শ্যাপেকোয়েনসেঃ একটি ব্রাজিলিয়ান রূপকথার নির্মম সমাপ্তি!

কলম্বিয়ার লা ইউনিয়ন পাহাড়ের ঢালে তখন একটু একটু করে ভোরের আলো ফোঁটার কথা। কিন্তু বিরূপ আবহাওয়া আর বৃষ্টির কারণে খানিকটা দেরিই হচ্ছিলো ভোর আসতে। সূর্য ওঠা-না ওঠার এই দোটানার মাঝে ঘটে গেলো এক অপূরণীয় দুর্ঘটনা! পাহাড়ের উপর থেকেই কাছের শহর মেডেলিনে যাচ্ছিলো বিমানটি, আর কয়েক মিনিট পরেই ল্যান্ডিং হবার কথা ছিলো! কিন্তু যাত্রার পরিসমাপ্তি ঘটলো ওই পাহাড়ের কোলেই। ‘ব্রিটিশ এরিওস্পেস ১৪৬’ মডেলের বিমানটি কেন ক্রাশ করলো সেটা দুর্ঘটনার কয়েক ঘন্টা পরেও নিশ্চিত করা যায় নি। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিলো, জ্বালানী শেষের কারণে হয়তো এই পরিণতি। যদিও আল-জাজিরার সূত্র জানিয়েছে, বিরূপ আবহাওয়া এবং বৃষ্টির জন্যেই প্লেনটি ক্রাশ করে।

৮১ জন যাত্রী নিয়ে ব্রাজিল থেকে ছেড়ে আসা বিমানটিতে ছিলো ২১ জন জার্নালিস্ট, ৫১ জন শ্যাপেকোয়েনসের খেলোয়াড়-কোচ-ট্রেইনার-কর্মকর্তাবৃন্দ এবং ৯ জন ক্রু-মেম্বার। ‘কোপা সুদামেরিকানা’ নামে পরিচিত দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফুটবল প্রতিযোগীতার ফাইনাল খেলার জন্যেই ছিলো শ্যাপেকোয়েনসের এই কলম্বিয়া যাত্রা। কিন্তু ভাগ্যের মোড় ঘুরে সেটি হয়ে গেলো স্বর্গযাত্রা! মাত্র ৫ জন বাদে কেউই বাঁচতে পারেন নি ওই প্লেনটির! যারা বেঁচে আছেন, তাদের অবস্থাও আশংকাজনক!

মেডেলিনে কোপা সুদামেরিকানার ফাইনালের প্রথম লেগ খেলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা দক্ষিণ ব্রাজিলের এই ক্লাবটি, মাত্র সাত বছর আগেও খেলতো ব্রাজিলিয়ান চতুর্থ বিভাগে! সেখান থেকে ইউরোপের দ্বিতীয় মর্যাদাপূর্ণ আসর ‘ইউরোপা’র সমতুল্য দক্ষিণ আমেরিকার ‘কোপা সুদামেরিকানা’র ফাইনাল খেলতে যাওয়া শ্যাপেকোয়েনসের এই যাত্রাটাকে এযুগের ফুটবল রূপকথা বলাই যায়।

৪৩ বছর আগে দক্ষিণ ব্রাজিলের শহর শ্যাপেকো’তে গড়ে ওঠা এই ক্লাবটি ছিলো, এবছরের ব্রাজিলিয়ান ফার্স্ট ডিভিশনের ২০টি দলের মাঝে প্রতিষ্ঠার দিক দিয়ে সবচাইতে তরুণ ক্লাব। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সমৃদ্ধশালী ইতিহাসে শ্যাপেকোয়েনসের জনপ্রিয়তা অতোটা নেই। এমনকি তাদের নিজ প্রদেশ সান্তা ক্যাটারিনাতেও, পাশের শহর ফ্লোরিয়ানোপোলিসের বড় দুই ক্লাব ‘এভাই’ এবং ‘ফিগুইরেন্সে’র জনপ্রিয়তা তাদের থেকে বেশী।

তবুও শ্যাপেকোয়েনসে নজর কেড়েছিলো তাদের নিজস্ব দর্শকগোষ্ঠীর কারণেই। ১৯৭০ এর পরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া দলটিকে শহরবাসীরা শুরু থেকেই প্রবল সমর্থন দিয়ে এসেছে। আর গত এক দশকে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের তাদের উত্থানের অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয় তাদের ঘরের মাঠ এরিনা কোন্দাকে। ২০১২ সালে সেকেন্ড ডিভিশন এবং ২০১৩ তে ফার্স্ট ডিভিশনে ওঠার পথে, নিজেদের মাঠে খেলা ৩০ ম্যাচের মধ্যে মাত্র ২টিতে হেরেছিলো শ্যাপেকোয়েনসে। এতেই বোঝা যায়, ঘরের সমর্থনে কতোটা শক্তিশালী তারা।

২০১৪ তে, ক্লাবের ইতিহাসে প্রথমবারের মত ফার্স্ট ডিভিশনের ম্যাচে মাঠে নামে শ্যাপে। ব্রাজিলিয়ান লীগে সদ্য পা দেয়া দলটি, সেইবার রেলিগেশন এড়িয়েভালোভাবেই থেকে যায় ফার্স্ট ডিভিশনে। কিছুটা বাজেট সংকট থাকার পরেও, তারা দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় সম্মানজনক প্রতিযোগীতা সুদামেরিকানায় কোয়ালিফাই করে সেই সিজনে। ‘ক্লাবের ইতিহাসে প্রথম’ তালিকায় যুক্ত করলো আরেকটি অর্জন!

২০১৫ তে কোপা সুদামেরিকানায় তাদের খেলা দেখে কেউ কল্পনাও করতে পারে নি, যে প্রথমবারের মত তারা কোন মহাদেশীয় টুর্নামেন্ট খেলছে। বিদেশী প্রতিপক্ষদের সাথেও সমানতালে লড়াই করে পৌঁছে যায় শেষ ১৬তে। শেষ ১৬’র প্যারাগুয়েন প্রতিপক্ষ লিবার্তেদের বিপক্ষে দারুণ জয়ে পৌঁছে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে। কোপা সুদামেরিকানা’র আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টাইন বনেদী ক্লাব রিভারপ্লেটের বিপক্ষে এগ্রিগেটে ৪-৩ গোলের হারে রূপকথার গল্প সেইবার আর লম্বা হয় নি। যদিও নিজেদের মাঠে রিভারপ্লেটকে ২-১ গোলে হারিয়েছিলো শ্যাপেকো’র দলটি। সেই ম্যাচটিতে জোড়া গোল করেছিলেন ক্লাবের অলটাইম টপস্কোরার ব্রুনো র্যািঞ্জেল, প্লেন ক্রাশের ঘটনায় যিনিও এখন স্বর্গযাত্রী।

ব্রাজিলিয়ান লীগে এরই মধ্যে মধ্যম সারির দল হয়ে ওঠা শ্যাপেকোয়েনসেকে ধরা হচ্ছিলো উঠতি ব্রাজিলিয়ান পরাশক্তি হিসেবে। নিজেদের নামের সুবিচার করতে এবারও কোপা সুদামেরিকানায় কোয়ালিফাই করেছিলো তারা। শেষ ষোলতে, আর্জেন্টাইন পরাশক্তি ইনদিপেনদেন্তের বিপক্ষে দুই লেগেই ০-০ ড্র’য়ের পর, ঘরের মাঠে দর্শকদের গর্জনের সামনে পেনাল্টি শ্যুটআউটে কোয়ার্টার নিশ্চিত করেছিলো সবুজ জার্সির এই দলটি। সেদিনের সেই টাইব্রেকারে, দলের জয় নিশ্চিত করা ২২ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড থিয়াগুইনহোও রয়েছেন মারা যাওয়া ৭৬ জনের মধ্যে, যার স্ত্রীগ্র্যাজিয়েলে আবার নিজেদের প্রথম সন্তানকে গর্ভে নিয়ে দিন পার করছেন!

কোয়ার্টার ফাইনালের প্রতিপক্ষ কলম্বিয়ান ক্লাব জুনিয়র দে ব্যারেনকুইলার মাঠে প্রথম লেগে, শ্যাপেকোয়েনসদের ১-০ গোলের হারে অনেকেই ভেবেছিলেন রূপকথার জন্ম এবারও হয়তো হবে না! কিন্তু ঘরের মাঠে অদম্য দলটি, ঝড়বৃষ্টির মাঝে হওয়া পরের লেগ জিতে নিলো ৩-০ ব্যবধানে।
সেমিতে, দক্ষিণ আমেরিকার আরেক পরাশক্তি স্যান লরেঞ্জের মাঠে ১-১ গোলের ড্র এবং নিজেদের মাঠে ০-০ গোলে তাদের রুখে দিয়ে ‘ক্লাবের ইতিহাসে প্রথম’বারের মত মহাদেশীয় প্রতিযোগীতার ফাইনালে নাম লেখায় শ্যাপে’রা, যারা কিনা মাত্র ৭ বছর আগেও খেলতো চতুর্থ বিভাগে!
সেমিফাইনালে চীনের প্রাচীর হয়ে ওঠা ৩১ বছর বয়সী গোলকিপার দানিলো শ্যাপেকোয়েনসে যোগ দিয়েছিলেন ২০১৩ তে। দ্বিতীয় লেগের রাতে, মরিয়া হয়ে ওঠা সান লরেঞ্জো ফরোয়ার্ডদের একের পর এক গোলবঞ্চিত রেখে এবং শেষ মিনিটে পয়েন্ট ব্লাংক রেঞ্জে একটি দুর্দান্ত সেইভ করে জয়ের মূল নায়ক হয়েছিলেন ওই দানিলো। বিমানের ধ্বংসস্তূপ থেকে তাঁকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা গেলেও, বাঁচানো যায় নি শেষ পর্যন্ত! ওপারে পাড়ি জমানো দলটিকে সম্পূর্ণ করতেই যেন এপারের মায়া ছাড়লেন এই গোলকিপার!
শ্যাপেকোয়েনসের শেষ ম্যাচ ছিলো এই রবিবারেই, শিরোপাপ্রত্যাশী দল পালমেইরাসের মাঠে। লীগ শিরোপা নিশ্চিত করতে একটি পয়েন্ট লাগতো পালমেইরাসের, কিন্তু ছেড়ে কথা বলে নি শ্যাপে’রা। দারুণ লড়াইয়ের পরে যদিও জয়টা ১-০ গোলে পালমেইরাসেরই হয়েছে, তবুও প্রতিপক্ষ শিবিরের প্রশংসার জোয়ারে ভেসেছে শ্যাপেকো’র দলটি। অ্যালিয়েঞ্জ পার্কে স্টেডিয়ামে চ্যাম্পিয়নের আনন্দে মেতে ওঠা পালমেইরাস ভক্তরা, বুধবারে হতে যাওয়া কোপা সুদামেরিকানা ফাইনালের প্রথম লেগের জন্য শুভকামনা আর সমর্থন জানাতে ভুলেন নি শ্যাপোয়েনসে কোচের কাছে।
ক্লাবের বয়স খুব বেশী না হওয়া স্বত্তেও, শ্যাপেকোয়েনসে পরিণত হয়েছিলো ব্রাজিলিয়ানদের অন্যতম আবেগের নামে। শ্যাপেকো শহরে অন্য কোন ফুটবল ক্লাব না থাকায়, সরাসরি কোন বড় রাইভাল তাদের ছিলো না। তবে খুব অল্প সময়ে একের পর এক চমক দেখিয়ে চলা দলটির ঘরের মাঠ এরিনা কোন্দা’কে সমীহ করতো যেকোন বড় প্রতিপক্ষই! আর রূপকথার মত উত্থান পুরো ব্রাজিলেই তাদের অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী আর সমর্থক বানিয়েছিলো। কোপা সুদামেরিকানার ফাইনালে তাই দেশের বড় সমর্থনই পেতেন তারা। কলম্বিয়ান ক্লাব অ্যাতলেতিকো ন্যাশিওনালের মাঠে ফাইনালের প্রথম লেগ খেলার উদ্দেশ্যে ছিলো বিমানযাত্রাটি! কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিণামে পুড়ে ছাই হতে হলো পুরো দলটিকেই। প্রতিপক্ষ অ্যাতলেতিকো ন্যাশিওনাল অবশ্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছে, শ্যাপেকোয়েনসে’কে কোপা সুদামেরিকানার চ্যাম্পিয়ন ঘোষণার মাধ্যমে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী’ করে রাখতে। মৃত খেলোয়াড়-কোচ-কর্মকর্তা-সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে সম্মান জানাতে,ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (সিবিএফ) তাদের ঘরোয়া ফুটবল কাপকে স্থগিত করেছে অনির্দিষ্টকালের জন্য।
রূপকথার অনবদ্য নিদর্শন হয়ে উঠতে থাকা দলটির এমন নির্মম পরিণতি শুধু ক্ষতিই করে নি ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে, কাঁদাচ্ছে পুরো ফুটবলবিশ্বকেও।

মূল : জীবন থেকে নেয়া

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

9 − nine =