কাতেনাচ্চিও : বিশ্ব কাঁপানো ট্যাকটিকস ও এক হেলেনিও হেরেরার কথা

এখন কোন দল অতিরিক্ত ডিফেন্সিভ খেললে, শুধুমাত্র গোল না খাওয়ার উদ্দেশ্যে পুরা নব্বই মিনিট বিরক্তিকর খেলা খেললে সে স্টাইলকে প্রায় সবাই চোখ বন্ধ করে ‘কাতেনাচ্চিও’ বলে। আধুনিক যুগে এই ট্যাকটিকসের আরো একটা গালভরা নামও হয়েছে বেশ – “পার্ক দ্য বাস”। মানে নিজের গোলপোস্টের সামনে বাস পার্ক করলে গোলপোস্ট যেরকম অভেদ্য থাকবে সেরকম অভেদ্য করে তোলা নিজের গোলপোস্টকে, দলের আর বাকীসব খেলোয়াড়কে দিয়ে ডিফেন্ড করিয়ে। হালের হোসে মরিনহো থেকে শুরু করে ইংলিশ ম্যানেজার স্যাম অ্যালার্ডাইস, টোনি পিউলিস, ফরাসী ম্যানেজার ক্লদে পুয়েল – সবাই-ই এই পার্ক দ্য বাস বা কাতেনাচ্চিওর অভিযোগে অভিযুক্ত। কোনরকমে একটা দুটো গোল করে বাকী ম্যাচ নাকমুখ খিঁচে ডিফেন্স করা আরকি।

নাকমুখ খিঁচে ডিফেন্স করাকে কাতেনাচ্চিও ট্যাকটিকস বলে অভিযুক্ত করা হলেও, আমরা কিন্তু জানিনা কাতেনাচ্চিওকে শুধুমাত্র নাকমুখ বন্ধ করে ডিফেন্স করার ট্যাকটিকস হিসেবে আখ্যায়িত করাটা কত মস্তবড় একটা ভুল! ভুল কেন? সেটার সুলুক সন্ধান করতে যেতে হবে প্রায় ছয়-সাত যুগ পেছনে।

তৎকালীন উনিশশ’ তিরিশের দশকে সুইজারল্যান্ডের এক আধাপেশাদার ফুটবল ক্লাব ছিল, নাম সারভেত্তে। এই সারভেত্তের কোচ ছিলেন কার্ল রাপ্পান বলে অস্ট্রিয়ান একজন ভদ্রলোক। সারভেত্তের ফুটবলাররা আধাপেশাদার/অপেশাদার হবার কারণে সেসব পেশাদার ফুটবলারদের বিপক্ষে ঠিক পেরে উঠতে পারতেন না। আধাপেশাদার ক্লাব হলেও সারভেত্তেকে প্রায়ই পেশাদার ক্লাবের বিপক্ষে খেলতে হত, পেশাদার ফুটবলাররা সারভেত্তের বিপক্ষে খেলতে এসে তাদের গোলবন্যায় ভাসিয়ে দিয়ে যেতেন। কার্ল রাপ্পান দেখলেন, পেশাদার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নূন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে হলে এমন এক ট্যাকটিকসের উদ্ভাবন করতে হবে, যে ট্যাকটিক্স মাঠে প্রয়োগ করার জন্য পেশাদার ফুটবলারের দরকার নেই, আবার পেশাদার প্রতিপক্ষদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও গড়ে তোলা যাবে এই ট্যাকটিকসের মাধ্যমে। কিভাবে গড়বেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা? সফলভাবে ডিফেন্ড করে কাউন্টার-অ্যাটাকে গোল করে ম্যাচ জেতা। ট্যাকটিকসটার নাম তিনি দিলেন “সুইস ভেরৌ”। সুইস ভাষার ‘ভেরৌ’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হল “দরজার কড়া (Swiss verrou/Door bolt)”। সে সময়ে ম্যান মার্কিং ট্যাকটিকসের জয়জয়কার থাকলেও এই সুইস ভেরৌ সিস্টেমই প্রথম জোনাল মার্কিং এর ধারণাটাকে সবার সামনে নিয়ে আসে। আর এই সুইস ভেরৌ সিস্টেমে ছিল জোনাল মার্কিন আর ম্যান মার্কিংয়ের একটা সমন্বয়। যারা জানেন না তাদের জন্য বলে রাখা ভালো, ম্যান মার্কিংয়ের অর্থ হল প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে কঠোরভাবে মার্ক করা যাতে উক্ত খেলোয়াড় নিজের খেলাটা ঠিকমত খেলতে না পারেন, আর জোনাল মার্কিংয়ের অর্থ হল মাঠের কোন একটা নির্দিষ্ট পজিশানে মার্ক/ডিফেন্ড করা যেন ঐ পজিশানে কোন খেলোয়াড় আসলে বল নিয়ে বেরোতে না পারে।

সাধারণত সারভেত্তে দুইজন ডিফেন্ডার নিয়ে খেলত, ম্যান মার্কিং সিস্টেমে। রাপ্পান ঐ তিনজন ডিফেন্ডারের পেছনে আরো একজন ডিফেন্ডার ঢুকিয়ে দিলেন, যার কাজই হল কোনভাবে যদি প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় দুজনের ডিফেন্স গলে বের হয়ে আসতে পারেন তাকে আটকানো। পেছনে থাকা ঐ একজন ডিফেন্ডারের উপরে কোন নির্দিষ্ট একজনকে মার্ক করার দায়িত্ব থাকত না – অর্থাৎ সামনে থাকা দুজন ডিফেন্ডারের মত সে ম্যান মার্কিং করতোনা। তাঁর দায়িত্ব ছিল জোনাল মার্কিংয়ের। দুই ডিফেন্ডারের ফাঁক গলে গোলরক্ষকের সামনে প্রতিপক্ষের কোন খেলোয়াড় চলে আসলে তাকে আটকানো ছিল ঐ একজন ডিফেন্ডারের কাজ। অর্থাৎ দুইজন ডিফেন্ডার আর গোলরক্ষকের মধ্যে যে জায়গা বা ‘জোন’ ছিল সেই জায়গাতে জোনাল মার্কিং করতো উক্ত একজন অতিরিক্ত ডিফেন্ডার। এবং এই ডিফেন্ডারকে বল পায়ে যথেষ্ট পটু হতে হত যাতে সে পেছন থেকে আক্রমণ গড়ে তুলতে পারে। এই পজিশানটার নাম পরে হয়ে গেল “লিবেরো” বা “সুইপার”। অর্থাৎ দুই ডিফেন্ডারের ফাঁক গলে চলে আসা খেলোয়াড়কে সুইপ করে সরিয়ে দিতে হয় দেখে এই পজিশানটার এমন নাম।

এই সুইস ভেরৌ ট্যাকটিকস থেকেই, বা ‘লিবেরো’ এর এই ধারণা থেকেই মূলত কাতেনাচ্চিওর জন্ম।

বলা বাহুল্য, এই সুইস ভেরৌ সিস্টেম অত্যন্ত কার্যকরী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল, কার্ল রাপ্পান এই ট্যাকটিকস প্রয়োগ করে বেশ সাফল্য পান, সারভেত্তের হয়ে টানা দুইবার সুইস লিগ জেতেন তিনি। এমনকি ১৯৩৮ বিশ্বকাপের আগে সুইজারল্যান্ড জাতীয় দলের কোচও হয়ে যান তিনি এই ট্যাকটিকসের সুবাদে! এই ট্যাকটিকস প্রয়োগ করে রাপ্পান তাঁর সুইস দল নিয়ে ১৯৩৮ বিশ্বকাপের কিছু আগে ইংল্যান্ডকে হারান, আর ১৯৩৮ বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে জার্মানিকে হারিয়ে জার্মানদের প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় করে দেন তিনি! দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে সুইস ভেরৌ ট্যাকটিকসের সুনাম।

সুইজারল্যান্ড ছাড়িয়ে এই ট্যাকটিকসের প্রভাব পড়া শুরু হয় ইতালিতে, মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। ইতালিয়ান দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব সালেরনিতানার কোচ জিউসেপ্পে ভিয়ানি সর্বপ্রথম এই ডিফেন্সে অতিরিক্ত একজন খেলানোর আইডিয়াটার সার্থক প্রয়োগ ঘটান, ফলে ১৯৪৭ সালে সালেরনিতানা ইতালির প্রথম বিভাগে উঠে আসে। সুইসে ভেরৌ এর ধারণা থেকে উদ্বুদ্ধ হন আরেক ইতালিয়ান কোচ, নেরেও রোক্কো। ইতালিয়ান ক্লাব ট্রিয়েস্টিনার কোচ থাকার সময় তিনি সফলভাবে অতিরিক্ত একজন ডিফেন্ডারের ব্যবহার করে লিগের রানার্সআপ হয়ে যান তিনি। পরে পাদোভা আর এসি মিলানের কোচ থাকার সময়েও এই ট্যাকটিকসের ব্যবহার করেন তিনি।

ভিয়ানি কিংবা রোক্কো যখন ইতালিয়ান ফুটবলে আস্তে আস্তে সুইস ভেরৌ সিস্টেমের প্রয়োগ করা শুরু করলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সেই সময়ে ফরাসী লিগে একজন ডিফেন্ডার খেলতেন। আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে স্প্যানিশ পিতামাতার ঔরসে জন্ম নেওয়া সেই ছেলেটা একদম ছোটবেলাতেই মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কাতে চলে এসে ফুটবল খেলা শুরু করে দিয়েছিলেন। মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কা তখন ছিল ফ্রান্সের একটা উপনিবেশ, ছিল সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার উর্বরভূমি। আরসি কাসাব্লাঙ্কার হয়ে খেলতে খেলতে ফরাসী ক্লাব সিএএসজি প্যারিসের স্কাউটদের নজরে পড়েন তিনি, ফলে পাড়ি জমান ফ্রান্সে। পরে ফ্রান্সের খেলোয়াড়ি জীবনের বাকীটা কাটিয়ে দেন সিএএসজি প্যারিস, স্টাডে ফ্র্যাঙ্কাই, শার্লভিল, এক্সেলসিওর রুবোঁ, রেড স্টার অলিম্পিক, পুতোঁ – প্রভৃতি ক্লাবে খেলে। হাঁটুর ইনজুরির কারণে আটাশ বছর বয়সেই খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টেনে ম্যানেজেরিয়াল ক্যারিয়ার শুরু করেন তিনি। বিশ্ব পেল এক তুখোড় ট্যাকটিক্যাল মস্তিষ্কের ম্যানেজারকে।

তাঁর নাম ছিল হেলেনিও হেরেরা গ্যাভিলান। স্প্যানিশ বাবা-মা, আর্জেন্টিনায় জন্ম, ছোটবেলায় মরক্কোতে আসা, পরে ক্লাব ফুটবল খেলতে ফ্রান্সে যাওয়া এবং পরবর্তীতে স্পেইন ও ইতালিতে নিজেকে অন্যতম সেরা ম্যানেজার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এই হেলেনিও হেরেরা সত্যিকার অর্থেই ছিলেন একজন বিশ্বনাগরিক। অনবরত বলতে পারতেন স্প্যানিশ, আরবি, ইতালিয়ান, ইংলিশ ও ফরাসী ভাষা – কখনো কখনো এক বাক্যেই সবগুলো ভাষার প্রয়োগ ঘটাতে পারতেন তিনি!

ছোটবেলা থেকেই বেশ আত্মকেন্দ্রিক ও কড়া নিয়ম-কানুন-অনুশাসনের অনুসারী ছিলেন তিনি। ফুটবলে সাফল্য অর্জন করতে হলে যে একটা দল হয়ে খেলাটা কত গুরুত্বপূর্ণ সেটা তিনি বুঝতেন। এ কারণে কোন খেলোয়াড় যদি সুপারস্টার হন, বলে তিনি কখনই কোন খেলোয়াড়কে বাকী দশজনের থেকে আলাদা করে দেখেননি, আলাদা করে খাতির করেননি। ফ্রান্সে কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করা হেরেরা স্পেইনে আসেন রিয়াল ভ্যালাদোলিদের কোচ হয়ে, সেখান থেকে রিয়াল-বার্সার দ্বৈরথের মধ্যে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের ম্যানেজার হয়ে টানা দুইবার লিগ জিতে দেখান তিনি যেন-তেন কোন ম্যানেজার নন। অ্যাটলেটিকোর পর টানা দুইবার লিগ জিতে বার্সেলোনা, তারপর থেকে শুরু হয় অ্যালফ্রেডো ডি স্টেফানো-ফেরেঙ্ক পুসকাস-প্যাকো জেন্টোর সর্বজয়ী রিয়াল মাদ্রিদের যুগ। মূলত ১৯৫৩ সালে অ্যালফ্রেডো ডি স্টেফানোকে দলে টানার পর থেকেই টানা তিনবার ইউরোপিয়ান কাপ (পরে আরো দুইবার টানা এই ট্রফিটা জেতে তারা, অর্থাৎ টানা পাঁচবার জেতা হয় ট্রফিটা তাদের) আর তিনবার লিগ জেতে রিয়াল মাদ্রিদ। তাদের সিংহাসন থেকে হটানোর অভিপ্রায়ে বার্সেলোনা ১৯৫৮ সালে হেলেনিও হেরেরাকে কোচ করে নিয়ে আসে।

হেরেরা এসে দেখলেন বার্সা দলটায় প্রতিভা ও সুপারস্টারের (তখন বার্সায় খেলতেন লাজলো কুবালা, স্যান্দর ককসিস, জোলতান জিবোর, লুইস সুয়ারেজের মত তারকারা) অভাব না থাকলেও খেলোয়াড়দের মানসিকতায় অনেক বড় একটা সমস্যা ছিল। তারা মনের মধ্যেই রিয়াল মাদ্রিদের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেয়েছিলেন, রিয়াল মাদ্রিদকে সিংহাসন থেকে সরানো সম্ভব না – এটা ভেবে নিয়েছিলেন তারা। খেলোয়াড়দের এই মানসিক বাধা দূর করার জন্য কাজ করা শুরু করে দিলেন হেরেরা।

শুরু হল মিলিটারি স্টাইলে ট্রেনিং। দিনে চার-পাঁচ ঘন্টা করে ট্রেনিং হওয়া শুরু হল, তিন সেশনের ট্রেনিং। দেখা গেলো বার্সার খেলোয়াড়রা ট্রেনিং করতে করতে বমি করে ফেলছেন, তাও হেরেরার কোন বিকার নেই। দেখা গেল কোন এক খেলোয়াড়ের হাত ভাঙ্গা, হাতে প্লাস্টার করে এসে হেরেরাকে বলতে এসেছেন ট্রেনিং করতে না পারার কথা, হেরেরা ক্ষিপ্ত হয়ে হাতের প্লাস্টারটা ছিঁড়ে ফেলে দিলেন! যত যাই হোক না কেন, ট্রেনিং এর ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজী ছিলেন না হেলেনিও হেরেরা।

তবে যত যাই হোক না কেন, খেলোয়াড়দের মনস্তত্ব বুঝে তাদের কাছ থেকে সেরাটা আদায় করে নিয়ে আসা, যেভাবেই হোক প্রতিপক্ষের কাছ থেকে জয় ছিনিয়ে নিয়ে আসা – এখনকার ম্যানেজারদের এসব গুণাবলির শুরুটা হয়েছিল কিন্তু এই হেলেনিও হেরেরার হাত ধরেই। নিজের প্রত্যেকটা খেলোয়াড়ের খুঁটিনাটি লিপিবদ্ধ করে রাখতেন তিনি বিভিন্ন ফাইলে। যখনই প্রতিপক্ষের মাঠে খেলতে যেতেন, খেলোয়াড়েরা মাঠে নামার আগে তিনিই প্রথমে মাঠে নেমে গোটা মাঠ চক্কর দিতেন। কারণ? প্রতিপক্ষ সমর্থকেরা প্রথমেই হেরেরাকে দেখে গলা ফাটিয়ে দুয়ো দিত, পরে হেরেরার খেলোয়াড়েরা মাঠে নামলে আর প্রতিপক্ষ দর্শকদের দুয়ো দেওয়ার শক্তি অবশিষ্ট থাকত না! বার্সেলোনার ম্যানেজার থাকার সময় একবার সুপারস্টার খেলোয়াড় জোলতান জিবোর প্রতিপক্ষের মাঠে গিয়ে একটা সফরে খেলতে চাইলেন না। কেননা পরিবার-পরিজন বাদ দিয়ে দূরে খেলতে যেতে মন চাইছিলো না তাঁর। হেরেরা তাঁকে বললেন, জিবোর যদি প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করতে পারেন তাহলে তাঁকে ঐ ম্যাচের পর ছুটি দিয়ে বাসায় পরিবারের কাছে পাঠানো হবে। বলা বাহুল্য, জিবোর প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করেন। হেরেরা বিশ্বাস করতেন, স্কোয়াডের প্রত্যেকটা খেলোয়াড়কে একই গৎবাঁধা কথা বলে অনুপ্রাণিত করা যাবেনা। বার্সেলোনার কোচ যখন ছিলেন তখন কাতালান প্রদেশের স্থানীয় খেলোয়াড়দেরকে উদ্বুদ্ধ করতেন কাতালান জাতীয়তার কথা বলে, কাতালানের জার্সি পরে খেলাটা কতটা গৌরবের – সে কথা বলে। কিন্তু বার্সেলোনার বিদেশী খেলোয়াড়দের তো এই কথা বলে অনুপ্রাণিত করা যাবেনা, তিনি জানতেন। তাই বিদেশী খেলোয়াড়দের লোভ দেখাতেন অর্থকড়ির! ভালো খেললে যে কত বেশী টাকা তারা উপার্জন করতে পারবে পরিবার-পরিজনদের জন্য – সেটার লোভ দেখাতেন! অর্থাৎ খেলোয়াড়দের মনস্তত্ব বুঝে তাদের আলাদা আলাদাভাবে অনুপ্রাণিত করার বিষয়টা তিনিই শুরু করেছিলেন প্রথম! দলের সুপারস্টার লুইস সুয়ারেজ মনে করতেন ম্যাচের আগের রাতে ডিনারের সময় যদি কারোর হাত থেকে গ্লাসের পানি পড়ে যায় তবে পরদিন ম্যাচে তিনি ভালো খেলবেন, এই উদ্ভট কুসংস্কারটা জানার পর কোচ হেরেরা প্রত্যেকটা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগের রাতে টিম ডিনারের সময় ইচ্ছা করে হাত থেকে গ্লাস ভরা পানি হাত থেকে ফেলতে শুরু করলেন! জেতার জন্য এতটাই মরিয়া ছিলেন তিনি!

বার্সার হয়ে দুবার লিগ আর দুবার ইন্টার সিটি ফেয়ার্স কাপ (এখনকার ইউরোপা লিগ) জিতে মাদ্রিদের আধিপত্য সামান্য খর্ব করতে পারলেও হেলেনিও হেরেরাকে বার্সা ছাড়তে হয় মূলত দুটো কারণে। এক – ইউরোপিয়ান কাপ বা তৎকালীন চ্যাম্পিয়নস লিগে রিয়াল মাদ্রিদের আধিপত্য খর্ব করতে না পারা, এবং দুই – দলের সুপারস্টার স্ট্রাইকার লাজলো কুবালার সাথে বিবাদে জড়ানো। ফুটবল ইতিহাসে হেরেরাই প্রথম কোচ যিনি কিনা খেলোয়াড়ের চেয়ে দল বড়, জেতার জন্য একটা সুস্থ্-নিয়মতান্ত্রিক খেলোয়াড়ি জীবনযাপন করা উচিত – এসব ধারণার প্রয়োগ ঘটান। খেলোয়াড়দের ফিটনেস কিরকম থাকা উচিত, কিভাবে জীবনযাপন করলে খেলোয়াড়েরা সেই ফিটনেস লেভেলটা ধরে রাখতে পারবেন, সেসব নিয়ে কড়াকড়ি সর্বপ্রথম এই হেরেরাই শুরু করেন। এদিকে ১৯৫২ ও ১৯৫৩ সালে জোড়া লিগ জেতানোয় বার্সাকে সহায়তা করা সুপারস্টার স্ট্রাইকার লাজলো কুবালার জীবনযাত্রা ছিল অনিয়ন্ত্রিত। প্রচুর মদ্যপান করতেন, মদ্যপ অবস্থায় সকালে ট্রেনিং-এ চলে আসতেন ; স্বভাবতই এসব পছন্দ হত না হেলেনিও হেরেরার। তাছাড়া বার্সেলোনার কাতালান জনগণ লাজলো কুবালাকে দেবতার মত সম্মান করতেন। এটা হেরেরার ভাল্লাগতো না। ১৯৫৯-৬০ ইউরোপিয়ান কাপের সেমিফাইনালে বার্সেলোনা মুখোমুখি হয় রিয়াল মাদ্রিদের, যেখানে হেলেনিও হেরেরা লাজলো কুবালাকে খেলাননি, ফলে যা হবার তাই হল, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মাদ্রিদের কাছে দুই লেগ মিলিয়ে ৬-২ গোলের ব্যবধানে হেরে বসে বার্সা। পরদিন রাস্তায় কিছু সমর্থকের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন হেরেরা – ফলে সে মৌসুমে বার্সাকে লা লিগা জিতিয়েও ক্লাব ছাড়েন তিনি।

ধান ভানতে শিবের গীত কি, শিবের পুরো কনসার্টই শুরু করে দিলাম দেখা যাচ্ছে! চেয়েছিলাম কাতেনাচ্চিও নিয়ে লিখতে, এতদূর বলার পরেও ট্যাকটিকস নিয়ে এক বর্ণও লিখিনি! যাই হোক, এবার আস্তে আস্তে শুরু করছি।

যাইহোক, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ, সেভিয়া, বার্সেলোনা – ইন্টার মিলানে যাওয়ার আগ পর্যন্ত হেলেনিও হেরেরা যে দলের ম্যানেজারই হয়েছেন, প্রত্যেক দলকে ২-৩-৫ ফর্মেশানে অতি আক্রমণাত্মক দৃষ্টিনন্দন ফুটবল খেলাতেন। ইন্টার মিলানে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ম্যানেজার হিসেবে ১৯৬০ সালে যখন বার্সেলোনা থেকে যোগ দিলেন, প্রথম দুই মৌসুমও আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়েই বসেছিলেন হেরেরা। সে প্রথম দুই মৌসুমে ইন্টার মিলান একবার হয় লিগে তৃতীয়, একবার হয় দ্বিতীয়। বার্সেলোনার কোচ হয়ে আসার সময় বার্সাকে যেরকম পেয়েছিলেন হেরেরা, ইন্টারকেও ঠিক তেমনটাই পেলেন। ১৯৫৪ সালে শেষবার লিগ জেতা ইন্টার মিলান তখন হন্য হয়ে লিগের সেরা হবার পথ খুঁজছিল। লিগের সেরা হবার জন্য হেরেরার হাতেই দায়িত্ব সঁপে দেয় তারা।

শুরু হল মিলিটারি স্টাইলে খেলোয়াড়দের কোচিং করানো। খেলোয়াড়দের মধ্যে নিয়মানুবর্তিতা ও শৃংখলা ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য সম্ভাব্য সবকিছুই করা শুরু করলেন হেরেরা। দলের চেয়ে কোন খেলোয়াড় বড় – কখনোই মানতেন না। তাও প্রথম দুই মৌসুমে শিরোপা আসলোনা। প্রেসিডেন্ট অ্যাঞ্জেলো মোরাত্তি বিরক্ত হয়ে গেলেন, স্বাভাবিকভাবেই। যে কোচকে এত দাম দিয়ে আনা হয়েছে লিগ খরা ঘোচানোর জন্য, সে কোচকে দিয়েও কাজ না হলে যে কেউই বিরক্ত হবে। দুই মৌসুম পর গুঞ্জন শুরু হল, ছাঁটাই করা হতে পারে হেরেরাকে।

দুই মৌসুমে আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়ে গোলবন্যা বইয়ে দিলেও শিরোপা যখন আসলো না, তখনই হেরেরার মাথায় সেই তুখোড় চিন্তাটা খেলে গেল। যে চিন্তাটা পরবর্তীতে গোটা ফুটবল বিশ্বকেই বদলে দেয়। কার্ল রাপ্পানের সেই বিখ্যাত সুইস ভেরৌ এর আদলে নিজে একটা আলাদা ফর্মেশান, একটা আলাদা ট্যাকটিকস সৃষ্টি করলেন হেরেরা। সুইস ভেরৌ এর মত এই ফর্মেশানেও থাকবেন একজন লিবেরো – অর্থাৎ দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারের মাঝখানে আরেকজন অতিরিক্ত ডিফেন্ডার, যিনি উক্ত দুই ডিফেন্ডারের ফাঁক গলে চলে আসা বল কে ‘সুইপ’ করবেন, বা ক্লিয়ার করবেন। বার্সেলোনা থেকে কোচের পিছু পিছু ইন্টার মিলানে চলে আসা ব্যালন ডি অর জয়ী কিংবদন্তী স্প্যানিশ প্লেমেকার লুইস সুয়ারেজকে দেওয়া হল Deep Lying Playmaker/Regista এর ভূমিকা, যার কাজই হবে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে বসে বসে নিখুঁত লং পাস/লং বল দেওয়া। এই ট্যাকটিকসের নাম হয়ে গেল কাতেনাচ্চিও।

মূলত ৪-২-৪ বা ৩-৫-২ ফর্মেশানে হেলেনিও হেরেরা প্রয়োগ ঘটাতেন তাঁর ক্যাতেনাচ্চিওর। গোলরক্ষক গিলিয়ানো সার্তির সামনে দুই সেন্টারব্যাক হিসেবে খেলতেন তার্চিসিও বুর্গনিচ আর আরিস্তিদে গুয়ার্নেরি, তাদের ভেতরে লিবেরো (তৃতীয় সেন্টারব্যাক) হিসেবে ভূমিকা পালন করতেন আরমান্দো পিচ্চি। পিচ্চির উপরে অন্যান্য দুই সেন্টারব্যাকের মত ম্যান মার্কিং এর দায়িত্ব থাকত না, অন্যান্য দুই সেন্টারব্যাকের তুলনায় পিচ্চি ছিলেন বল পায়ে অত্যন্ত দক্ষ। এখনকার যুগে লিওনার্দো বোনুচ্চি, টোবি অল্ডারওয়াইরেল্ড কিংবা জেরার্ড পিকেরা যেরকম বল পায়ে একেবারে ডিফেন্স থেকেই ছোট ছোট পাস দিয়ে আক্রমণ রচনা করতে পারতেন, আরমান্দো পিচ্চি ছিলেন সেরকমই বল-প্লেয়িং একজন ডিফেন্ডার। ইন্টারের আক্রমণ শুরু হত এই পিচ্চিকে দিয়েই। দুইদিকে দুই উইংব্যাক হিসেবে ডানদিকে থাকতেন ব্রাজিলিয়ান উইংব্যাক হাইর আর বামদিকে ইতালিয়ান কিংবদন্তী জিয়াচিন্তো ফাচেত্তি। ফাচেত্তি আর হাইর খুব সম্ভবত ফুটবল ইতিহাসের প্রথম ফুলব্যাক যাদের উপর আক্রমণের দায়িত্ব থাকত, অনেকটা আজকের যুগের কাফু-রবার্তো কার্লোস, দানি আলভেস-মার্সেলো এদের মত। ইন্টারের হয়ে ৪৫০ এরও বেশী ম্যাচে ৫৯ গোল করে এক ফাচেত্তিই তো যুগের পর যুগ নতুন খেলোয়াড়দের অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন ফুলব্যাক হবার জন্য, ফুলব্যাক হয়েও যে সুপারস্টার হওয়া যায়, এই পথ তো হাইর-ফাচেত্তি এদেরই বাতলানো!

যাই হোক, ডিফেন্সের ঠিক সামনে প্লেমেকার হিসেবে খেলতেন লুইস সুয়ারেজ, তাঁর দায়িত্ব ছিল নিখুঁত লং পাস দেওয়া। পাশে থাকা মিডফিল্ডার জিয়ানফ্রাঙ্কো বেদিনের ভূমিকাটা ছিল অনেকটা এখনকার ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের মত। ট্যাকল ইন্টারসেপ্ট করে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নিতেন, বেদিনের কাছ থেকে বল নিয়েই লুইস সুয়ারেজ আক্রমণ রচনা করতেন। বামদিকে প্রথাগত লেফট উইঙ্গার হিসেবে খেলতে ড্রিবলে অত্যন্ত দক্ষ মারিও করসো, তাঁর পাশেই খেলতেন কিংবদন্তী ইতালিয়ান স্ট্রাইকার স্যান্দ্রো মাজোলা। মাজোলা ছিলেন সেই যুগের ফ্যান্তাসিস্তা/সাপোর্টিং স্ট্রাইকার/সহকারী স্ট্রাইকার/দ্বিতীয় স্ট্রাইকার, পরে ফ্র্যান্সেসকো টট্টি/রবার্তো ব্যাজিও/অ্যালেসান্দ্রো দেল পিয়েরোর মত খেলোয়াড়েরা যে পজিশানে খেলে বিখ্যাত হয়েছেন আরকি, মূল স্ট্রাইকারের একটু পেছনে। এই পজিশানে খেলার জন্য যতটুকু ট্যাকটিকাল দক্ষতা ও প্রতিভার প্রয়োজন ছিল, সেটা মাজোলার প্রচুর ছিল। আর মাজোলার সামনে টার্গেটম্যান হিসেবে খেলতেন হোয়াক্যুইন পিয়েরো বা অরেলিও মিলানি। হেরেরার কাতেনাচ্চিও সফল হবার পিছনে যে কয়জন খেলোয়াড়ের মূল ভূমিকা ছিল, তারা হলেন পিচ্চি, হাইর, ফাচেত্তি, সুয়ারেজ ও মাজোলা। তারাই মূলত গোটা দলের খেলাটাকে নিয়ন্ত্রণ করতেন, তারা ভালো খেললেই অন্যরা ভালো খেলতেন।

যেটা একটু আগে বললাম, আরমান্দো পিচ্চির উপর ম্যান মার্কিংয়ের কোন দায়িত্ব ছিল না, তাঁর দায়িত্ব ছিল জোনাল মার্কিংয়ের। দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার বুর্গনিচ ও গুয়ার্নেরির মাঝে একটু পিছনে যতটুকু ‘জোন’ বা জায়গা আছে, সেটা কভার করতেন পিচ্চি। পিচ্চির বল প্লেয়িং দক্ষতা এতটাই ভালো ছিল মাঝে মাঝে গুয়ার্নেরি আর বুর্গনিচ নিজেদের মধ্যে ফাঁক বাড়িয়ে দুইজন প্রায় ফুলব্যাক হয়ে যেতেন, কারণ তাদের মধ্যে পিচ্চি তো আছেনই বল ফাঁক গলে চলে গেলে সেটা সামলানোর জন্য। পিচ্চিকে মাঝে রেখে বুর্গনিচ ও গুয়ার্নেরি দুইপাশে চলে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশী উপকার হত দুই উইংব্যাক হাইর ও ফাচেত্তির। কেননা তাদের দুইজনের উপর আক্রমণের দায়িত্ব ছিল, প্রায় সময়ে উপরে উঠে যেতে হত তাদের, তাই তারা উপরে আক্রমণে উঠে গেলে তারা ডিফেন্সে যে ফাঁকটা রেখে যেতে সে জায়গাটুকু তখন কভার করতেন বুর্গনিচ ও গুয়ার্নেরি। অর্থাৎ ডিফেন্স করার সময় বুর্গনিচ আর গুয়ার্নেরির মাঝের ফাঁকটা কম থাকত, দুইদিক থেকে হাইর আর ফাচেত্তিও নেমে আসতেন, কিন্তু আক্রমণের সময় নিজেদের মাঝের ফাঁকটা বাড়িয়ে দিয়ে প্রায় ফুলব্যাক হয়ে যেতেন বুর্গনিচ আর গুয়ার্নেরি, ওদিকে হাইর আর ফাচেত্তিও তখন স্বচ্ছন্দে উপরে উঠে আক্রমণে যোগ দিতে পারতেন।

রক্ষণের সময়
আক্রমণের সময় (বুর্গনিচ ও গুয়ার্নেরির মাঝের ফাঁকটা লক্ষ্য করবেন)

রাইট উইংব্যাক হাইর ও লেফট উইংব্যাক ফাচেত্তির দায়িত্ব ছিল ক্রমাগত মাঠের মধ্যে উপর-নিচ করার, অর্থাৎ, ডিফেন্সের কাছ থেকে বল নিয়ে আক্রমণভাগে যাওয়ার দায়িত্ব ছিল তাদের উপরে – বিশেষত হাইর। আরমান্দো পিচ্চি এহেতু তিনজন ডিফেন্ডারের মধ্যে বল পায়ে বেশী দক্ষ, কাউন্টার-অ্যাটাকের দায়িত্ব অনেকসময় তাঁর উপরেও বর্তানো হত, দেখা যেত তিনি ডিফেন্স থেকে বিশাল বড় একটা লং বল দিলেন, আক্রমণভাগে মাজোলা বা সুয়ারেজ সেটাকে রিসিভ করে সেন্টার ফরোয়ার্ড যে থাকত (হোয়াক্যুইন পিয়েরো) তাঁকে দিতেন গোল করার জন্য, বা সুযোগ থাকলে নিজেরাই গোল করতেন। কোচ হেলেনিও হেরেরার দর্শনই ছিল, বলের পেছনে যখন সেটা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কেউ থাকেনা, তখনই বল মাঠের মধ্যে দৌড়ায় বেশী। ডিফেন্স থেকে প্রতিপক্ষ ডি-বক্সে যাওয়ার জন্য তিনটে পাসের বেশী খরচ করতে আগ্রহী ছিলেন না হেরেরা। ডিফেন্স বা মিডফিল্ড থেকে পিচ্চি বা সুয়ারেজ লং বল দেবেন, সেটা অসাধারণ দক্ষতার সাহায্যে আয়ত্বে আনবেন মাজোলা বা ফাচেত্তি, সেখান থেকে খুব বেশী দরকার হলে আরেকটা পাস দেওয়া হবে গোল করার আগে। ব্যস। এর থেকে বেশী নয়। যত কম সময়ে রক্ষণ থেকে আক্রমণে যাওয়া যায় আরকি।

এখানেই কাতেনাচ্চিওর সাথ “বাস পার্ক” এর মূল পার্থক্য। বাস পার্কের মূল উদ্দেশ্যই হল নাকমুখ খিঁচে ডিফেন্স করা যাতে কোনভাবেই গোল না হয়। পরে ভাগ্যবলে একটা গোল এসে গেলে সেটা প্লাসপয়েন্ট। অর্থাৎ “বাস পার্ক” ট্যাকটিকসে আক্রমণ করার কোন আলাদা পরিকল্পনা নেই। কিন্তু কাতেনাচ্চিওতে আছে, এবং বেশ ভালোভাবেই আছে। কাউন্টার অ্যাটাকে গোল করা কাতেনাচ্চিওর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ, অনেকে এটাকে বাদ দিয়েই বাস পার্কের সাথে কাতেনাচ্চিওকে মিলিয়ে ফেলে তাই। যেটা আসলে ঠিক না। হেরেরা নিজেও বলে গিয়েছেন, “অনেকে কাতেনাচ্চিওকে নকল করার চেষ্টা করেছে, পুনরাবৃত্তি করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু তারা সেটা ভুলভাবে করেছে, কারণ তারা কাতেনাচ্চিও থেকে আক্রমণটাই বাদ দিয়ে দিয়েছে।”

কথাটা কিন্তু একেবারে সত্যি। সে যুগের ইন্টার মিলান ডিফেন্ড করত ঠিকই খুবই কার্যকরভাবে, কিন্তু আক্রমণও করত। তবে এটাও ঠিক, কাতেনাচ্চিওর মূলকথা অবশ্যই ডিফেন্স ছিল। স্যান্দ্রো মাজোলা নিজেই বলেছেন, “ঘরের মাটিতে এরকম অনেক খেলাই আমরা খেলেছি যেখানে দেখা যেত আমাদের দুই সেন্টারব্যাক পিচ্চি আর গুয়ার্নেরি গোটা সময়টায়ই গ্যালারির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সুন্দরী মেয়ে খুঁজে খুঁজে কাটিয়েছে, ম্যাচ শেষে কোন মেয়ের সাথে ডেইটে যাওয়া যায় তার জন্য!” তাহলে বলুন, কাতেনাচ্চিও ট্যাকটিকস দিয়ে শুধুমাত্র যদি ডিফেন্স করাই বোঝাতো, তাহলে দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ সেন্টারব্যাক এত সময় পেতেন গ্যালারীতে সুন্দরী মেয়ে খোঁজার জন্য?

আজকাল একটা ট্রেন্ডই হয়ে দাঁড়িয়েছে অতিরিক্ত ডিফেন্সিভ খেলা হলেই সেই ট্যাকটিকসকে কাতেনাচ্চিও বলা। আসলেই কি তাই? আশা করি পুরো আর্টিকেলটা পড়ার পর একটু হলেও বুঝতে পেরেছেন!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

1 + 1 =