বিপিএল: অপেক্ষার তিন রঙ

ফ্র‍্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টের আগে টীম রিভিউ লেখার চেয়ে গতানুগতিক কাজ এখন আর একটাও নেই। তারচেয়ে বরং ক্রিকেটের এই ফরম্যাট ফুলে ফেঁপে উঠার যুগে একদম নিজেদের ঘরোয়া টুর্নামেন্টের চতুর্থ আসরের আগে নিজের মনের কিছু কথা বলার চেষ্টা করি। সিজন থ্রির প্রথম ম্যাচটা দেখার জন্যে যখন টিভি ছেড়ে বসি, টুর্নামেন্টের প্রতি তাবৎ আগ্রহের প্রায় ৪০ শতাংশ মিইয়ে যায় ঐ মুহূর্তেই। কথায় আছে, ফার্স্ট ইম্প্রেশন ইজ দ্যা লাস্ট ইম্প্রেশন। ঘ্যাড়ঘেড়ে সাউন্ড, স্কোরবোর্ডের বিতিকিচ্চি অবস্থা আর খুব নিম্নমানের ক্যামেরা কোয়ালিটি। সবমিলিয়ে ক্রিকেট মেলায় ঢোকার এন্ট্রিতেই জরাজীর্ণ গেইট দেখে আগ্রহে ভাটা পড়া আর কী!সনি সিক্সে খেলা দেখানো, ২৮ টা ক্যামেরা – আরো কী কী উড়ো খবর আসছে সিজন ফোরের আগ দিয়ে। নাহ! কাউকে বিশ্বাস করছি না। বিশ্বাস করলে খেলা শুরু হবার পরে কথা কাজে না মিললে অনেক বেশি ভাটা পড়বে আগ্রহে। সেটা চাই না একজন খাঁটি বাংলাদেশি হিসাবে। সারাদুনিয়াতে যেখানে ৫০-৬০ এর দশকের সিনেমা ঝকঝকে করে এই জেনারেশনকে দেখানোর আপ্রাণ চেষ্টা চলছে, সেখানে এই ২০১৬ সালের ডিজিটাল বাংলাদেশে মানুষ আওয়ামীলীগ- বিএনপির সম্মেলনে ব্যবহার করা ক্যামেরা দিয়ে ফ্র‍্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট কেন দেখবে??

মাঠের খেলা কেমন হবে সেটা স্কোয়াড দেখে বলা অনেকটা দুষ্কর। দিনে আশি ওভার (৪০-৪০) খেলা হবার পরে চার থেকে পাঁচ দিন পরেই উইকেট কেমন করে ইনিংসে ১২০ রানের উইকেট হয়ে যায় সেটা গত সিজন দেখার পরে কারো অজানা থাকার কথা না। এখানেও একটা ইতিবাচক গুজব কানে ভেসে আসছে। সেটা হচ্ছে সিজন থ্রির চাইতে এবারের খেলাগুলো আরো বেশি পিচে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। মোটামুটি শাফল করে ফ্রেশ পিচে খেলা হতে পারে এবার। যাই হোক মাঠে গড়ানোর আগ পর্যন্ত কোন কথা কানে নিয়ে নিজের আশা বাড়াতে চাই না। তবে স্কোয়াডের দিকে চোখ বুলিয়ে কয়েকটা স্পষ্ট জায়গা আছে যেখানে আস্তে আস্তে উঠতে থাকা বাংলাদেশের ক্রিকেটের ফলোয়ার হলে আপনার আগ্রহের থাকতে পারে। আজ বরং সেগুলো নিয়ে কথা বলি।

১) জাতীয় দলের ওরা কয়েকজন: ঢাকার স্কোয়াডের দিকে তাকালে সাকিব আল হাসানের বাইরে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের মধ্যে দুইজনের নাম চোখে পড়বে ভালোমতো। একজন নাসির হোসেন আর আরেকজন মোসাদ্দেক। জাতীয় দলে দুইজন একই স্পটের জন্যে একে আরেকজনের সাথে লড়ছেন। সামনের নিউজিল্যান্ড সিরিজে হয়তো সাকিবের বাইরে আরো দুইজন স্পিনিং অলরাউন্ডার বাংলাদেশ খেলাবে না। সেক্ষেত্রে একজন বাদ পড়তে পারেন আরেকজনের জন্যে। সামনের দিনগুলোয় বিপিএলে কে কাকে ছাড়িয়ে যান সেটা দেখার ইচ্ছে হচ্ছে খুব।

বিপিএল দিয়ে উত্থান ঘটা তাসকিন ইংল্যান্ড সিরিজে অনেক দরকারি সময়ে অনেকগুলো উইকেট নিয়েছেন। তবে নতুন বলে তাসকিনের বেধড়ক পিটুনি ও বাজে লাইন লেংথ চোখে এড়ায় নি কারো। চিটাগাং ভাইকিংসের বোলিং এর ঝান্ডা তাসকিনের হাতে। আশায় উন্মুখ সবাই। বরিশাল বুলস রেখে দিয়েছে গত সিজনের সবচেয়ে ভালো উইকেট টেকারদের একজন আলামিনকে। ইংল্যান্ড ওয়ানডে সিরিজে আলামিনকে টপকে শফিউল জায়গা পেলে কিছু কোয়েশ্চেন মার্ক এলেও দীর্ঘমেয়াদে আসল লড়াইটা এবার। লড়াইটা মাশরাফি-মুস্তাফিজের সাথে থার্ড পেসার হিসাবে দলে জায়গা পাকাপোক্ত করার। লড়াইটা চিটাগাং এর তাসকিন-খুলনার শফিউল আর বরিশাল বুলসের আলামিনের মধ্যে ত্রিমুখী। ত্রিমুখী বলেই জিভ কাটার পালা রংপুর রাইডার্সের রুবেলের কথা মনে পড়তেই। চার পেসারদের সবাই নিজেদের ছাড়িয়ে যাক।

২) ওরা উড়ার অপেক্ষায়: এই লিস্টে মেহেদী হাসান মিরাজের নাম থাকবে সবার আগে। রাজশাহী কিংসের মেহেদী মিরাজের পপুলারিটি হাইপমিটার দিয়ে মাপলে সাকিব বা মাশরাফিকে টপকে যাবার কথা। সবাই জানেন সাকিব বা মাশরাফি কী… কৌতুহলের জায়গাটা সেখানে কম। মিরাজকে নিয়ে এখন হাজার কারণে কৌতুহল, হাজারভাবে কৌতুহল। তাই আমার প্লেয়ার টু ওয়াচ লিস্টে মিরাজ থাকবে সাকিব-মাশরাফির চেয়েও উপরের দিকে। মিরাজ খেলছেন রাজশাহী কিংসের হয়ে।

একটা মিডিয়াম পেস অলরাউন্ডারের জন্যে অনেকদিনের আক্ষেপ। কখনো জিয়াকে দিয়ে, কখনো ফরহাদ রেজাকে দিয়ে চেষ্টা করে গেছি। খুঁজে পাই নি অটোচয়েজ। গেলো আন্ডার নাইন্টিন ওয়ার্ল্ড কাপে সাইফুদ্দিনের উপস্থিতি আশা জাগিয়েছিলো। আর ঐ দলটাতেই নাজমুল হাসান শান্ত নামের একজন বাঁহাতি টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানের পজিটিভ এটিচ্যুড চোখে লেগেছিলো। বেশ ভালো স্ট্রাইক রোটেট করার ব্যাপার ছিলো তার মধ্যে। দুইজনই কুমিল্লার হয়ে খেলবেন। অপেক্ষায় থাকবো ….

৩) ওরা দুজন ইনফর্ম: টিটোয়েন্টির সীল লাগা স্লগার থেকে দেশের সেরা টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের একজন! সাব্বিরের যাত্রার গল্পটা অন্য কারোর মতো নয়। শীর্ষ রান তোলায় আমার বাজি জানতে চাইলে আমি সাব্বিরের নাম বলবো। এশিয়া কাপ টি২০ তে শ্রীলংকার সাথে ঐ ইনিংসের পরে টুর্নামেন্টের সেরা প্লেয়ারের খেতাবটাও এলো। তারপরে ইংল্যান্ডের সাথে টেস্টের পথচলা শুরু। সাব্বির ক্যারিয়ারের সেরা সময় পাড়ি দিচ্ছেন কিনা জানি না। তবে ক্রিকেট ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ঘটনাবহুল একটা পর্যায় পাড়ি দিচ্ছেন সন্দেহ নেই। সাব্বিরের ভক্ত না হয়ে উপায় নেই। ওর শটগুলো বোলারের কনফিডেন্স কমিয়ে দেবার মতো। আমাকে যদি এখন জাদুশক্তি আর শর্ত দিয়ে কোন ওয়ানডে ম্যাচের আগে বলা হয়, বাংলাদেশ দলের যেকোন একজন ১০০ বল টিকবে, কয়েকদিন আগে হলেও মুশফিকের নাম বলতাম। কিন্তু সেই জায়গাটা এখন সাব্বিরের। ক্লাস, মাসল সবকিছুর খুব ভালো ব্লেন্ড।

ইংল্যান্ডের সাথে প্রথম ওয়ানডেতে ক্রিস ওকসের প্রথম ওভারে ছক্কা মারার পরেই নাকি বুঝেছিলেন বল তার ব্যাটে আসছে। পরে দারুন এক সেঞ্চুরি আসে সে ম্যাচেই। মহাকাব্যিক ঢাকা টেস্টের থার্ড ইনিংসে সবাই যখন সংগ্রাম করছিলো, প্রথম ৩০ বল খেলার পরে ইমরুলকে লাগছিলো পিচের সাথে দারুন পরিচিত। তিন বছর আগের ইমরুলের চেয়ে এখনকার জনের সবচেয়ে বড় পার্থক্যের জায়গা আত্মবিশ্বাস। কিছু কিছু সময় তামিমের মত ডাকাবুকো ব্যাটসম্যানকেও কিছুটা ম্লান মনে হয়। গত বিপিএলের আগে জাতীয় দলে আসা যাওয়ার প্রতিনিয়ত বৃত্তে বন্দী থাকা ওপেনারটি এই বিপিএলের আগে দুই ফরম্যাটেই তামিমের নিশ্চিত সঙ্গী। বিপিএলটা সেই আত্মবিশ্বাসটাতেই আরো গাঢ় রঙ লাগাবার সুযোগ দিচ্ছে ইমরুল কায়েসকে।

নিউজিল্যান্ডের সাথে কঠিন কন্ডিশনে টেস্ট খেলতে হবে। সেটা ভুলে যাচ্ছি। মাসের ১১ তারিখে ব্রাজিল আর্জেন্টিনা ম্যাচ। সেটাকে এই অপেক্ষার কয়েক ঘন্টার জন্যে দূরে সরিয়ে রাখছি। কারণ বিপিএলের অপেক্ষাটা কয়েক রঙের, কয়েক প্রস্থের। নতুন কোন সুপারস্টার পেয়ে যাবার আনন্দ কিংবা অলক কাপালির মত অপ্রত্যাশিতভাবে কাউকে শেষ দৃশ্যের নায়ক হিসেবে পেয়ে যাবার অপেক্ষা। বিপিএলের অপেক্ষা তাই কয়েকটা আলাদা আলাদা রঙের, আলাদা আলাদা প্রস্থের।

Squads:
ঢাকা ডায়নামাইটস
সাকিব আল হাসান (আইকন), নাসির হোসেন, মোসাদ্দেক হোসেন, সানজামুল ইসলাম, আলাউদ্দিন বাবু, সোহরাওয়ার্দী শুভ, মেহেদী মারুফ, মোহাম্মদ শহীদ, ইরফান শুক্কুর, তানভীর হায়দার।
বিদেশি খেলোয়াড়: কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে, সেকুগে প্রসন্ন (শ্রীলঙ্কা), আন্দ্রে রাসেল, ডোয়াইন ব্রাভো, এভিন লুইস (ওয়েস্ট ইন্ডিজ), রবি বোপারা (ইংল্যান্ড), ওয়েইন পারনেল (দক্ষিণ আফ্রিকা), উসামা মির (পাকিস্তান)।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস
মাশরাফি বিন মুর্তজা (আইকন), ইমরুল কায়েস, লিটন দাস, আল আমিন জু., নাজমুল হাসান শান্ত, নাহিদুল ইসলাম, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, মোহাম্মদ শরীফ, নাবিল সামাদ, জসিমউদ্দীন, সৈকত আলী, আবদুল্লাহ আল মামুন।
বিদেশি খেলোয়াড়: সোহেল তানভীর, ইমাদ ওয়াসিম, আহমেদ শেহজাদ, আসহার জাইদি, খালিদ লতিফ, শাহজাইব হাসান (পাকিস্তান), নুয়ান কুলাসেকারা (শ্রীলঙ্কা), রশিদ খান (আফগানিস্তান), জেসন হোল্ডার, রোভম্যান পাওয়েল (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)।
চিটাগং ভাইকিংস
তামিম ইকবাল (আইকন), তাসকিন আহমেদ, এনামুল হক, আবদুর রাজ্জাক, শুভাশিস রায়, জহুরুল ইসলাম, নাজমুল হোসেন মিলন, জাকির হাসান, সাকলাইন সজীব, শহীদুল ইসলাম, ইয়াসির আলী, জুবায়ের হোসেন।
বিদেশি খেলোয়াড়: ক্রিস গেইল (ওয়েস্ট ইন্ডিজ), ডোয়াইন স্মিথ (ওয়েস্ট ইন্ডিজ), শোয়েব মালিক, ইমরান খান জুনিয়র (পাকিস্তান), চতুরঙ্গা ডি সিলভা, জীবন মেন্ডিস (শ্রীলঙ্কা), মোহাম্মদ নবী (আফগানিস্তান), গ্রান্ট এলিয়ট (নিউজিল্যান্ড), টাইমাল মিলস (ইংল্যান্ড)।
খুলনা টাইটানস
মাহমুদউল্লাহ (আইকন), মোশাররফ রুবেল, শফিউল ইসলাম, শুভাগত হোম, আরিফুল হক, আবদুল মজিদ, অলক কাপালি, হাসানুজ্জামান, নাঈম ইসলাম জুনিয়র, নূর হোসেন সাদ্দাম, তাইবুর রহমান, আবদুল হালিম।
বিদেশি খেলোয়াড়: মোহাম্মদ আসগর, জুনাইদ খান (পাকিস্তান), বেনি হাওয়েল, রিকি ওয়েসেলস (ইংল্যান্ড), বেন লাফলিন (অস্ট্রেলিয়া), লেন্ডল সিমন্স, আন্দ্রে ফ্লেচার, নিকোলাস পুরান, কেভন কুপার (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)।
রাজশাহী কিংস
সাব্বির রহমান (আইকন), নুরুল হাসান, মেহেদী হাসান মিরাজ, মুমিনুল হক, ফরহাদ রেজা, নাজমুল ইসলাম, রকিবুল হাসান, আবুল হাসান, রনি তালুকদার, সালমান হোসেন, ইবাদত হোসেন ও দেলোয়ার হোসেন।
বিদেশি খেলোয়াড়: ড্যারেন স্যামি, কেসরিক উইলিয়ামস (ওয়েস্ট ইন্ডিজ), মোহাম্মদ সামি, উমর আকমল (পাকিস্তান), মিলিন্ডা সিরিবর্ধনা, উপুল থারাঙ্গা
(শ্রীলঙ্কা), সামিত প্যাটেল (ইংল্যান্ড)।
বরিশাল বুলস
মুশফিকুর রহিম (আইকন), আল আমিন হোসেন, তাইজুল ইসলাম, শামসুর রহমান, আবু হায়দার, কামরুল ইসলাম, নাদিফ চৌধুরী, মেহেদী হাসান, মনির হোসেন, শাহরিয়ার নাফীস, ধীমান ঘোষ, ফজলে রাব্বী, শাহিন হোসেন।
বিদেশি খেলোয়াড়: থিসারা পেরেরা, দিলশান মুনাবীরা (শ্রীলঙ্কা), মোহাম্মদ নওয়াজ, রুম্মান রায়েস খান (পাকিস্তান), কার্লোস ব্রাফেট, রায়াদ এমরিত (ওয়েস্ট ইন্ডিজ), জশুয়া কব (ইংল্যান্ড)।
রংপুর রাইডার্স
সৌম্য সরকার (আইকন), মোহাম্মদ মিঠুন, আরাফাত সানি, রুবেল হোসেন, সোহাগ গাজী, জিয়াউর রহমান, নাঈম ইসলাম, ইলিয়াস সানি, পিনাক ঘোষ, মুক্তার আলী, মেহরাব হোসেন জোসি, শাহবাজ চৌহান, জুপিটার ঘোষ।
বিদেশি খেলোয়াড়: শহীদ আফ্রিদি, শারজিল খান, বাবর আজম, নাসির জামশেদ (পাকিস্তান), মোহাম্মদ শেহজাদ (আফগানিস্তান), গিডরন পোপ (ওয়েস্ট ইন্ডিজ), রিচার্ড গ্লিসন (ইংল্যান্ড), দাসুন শানাকা, সচিত্র সেনানায়েকে, জিহান রুপাসিঙ্গে (শ্রীলঙ্কা)।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

ten − 9 =