যে গল্পে থাকবে একজন ক্রিশ্চিয়ানো !

টাইম ট্র্যাভেল বিশ্বাস করেন ?

করেন না তো ?
আচ্ছা তবে খেলার ছলেই মিছে কল্পনায় বিশ্বাস আনুন । কল্পনায় চলুন ভবিষ্যতে টাইম ট্র্যাভেল করি ।

২০৬০ সাল !
মধ্যে রাত । খুক খুক করে অনবরত কাশছি । শরীরের কল কব্জা ক্ষয়ের মৃত্যুপ্রান্তে । পাশে অঘোরে ঘুমিয়ে সাদা চুলে ভাঁজ পড়া চামড়ায় আমার সহধর্মিনী । আয়নায় নিজেকে দেখিনা অনেক দিন । তবে সহধর্মিনীর সাদা চুল আর ভাঁজ চামড়া বলে দেয় আমিও কাশফুল মুখে-মাথায় নিয়ে ঘুরছি । মাথায় দু চারটে চুল আছে অবশ্য । যৌবনের সেই অহংবোধীয় চুলের কথা ভেবে খানিকটা বুলিয়ে নিলাম টিকে থাকা গোটা চারেক সাদা চুল । হঠাত্‍ পাশের ঘর থেকে বড্ড পরিচিত একটা আওয়াজ ভেসে এলো ।

হি ইজ ফিনম্যিনাল ! আনস্টপেবল রান, ক্লিনিক্যাল ফিনিশ !

শরীরের সাথে অনেকটা বিদ্রোহ করেই নেমে পড়লাম বিছানা থেকে । খাটের কঁচকঁচ আওয়াজের সাথে পাঁজি কাশিটা একসাথে আর্তনাদ করে উঠলো । ভয়ার্ত আড়চোখে চেয়ে দেখে নিলাম সহধর্মিনীকে । নাহ, টের পায়নি কিছু । বাঁচলাম !
অতি সন্তর্পনে এগুলাম পাশের ঘরের পানে । দেয়াল জুড়ে দৈত্যাকার এক টিভি ঝুলছে । মুখোমুখী সোফায় উত্তেজিত মুষ্টিতে বসে আছে আমার স্কুল পড়ুয়া কিশোর দৌহিত্র ।
পাঞ্জাবীর পকেট হাঁতড়ে চশমাটা বের করলাম । দৈত্যাকার টিভিতে চলছে গ্রেটেস্ট গেইম ফুটবল !
খানিক বাদে টের পেলাম স্যান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে চলছে জাল লক্ষ্যে নিয়ে ২২ জনের দৌড়াদৌড়ি ।

অবশ্য বার্নাব্যুকে চিনতে পারিনি প্রথম দফায় । সে এক হুলস্থুল ব্যাপার স্যাপার । গ্যালারি যেন ঝুলে আছে শূন্যে ভর করে । ব্যবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান মনে পড়ে গেল । বার্নাব্যুর ঘাস গালিচাও বদলে গেছে । মনে হচ্ছে যেন জহরতে মোড়ানো পারস্যের কোন মখমল গালিচা ।
খেলছে স্বাগতিক রিয়াল মাদ্রিদ এবং অচেনা কোন এক দল । মাদ্রিদের পোষাকেও এসেছে পরিবর্তন । তবে সগৌরবে রয়ে গেছে সেই অনুভূতির সাদা রং । চোখ ছোট ছোট করে অতিকষ্টে দেখে নিলাম স্কোর লাইন ।
১-০ !
তবে পাশে ব্র্যাকেটে বেরসিক এক সমীকরণ । লেগ চলছে আর সেখানে পিছিয়ে সাদা সৈন্যরা ১-২ এ ।

হঠাত্‍ই ক্যামেরা স্থির এক চলমান মাদ্রিদ খেলোয়ারের উপর । হালকা পেটানো দেহের একজন লেফট উইংগ ধরে রেলগাড়ি ছুটিয়েছে যেন । প্রতিপক্ষের তাগড়া জোয়ানরা বার কয়েক ধাক্কা দিলো । একজন তো বেশ ভয়ংকরতায় চালালো স্লাইড ট্যাকল । হালকা দমলো ছেলেটি । মনে মনে বললাম সামলে বাছা !
পতন রক্ষা করে ছেলেটি তার রেলগাড়ির অদম্য যাত্রা রাখলো অব্যাহত ।
প্রতিপক্ষের বিপদ সীমানায় ঢুকে পড়লো । আমি বললাম সাবাশ ব্যাটা ! পা চালা ! ছেলেটি শট নিলো, তবে দস্তানা মানব তা ঠেকিয়ে পাঠালো বারের উপরের ওপারে ।
কর্নার !
ছুটে এলো সাদা চামড়ার পাতলা চুলওয়ালা একজন । দেখতে বেশ ছিমছাম ভদ্র গোছের ।

বল উড়ে এলো কর্নার থেকে । লাফিয়ে আক্রমণ-প্রতিরোধে উড়ন্ত জটলা তৈরি হলো। লাফানো জটলা থেকে সর্ব উঁচুতে দেখা মিললো একজনের । যেন আকাশ ছোঁয়ার বায়না ধরেছে । ভেসে আসা বলে তার খুলি চুঁম্বন করলো এবং. . . . . . .
বলের জাল প্রণয় !
কেঁপে উঠলো বার্নাব্যু । সবাইকে সাথে করে সাদা সৈন্যদের সেকি জংলি উদযাপন । আমার দৌহিত্রও যোগ দিলো তাতে । Yes, Yes, Yes বলে বাতাসে বার কয়েক ঘুসি চালালো !

এবার ফিরতে হলো আমাকে । না, বিছানায় নয় । ফিরলাম স্মৃতিপটে । ফিরলাম ৪০ বছরেরও আগে । ফিরলাম ওল্ড ট্র্যাফোর্ড । যেখানে পাতলা দেহের একজন ছুটছে গ্রীক অশ্বরথ ছুটিয়ে । সর্পিল বাঁকে ঘোল খাওয়াচ্ছে প্রতিপক্ষকে ।

কখনও ৩০-৩৫ গজ দুরত্বের গোলা শটে পরাস্ত করছে গোলবার প্রহরীকে । আবার কখনো বা আকাসে ভাসছে চরম বিস্ময় জাগিয়ে । ওল্ড ট্র্যাফোর্ড থেকে মুহুর্তে উড়ে গেলাম স্যান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে । গ্রীক অশ্বরথের সেই যোদ্ধা এখানেও ছুটছে । ছুটছে জাল টানে, ছুটছে অমরত্বের পানে ।
চির অভ্যাসে আকাশে ভাসছে, মমতায় গোল গল্প আঁকছে ।
হাত উঁচিয়ে তপ্ততা বাড়াচ্ছে বার্নাব্যুর । সুপ্ত মাদ্রিদকে দিচ্ছে জীবন্ত লাভা ।
হঠাৎ দুরে কোথাও অপরিচিত এক রাতের পাখি বড্ড অস্থিরতায় ডেকে উঠলো । ঘোর ভাঙ্গলো আমার । দেখলাম পাখির অস্থিরতা জাদুর বাক্সেও ।
৯০ মিনিট পেরিয়ে যাচ্ছে । এক গোল চাই-ই সাদা সওদাগরদের ।
উপলক্ষ্য প্রতিপক্ষই এনে দিলো । নিজেদের বিপদ সীমার সামনে ফেলে দিলো একজনকে ।

রঙ্গীন মোড়কে রেফারি বাঁজালেন ফ্রি-কিকের বাঁশি ।
তত্‍ক্ষণাত আপোসে বিস্মিত হলাম । সাড়া দিচ্ছে আমার অকেজো পেশিগুলো । উত্তেজনা ছুঁয়ে গেছে তাদেরও । কে নিবে ফ্রি-কিক ?
কে নিবে ঘাড়ে তুলে স্বপ্ন ঐচ্ছিক ?
বাম ডানার সেই ছুটন্ত ছেলেটিই এলো ।
বল সস্থানে রেখে পেছালো দু কদম । লম্বা করে ছাড়লো শ্বাস । তবে আমার শ্বাস বন্ধ । দৌহিত্রের বন্ধ শ্বাসে গলা মিলিয়ে বার্নাব্যুও মৃত্যু স্তব্ধ ।
এবার দু কদম এগোনোর পালা । এগোলো ছেলেটি !
পরম আত্নবিশ্বাসে পা দিয়ে চুঁম আঁকলো বলে । লাফিয়ে উঠলো প্রহরা দেয়াল । তবে গল্পটি তৈরি হয়েই গেল । দেয়াল চিঁড়ে বল খুঁজে পেল প্রেমিকা জালের স্পর্শ । দেয়াল আর গোলবার প্রহরীদের হাতাশা দৃষ্টি গোল বস্তুটিতে ।
ওদিকে সন্তুষ্টিতে বদ্ধ উন্মাদনার সৃষ্টি বার্নাব্যুতে । ধারাভাষ্যকারের উত্তেজিত কন্ঠে যেন নিষ্পেষিত মাইক বলে উঠলো ‘ছেড়ে দে ভায়া, কেঁদে বাঁচি’ ।
সে কান্না অত্যাচারের নাকি উপস্থিত দৃশ্যে সুখে সেটি আর জিজ্ঞেস করা হলোনা মাইক মহাশয়কে ।
রেফারি ততক্ষণে বাঁজিয়েছে অন্তিম সুর । মাঠের কোণে একে অপরের উদযাপন যাতাকলে পিষ্ট সাদা রাজারা ।
ভাবলাম তবে এ ঘর কেন নিশ্চুপ ? নিশ্চুপ কেন ত্রয়োদশ দৌহিত্র ? কেনই বা নিশ্চুপ আমার শরীরে বাস করা ব্যাধিগুলো ।
উত্তর খুঁজতে তাকাতে চাইলাম । হঠাত্‍ই ঝাঁপসা চারিদিক । জাদুর বাক্সে বার্নাব্যুর কোলাহলও কমে এসে চলছে কোন বিজ্ঞাপণের সুর ।

উত্তর খুঁজতে তাকাতে চাইলাম । তবে সহসাই দৃষ্টি আরও বিস্মিত বিদ্রোহী ঘোলাটে । টের পেলাম গাল ভেঁজা লাগছে । ঠোঁটে লাগলো নোনতা স্বাদ । অশ্রু জল আর ভাঁপে চশমাটার কাঁচ ধূসর ধোঁয়ায় আচ্ছাদিত ।
জল গড়িয়ে পড়ছে বড্ড ছেলেমানুষিতে । আত্ন উপহাসে নিজের প্রতি হাসলাম চোখে জল নিয়ে । সোনালী ফ্রেমের চশামাটিও অবমুক্ত করে মুছে নিলাম ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবীতে ।
স্বচ্ছ চশমায় যখন এবার তাকালাম তখন গোটা পৃথিবীই যেন আমাকে চেয়ে দেখছিলো । সামনে দৌহিত্র বিস্ময় মেশানো তাকিয়ে রয়েছে । দৃষ্টির সাথে যেন এবার জমে থাকা শরীরও আত্নপ্রকাশ করলো । সঙ্গী কাঁশিটা বেড়িয়ে এলো তীব্র ব্যথা দিয়ে । তবে বাহুতে কার জানি নরম স্পর্শ সেটিকে মুছে দিলো নিমিষেই ।
আমার সাদা চুলের খুঁকি সহধর্মিনী ।
তার চোখটাও ভেঁজা । আমার আবেগ তাকেও ছুঁয়ে গেছে । যে কিনা সেই একসাথে চলার শুরু থেকেই ঢং আখ্যা দিয়ে আমার ফুটবল প্রেমে টিপ্পনী কাটে।
টিভির আলোতে স্পষ্ট টের পেলাম তার গালের ভাঁজে চকচক করছে শুকানোর অপেক্ষায় অশ্রুজল ।
ভীত কম্পনে ধরা গলায় বললাম- ইয়ে মানে, ওয়াশরুমে এসেছিলাম ।
হেসে দিলো আমার সাদা চুলের রাণী । বললো, আজ আর চোখ রাঙাবো না । চলো শোবে চলো !

বহু বছর বাদে দারুন প্রশান্তির এক ঘুম হলো সে রাতে । স্বপ্নে দেখলাম দৌহিত্র আর সেই লেফট উইংয়ের সেই দুরন্ত ছেলেটি ভাঁজ করা হাঁটু ধরে বলছে-
দাদু তোমাদের সেই রোনালদোর গল্প শোনাবে ?
স্বপ্নেই আমরা চোখ ভিঁজে উঠলো । ইচ্ছে করছিলো আবেগে ডুঁকরে কেঁদে উঠি । কিন্তু না, আজ তো গল্প বলার দিন । যে গল্পে থাকবে পরিশ্রম, আত্নবিশ্বাস আর সাফল্য । যে গল্পে থাকবে আবেগ, ব্যর্থতা, বেদনা ।
যে গল্পে থাকবে ব্যর্থতার সাময়িক ও সাফল্যের চিরস্থায়ী কান্না । যে গল্পের প্রারম্ভ, মধ্য গগন আর ইতিকথায় থাকবে একজন রাজকুমারের অমরত্বের চির সবুজ রঙ । যে গল্পে থাকবে একজন ক্রিশ্চিয়ানো !
একজন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো দস সান্তোস এ্যাভেইরো ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

4 + 20 =