বিশ্ব জয় করা হাসির সেই শিশুটি…

ছেলেটার বয়স কতই বা হবে? পাঁচ পেরিয়ে ছয়? ছয় বছর বয়সে আপনি আমি কি করতাম মনে পড়ে কি?

নার্সারি কিংবা কেজিতে পড়তাম। মা স্কুলের টিফিনে মুখরোচক কিছু বানিয়ে দিলে টিফিন টাইমে সেটা সহপাঠীদের কাছ থেকে সামলিয়ে পুরোটা খেয়ে ফেলার মধ্যেই বিরাট একটা যুদ্ধজয়ের আনন্দ খুঁজে পেতাম। ছুটির ঘন্টা বাজলেই কাঁধে ইয়া বড় ব্যাগটা ঝুলিয়ে কে সবার আগে ক্লাসরুমের কড়িকাঠ পেরিয়ে বাইরে অপেক্ষায় থাকা বাবা-মায়ের কোলে যেতে পারে সেই অঘোষিত প্রতিযোগিতায় সবার আগে যাওয়ার মধ্যেই আমরা নিজেদের ভেবে নিতাম নেপোলিয়নের মত সর্বজয়ী।

এসব সুখস্মৃতিমাখা ছোট ছোট ঘটনাগুলো নিয়েই আমাদের শৈশবের দিনগুলো ভরপুর। চিন্তা নেই, ভাবনা নেই, নেই জীবিকার্জনের তাড়না। নেই বেঁচে থাকার আসল যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা।

সবার শৈশব এরকম আনন্দময় হয় না। যেমনটা হয়নি ব্র্যাডলি লোয়ারির। সহপাঠীদের কাছ থেকে নিজের টিফিন বাঁচানোর মত ‘যুদ্ধজয়’ করার সে সুযোগ পায়নি, স্কুল ছুটির পর অন্যান্য সহপাঠীদের রেইসে হারিয়ে সবার আগে বাইরে থাকা মায়ের কোলে ফিরে গিয়ে নিজেকে ”বিশ্বজয়ী নেপোলিওন” ভাবারও সুযোগ পায়নি বাচ্চা ছেলেটা। কেননা, আরও বড় লড়াই ত সে জন্ম থেকেই করে আসছে। আরও বিস্তৃত, আরও ভয়ংকর, আরও যন্ত্রণাদায়ক যুদ্ধের সাথে যে তাকে লড়তে হচ্ছে প্রতিনিয়ত! যে বয়সে শিশুরা হাঁটি হাঁটি পা পা করে স্কুলের দোরগোড়ায় উঁকিঝুকি মারা শুরু করে, সে বয়সেই ব্র্যাডলির সাথে হাসপাতালের ‘সখ্যতা’। ২০১১ সালে জন্ম নেওয়া ব্র্যাডলির বয়স যখন মাত্র আঠারো মাস, তখনই ধরা পড়ে – শরীরে বাসা বেঁধেছে জীবনঘাতী ক্যান্সার। এ ক্যান্সার যেমন তেমন কোন ক্যান্সার নয়, ‘নিউরোব্লাস্টোমা’ নামের ক্যান্সারটা এমনিতেও অনেক বিরল প্রজাতির একটা ক্যান্সার। ব্র্যাডলির দেশ ইংল্যান্ড বা ব্রিটেনে যার চিকিৎসা নেই বললেই চলে, চিকিৎসা করাতে হলে করাতে হবে আটলান্টিকের ঐপারে, সেই সুদূর যুক্তরাষ্ট্রে। আঠারো মাস বয়সে যখন ক্যান্সারটা ধরা পড়ে, ডাক্তাররা তখন ঘোষণা করেই দিয়েছিলেন, বড়জোর দুই কি তিন মাস বাঁচবে ছেলেটা।

কিন্তু না। মাত্র দুই বা তিন মাসে ব্র্যাডলির মত সাহসীরা হার মানেনা। কখনো মানেনি। লড়াই চালিয়ে গেল অনুজ-প্রাণ। সে লড়াই সর্বগ্রাসী ক্যান্সারের সাথে একটা ছয় বছরের শিশুর অসম লড়াই। কিন্তু এই অসম লড়াইতেও ব্র্যাডলি মাঝে দেখিয়ে দিল, ক্যান্সারকেও কিস্তিমাত করার ক্ষমতা তার আছে। ডাক্তারদের হতভম্ব করে দিয়ে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের সব মারপ্যাঁচ অসাড় প্রমাণ করে ২০১৪ সালের শেষের দিকে ঘোষণা এল ক্যান্সারকে হারিয়ে দিয়েছে ব্র্যাডলি!

কিন্তু না, সব গল্পের শেষে ব্র্যাডলির মত সুপারহিরোরা দৃশ্যত জিততে পারেনা। সেসব গল্পে ব্র্যাডলির মত সুপারহিরোরা হেরেও হয় বিজয়ীর চেয়েও মহিমান্বিত। তাদের হারটা হয় প্রতিপক্ষের বিজয়ের থেকেও ভাস্বর।

২০১৬ সালের মাঝামাঝিতে দেখা গেল প্রাণঘাতী ক্যান্সার আবার ফিরে এসেছে ব্র্যাডলির শরীরে। এবার একেবারে সর্বশেষ পর্যায়ে, মানে বেঁচে থাকার একরকম কোন আশাই নেই আর। ব্র্যাডলির বাবা-মাও জানলেন, যে ছেলের আরও এক বছর আগেই অমৃতলোকে পাড়ি জমানোর কথা, সে ছেলে এতদিন ধরে যুদ্ধ করার পর অবশেষে পরিশ্রান্ত হয়ে উঠেছে। পারছে না আর ব্র্যাডলি।

ফুটফুটে দাঁত ফোকলা ছেলেটি ইংলিশ ক্লাব স্যান্ডারল্যান্ডের পাঁড় ভক্ত। ব্র্যাডলির মা-বাবা ব্র্যাডলির অবস্থা বর্ণনা করে ছেলের জন্য ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা চাইলেন বিশ্বব্যাপী ফুটবলপ্রেমীদের কাছে। ব্র্যাডলির অসমসাহসী লড়াইয়ের কাহিনী নাড়া দিয়ে গেল ফুটবল বিশ্বকে। বিশ্বব্যাপী ফুটবলমোদীরা আবার সেই অমোঘ সত্যের বাণীটা অনুস্মারক হিসেবে পেলেন যে না – ফুটবলের চেয়েও জীবন আসলেই অনেক বড়, আমরা যত যাই বলি বা করি না কেন। ব্র্যাডলির জন্য মাঠের শত্রুতা ভুলে গিয়ে এক হয়ে গেল সব ক্লাব, সব খেলোয়াড়, পুরো ফুটবল বিশ্ব। যে নিউক্যাসল ইউনাইটেডের সাথে স্যান্ডারল্যান্ড-এর সাপে-নেউলে সম্পর্ক, সেই নিউক্যাসল-স্যান্ডারল্যান্ডকেও এক করে দিলো ব্র্যাডলির মুখে সর্বক্ষণ লেগে থাকা সংক্রামক সেই হাসিটা। সংক্রামক সেই হাসিতে লিভারপুল থেকে এভারটন, চেলসি থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি থেকে আর্সেনাল, ওয়েস্টব্রমউইচ অ্যালবিওন থেকে বিউরি এফসি – কোন ক্লাবের খেলোয়াড়-সমর্থকেরা বশ মানেনি, বলতে পারবেন?

কিন্তু সময় শেষ হয়ে আসছিলো। ব্র্যাডলির বাবা-মা পাগলের মত অর্থ সংগ্রহ করলেও বুঝতে পেরেছিলেন, ব্র্যাডলিকে আসলে ফেরত পাওয়া যাবেনা। প্রয়োজনীয় সাত লক্ষ ডলারের প্রায় পুরোটাই যোগাড় হয়ে গেলেও ডাক্তাররা ঘোষণা করে দিয়েছিলেন, ক্যান্সার একেবারেই শেষ পর্যায়ে – অর্থাৎ অর্থও যেখানে বেকার। ২০১৪ সালে যে ক্যান্সারটা চলে গিয়েছিল, ২০১৬ সালের মাঝামাঝিতে আরও একটা নতুন টিউমারের মাধ্যমে তা শেষ পর্যায়ে ফিরে আসে। ব্র্যাডলির সময় শেষ হয়ে আসছিল ধীরে ধীরে।

নিজেদের মধ্যে শত্রুতা, বৈরীতা – সবকিছু ভুলে পুরো ফুটবল বিশ্ব এই কয়েক মাস এক হয়ে কাজ করেছে ছোট্ট ব্র্যাডলির শেষ কয়েকটা দিন যেন তাঁর ছোট জীবনের সবচেয়ে অবিস্মরণীয় কয়েকটা দিন হয়ে থাকে, তার জন্য। এই কয়মাসে নিয়মিত স্যান্ডারল্যান্ডের ম্যাচগুলোর মাসকট হিসেবে মাঠে গিয়েছে ব্র্যাডলি, গত ডিসেম্বরে চেলসির বিপক্ষে ম্যাচের হাফটাইমে চেলসি গোলরক্ষক আসমির বেগোভিচের বিপক্ষে ব্র্যাডলিকে সুযোগ দেওয়া হয় একটা পেনাল্টি কিক নেওয়ার জন্য, যে শটটা স্বাভাবিকভাবেই বেগোভিচ ছেড়ে দেন যাতে ছোট্ট ব্র্যাডলি তাঁর মত একটা সুপারস্টার গোলরক্ষকের বিপক্ষে গোল করার আনন্দটা পেতে পারে। সেই গোল আবার প্রিমিয়ার লিগের ডিসেম্বর মাসের সেরা গোলের মর্যাদা দিয়েছিল প্রিমিয়ার লিগ, সেই গোলের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করেছিল বিবিসি স্পোর্টসের ম্যাচ অফ দ্য ডে এর বাঘা বাঘা সব পণ্ডিতরা! এমনই সবার মন জয় করে নিয়েছিল ব্র্যাডলি!

তবে গ্যারি লিনেকার, অ্যালান শিয়ারার, রোমেলু লুকাকু, পুরো চেলসি দল, পেপ গার্দিওলাসহ এত জনের সাথে ব্র্যাডলির সুখস্মৃতি থাকা সত্ত্বেও একজন এই কয়দিনে হয়ে গিয়েছিলেন ব্র্যাডলির বেস্ট ফ্রেন্ড। তিনি আর কেউই নন, স্যান্ডারল্যান্ডের ইংলিশ স্ট্রাইকার জার্মেইন ডেফো।

স্যান্ডারল্যান্ড এমনিতেই অত্যন্ত দুর্বল একটা দল, এবার রেলিগেশানের খাঁড়ায় পড়ে অবনমিতও হয়েছে, কিন্তু এই দলের অবিসংবাদিত সুপারস্টার ছিলেন এই জার্মেইন ডেফো। ছিল বলতে হচ্ছে, কেননা এই মৌসুমে তিনি যোগ দিয়েছেন বোর্নমাথে। কিন্তু স্যান্ডারল্যান্ডে থাকার সময় ব্র্যাডলি লোয়ারির সবচাইতে কাছের বন্ধু ছিলেন এই সুপারস্টার। স্যান্ডারল্যান্ডের শেষ কয়েকটা ম্যাচে প্রিয় বন্ধু ‘জার্মেইন’ এর হাত ধরে হাঁটি হাঁটি পা পা করে স্টেডিয়ামে ঢুকে মাসকটের দায়িত্ব পালন করেছে ছোট্ট ব্র্যাডলি। এমনকি ইংল্যান্ডের সাথে লিথুয়ানিয়ার ফ্রেন্ডলি ম্যাচেও জার্মেইনের হাত ধরে মাসকট হয়ে গেছিলো ব্র্যাডলি, ওয়েম্বলির প্রায় লক্ষাধিক দর্শক করতালিতে বরণ করে নিয়েছিল ছোট্ট ব্র্যাডলিকে।

নিয়মিত সবসময় ব্র্যাডলির খোঁজখবর রাখতেন জার্মেইন, ব্র্যাডলির পরিবারের সাথে একটা বন্ধন হয়ে গিয়েছিল তাঁর। সময় পেলেই ছুটে যেতেন ছোট্ট বন্ধুর সাথে দেখা করতে, নিজের ফুটবল হিরো আর এখন নিজের সবচেয়ে বড় বন্ধু  জার্মেইনের কোলে শান্তির ঘুম দিত ব্র্যাডলি। ছোট্ট ব্র্যাডলির শেষ দিনগুলোকে এভাবেই রাঙ্গিয়ে দিয়েছেন জার্মেইন। মাঠে কোলে করে নিয়ে বেড়াতেন, ছোট্ট ব্র্যাডলিকে স্যান্ডারল্যান্ড সতীর্থদের সাথে ওয়ার্মআপ করার সুযোগ করিয়ে দিতেন। একটা মৃত্যুপথযাত্রী ছয়বছর বয়সী শিশুর কাছে এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কী-ই বা হতে পারত? প্রিয় বন্ধু জার্মেইন সেসবই করেছেন অহরহ।

এমন কোন দিন যায়না যেদিন আমি সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে আমার ফোনে ব্র্যাডলির টেক্সট এসেছে কি না সেটা চেক করি না। ড্রেসিংরুমে ওর উচ্ছ্বলতা, আমি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি পারিনি ওর মত এত ফুটফুটে একটা বাচ্চা এভাবে জীবন আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কখনো ভুলবোনা তুমি যেভাবে আমার দিকে তাকাতে, সে তাকানোর মধ্যে নিখাদ ভালোবাসা ছিল, যেটা আমি টের পেতাম। তুমি জানো ও না তুমি আমার জন্য কি, আমার জীবনকে কিভাবে বদলে দিয়েছ তুমি। শান্তির ঘুম দাও, আমার বেস্ট ফ্রেণ্ড!

(জার্মেইন ডেফো, ”বেস্ট ফ্রেন্ড” ব্র্যাডলি লোয়ারি সম্পর্কে বলতে গিয়ে)

প্রিয় বন্ধু জার্মেইনের সাথে ব্র্যাডলি

এখন আর কেউ জার্মেইনের কোলে মাথা রেখে প্রশান্তি আর নিশ্চয়তা ভরা মনে ঘুমাবেনা। স্যান্ডারল্যান্ডের ড্রেসিংরুমে এসে “হোয়্যার ইজ জার্মেইন?” বলে জার্মেইনকে খুঁজে বেড়াবেনা ছোট ছোট দুটি পা। সর্বক্ষণ মুখে একটা সংক্রামক হাসি লাগিয়ে রেখে দুই হাতে থাম্বস আপ দেখাবেনা আর কেউ। হ্যাঁ, ক্যান্সারের কাছে হয়ত হেরেছে অবশেষে ছয় বছরের ছোট্ট শিশুটি, কিন্তু একে কি আসলেই হারা বলে? কই, ক্যান্সার ত তার মত ছোট্ট শিশুকে তার জীবনের সর্বোচ্চ উপভোগ করার ক্ষেত্রে বাধা দিতে পারেনি? ক্যান্সার ত বাধা হতে পারেনি ব্র্যাডলি লোয়ারির বিশ্বের শতকোটি ফুটবল ভক্তের কাছে সাহসিকতার এক আইডল হবার পথে? একে কি জেতা বলে? জিতেও ত হেরেছে ক্যান্সার, জিতেও হার বোধহয় এটাকেই বলে!

অমৃতলোকে শান্তিতে থেকো, প্রিয় ব্র্যাডলি লোয়ারি!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

two × one =