শত্রুশিবির থেকে মিলানের কিস্তিমাত : লিওনার্দো বোনুচ্চি

এবারের দলবদলের বাজারে থামাথামির কোন লক্ষণই দেখাচ্ছেনা মিলান। চাইনিজ মালিকানার অধীনে একের পর এক সুপারস্টারকে কিনেই যাচ্ছে তারা। দলে এসেছেন ফ্র্যাঙ্ক কেসি, রিকার্ডো রড্রিগেজ, মাতেও মুসাচ্চিওহাকান চালহানোগলু, ফাবিও বোরিনি, অ্যান্দ্রেয়া কন্তিঅ্যান্দ্রে সিলভার মত তারকারা। সবাই-ই এখনকার সময়ের বেশ প্রতিষ্ঠিত নামকরা খেলোয়াড়। মূলত মুসাচ্চিও, রড্রিগেজকে এনে নিজেদের ডিফেন্সকে একরকম ঢেলেই সাজিয়েছে মিলান, রড্রিগেজ লেফটব্যাক আর মুসাচ্চিও সেন্টারব্যাক। তবে ডিফেন্সকে ঢেলে সাজানোর জন্য এবার যা করল মিলান, সেটার সাথে তাদের আগের এইসব দলবদলের কোন তুলনাই চলেনা! তর্কযোগ্যভাবে বর্তমান বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম সেন্টারব্যাককে যে দলে নিয়ে এসেছে তারা! তাও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইতালিয়ান চ্যাম্পিয়ন জুভেন্টাসের শিবির থেকে! ৩০ বছর বয়সী ইতালিয়ান সেন্টারব্যাক লিওনার্দো বোনুচ্চিকে মাত্র ৪২ মিলিয়ন ইউরোর (৩৬ মিলিয়ন পাউন্ড) বিনিময়ে শত্রুশিবির জুভেন্টাস থেকে ৫ বছরের চুক্তিতে দলে নিয়ে এসেছে এসি মিলান, বছরে ৭.৫ মিলিয়ন ইউরো করে বেতন পাবেন মিলানে বোনুচ্চি। ফলে ইতালিয়ান লিগের সবচেয়ে বেতন পাওয়া খেলোয়াড় হতে যাচ্ছেন বোনুচ্চি।

ট্রান্সফার ফি এর আগে ‘মাত্র’ বলতে হচ্ছে, কারণ যে দলবদলের বাজারে কাইল ওয়াকারের মত ডিফেন্ডার ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়ে বিক্রি হচ্ছে, রোমেলু লুকাকুর মত স্ট্রাইকারের দাম যেখানে ১০০ মিলিয়নের কোটা ছাড়াচ্ছে, সেখানে বিশ্বের সেরা এক সেন্টারব্যাককে মাত্র ৩৬ মিলিয়ন পাউন্ডে পাওয়া মানে ত পানির দামে পাওয়া! মানে সব দিক দিয়েই মিলানের কিস্তিমাত – বিশ্বের সেরা এক ডিফেন্ডারও দলে আসলো, সরাসরি শত্রু যে ক্লাব সেও দুর্বল হল, আর সেটা তারা করল একরকম পানির দামে!

কিন্তু এমন কি কারণ হতে পারে যার কারণে জুভেন্টাসের মত ক্লাব তাদের সরাসরি শত্রুর কাছে লিওনার্দো বোনুচ্চির মত ডিফেন্ডারকে, গত ছয়-ছয়বার জুভেন্টাসের স্কুডেট্টো জয়ের পেছনে যার অপরিসীম অবদান ছিল, এত কম মূল্যে ছেড়ে দিল? বাতাসে যেসব কারণ ভাসছে তাঁর মধ্যে খুবই উল্লেখযোগ্য দুটো কারণ হল –

১. লিওনার্দো বোনুচ্চির ছোট ছেলের অসুস্থতা। এটাকেই মানা হচ্ছে বোনুচ্চির ক্লাব ছাড়ার মূল কারণ। এই ছেলের অসুস্থতার কারণেই গত বছর ফুটবল খেলাই ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা করেছিলেন বোনুচ্চি। প্রায় নিয়মিত ছোট ছেলে মাত্তেও বোনুচ্চির চিকিৎসার জন্য মিলানের একটা শীর্ষস্থানীয় ক্লিনিকে যেতে হয় বোনুচ্চি ও তার পরিবারকে। তুরিন থেকে মিলানে বারবার যাওয়াটা বেশ ঝামেলার একটা বিষয়, তাই বোনুচ্চি যদি কাছাচকাছিই থাকেন কোথাও, তাহলে সন্তানের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সমস্যা হবেনা কোন। এই সমস্যাটার কথা বিবেচনা করেই মূলত জুভেন্টাস লিওনের্দো বোনুচ্চির দলবদলের অনুরোধটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছে, বেশী ঝামেলা করেনি।

২. দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বলা যায় জুভেন্টাস কোচ ম্যাসিমিলিয়ানো অ্যালেগ্রি ও স্ট্রাইকার পাওলো ডাইবালার সাথে বোনুচ্চির রেষারেষি। গত ফেব্রুয়ারীতে শৃংখলাজনিত কারণে পালের্মোর সাথে লিগ ম্যাচে বোনুচ্চিকে স্কোয়াডেই রাখেননি অ্যালেগ্রি। আর রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে হাফটাইমে ড্রেসিংরুমে সতীর্থ পাউলো ডাইবালা ও অ্যান্দ্রেয়া বারজাগলির সাথে তর্কাতর্কিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন বোনুচ্চি। ঐ ম্যাচে মাত্র ১২ মিনিটেই হলুদ কার্ড খাওয়া স্ট্রাইকার পাওলো ডাইবালা ভালোভাবে মাঠে খেলছেন না, সেদিন এই অভিযোগ ছিল বোনুচ্চির। পরে কোচ ম্যাসিমিলিয়ানো অ্যালেগ্রি ডাইবালার পক্ষ নিয়ে বোনুচ্চিকে থামতে বলেন। পরে রাইটব্যাক দানি আলভেস এসে বোনুচ্চির পক্ষ নেন। পরে আরেক ডিফেন্ডার অ্যান্দ্রেয়া বারজাগলি এসে পরিস্থিতি ঠান্ডা করার চেষ্টা করেন। এইসময় বোনুচ্চি বারজাগলিকে নিজের কাজে মন দেওয়ার জন্য একটু শাসিয়ে দেন, বলেন পুরো অর্ধে রিয়াল মাদ্রিদের লেফটব্যাক মার্সেলোর কাছে পাত্তা পায়নি বারজাগলি। এ কথা শোনার পর বারজাগলি ও বোনুচ্চির মধ্যে প্রায় হাতাহাতি লেগে যায়, যেটা থামাতে হয় কোচ অ্যালেগ্রিকে। এটাকেও মানা হচ্ছে একটা মূল কারণ হিসেবে, যার জন্য এই মৌসুমে আলভেস ও বোনুচ্চি, দুইজনকেই স্কোয়াড থেকে নিষ্কৃতি দান করল জুভেন্টাস।

যাই হোক, যে কারণেই হোক না কেন, থিয়াগো সিলভা যাওয়ার পর গত পাঁচ বছরের মধ্যে এই প্রথম একটা বিশ্বসেরা বল-প্লেয়িং সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার পেল এসি মিলান। সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন বলেই বোধহয় বল পায়ে বোনুচ্চি এতটা ভাল, পাস প্রদানে এতটা সফল। লং পাস থেকে আক্রমণ শুরু করার দায়িত্বটা সবসময় বোনুচ্চির হাতেই থাকে, এমনি এমনি-ই ত আর বোনুচ্চিকে ইতালির “ডিফেন্সিভ পিরলো” বা ‘ডিফেন্সিভ প্লেমেকার” বলা হয় না! গত ইউরোতে বেলজিয়ামের বিপক্ষে গ্রুপপর্বে ইতালির প্রথম ম্যাচে ইম্যানুয়েলে জ্যাক্কেরিনির গোলটার কথা মনে আছে কি? সেই গোলটার পাস কিন্তু এসেছিল এই লিওনার্দো বোনুচ্চির পা থেকেই! ডিফেন্স থেকে একেবারে উপরে উঠানো মাপা একটা বল ফেলেছিলেন জাক্কেরিনির পায়ে, বেলজিয়ান সেন্টারব্যাক টোবি অল্ডারওয়াইরেল্ডকে বোকা বানিয়ে, জ্যাক্কেরিনির গোল করতে সমস্যাই হয়নি পরে আর! অনেকের কাছে তিনি জুভেন্টাস কিংবদন্তী গায়েতানো চিরেয়ার নতুন রূপ। আবার অনেককে তিনি মনে করিয়ে দেন প্রখ্যাত জার্মান সুইপার ফ্র্যাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের কথা – যার সাথে মিলিয়ে বোনুচ্চিকে ডাকা হয় ‘বেকেনবোনুচ্চি’ বলে। হুটহাট ট্যাকলে যেতে নারাজ বোনুচ্চির সঠিক জায়গায় থাকার ক্ষমতা ও সঠিক সময় বল ইন্টারসেপ্ট করার ক্ষমতা এতটাই যে তাঁকে একরকম হুটহাট ট্যাকল করতেই হয়না, এখনকার দিনের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারদের মধ্যে এটা দেখাই যায়না বলতে গেলে। ১৯০ সেন্টিমিটার উচ্চতা আর ৮২ কেজি ওজনের এই ডিফেন্ডার খুব ভালোভাবেই জানেন নিজের ওজনের সর্বোচ্চ ব্যবহার কিভাবে করতে হয়, যে কারণে বাতাসে ভেসে আসা বলগুলো দখলে আনতেও তাঁর কোন সমস্যা হয়না।

মিলানে গিয়েই অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড পরছেন বোনুচ্চি, দেখা যাক নতুন অধিনায়ক মিলানকে আর কি কি উপহার দিতে পারেন!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

17 + twelve =