দুঙ্গা-আর্মি বৃত্তান্তঃ কোপা আমেরিকা ব্রাজিল টীম রিভিও

যাদের চিনি সবাই টীম এনালাইসিস দিচ্ছিলো। যারা আমার মত পাঁড় ব্রাজিল ভক্ত, তারা ব্রাজিল দলের ফর্মেশন দিচ্ছিলো । যারা অন্তত এ খেলায় আমার রাইভাল আর কমবেশী ভালো লিখতে জানে , তারা আর্জেন্টিনা দলের এক্সরে করছিলো । চুপচাপ বসে ছিলাম । যেদিনই নিজের স্বল্পজ্ঞান থেকে দুইটা বিরক্তিকর কথা লেখার কথা মাথায় আসে , সেদিনই চোটে বা আঘাতে দলের দরকারি কেউ দূরে সরে যায় । তাই অপেক্ষায় ছিলাম, দেখি চোটাঘাতের লিস্টিটা কতো বড় হতে পারে !
আমার দেখা মতে, মিনেইরাজোর পরে স্কোলারির কাছ থেকে চার্জ নিয়ে দুঙ্গা সর্বসাকুল্যে চোখে পড়ার মত বড়সড় ট্যাকটিকাল ডিফারেন্স আনেন দুটো …
১) ৪-২-৩-১ কে বদলে কমবেশি ৪-২-২-২ করে দেন । ৪-২-২-২ ফর্মেশনটার আগে কমবেশি কথাটা যোগ করার কারণ আছে । প্রথম ২-৩ ম্যাচের “পরীক্ষামূলক” স্টেজে দুঙ্গাকে ২০ মিনিট-৩০ মিনিট পরে পরে বদলে ফেলতে দেখেছি । প্রতিটা ফ্রেন্ডলিতেই ৫-৬টা করে সাবস্টিটিউশন । চার্জ পাবার পরে দুই ল্যাটিন প্রতিপক্ষ কলম্বিয়া আর ইকুয়েডরের বিপক্ষে ম্যাচদুটো ছিলো দুঙ্গার ল্যাব । সেখানে সে নিজেকে একটু একটু করে বদলে বদলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখার স্বাধীনতা দিয়েছেন । একটা জায়গায় ফিক্সড হয়ে বসে থাকেন নি । কারণ, তার পরের ম্যাচটাই ছিলো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার সাথে । দলের ভিতরে কনফিডেন্স নামের ইনজেকশনটাকে পুশ করার জন্যে সেই ম্যাচে জয়ের বিকল্প ছিলো না ব্রাজিল জেনারেলের হাতে ।

সেটা স্কোলারির যুগ
সেটা স্কোলারির যুগ
দুঙ্গা বদলে দিলেন এভাবে !
দুঙ্গা বদলে দিলেন এভাবে !

২) স্কোলারির ব্রাজিলের এটাকে একজন টার্গেট ম্যান ছিলো । সেই রোলটা ফ্রেডের ছিলো । দুঙ্গা এসে এই টার্গেটম্যানের কনসেপ্টটাকে মুছে দিলেন । নেইমারকে ফ্রি রোল দিয়ে দিলেন যার পিছে চেলসি ডুয়ো অস্কার আর উইলিয়ান থাকবে আর সামনে ফিরমিনো বা তারদেল্লি থাকবে । মাঝেমাঝে নেইমারের সামনের এই জায়গাটায় খেলিয়ে দেখেছেন ইউসিএলে ১ ম্যাচে ৫ গোল করে চমক জাগানো শাখতার ফরোয়ার্ড লুইজ আদ্রিয়ানোকেও । ব্রাজিল বস দুঙ্গা তার এটাকের এই একটা জায়গা নিয়েই নাড়াচাড়াটা সবচেয়ে বেশি করেছেন ।মাই হর্স ? অবশ্যই ফিরমিনো ! অনেক কম সুযোগ পেয়ে নিজেকে বেশ ভালোভাবে প্রমাণ করে ফেলেছে জার্মান লিগে খেলা এই ফিরমিনো । আজকের গোলটা নিয়ে হয়ে গেল জাতীয় দলে ৩ গোল এর মধ্যে !

ফিরমিনো
ফিরমিনো

এই ম্যাচগুলোয় নেইমারকে কখনো দেখেছি ডিপে গিয়ে গুস্তাভোর কাছ থেকে বল নিয়ে আসতে , আবার কখনো দেখেছি আগের মতো অস্কারের সাথে ওয়ান টু করে ঢুকছে । অস্কারকে আর উইলিয়ানকে ফ্রিজ করে দিয়ে নেইমারকে দিয়ে দিলেন খুব বড়সড় একটা ফ্লোর । এতে করে জাতীয় দলের হয়ে দারুন ফর্মে থাকা নেইমার আরো আনপ্রেডিক্টেবল হয়ে উঠলেন ।

আরো জায়গা পেয়ে আরো সাবলীল নেইমার
আরো জায়গা পেয়ে আরো সাবলীল নেইমার

Life was going good for Carlos Dunga… গোলের নিচে জেফারসন , ব্যাকলাইনে মিরান্ডা-সিলভা/লুইজ-দ্যানিলো-ফেলিপে লুইস, সেন্ট্রালে এলিয়াস-গুস্তাভো, সামনে নেইমার-অস্কার-উইলিয়ান আর ফিরমিনোর চতুষ্টক …

আলভেজের চোটে আরো পোক্ত জেফারসন
আলভেজের চোটে আরো পোক্ত জেফারসন

কিন্তু বড় টুর্নামেন্টটা ঘনিয়ে আসতেই চোটের কারণে একের পর এক ট্যাকটিকাল কোয়েশ্চেন ঘনিয়ে আসতে থাকলো দুঙ্গার কাছে ।
প্রশ্ন ১ ) অস্কারের চোটের পরে … ওর জায়গায় কে খেলবে ? কৌতিনহো যতোটা না অস্কারের মত, তার চাইতে বেশী নেইমারের মত । ক্রিয়েটিভ, একটু জায়গা নিয়ে খেলতে ভালোবাসে প্লাস ডিফেন্সিভলি অস্কারের মত কার্যকর না । একটা কথা মনে রাখা দরকার উইলিয়ান দুঙ্গার অটো চয়েজ শুধু মাত্র তার ডিসিপ্লিনের কারণে । নেইমারের পিছে দুঙ্গার চাওয়াটা আসলে খুবই ডিসিপ্লিনড দুইজন মিডি । দুঙ্গা তার নীতি থেকে একটু নমনীয় হয়ে আসতেই পারেন । অস্কারের রোলটায় কৌতিনহোকে খেলিয়ে দিতেই পারেন । নমনীয় হয়ে আসার সুযোগটা বড় হয়ে আসে যখন দলে রোলটায় খেলার জন্যে সেখানে আছে শুধু ডগলাস কস্তা বা আল আহলির এভারটন রিবেইরো । নমনীয় হয়ে আসার সুযোগটা বড় হয়ে আসে যখন কোপার সপ্তাহ খানেক আগে কৌতিনহো নেইমারের জায়গায় নেমে দারুন এক গোল করে বুঝিয়ে দিয়েছেন তার মধ্যে একাই দুই দলের মধ্যে পার্থক্যটা গড়ে দেবার ক্ষমতাটা আছে যেটা ডগলাস কস্তা বা রিবেইরোর কাছে আশা করাটা বোকামি বা উচ্চাশা।

দিন যত যাচ্ছে , কৌতিনহো ততোই ধারালো হচ্ছেন
দিন যত যাচ্ছে , কৌতিনহো ততোই ধারালো হচ্ছেন
আলোচনায় আছেন ডগলাস কস্তাও
আলোচনায় আছেন ডগলাস কস্তাও

তারপর গোলরক্ষক দিয়াগো আলভেজ চোটে পড়েছেন, মার্সেলো ছিটকে গেছেন । কিন্তু দুঙ্গার সামনে এগুলো বড় ট্যাক্টিকাল প্রশ্ন হয়ে আসে নি । শুধু দায়সারাভাবে রিপ্লেসমেন্ট ডেকে নিজের কাজ সেরেছেন । মার্সেলোর জায়গায় এলেক্স সান্দ্রো বা ম্যাক্সওয়েলের মত অপশন ছেড়ে ইন্টারন্যাসিওনালের গেফারসনকে ডাকলে ছোটোছাট কথা হয়েছে হালকা পাতলা , তবে তাতে আশা ফিঁকে হয় নি ।

ব্রাজিল মিস করবে গুস্তাভোর সার্ভিস
ব্রাজিল মিস করবে গুস্তাভোর সার্ভিস

প্রশ্ন ২ ) এবার দুঙ্গা হারালেন নেইমারের পরে তার দলের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়টিকে । লুইজ গুস্তাভো । ভলফসবুর্গের ডেস্ট্রয়ার মিডফিল্ডার গুস্তাভো জার্মান কাপ জিততে না জিততেই আসে তার চোটের খবর । দুঙ্গার ২য় স্পেলে প্রত্যেকটা ম্যাচেই এই গুস্তাভোকে দেখেছি অক্লান্তভাবে পারফর্ম করে যেতে । আগের রামিরেসের মত অযথা ফাউল করার হ্যাবিটটাও ওর মধ্যে নেই , আবার অহেতুক দূর থেকে পাওলিনহোর মত জোরে মেরে দেবার হ্যাবিটটাও নেই । দারুন পরিমিত , দারুন পরিশ্রমী । কোপার আগে দুটো ফ্রেন্ডলি দেখলাম হন্ডুরাস আর মেক্সিকোর সাথে । তাতে শাখতার থেকে ডাকা ফ্রেডকে ভালো লাগলো । তবে আগেই বলে রাখছি, এ ম্যাচদুটো ব্রাজিল খেলেছে মেক্সিকোর হাফ টীম প্লাস হন্ডুরাসের মত দলের সাথে । তাই ফ্রেড বা ক্যাসেমিরো- যেই আসুক না কেন আমাদের আশাটা রাখতে হবে সেই জায়গাতেই । ক্যাসেমিরো-ফার্নান্দিনিহো-ফ্রেড আপাতত সম্ভাবনাটা এই ট্রায়াঙ্গেলে । দুটো ফ্রেন্ডলি মিলে সবচেয়ে প্রমিজিং লাগলো শাখতারের ফ্রেডকেই । ফার্নান্দিনহোকে সিটির প্রথম দিককার ফার্নান্দিনহোর ছায়া লাগছে প্রতিদিনই ।

ফ্রেডের সম্ভাবনাই সবচেয়ে উজ্জ্বল
ফ্রেডের সম্ভাবনাই সবচেয়ে উজ্জ্বল
ক্যাসেমিরো
ক্যাসেমিরো

প্রশ্ন ৩ ) শেষ ধাক্কা ? দ্যানিলো ! যেই রাইটব্যাককে প্রত্যেকটা ম্যাচ আগাগোড়া খেলালেন , টুর্নামেন্টের আগে এসে ছিঁটকে পড়লেন সেই দ্যানিলো । মোনাকোর ফ্যাবিনহো হন্ডুরাসের বিপক্ষে স্টার্ট পেলেন । তবে একে দ্যানিলোর আশেপাশেও মনে হয় নি । দানি আলভেজ এসেছেন বদলি হয়ে । এই আলভেজের রোগটা কমবেশি সবার জানা ।

দ্যানিলো ছাড়া প্ল্যান বি না থাকাই দুঙ্গার বিপদ
দ্যানিলো ছাড়া প্ল্যান বি না থাকাই দুঙ্গার বিপদ

আরো আরো প্রশ্ন আছে …
আরো আরো জানার আছে …
জেনে রাখুন থিয়াগো সিলভার মাপের একজন স্টার্টার হিসেবে গ্যারান্টেড না । জেনে রাখুন ফ্রেদকে নিয়ে এত হাসাহাসির পরেও দুঙ্গা তারদেল্লির মত একই ফিচারের একজনের উপর ভরসা রাখছেন । জেনে রাখুন প্রি কোপা ফ্রেন্ডলিতে ড্রিম রানের পরেও কৌতিনহোকে বেঞ্চার হয়ে থাকতে হতে পারে । দুঙ্গার চাহিদামত সলিড ফুলব্যাক নন আলভেজ । তবে ফ্যাবিনহোও এখনো স্টার্ট করার লেভেলে যান নি সেটা বুঝলাম হন্ডুরাস ম্যাচ দেখে ।

দ্যানিলোর বদলি আলভেজ
দ্যানিলোর বদলি আলভেজ

তাহলে সবম মিলিয়ে চোট ফোটের পরে আমাদের টীমটা কেমন দাঁড়ালো ?

গোলকিপারঃ জেফারসন, মার্সেলো গ্রোহে , নেতো
রাইটব্যাকঃ দ্যানিলো, দানি আলভেজ
লেফটব্যাকঃ ফেলিপে লুইস, গেফারসন
সেন্টারব্যাকঃ মিরান্ডা, মার্কুইনহোস, থিয়াগো সিলভা, ডেভিড লুইজ
সেন্ট্রাল মিডঃ ফ্রেড, ফার্নান্দিনহো, এলিয়াস, ক্যাসেমিরো
এটাকিং মিডঃ কুটিনিও, উইলিয়ান, ডগলাস কস্তা, এভারটন রিবেইরো
এটাকঃ নেইমার, তারদেল্লি, ফিরমিনো, রবিনহো

আর ফর্মেশনটা এমন
আর ফর্মেশনটা এমন
ভরসা রাখতেই হবে
ভরসা রাখতেই হবে

সবকিছু জেনেও বিশ্বাসটা রাখতে হবে । আমি বিশ্বাস রেখেছি । রেখেছি বলেই এত আশার বিশ্বকাপে অমন ভরাডুবির পরেও সময় নিয়ে এই লম্বা লম্বা এক গাঁদা বিরক্তিকর কথা লিখে ফেলেছি ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

four − 4 =