যা যা মনে আছে ২০১১ এর কোপারঃ একটি ফ্ল্যাশব্যাক স্টোরি

স্মরণ অতীতে আর কোন বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের খেলা এতোটা কম দেখেছি মনে পড়ে না । ২০১১ সালের কোপা আমেরিকা । ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি পর্বের সময়ে পড়লো । কোচিং ফাঁকি দিয়ে ব্রাজিলের ম্যাচগুলো দেখেছিলাম আর এর বাইরে এমন কি আর্জেন্টিনার খেলাও দেখতে পারি নি । খেলাটার স্বাগতিক আর্জেন্টিনা হওয়াতে তাদের জন্যে বড় সুযোগ ছিলো ১৯৯৩ সালের পরে প্রথম কোন ট্রফি জেতা । ১৯৯৩ সালে জেতা কোপা আমেরিকাটাই ছিলো আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জেতা কোন টুর্নামেন্ট । অন্যদিকে ব্রাজিলের জন্যে টুর্নামেন্ট ছিলো অনেক প্রশ্নের জবার দেবার টুর্নামেন্ট । মানো মেনেজেসের নতুন দলটা আসলেই কতোটা ভালো সেটা দেখার টুর্নামেন্টও ছিলো এই কোপা আমেরিকা । আগের ৫টি টুর্নামেন্ট (১৯৯৭,১৯৯৯, ২০০১,২০০৪,২০০৭) এর মধ্যে চারটেরই চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল । রোল অব অনারে নিজেদের নামটা দেখতে তো ভালোই লাগে বারবার । সেদিক দিয়ে দেখলে আরেকবার দেখতে পারলে ভালো তো লাগতোই !

ভেনিজুয়েলা আর প্যারাগুয়ে দুটো ম্যাচই ব্রাজিলের গ্রুপ লেভেলে সবচাইতে সহজ মনে করেছিলাম ফিকচার দেখে । আর বাকি ম্যাচটা ছিলো ইকুয়েডরের সাথে । কিন্তু আশ্চর্যভাবে প্রথম ২টা ম্যাচই ড্র করে বসে মেনেজেসের ব্রাজিল । তবে ড্র-তে ড্র-তেও অনেক পার্থক্য । ভেনিজুয়েলা ম্যাচটা গোলশূন্য ড্র হলেও সে ম্যাচটার মত সুন্দর আর দর্শনদারি ফুটবল ব্রাজিল ২০১৩ সালের কনফেড কাপে এতোটা প্রতাপ নিয়ে জিতলেও খেলতে পারে নাই । তবে আমাদের একটা অভ্যাস আছে । কোনকিছু ভালো দেখলেই সবচেয়ে ভালোটার সাথে তুলনা করে ফেলার অভ্যেস । ম্যাচের পরের দিন কোচিং এ গিয়ে কলেজের এক ফ্রেন্ডকে জিজ্ঞাসা করলাম , “কীরে মামা ? খেলা কেমন লাগছে ?”… “মাম্মা ! পুরা সত্তুরের ব্রাজিলরে ! সত্তুরের ব্রাজিল ! “… আমার কলেজের সেই বন্ধুর উত্তরটা এমন ছিলো !

info_1309766260

তবে কি ? তখনকার নেইমারটা এত কার্যকর ছিলো না ! আর মেনেজেসকে যত দেখেছি ততোই লেগেছে , এই লোকের কাছে অপশন বি বলে কিছুই নেই । কোন সিচুয়েশন থেকে কীভাবে বেরোতে হবে সেটা নিয়েও তার চালগুলো কাজ করেই না ! প্যারাগুয়ের সাথে ২-২ গোলের ড্র-র দিন আরো পরিষ্কার হয়ে যায় সেই দলটা একটু ভালো ডিফেন্সের বিরুদ্ধে আসলে ট্যাকটিকালি কতোটা মুখ থুবড়ে পড়ত ! একদম শেষে ফ্রেড গোল করে ড্র ঠিক করায় … তবে সেদিন সেই গা-জোয়ারি ফুটবলের সাথে হাঁসফাঁস করা ব্রাজিলকে দেখেছিলাম । ব্রাজিলের একের পর এক বল কীভাবে ফ্লো হারাচ্ছিলো প্যারাগুয়ের অখ্যাত ডিফেন্সের কাছে সেটাও দেখেছিলাম ।

Brazil+v+Paraguay

নেইমারকে নিয়েও বলার আছে কয়েকটা কথা । ওভাররেটেড , ইউটিউববয় এসব খেতাবগুলি তার নামের সাথে জুড়ে যেতে থাকে আসলে সেই টুর্নামেন্ট থেকে । প্রথমত , নেইমারকে সে সময়টায় দেখেছি সবসময়ই আলাদা কিছু করার চেষ্টা করত ! চোখে লেগে থাকার মতো কয়েকটা মুভ দেখাত মাঝে মাঝে । তা নিয়ে আমরা মেতে উঠতাম ! তবে অতিরিক্ত আর অপ্রয়োজনীয় ড্রিবলিং আর সাথে সাথে ছিলো একা খেলার প্রবণতাটা । প্রচুর বল ছুটে যেত ওর পা থেকে ! দেখতে দারুন বাজে লাগত । আর দ্বিতীয়ত, বয়সের তুলনায় তাকে হাইপটা বেশিই দিয়ে ফেলে ব্রাজিলিয়ান মিডিয়াসহ পুরো ফুটবল মিডিয়া । পৃথিবীর সবচেয়ে সমর্থিত জাতীয় দলের সমর্থকেরা কাকা-দিনহো-ফোনোমেননদের পরে একজন সুপারস্টারের অপেক্ষায় ছিলো ! অনেক বড় স্টার ! তাদের দরকার ছিলো । মিডিয়ার দরকার ছিলো , নিউজ বানানোর জন্যে । আমাদের দরকার ছিলো , পোস্টারবয় বানানোর জন্যে । দুঙ্গার দলে, কাকা তারকা ছিলেন… তবে নিভে নিভে । তাই , সবকিছু মিলিয়েই একজন মেইনম্যান দরকার ছিলো ! মিডিয়া নেইমারকে পায় আর লুফে নেয় । ফলাফল ? ক্যারিয়ারের এই ফেইজটায় নেইমার খুব এক্সট্রা অর্ডিনারি কিছু করার চেষ্টা করলো । নিজের নামের ভার ধরে রাখার জন্যে । সাথে সাথে , অনেকেই মেসির সাথেও তুলনা করা শুরু করে দেয় । আগেও বলেছি , এখনো বলছি , ১৯ বছর বয়সের ছেলেটার জন্যে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো এই ব্যাপারটাই । মেসি তখনো ব্যালন ডি অর উইনার আর নেইমার তখনো ইউরোপেই আসে নি !

নেইমার আর পাতো দুজনেই জোড়া গোল করে দিলো নেক্সট খেলায় ইকুয়েডরের সাথে ! ৪-২ গোলের জয় । গ্রুপে সবার উপরে থেকেই কোয়ার্টারে ব্রাজিল । প্যারাগুয়ের সাথেই আবার কোয়ার্টারে দেখা । ফিকচারের ফর্মেশন ছিলো দারুন অদ্ভুত । তিন গ্রুপ থেকে সেরা দুটো করে দল যাবে … আর সাথে তিন গ্রুপের মধ্যে যেই ২টা গ্রুপের থার্ডপ্লেসধারীর পয়েন্ট বেশি , সেই দল যাবে । তাই , প্যারগুয়ে গ্রুপে থার্ড হয়েও সামনে বাড়লো এবং আমাদের সাথেই আবার দেখা হলো ।

brazil_1948957a

সেই আগের সমস্যা । দল সব জানে , কিন্তু ফাইনাল গোলটা বের করার জন্যে কি করা দরকার সেটা ঠিক জানে না । কেউই ক্লিনিক্যাল না ! তারা যা জানত তা হলো , দুটো পাসে ডি এর সামনে গিয়ে আস্তে করে বল হারিয়ে ফেলা ! দারুন দিশাহীন ব্রাজিল দলকে দেখেছিলাম । সাথে বুঝেছিলাম , ট্রফিটা না জিতলে মানো সাহেবের চাকরি কেউ বাঁচাতে পারবে না । শ্যুট আউটে গেল ম্যাচ । সবগুলো শ্যুট মিস হল । ট্রাইবেকে ০-২তে হেরে কোয়ার্টারেই বিদায় ব্রাজিল । তবে দিনের শেষে খুব গোমড়া করে বসে থাকি নাই মুখ , ঘরের মাঠে উরুগুয়ের সাথে হেরে আর্জেন্টিনাও যে বাদ ! সেই শ্যুট আউটেই । একদম সাথে কলেজের যেই দুইটা ফ্রেন্ড ঘুরত , দুইটাই আর্জেন্টিনা সাপোর্টার । তাদের টিটকিরির জ্বালায় কোচিং এ যাইতে একদম বারোটা বেজে যেত আমি জানি । সাথে সাথে একটা ইন্টারন্যাশনাল ট্রফির জন্যে আর্জেন্টিনার অপেক্ষাটা বড় হলো ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত । ১৯৯৩ থেকে ২০১৫- ২২ বছরের অপেক্ষা । চলছে এখনও !

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

7 − two =