চেলসির প্রতি হিংসা

একজন লিভারপুল সমর্থক হিসেবে চেলসিকে হিংসা করার কারণের অভাব হবেনা। তাদের মিলিওনিয়ার মালিক রোমান আব্রামোভিচ, যিনি কিনা পছন্দের প্লেয়ার দলে টানতে টাকা নিয়ে কোন কার্পণ্য করেননা। এদিকে হিকস-জিলেট থেকে শুরু করে এখনকার ফেনওয়ে স্পোর্টসগ্রুপের জন হেনরি, লিভারপুলের মালিকদের আগ্রহ গত এক-দুই দশক ধরে সেইসব খেলোয়াড়দের প্রতিই সীমাবদ্ধ থেকেছে যাদের অনেক প্রতিভা ও পটেনশিয়াল আছে, কম দামে কিনে পরে বিক্রি করলে বেশী লাভ পাওয়া যাবে, সোজা কথায় যাদের resale value আছে আরকি। হিসাব করলে দেখা যাবে কোন সুপারস্টারকেই এই সময়ে লিভারপুল কেনেনি, বরং লিভারপুলে এসেই খেলোয়াড়েরা সুপারস্টারডমের সাথে পরিচিত হয়েছে। ফলে ওয়েন, টরেস, সুয়ারেজ, আলোনসো, ম্যাশচেরানো, রেইনাদের মত খেলোয়াড়েরা যেরকম এই ক্লাবে এসে সুপারস্টার হয়েছেন, ডেগেন-দিয়াও-দিউফ-এনগগও আছে অসংখ্য।

উল্টোদিকে বলা বাহুল্য, চেলসির রোমান আব্রামোভিচের সাফল্যক্ষুধা লিভারপুলের মালিকদের থেকেও যথেষ্ট বেশী, তাই পছন্দের খেলোয়াড়ের দাম যতই হোক না কেন, রোমান আর তাঁর স্বপ্নের পথে খেলোয়াড়ের দাম কখনো বাধা হতে পারেনি। মাইকেল বালাক, ক্লদ ম্যাকেলেলে, ডেকো, অ্যান্দ্রিই শেভচেঙ্কো, ফার্নান্দো টরেস, ইডেন হ্যাজার্ড, ডিয়েগো কস্টা, অ্যাশলি কোল… নাম বলে শেষ করা যাবেনা সেসব খেলোয়াড়ের, যেসব খেলোয়াড় আগে থেকেই সুপারস্টার ছিলেন, চেলসিতে যোগ দেওয়ার আগে। আরেকটা কারণ হতে পারে, খেলোয়াড়দের মত সময়ের সেরা কোচটাকেও তাদের দলে নিয়ে আসার চেষ্টাটা। মরিনহো, অ্যানচেলত্তি, স্কলারি, কন্তে, রানিয়েরি… তারা চেলসিতে এসে কিরকম সাফল্য পেয়েছেন সে কথা বাদ দেন, তাদের সবাই-ই তাদের কোন না কোন সময়ে বিশ্বের সেরা কোচ ছিলেন, সেটা আপনাকে মানতেই হবে।

তবে আমার আজকের হিংসার কারণ এটা না। মনে মনে হয়তোবা লাইনটা পড়েই আমার মুণ্ডুপাত করা শুরু করে দেবেন “শালা হিংসার কারণ এইটা না হলে এতবড় ইন্ট্রোডাকশান টানলি ক্যান” বলে! আমার হিংসার কারণ প্রায় প্রত্যেক সময়েই তাদের দলে যখনই একটা সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের প্রয়োজন হয়েছে, তারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ/অন্যতম শ্রেষ্ঠ ডিস্ট্রয়ার মিডফিল্ডারকে দলে টেনেই তবে ক্ষান্ত হয়েছে। আর একটা দলে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের দায়িত্ব যে কত বেশী, সেটা ফ্যটবল ভক্ত মাত্রি সবাই জানেন। পৃথিবীতে আন্দ্রেয়া পিরলো-জাবি আলোনসো-জাভি হার্নান্দেজরা মাঝমাঠে ঠিকঠাকমত জাদুকরের ছড়ি ঘোরাতে পারেন কারণ তাদের পাশে একটা করে ড্যানিয়েলে ডি রসি, আর্তুরো ভিদাল, হ্যাভিয়ের ম্যাশচেরানো কিংবা সার্জিও বুসকেটস থাকেন তাই, যাদের কাজই হল ট্যাকল, ইন্টারসেপশান করে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল যেকোন মূল্যে কেড়ে নিয়ে এসে পিরলো-জাভি-জাবিদের দেওয়া যাতে পিরলোরা আক্রমণ শানাতে পারেন।

কালকে চেলসি বনাম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এফএ কাপ ম্যাচ দেখছিলাম। আর দেখছিলা একটা খেলোয়াড়ের কীর্তি। খেলোয়াড়টার নাম এনগোলো কান্তে। আন্তোনিও কন্তের ইঞ্জিনরুম সামলানোর দায়িত্ব এখন যার কাঁধে!  স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে বলতে গেলে একাই এই লোকটা ইউনাইটেডের কোন খেলোয়াড়কে ঠিকমত মিডফিল্ডে ফাংশন করতে দিলেনই না! ইউনাইটেডের মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আবার একটা গোলও করলেন তিনি! যে গোলে ইউনাইটেডকে হারিয়ে এফএ কাপের সেমিতে উঠেছে চেলসি।

এই কান্তেও চেলসিতে এই মৌসুমেই কিন্তু এসেছেন, গত মৌসুমে লেস্টার সিটির মত দলকে ইংলিশ প্রিমিয়ারশিপ জেতানোতে এই কান্তের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশী বলে আমি মনে করি। নাহলে এখন লেস্টার সিটির অবস্থা দেখুন, রেলিগেশন অঞ্চলে ঘোরাফেরা করছে মাত্র গত মৌসুমেই শিরোপা জেতা দলটি। গত মৌসুমের দল থেকে শুধুমাত্র কান্তে ছাড়া সবাইই কিন্তু লেস্টারে আছেন, তাহলে সমস্যা কি? সমস্যা ঐ একটাই। কান্তে নেই। গত মৌসুমেই নিজেকে তর্কযোগ্যভাবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে প্রমাণ করা এই কান্তেকে যেভাবেই হোক, দলে এনেছে চেলসি।

শুধু কান্তে বলেই নয়। গত এক দশকে চেলসির ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের দিকে চোখ দিলেই দেখা যায়, একেকজনের থেকে একেকজন সেরা। সবসময়ই বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারকেই দলে এনে ক্ষান্ত হয়েছে তারা। দলে খেলে গেছেন ফ্রান্সের ক্লদ ম্যাকেলেলে ; ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড পজিশনটাকেই “ম্যাকেলেলে পজিশান” বলা হয় যার কারণে! 

ক্লদ ম্যাকেলেলে

দলে এসেছেন মাইকেল এসিয়েনের মত তারকা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, মাঠে যার কার্যক্রম দেখে চেলসির সমর্থকেরা আদর করে ‘বিসন’ বা আমেরিকান ষাঁড় বলে ডাকতেন! এমনকি বছর দুয়েক আগেও যে নেমানিয়া ম্যাটিচকে বেনফিকা থেকে আনা হয়েছে, তৎকালীন চেলসি কোচ মরিনহো বুঝেছিলেন, ফ্যাব্রিগাসের ক্রিয়েটিভিটির পেছনে এই ম্যাটিচকেই লাগবে, প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জেতার জন্য!

এ ত গেল শুধুমাত্র ম্যাকেলেলে, কান্তে, এসিয়েন আর ম্যাটিচের কথা। ওবি মিকেল, র‍্যামিরেস – এদের কথা নাহয় বাদই দিলাম। (চেলসির আরেক অসাধারণ ডিফেন্সিভ মিড ইম্যানুয়েল পেতিতকে আলোচনায় আনছিনা, কেননা আব্রামোভিচ তাঁকে কেনেননি) জন ওবি মিকেলকে ত একরকম স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের মুখের সামনে থেকে কেড়ে নিয়ে এসেছেন অ্যাব্রামোভিচ – আব্রামোভিচকেই যেই ডিফেন্সিভ মিডের গুরুত্ব সম্বন্ধে বুঝিয়েছেন, অনেক ভালোই বুঝিয়েছেন, বোঝা যায়!

আর লিভারপুল? বছর দশেক ধরে লুকাস লেইভার মত একটা সাধারণ মানের ডিফেন্সিভ মিড নিয়েই পড়ে আছে। তাও এই লুকাসকে যখন গ্রেমিও থেকে আনা হয়, তিনি ছিলেন ক্যুটিনিও-ফার্মিনিওর মতই একজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। তৎকালীন লিভারপুল কোচ রাফায়েল বেনিতেজ ঘষেমেজে এই লুকাসকে ডিফেন্সিভ মিডে পরিণত করেন।

এখনও প্রত্যেকটা ট্রান্সফার উইন্ডো যায়, আর আমরা লিভারপুল সমর্থকেরা হাহাকার করতে থাকি একটা জাতের সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের জন্য, আর হিংসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি চেলসির দিকে, প্রিমিয়ার লিগে সেরা সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের আঁতুড়ঘর যেখানে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

8 − five =