কেমন হল আর্জেন্টিনার কোপা আমেরিকা দল?

 

বেশী দেরি নেই আর। চিলিতে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ের পর্দা উঠতে বাকী আর আছে মাত্র তিন দিন। আর টুর্নামেন্টে যেহেতু ব্রাজিল আর্জেন্টিনার মত দল আছে, তাই এই কোপা নিয়ে বাঙ্গালীদের আগ্রহের কোন কমতি নেই। কনমেবল এর দশ দলের সাথে কনক্যাকাফ অঞ্চলের মেক্সিকো ও জ্যামাইকা, এই ১২ দল নিয়ে এবারের কোপার লড়াইটা শুধুমাত্র ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মধ্যে হবে – এ কথা ভাবাটা নিতান্তই ভুল হবে। আছে রড্রিগেজ-ফ্যালকাও-কুয়াড্রাডো’র কলম্বিয়া, আছে স্যানচেজ-ভিদালের চিলি, আছে কাভানি-গোডিনের উরুগুয়েও। তাই জিভে পানি আসা এক আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের আশা করাটা বাতুলতা হবে না।

এখন আর্জেন্টিনার প্রসঙ্গে আসা যাক। চৌদ্দবার কোপা আমেরিকার শিরোপা ঘরে তোলা আর্জেন্টিনা এই টুর্নামেন্টে যোজন যোজন এগিয়ে ব্রাজিলের থেকে। যদিও শেষ শিরোপাটা এসেছিল সেই ১৯৯৩ সালে, এ যুগের ফুটবল ফ্যানাটিকসদের অধিকাংশের জন্মই হয়নি তখন, হলেও ফুটবল কি বুঝতে শেখেনি। সেই কোপা আমেরিকার শিরোপাটাই এখন পর্যন্ত কোন বড় বিশ্ব টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার সর্বশেষ শিরোপা হয়ে আছে। গতবছর নিজেদের তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ে নিশ্বাস দূরত্বে চলে আসা আর্জেন্টিনা কি এবার পারবেন তাদের শিরোপা বন্ধ্যাত্ব ঘোচাতে? ৪ জুলাইয়ের পরেই পেয়ে যাব আমরা সবাই সে প্রশ্নের উত্তর!

বাতিস্তুতা-সিমিওনেদের সেই ১৯৯৩ এর দলের পরে আর্জেন্টিনার কোন দল আর কিছু জেতেনি
বাতিস্তুতা-সিমিওনেদের সেই ১৯৯৩ এর দলের পরে আর্জেন্টিনার কোন দল আর কিছু জেতেনি

দেখে নেওয়া শিরোপার খোঁজে থাকা আর্জেন্টিনার দলটিকে শিরোপাজয়ী বলা যায় কিনা!

  •  গোলবার

২৩ জনের দলে গোলরক্ষক আছেন তিনজন। যথারীতি আছেন বহুদিন ধরে আর্জেন্টিনার নাম্বার ওয়ান থাকা সাম্পদোরিয়া গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরো, আছেন নাপোলির মারিয়ানো আন্দুজারও। তৃতীয় গোলরক্ষক পছন্দের ক্ষেত্রে কোচ জেরার্ডো মার্টিনো প্রাধান্য দিয়েছেন মেক্সিকো’র টিগ্রেস এ খেলা গোলরক্ষক নাহুয়েল গুজম্যানকে।

নাহুয়েল গুজম্যান
নাহুয়েল গুজম্যান

ফলে কপাল পুড়েছে গত মৌসুমে মালাগা থেকে ম্যানচেস্টার সিটিতে আসা উইলফ্রেডো ক্যাবায়েরো’র। আশ্চর্যের কিছু নেই, ক্যাবায়েরো সিটিতে আসার পর খেলেছেনও জঘন্য। নাম্বার ওয়ান জ্যো হার্টকে ত বেঞ্চে বসাতে পারেনইনি, উলটো যখন মূল একাদশে ডাক পেয়েছেন করে বসেছেন একের পর এক শিশুতোষ সব ভুল। দলে জায়গা হয়নি পুরো মৌসুম ধরে দুর্দান্ত খেলতে থাকা রিয়াল সোসিয়েদাদের গোলরক্ষক জেরোনিমো রুয়ি’র। মোটামুটি বলেই দেওয়া যায় তাই কোনরকম ফর্মের পতন না হলে পুরো কোপা আমেরিকা জুড়ে ২০১৪ বিশ্বকাপের আনসাং হিরো আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক সেই সার্জিও রোমারো’ই থাকছেন মূল গোলরক্ষক হিসেবে।

সার্জিও রোমেরো
সার্জিও রোমেরো
বরাবরের মত এবারও মারিয়ানো আন্দুজার নাম্বার টু গোলরক্ষকই থাকছেন
বরাবরের মত এবারও মারিয়ানো আন্দুজার নাম্বার টু গোলরক্ষকই থাকছেন
  •  ডিফেন্স

ডিফেন্সে সেরকম নতুন কেউই নেই। নতুন মুখ বলতে আছেন শুধু নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের ২৭ বছর বয়সী ফুলব্যাক মিল্টন কাসকো। এই কাসকো কে বহুদিন ধরেই নজরে রাখছিলেন মার্টিনো। ফুলব্যাক পজিশানে আরও আছেন আর্জেন্টিনার ফার্স্ট চয়েস রাইটব্যাক ম্যানচেস্টার সিটির পাবলো জাবালেতা ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মার্কোস রোহো। অন্য সেন্টারব্যাক জাবালেতার সিটি-সতীর্থ মার্টিন ডেমিকেলিসও।

নতুন মুখ - মিল্টন কাসকো
নতুন মুখ – মিল্টন কাসকো

সেন্ট্রাল ডিফেন্সের কথা চিন্তা করলে বিশ্বকাপে থাকা ডিফেন্ডারদের মধ্যে বাদ পড়েছেন নাপোলি’র ফেদেরিকো ফার্নান্দেজ, তাঁর পরিবর্ত হিসেবে দলে ঢুকেছেন ভ্যালেন্সিয়ার হয়ে অসাধারণ মৌসুম কাটানো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের নজরে থাকা সাবেক পোর্তো সেন্টারব্যাক নিকোলাস ওটামেন্ডি। তাছাড়া জেনিত সেইন্ট পিটার্সবার্গের এজেকিয়েল গ্যারায় ত আছেনই। আছেন জেনোয়ার ফাকুন্দো রনক্যাগলিয়া। টটেনহ্যাম হটস্পারে গিয়ে ফর্ম হারানো ফেদেরিকো ফাজিও হারিয়েছেন আর্জেন্টিনা দল থেকে নিজের জায়গাটাও। পায়ের ইনজুরির কারণে বাদ গেছেন ভিয়ারিয়ালের মাতেও মুসাচ্চিও। বিশ্বকাপ দলে থাকা হুগো ক্যাম্প্যানিয়ারো ও হোসে মারিয়া বাসান্তা – জায়গা হয়নি কারোর। লা লিগার সবচেয়ে বাজে একাদশে থাকা অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের লেফটব্যাক ক্রিস্টিয়ান আনসালদির দলে হায়গা হয়নি সঙ্গত কারণেই। তাই গত বিশ্বকাপে ৫-৩-২ ও ৪-৩-৩ ফর্মেশানে খেলা আর্জেন্টিনা যেরকম পাঁচজন ডিফেন্ডার খেলালে দলে খেলাত জাবালেতা-ডেমিকেলিস-গ্যারায়-ফার্নান্দেজ-রোহো কে ; কিংবা চারজন খেলালে খেলাত জাবালেতা-গ্যারায়-ডেমিকেলিস-রোহো’কে, এখন মোটামুটি নিঃসন্দেহ হয়ে বলাই যায় ঐ ডিফেন্সিভ লাইনআপ আমরা দেখছিনা এবারের কোপায়। ডেমিকেলিসের জায়গায় ওটামেন্ডি এসে যেতে পারেন। গ্যারায়, জাবালেতা ও রোহো’র জায়গা মোটামুটি মূল একাদশে নিশ্চিত, তাই আরেকটা সেন্ট্রাল ডিফেন্সের স্পট নিয়েই হবে মূল লড়াইটা। ফলে আর্জেন্টিনা যদি যথারীতি ৪-৩-৩ ফর্মেশানে খেলে, সেক্ষেত্রে ডিফেন্সিভ লাইনআপ দাঁড়াতে পারে অনেকটা এরকম ;
রাইটব্যাক – পাবলো জাবালেতা
সেন্টারব্যাক – এজেকিয়েল গ্যারায়, নিকোলাস ওটামেন্ডি
লেফটব্যাক – মার্কোস রোহো

মূল ডিফেন্স হবে এটাই
মূল ডিফেন্স হবে এটাই
  •  মিডফিল্ড

আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ দলে থাকা ভ্যালেন্সিয়ার এনজো পেরেজ, নিউয়েলস এর ম্যাক্সি রড্রিগেজ ও স্যান্ডারল্যান্ডের রিকার্ডো আলভারেজের জায়গা হয়নি কোপা আমেরিকা দলে। পুরো মৌসুম ধরেই ভ্যালেন্সিয়ার হয়ে দুর্দান্ত খেলতে থাকা এনজো পেরেজের কপাল পুড়েছে ইনজুরির কারণে।

ইনজুরিতে শেষ এনজো পেরেজের কোপা
ইনজুরিতে শেষ এনজো পেরেজের কোপা

আর আলভারেজ বহুদিন ধরেই খেলছিলেন জঘন্য। ফলে দলে ঢুকে গেছেন টটেনহ্যামের এরিক ল্যামেলা, পিএসজি’র হাভিয়ের পাস্তোরে, সেভিয়ার এভার বানেগা ও জুভেন্টাসের রবার্তো পেরেইরা। দলে জায়গা হয়নি বেনফিকার নিকোলাস গাইতান ও এদুয়ার্দো সালভিওরও। দলে আরও আছেন বার্সেলোনার চিরনির্ভর হ্যাভিয়ের ম্যাশেরানো, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অ্যানহেল ডি মারিয়া। দলে জায়গা ধরে রেখেছেন বোকা জুনিয়র্সের ফার্নান্দো গ্যাগো ও লাজিওর লুকাস বিলিয়া ও। ৪-৩-৩ ফর্মেশানে খেলতে চাইলে মিডফিল্ডের ম্যাশেরানো ও ডি মারিয়ার জায়গা মোটামুটি নিশ্চিত, তাই লড়াই হবে বাকী জায়গাটা নিয়ে। এনজো পেরেজ থাকলে যে জায়গাটায় খেলতেন আরকি। সে জায়গায় খেলার জন্য মার্টিনোর প্রথম পছন্দ হতে পারেন এভার বানেগা, সেক্ষেত্রে প্রথম একাদশে বিলিয়ার জায়গা হয়ে যাবে অনিশ্চিত। মিডফিল্ড লাইনআপ ;
ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড – হাভিয়ের ম্যাশেরানো
সেন্টার মিডফিল্ড – এভার বানেগা, অ্যানহেল ডি মারিয়া

বানেগা-ম্যাশেরানো-ডি মারিয়া
বানেগা-ম্যাশেরানো-ডি মারিয়া
  •  অ্যাটাক
অ্যাটাকিং ট্রাইডেন্ট
অ্যাটাকিং ট্রাইডেন্ট

যুগ যুগ ধরে আর্জেন্টিনার শক্তির প্রধান জায়গা তাদের আক্রমণভাগ। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। আক্রমণভাগে যথারীতি আছেন দ্য ম্যান হিমসেলফ – লিওনেল মেসি। সাথে সার্জিও অ্যাগুয়েরো, গঞ্জালো হিগুয়াইন, এজেকিয়েল লাভেজ্জি ত আছেনই। অ্যালেহান্দ্রো সাবেয়ার আমলে অচ্ছুৎ থাকা স্ট্রাইকার কার্লোস তেভেজ আবারও ডাক পাওয়া শুরু করেছেন। ফলে দলে জায়গা হারিয়েছেন ইন্তার মিলানের রড্রিগো প্যালাসিও। দলে জায়গা পাননি তাঁর সতীর্থ মাউরো ইকার্দিও। দলে জায়গা পাননি ভিয়ারিয়ালের হয়ে দুর্দান্ত মৌসুম কাটান লুসিয়ানো ভিয়েত্তো ও পালের্মো থেকে জুভেন্টাসে আসা স্ট্রাইকার পাউলো ডাইবালাও।

নতুন কোচ ফিরিয়ে আনার পর তেভেজ কি করেন জাতীয় দলের হয়ে - দেখবে সবাই
নতুন কোচ ফিরিয়ে আনার পর তেভেজ কি করেন জাতীয় দলের হয়ে – দেখবে সবাই

মেসি-হিগুয়াইন-অ্যাগুয়েরো এই তিনজন নিয়েই আর্জেন্টিনা মোটামুটি মূল একাদশ খেলাবে, তাও তেভেজ বা লাভেজ্জি দলে ঢুকে যেতে পারেন যেকোন সময়েই।

দলে জায়গা হয়নি ইকার্দি-ডাইবালা-ভিয়েত্তো দের মত তরুণদের
দলে জায়গা হয়নি ইকার্দি-ডাইবালা-ভিয়েত্তো দের মত তরুণদের

গ্রুপপর্ব পেরোতে হলে পেরোতে হবে উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে ও জ্যামাইকার বাধা। আর্জেন্টিনার দল পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় কোপা আমেরিকা নিয়ে কোনধরণের পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে রাজী নন কোচ জেরার্ডো মার্টিনো। তাই তরুণ সুপারস্টার ডাইবালা, ইকার্দি, ভিয়েত্তো, ক্রেইনভিটার – এদের নিয়ে অযথাই বাজী খেলার পক্ষপাতী নন তিনি।

অযথা ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না মার্টিনো
অযথা ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না মার্টিনো

তবে অন্যতম ইতিবাচক দিক হচ্ছে অযথাই অপরিচিত খেলোয়াড় নিয়ে দল ভারী করেননি তিনি। মার্টিনোর পূর্বসুরি বাতিস্তা, ম্যারাডোনা বা সাবেয়া প্রায়শই যে কাজতা করতেন। ফলে দলে অগাস্টিন অরিয়ন, নিকোলাস পারেজা, অগাস্তো ফার্নান্দেজ এসব জিনিসের জায়গা হয়নি। দেখা যাক, এই দল নিয়ে আর্জেন্টিনা কতদূর যেতে পারে!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

seven − 4 =