যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে : হাস্যকর ফ্রি-কিক ও এক জেদি একনায়কের কথা

যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে : হাস্যকর ফ্রি-কিক ও এক জেদি একনায়কের কথা

আর মাত্র ৩৩ দিন বাকী। ৩৩ দিন পরেই শুরু হবে বিশ্ব ফুটবলের সর্ববৃহৎ মহাযজ্ঞ – বিশ্বকাপ ফুটবল। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই মহাযজ্ঞের একবিংশতম আসর বসছে এইবার – রাশিয়ায়। বিশ্বকাপ ফুটবলের অবিস্মরণীয় কিছু ক্ষণ, ঘটনা, মুহূর্তগুলো আবারও এই রাশিয়া বিশ্বকাপের মাহেন্দ্রক্ষণে পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য গোল্লাছুট ডটকমের বিশেষ আয়োজন “যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে”!

১৯৭৪ বিশ্বকাপ, পশ্চিম জার্মানিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় আফ্রিকান দল হিসেবে মিশরের পর (১৯৩৪ বিশ্বকাপ) সেবার জায়গা করে নেয় জাইরে, বর্তমানে যা কঙ্গো নামে পরিচিত। বেলজিয়ামের কাছ থেকে ১৯৬০ সালে স্বাধীনতা পাওয়া এই দেশে ১৯৬৫ সালে এক সফল ক্যু এর মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন একনায়ক এমবোতু সেসে সেকো। জাত্যাভিমান প্রচণ্ডমাত্রায় ছিল এই লোকের। নিজের দেশে পশ্চিমা কাপড় আসা বন্ধ করে দিলেন। দেশের বাইরে খেলা সকল খেলোয়াড়কে নির্দেশ দিলেন দেশের ক্লাবে খেলার জন্য, এমনকি জাইরের বাসিন্দাদের বলে দিলেন নামের মধ্যেকার ইউরোপিয়ান অংশটুকু ছেঁটে ঐতিহ্যবাহী আফ্রিকান নামে পরিচিত হতে হবে সবাইকে। ফলে দেশের ইতিহাসের সেরা গোলরক্ষক কাজাদি মুয়াম্বা, মিডফিল্ডার রিকি মাভুবা, স্ট্রাইকার মুলাম্বা এনদায়ে ও আডেলার্ড মায়াঙ্গা সবাই দেশে এসে খেলা শুরু করেন। এমবোতু ঘোষণা করেন জাইরে যদি ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে তবে তিনি দলের প্রত্যেকটা খেলোয়াড়কে বাড়ি, গাড়ি উপহার দেবেন। রিপাবলিক অফ কঙ্গো/কঙ্গো/জাইরে এর মধ্যেই মোটামুটি তিনবার আফ্রিকান কাপ অফ নেশনস জয় করে জানান দেয় যে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা তাদের পক্ষে বেশ সম্ভব। বিশ্বকাপ এ জায়গাও করে নেয় তারা। প্রত্যেক খেলোয়াড় এমবোতুর কাছ থেকে বাড়ি, একটা করে ভক্সওয়াগন গাড়ি উপহার পান। গ্রুপ বি তে জাইরের প্রতিপক্ষ হয় পরাক্রমশালী ব্রাজিল, স্কটল্যান্ড ও যুগোশ্লাভিয়া। প্রেসিডেন্ট এমবোতু পশ্চিম জার্মানিতে বিশ্বকাপ না দেখতে গেলেও মন্ত্রী ও আমলাদের একটা বিশাল বহর পাঠিয়েছিলেন জাতীয় দলের সাথে, খেলা দেখার জন্য।

প্রথম ম্যাচ স্কটল্যান্ডের সাথে। স্কটল্যান্ড ম্যানেজার উইলি আরমন্ড ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তাঁর দল যদি জাইরের কাছে হারে তাহলে তাদের তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাড়ি ফেরত যাওয়া উচিৎ। যাহোক, তাদেরকে সেটা করতে হয়নি। কেনি ডালগ্লিশ, ডেনিস ল এর স্কটল্যান্ড জাইরে কে ২-০ গোলে হারায়, যদিও জাইরের খেলার স্টাইল ও আক্রমণাত্মক মনোভাব সবাইকে মুগ্ধ করে।

বিপত্তি ঘটে ম্যাচের পর। ম্যাচ হারার কারণে মন্ত্রীর বহর খেলোয়াড়দের জানিয়ে দেয় জাইরের খেলোয়াড়দের প্রাপ্য বোনাস দেওয়া হবেনা কোন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে জাইরের খেলোয়াড়েরা। সিদ্ধান্ত নেয় যুগোশ্লাভিয়ার সাথে পরবর্তী ম্যাচ না খেলার। কিন্তু তা চাইলেই কি হবে? দেশে যে অপেক্ষা করছেন ক্ষিপ্ত একনায়ক এমবোতু! ফলে জাইরের খেলোয়াড়েরা সিদ্ধান্ত নেন যে না, পুরোপুরি টুর্নামেন্ট বয়কট করবেনা তারা, কিন্তু যুগোশ্লাভিয়ার সাথে ম্যাচে মাঠে নেমে নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলবেনা তারা, জয়ের চেষ্টা করবেনা। ফলাফল যা হবার তাই হল। ৯-০ গোলে জাইরেকে বিধ্বস্ত করলো যুগোশ্লাভরা। ম্যাচের শেষে প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ডরা এসে খেলোয়াড়দের জানিয়ে গেলেন ব্রাজিলের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে যদি চার গোলের থেকে বেশী গোল খায় জাইরে, তাহলে খেলোয়াড়দের কাউকে দেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না।

৬৬ মিনিটের মধ্যে রিভেলিনো আর জেয়ারজিনহোর গোলে ২ গোলে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। এর পরেই ঘটে আপাতদৃষ্টিতে ফুটবল বিশ্বকাপ এর অন্যতম হাস্যকর এক ঘটনা। আপাতদৃষ্টিতে বললাম এই কারণে, কেননা উপর থেকে ঘটনাটাকে হাস্যকরই লাগবে, কিন্তু এই ঘটনার আড়ালে যে কতটা করুণ ইতিহাস আছে সে সম্পর্কে অনেকেই আসলে জানেনা।

দুই গোল খাওয়ার পর ব্রাজিল ডিবক্সের ঠিক বাইরে একটা ফ্রি-কিক পায়। ফি কিক নেওয়ার জন্য রিভেলিনো আর জেয়ারজিনহো দুইজন বলের সামনে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা বলতে থাকেন। সামনে জাইরের খেলোয়াড়েরা মানব দেয়াল গঠন করেন। এর মধ্যেই হঠাৎ মানব দেয়াল ভেঙ্গে জাইরের ডিফেন্ডার এমওয়েপু ইলুঙ্গা রিভেলিনো-জেয়ারজিনহোর সামনে থাকা বলটাকে লাথি মেরে উড়িয়ে দেন!

গোটা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করে এক হাস্যকর ঘটনা। অনেকেই ভাবা শুরু করেন যে আফ্রিকানরা ফুটবল সম্পর্কে এতটাই অজ্ঞ যে তারা জানেনা বিপক্ষ দল ফ্রি-কিক পেলে সেটা বিপক্ষ দলের কাউকেই নিতে হয়, নিজের দলের কেউ নিলে হয়না। কিন্তু আসল ঘটনা বের হয় ম্যাচের পর।

যত কাণ্ড বিশ্বকাপ ফুটবলে : হাস্যকর ফ্রি-কিক ও এক জেদি একনায়কের কথা

জাইরের খেলোয়াড়েরা গোল খাওয়ার ভয়ে এতটাই সন্ত্রস্ত ছিল যে আর একটা গোলও খেতে চায়নি তারা, পাছে ব্রাজিল চারটা দিয়ে বসে! এই জন্যই ফ্রি-কিক থেকে গোল খাওয়ার ভয়ে ইলুঙ্গা সেই কাণ্ডটা করেছিলেন! ইলুঙ্গা পরে নিজেও স্বীকার করেন তাঁর এই কাজ করার পেছনে আরেক কারণ ছিল – রেফারির কাছ থেকে লাল কার্ড দেখা। অন্তত যে লাল কার্ড পেয়ে ম্যাচ থেকে বের হয়ে যাবে তাঁর উপর তো আর দোষ বর্তাবে না যে তোমার জন্যই ম্যাচ হেরেছি আমরা, চার গোল খেয়েছি আমরা! এমনটাই ছিল ইলুঙ্গার চিন্তা!

যাই হোক, ৭৮ মিনিটে ভলদোমিরো গোল করে স্কোরলাইনকে ৩-০ করেন, এরপর ব্রাজিল আর কোন গোল দিতে পারেনি। জাইরের খেলোয়াড়েরাও নিজের দেশে ফিরতে পারে, যদিও তাদের সবাইকে জাতীয় প্রতারক হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। তাদের প্রাপ্য বোনাসও দেওয়া হয়নি কখনো, পরবর্তী প্রতিভাবান ফুটবলারদের এই প্রজন্মটা দারিদ্র্যের কষাঘাতে আস্তে আস্তে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। একনায়ক এমবোতুও ফুটবলের উপর থেকে তাঁর সকল আগ্রহ উঠিয়ে নেন, দেশের ফুটবলের পেছনে খরচ করা বন্ধ করে দেন। বরঞ্চ জাইরেতে “শতাব্দীর সেরা বক্সিং ম্যাচ” আয়োজন করার জন্য তোড়জোড় করা শুরু করেন তিনি। তৎকালীন সেরা দুই বক্সার মোহাম্মদ আলী ও জর্জ ফোরম্যানকে ৫ মিলিয়ন ডলার করে পারিশ্রমিক দিয়ে জাইরেতে নিয়ে আসেন “রাম্বল অফ দ্য জাঙ্গল” খেলার জন্য। সেই থেকে জাইরের ফুটবল আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

16 − three =