেড়াজালের উপরেই নির্ভর করছে এবার চ্যাম্পিয়নস ট্রফির অধিকাংশ ম্যাচের ফলাফল, কিংবা বৃষ্টিবিঘ্নিত যেকোন ক্রিকেট ম্যাচেরই ফলাফল!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

10 + one =