যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে : রজার মিয়া ও বুড়ো হাড়ের ভেলকি

আর মাত্র ৪৫ দিন বাকী। ৪৫ দিন পরেই শুরু হবে বিশ্ব ফুটবলের সর্ববৃহৎ মহাযজ্ঞ – বিশ্বকাপ ফুটবল। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই মহাযজ্ঞের একবিংশতম আসর বসছে এইবার – রাশিয়ায়। বিশ্বকাপ ফুটবলের অবিস্মরণীয় কিছু ক্ষণ, ঘটনা, মুহূর্তগুলো আবারও এই রাশিয়া বিশ্বকাপের মাহেন্দ্রক্ষণে পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য গোল্লাছুট ডটকমের বিশেষ আয়োজন “যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে”!

ফুটবল খেলার সবচেয়ে বড় আসরে কোনভাবে একটা গোল করতে পারলে আপনি কি করবেন? আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবেন, ভাববেন স্বর্গটাই আপনার হাতে চলে এসেছে, তাই তো? ইতালিয়ান মিডফিল্ডার মার্কো তারদেল্লিকে জিজ্ঞাসা করলে হয়তো তিনি এটাই বলবেন। আবার দক্ষিণ আফ্রিকার খেলোয়াড়দের জিজ্ঞাসা করলে হয়তো বলবেন পুরো দল বেঁধে সাইডলাইনে গিয়ে নাচার কথা (২০১০ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম গোল করে দক্ষিণ আফ্রিকান উইঙ্গার সিফিওয়ে শাবালালা এটাই করেছিলেন), আবার ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তী রিভালদোকে জিজ্ঞাসা করলে হয়তো উনি বলবেন জার্সি খুলে দৌড় দেওয়ার কথা। বিশ্বকাপে গোল করাটা এমনই এক জিনিস। অনাবিল আনন্দের এক উপলক্ষ্য। একেকজনের গোল উদযাপনে সে বিষয়টাই পরিস্ফুটিত হয়ে ওঠে। বিশ্বকাপে একেক খেলোয়াড়ের গোল উদযাপনই অনেক সময় খেলা বা গোল করার ধরণের থেকে অনেক বেশী আলোচিত হয়ে ওঠে। এমনই এক কারণে এখনো পর্যন্ত অনেক বেশী আলোচিত হলেন ক্যামেরুনের বর্ষীয়ান স্ট্রাইকার রজার মিয়া।

অথচ বিশ্বব্যাপি ফুটবল প্রেমিকেরা এই আলোচনার খোরাকটা পেতেন না যদি না ক্যামেরুনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পল বিয়া একটা ফোনকল না দিতেন রজার মিয়া কে। ১৯৭৩ সালে জাইরে’র বিপক্ষে ১৯৭৪ বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ারের এক ম্যাচে অভিষিক্ত রজার মিয়া এর বিশ্বকাপ স্বপ্ন পূরণ হয় ১৯৮২ সালে এসে। সেবারের বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ড থেকেই বাদ পড়ে যায় আফ্রিকার অদম্য সিংহরা। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে জায়গা হয়নি ক্যামেরুনের। পরের বছরেই ৩৫ বছর বয়সী রজার মিয়া আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন। কিন্তু যার কপালে বিশ্বকাপের কিংবদন্তী হওয়া লেখা আছে, সে কি চাইলেই অবসর নিতে পারে?

১৯৯০ বিশ্বকাপে ক্যামেরুন জায়গা পাওয়ার পরপরই ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্ট পল বিয়া রজার মিয়া কে ফোন করে আকুতি করেন, দলে ফেরার জন্য। প্রেসিডেন্টের এই আকুতি ফেলার সাধ্য ছিল না সদাহাস্যোজ্জ্বল রজার মিয়া এর। অবসর ভেঙ্গে ফিরে এলেন তিনি জাতীয় দলে। ৩৮ বছর বয়সে রজার মিয়া আবারও গেলেন বিশ্বকাপ খেলতে।

প্রথম ম্যাচেই আগের বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাকে হারালো আফ্রিকার অদম্য সিংহরা। দ্বিতীয় ম্যাচ গিওর্গি হ্যাজির রোমানিয়ার বিপক্ষে। দুটি গোল এলো এই বুড়ো রজার মিয়া এর পা থেকে। বিশ্ব দেখলো বুড়ো হাড়ের ভেলকি। দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে গেল ক্যামেরুন। দ্বিতীয় রাউন্ডে মিয়াদের প্রতিপক্ষ টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলা হোর্হে ভালদেরামার কলম্বিয়া। কিন্তু রজার মিয়া এর ঝলকানিতে মলিন হয়ে গেলেন ভালদেরামারা। দুটি গোল করে আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে ক্যামেরুনকে কোয়ার্টার ফাইনালে নিয়ে গেলেন রজার মিয়া। এর মধ্যে আবার অতিরিক্ত সময়ে করা তার একটি গোল আজও স্মরণীয়। উপরে উঠে আসা কলম্বিয়ান গোলরক্ষক রেনে হিগুইতার কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে লক্ষ্যভেদ করেন রজার মিয়া।
মিয়ার সেই ড্যান্স!
৩৮ বছর বয়সে গোল করা যেমন তেমন, সবচেয়ে বেশী আলোচনার সৃষ্টি হল রজার মিয়া এর গোল উদযাপন নিয়ে! মাঠের কোণায় গিয়ে স্টিক ধরে অদ্ভুত ভঙ্গীতে কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে দুই হাত উপরে তুলে নাচতেন রজার মিয়া। রজার মিয়া এর উদযাপনভঙ্গি সে সময় বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলে। কোমল পানীয় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কোকাকোলা তাদের বিজ্ঞাপনচিত্রেও রজার মিয়ার সে উদযাপনভঙ্গি ব্যবহার করে। রজার মিয়া হয়ে যান বিশ্বকাপের এক বড় তারকা!
সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে শেষ হয়ে যায় ক্যামেরুনের বিশ্বকাপ যাত্রা। গ্যারি লিনেকার-পল গ্যাসকোয়েনের ইংল্যান্ডের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় তারা। পরের বিশ্বকাপে আবারও জায়গা করে নেয় ক্যামেরুন। আবারও দলে জায়গা করে নেন ৪২ বছর বয়সী রজার মিয়া! সেবার প্রথম রাউণ্ডেই বাদ পড়ে যায় ক্যামেরুন যদিও! রাশিয়ার বিপক্ষে গ্রুপপর্বের ম্যাচে ৬-১ গোলে হারলেও ক্যামেরুনের রজার মিয়া পরদিন সকল পত্রিকার হেডলাইন দখল করে নেন। ঐ এক গোল করেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী বয়সী গোলদাতা হয়ে গিয়েছিলেন যে তিনি! আর সাথে সেই উদযাপন তো ছিলোই!
ওলেগ সালেঙ্কোর কথা একটু চিন্তা করুন, সে ম্যাচে রাশিয়ার হয়ে একাই ৫ গোল করে বিশ্বকাপের এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশী গোল করার রেকর্ড করেও রজার মিয়া এর অর্জনের কাছে ফিকে হয়ে গিয়েছিলেন তিনি!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

2 × 1 =