পরিচিত লিভারপুল, বিপন্ন লিভারপুল

এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগের গ্রুপপর্বের প্রথম রাউন্ডের ম্যাচ শুরু হয়েছে গত পরশু রাত থেকে। দীর্ঘ তিন বছর এ প্রতিযোগিতায় খেলতে না পারার পর গত রাতে আবারও অ্যানফিল্ডে চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচ খেলতে নেমেছিল লিভারপুল, পাঁচবার এই ট্রফি জেতার মাধ্যমে প্রতিযোগিতার অন্যতম সফল দল যারা। গত শনিবার লিগে ম্যানচেস্টার সিটির কাছে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত হবার পর কালকেও চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচে সেভিয়ার সাথে জয়শূণ্য থেকেছে তারা, ড্র করেছে ২-২ গোলে।

গত ছাব্বিশ বছর ধরে লিগ না জিততে পারা লিভারপুলকে কি আমরা এরকমই দেখছি না সবসময়? সবসময় তীরে এসে তরী ডোবার কারণে গত ছাব্বিশ বছরে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী অন্যান্য ইংলিশ ক্লাবের তুলনায় অনেক অনেক কম শিরোপা জিতেছে লিভারপুল কখনো ভুল ট্যাকটিকসের কারণে, নাহয় খেলোয়াড়দের ফর্মহীনতার কারণে, নাহয় ট্রান্সফার মার্কেটে ব্যর্থতার কারণে। কোন না কোন কারণে শিরোপা জয়ের আশার তীরে ডুববেই লিভারপুলের। এবারও এখন পর্যন্ত লিভারপুলের খেলা দেখে বেশ কিছু এরকম সমস্যাই চোখে পড়ছে যেসব সমস্যার আশু সমাধান না হলে এবারও বিভিন্ন প্রতিযোগিতা থেকে খালি হাতেই ঘরে ফিরতে হবে ইয়ুর্গেন ক্লপের বাহিনীকে।

  • ডিফেন্স

লিভারপুলের চিরশত্রু ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তী ম্যানেজার স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের একটা উক্তি আছে, “একটা ভালো আক্রমণভাগ আপনাকে ম্যাচ জেতাতে পারে, কিন্তু শিরোপা জেতানোর সামর্থ্য আছে শুধুমাত্র একটা ভালো রক্ষণভাগের”। লিভারপুলের সব সমস্যার সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন এটা, রক্ষণভাগ বা ডিফেন্স। সেই ড্যানিয়েল অ্যাগার-মার্টিন স্কার্টেলের সফল জুটির পর এখনও সেন্ট্রাল ডিফেন্সে একটা সফল জুটির জন্য হন্য হয়ে খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছে লিভারপুল। দলে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে এই মৌসুমে আছেন ক্যামেরুনিয়ান সেন্টারব্যাক জ্যল মাতিপ, ক্রোয়েশিয়ান সেন্টারব্যাক দেয়ান লভরেন। তাঁদের ব্যাকআপ হিসেবে দলে রাখা হয়েছে এস্তোনিয়ার সেন্টারব্যাক র‍্যাগনার ক্লাভান ও ইংলিশ তরুণ সেন্টারব্যাক জ্যো গোমেজকে।

ব্যস।

যে লিভারপুল এই মৌসুমে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ, লিগ কাপ, চ্যাম্পিয়নস লিগ প্রত্যেকটা প্রতিযোগিতা জয় করার আশা নিয়ে লড়বে, সে লিভারপুলের স্কোয়াডে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার মাত্র চারজন যার মধ্যে শুধুমাত্র জ্যল মাতিপকেই মোটামুটি বিশ্বমানের বলা যেতে পারে। জ্যো গোমেজের মধ্যে অনেক প্রতিভা থাকলেও এখনও বড় ম্যাচে পারফর্ম করার মত তাঁর ক্ষমতা হয়েছে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। ওদিকে এস্তোনিয়ার ইতিহাসের অন্যতম সফল খেলোয়াড় হওয়া সত্বেও প্রিমিয়ার লিগের গতিশীলতার সাথে ক্লাভান এখনও মানিয়ে নিতে পারেননি অত। তাই তাঁর পারফরম্যান্সের মধ্যেও কোন ধারাবাহিকতা নেই, একদিন অসাধারণ খেলেন তো পরের দিনই মাঠে খুঁজে পাওয়া যায় না তাঁকে।

বাকী থাকেন দেয়ান লভরেন।

ক্রোয়েশিয়ান এই সেন্টারব্যাক বর্তমানে জ্যল মাতিপের পাশাপাশি লিভারপুলের প্রথম পছন্দের সেন্টারব্যাক, কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ মাতিপ-লভরেন জুটিকেই বর্তমানে লিভারপুলের মূল সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ জুটি বানিয়েছেন। লিভারপুল সমর্থকদের কপাল খারাপ, তাই এই লভরেনকে দলের মূল সেন্টারব্যাক হিসেবে দেখা লাগে। প্রতি মুহূর্তে, প্রায় প্রতি ম্যাচে কোন না কোন হাস্যকর ভুল করে দলকে বিপত্তির মুখে ঠেলে দেওয়া এই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার নিয়মিত খেললে লিভারপুলের আদৌ কোনকিছু জয়ের আশা আছে বলে আমার মনে হয় না। এবারের দলবদলের বাজারে এই লভরেন জায়গায় সেন্ট্রাল ডিফেন্সের বামদিকটার মান উন্নত করার জন্য সাউদাম্পটনের ডাচ সেন্টারব্যাক ভার্জিল ভ্যান ডাইককে আনতে চেয়েছিল লিভারপুল, কিন্তু বহু কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করার পর শেষ পর্যন্ত লিভারপুলে ভ্যান ডাইককে যেতে দেয়নি সাউদাম্পটন। ওদিকে লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপও নিজের জেদ নিয়েই ছিলেন, ঘোষণা দিয়েছিলেন ভ্যান ডাইক না আসলে অন্য কোন ডিফেন্ডারকে দলে আনবেন না তিনি, যারা আছে তাদেরকে দিয়েই কাজ চালাবেন। সে অন্য কাহিনী। ফলে লিভারপুলের মূল সেন্টারব্যাক থেকে গেছেন মাতিপ, আর এই লভরেন। গতরাতে সেভিয়ার বিপক্ষে জেতা ম্যাচ ড্র করার কারণও এই লভরেন। বামদিক থেকে তেড়ে আসা সেভিয়ার লেফটব্যাক সার্জিও এসকুদেরোর মাটিঘেষা ক্রসটা লভরেন ক্লিয়ার করতে পারবেন না এ কথা বোধহয় কেউ কস্মিনকালেও কল্পনা করতে পারেননি। লভরেনের জায়গায় যদি এই আর্টিকেল লেখকের মত স্থুলকায় রোবটও থাকত, সেও সেই ক্রসটা লাথি দিয়ে সরাতে পারত বোধকরি। তেমনটাই ভেবেছিলেন হয়তো লিভারপুলের গোলরক্ষক লরিস ক্যারিয়াস কিংবা অন্যান্য লিভারপুলের খেলোয়াড়রা। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে দেখা গেল লভরেন লাথি মারলেন ঠিকই, কিন্তু লাথিটা বোধহয় তাঁর হেটারদের কল্পনা করেই দিয়েছিলেন বাতাসে, বলকে নয়। ফলে বলটা সুন্দরমত লভরেনের পায়ের নিচ দিয়ে পেছনে থাকা আগুয়ান সেভিয়ার ফরাসী স্ট্রাইকার উইসাম বেন ইয়েদেরের পায়ে গিয়ে আসলো, আর ডিবক্সের মধ্যে তুখোড় সুযোগসন্ধানী হিসেবে পরিচিত এই স্ট্রাইকার ক্যারিয়াসকে পরাস্ত করে গোল করতে ভুল করেননি মোটেও! ভুল করবেন কেন? সবাই তো আর লভরেন নন!

প্রতিমুহূর্তে লভরেনের একের পর এক ভুলের মাশুল দিতে হচ্ছে লিভারপুলকে

ক্রমাগত এরকম ভুল যদি হতে থাকে (যেটা কি না হচ্ছে) তাহলে এই মৌসুমেও কোনকিছু জিতার আশা ত্যাগ করাটাই উত্তম হবে লিভারপুল সমর্থকদের।

রাইটব্যাক হিসেবে দলে আছেন তিনজন ইংলিশ, ন্যাথানিয়েল ক্লাইন, জ্যো গোমেজ আর ট্রেন্ট-অ্যালেক্সান্ডার আরনল্ড। জ্যো গোমেজকে এইখানেও রাখা হয়েছে ব্যাকাপ হিসেবে। ন্যাথানিয়েল ক্লাইনের ইনজুরির কারণে লিভারপুলের মূল রাইটব্যাক এখন ট্রেন্ট অ্যালেক্সান্ডার-আরনল্ড। আর আরনল্ডের ব্যাকাপ? সেই গোমেজ! ভেবে দেখুন, কোন কারণে লিভারপুলের সেন্ট্রাল ডিফেন্স আর রাইটব্যাক পজিশানের কোন একজন যদি ইনজুরিগ্রস্থ হন, তাহলে কি হবে? রাইটব্যাক হিসেবে যদি অ্যালেক্সান্ডার আরনল্ড ইনজুরিতে পড়েন তাহলে গোমেজ ছাড়া ব্যাকাপ দেওয়ার কেউ নেই, আর গোমেজ যদি রাইটব্যাক চলে যান তাহলে সেন্টারব্যাক চারজন থেকে কমে দাঁড়াচ্ছে তিনজনে – মাতিপ, লভরেন আর ক্লাভান। আবার গোমেজের কিছু হলে আরনল্ডকে ব্যাকাপ দেওয়ার কেউ থাকবেন না, যে ভয়টাই সত্যি হয়েছে কালকে। সেভিয়ার সাথে ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়েছেন গোমেজ, তাই এখন দেখা যাবে অ্যালেক্সান্ডার-আরনল্ডের মত টিনএজারকেই লিগের পাশাপাশি চ্যাম্পিয়নস লিগেও রাইটব্যাকের ভূমিকা পালন করতে হবে, কারণ গোমেজ এখন সামনের তিন ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ থাকবেন, যেটা কিনা আর্নল্ডের মত অনভিজ্ঞ ডিফেন্ডারের জন্য অনেক বড় এক দায়িত্ব।

এবারে আসা যাক লেফটব্যাক পজিশানে। গত দুই মৌসুমে জঘন্যতম পারফর্ম করার পর এই মৌসুমে নিজেকে আবার খুঁজে পেয়েছেন স্প্যানিশ লেফটব্যাক আলবার্তো মোরেনো। সাথে তাঁর ব্যাকআপ হিসেবে এবার নিয়ে আসা হয়েছে স্কটিশ লেফটব্যাক অ্যান্ড্রিউ রবার্টসনকে, যিনি কিনা এই মৌসুমে এই পর্যন্ত শুধুমাত্র ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষেই খেলতে পেরেছেন, এবং সেই ম্যাচে ভালোও খেলেছেন। আর এদের দুইজনের যদি ব্যাকাপের প্রয়োজন হয়, সেক্ষেত্রে খেলতে পারেন গত মৌসুমের পুরোটাই লেফটব্যাক পজিশানে খেলে ঔজ্জ্বল্য ছড়ানো ইংলিশ মিডফিল্ডার জেইমস মিলনার। ফলে ডিফেন্সের এই জায়গাটায় লিভারপুলের চিন্তার মাত্রাটা একটু কম।

এই অনভিজ্ঞ ও ভুলে ভরা ডিফেন্সের কারণে প্রায় অনেক সময়েই দেখা যাচ্ছে আগে গোল করেও অগ্রগামিতা ধরে রেখে ম্যাচ শেষ করতে পারেনা লিভারপুল, প্রতিপক্ষ চাপ সৃষ্টি করে গোল দিয়েই দেয়। আর এই চাপেই ভেঙ্গে পড়ে লিভারপুলের ডিফেন্স। কালকের ম্যাচের কথা ভাবুন, দুই গোলে এগিয়ে থাকার পরেও সেভিয়ার চাপে পিষ্ট লিভারপুলের ডিফেন্স দ্বিতীয়ার্ধে মাত্র একটা ট্যাকল জিততে পেরেছে, মাত্র একটা! কিংবা এই মৌসুমে লিগের প্রথম ম্যাচের কথাই ভাবুন। ওয়াটফোর্ডের মত দলের সাথে ৩-২ গোলে এগিয়ে থাকার পরেও শেষ মুহূর্তে গোল খেয়ে ড্র করতে হয়েছে তাঁদের। অন্যান্য দল যেখানে আগে গোল খেয়ে বসলে সেটা কিভাবে শোধ করবে সে চিন্তায় থাকে, সেখানে লিভারপুলের চিন্তার জায়গা হল আগে গোল করেও লিড ধরে না রাখতে পারা। আর এই সমস্যটা শুরু এই মৌসুমেই না, বহুদিন থেকেই। ক্লপের প্রথম মৌসুমে নিজেদের মাঠে সাতটা ম্যাচে ড্র করে লিভারপুল, এদের মধ্যে ছয়টাতেই তারা আগে গোল করেছিল। ডিফেন্স চাপে ভেঙ্গে না পড়ে যদি অগ্রগামিতাটা তারা ধরে রাখতে পারত তাহলে ঐ পাঁচ ম্যাচে পাঁচ পয়েন্ট না, পেত পনের পয়েন্ট, দশ পয়েন্ট বেশী পেত। বিরক্তির বিষয় হল এসব ড্র করা প্রতিপক্ষের মধ্যে সান্ডারল্যান্ড বা নিউক্যাসলের মত প্রতিপক্ষই বেশী ছিল। গত মৌসুমেও অবস্থার বিশেষ কোন পরিবর্তন হয়নি। জেতা অবস্থান থেকে গত মৌসুমে ১৮ পয়েন্ট হারিয়েছে লিভারপুল গত মৌসুমে।

আঠারো।

যে দল শিরোপা জিততে চায় তাঁদের ডিফেন্সের অবস্থা এরকম হলে চলেনা।

  • মিডফিল্ডের সুযোগ সৃষ্টিতে অক্ষমতা

লিভারপুলের ৪-৩-৩ ফর্মেশানের মূল তিন মিডফিল্ডার এখন অধিনায়ক জর্ডান হেন্ডারসন, এমরে চ্যান ও জর্জিনিও ভাইনাল্ডাম। বলতে বাধা নেই, তিনজনই মূলত একই স্টাইলের মিডফিল্ডার, বক্স-টু-বক্স দৌড়াতে পছন্দ করেন, ডিবক্সের সামনে গিয়ে শট নিয়ে আগ্রহী। ইঞ্জিনের মত প্রচুর দৌড়াতে তিনজনই।

তিনজনের মিডফিল্ড সবচেয়ে ভালো কাজ করে তখনই যখন তিনজনের একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার থাকেন, যার পাস দেওয়ার চেয়ে ট্যাকল বা ইন্টারসেপ্ট/বল কেড়ে নেওয়ার দিকেই আগ্রহ বেশী, দুই সেন্টারব্যাকের মাঝে থেকে যার কাজ হয় ডিফেন্সকে রক্ষা করা। যাদেরকে ডেস্ট্রয়্যারও বলা হয়ে থাকে। বর্তমানে এই ক্যাটাগরির সবচেয়ে আদর্শ মিডফিল্ডার রিয়াল ম্যাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার ক্যাসেমিরো, বার্সেলোনার স্প্যানিশ মাস্টার সার্জিও বুসকেটস, চেলসির ফরাসী মিডফিল্ডার এনগোলো কান্তে ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সার্বিয়ান মিডফিল্ডার নেমানিয়া মাতিচ। দুর্ভাগ্যবশত আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার হ্যাভিয়ার ম্যাশচেরানো বার্সেলোনাতে চলে যাওয়ার পর এই ক্যাটাগরির কোন ভালো মিডফিল্ডার লিভারপুলে খেলেননি। লুকাস লেইভা যা একটু ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ছিলেন, তাকেও এই মৌসুমে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে লাৎসিওর কাছে। বাকী দুইজনের একজন বা দুইজন থাকতে পারেন বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার, যার কাজ হল বলের জন্য পুরো মাঠ দৌড়ে বেড়ানো, বল পায়ে থাকলে আক্রমণের জন্য ও বল পায়ে না থাকলে বল কেড়ে নেওয়ার জন্য, এদের অন্যতম কাজ হল ডিবক্সের সামনে গেলেই গোলমুখে শট করা। হেন্ডারসন-চ্যান-ভাইনাল্ডাম ; তিনজনই মূলত এই ক্যাটাগরির মিডফিল্ডার আর এই ক্যাটাগরির মিডফিল্ডারের আদর্শ উদাহরণ হলেন বায়ার্ন মিউনিখের চিলিয়ান মিডফিল্ডার আর্তুরো ভিদাল, ম্যানচেস্টার সিটির ইয়ায়া ত্যুরে, এএস রোমার বেলজিয়ান মিডফিল্ডার রাজ্জা নাইঙ্গোলান ও চেলসির তিমুইয়ে বাকায়োকো। আর বাকীজনকে হতে হয় পাস মাস্টার, যিনি কিনা মিডফিল্ডে থেকে মাঝমাঠ থেকেই খেলাটা গড়ে দিতে পারেন। কিছুকাল আগে স্পেইনের জাভি হার্নান্দেজ, ইতালির অ্যান্দ্রেয়া পিরলো ও স্পেইনের জাবি আলোনসো যেরকম মিডফিল্ডার ছিলেন আরকি। এখন এই ভূমিকায় সবচেয়ে অভিজ্ঞ হলেন রিয়াল মাদ্রিদের লুকা মডরিচ, বায়ার্ন মিউনিখের থিয়াগো আলকানতারা, জুভেন্টাসের মিরালেম পিয়ানিচ। গালভরা একটা নামও আছে এই পজিশানের, “ডিপ লায়িং প্লেমেকার”, দুর্ভাগ্যবশত এই ক্ষেত্রেও জাবি আলোনসো চলে যাওয়ার পর সেরকম কেউই আসেননি লিভারপুলে।

লিভারপুলের মিডফিল্ডারদের মধ্যে ৪-৩-৩ ফর্মেশানে কারোর যদি এরকম মিডফিল্ড থেকেই খেলা বানিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা থাকে, তিনি হলেন ইংলিশ মিডফিল্ডার অ্যাডাম লালানা। যিনি কিনা এখন ইনজুরির কারণে মাঠের বাইরে। লালানা না থাকার কারণে লিভারপুলের তিনজন মিডফিল্ডারের প্রত্যেকেই হয়ে গেছেন একই ধরণের ; বক্স-টু-বক্স। ইয়ুর্গেন ক্লপ গত দুই মৌসুম ধরে হয় অধিনায়ক জর্ডান হেন্ডারসন, নাহয় ডাচ মিডফিল্ডার জর্জিনিও ভাইনাল্ডামকে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বানাতে চাচ্ছেন, কিন্তু পারছেন না। গতকালকের ম্যাচটাই দেখুন, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে হেন্ডারসনের কাজ হওয়া উচিত ছিল দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার মাতিপ-লভরেনের মাঝে থেকে ডিফেন্সকে রক্ষা করা। কিন্তু সেভিয়ার দ্বিতীয় গোলটা দেখার পর স্পষ্টত বোঝা গেছে হেন্ডারসন সেই পজিশানেই ছিলেন না! ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের ভূমিকা থাকে দুইপাশ থেকে দুই ফুলব্যাক উপরে উঠে গেলে তাঁদের জায়গায় ডিফেন্সকে রক্ষা করা, দুইপাশ থেকে গ্যোমেজ/আলেক্সান্ডার-আরনল্ড আর আলবার্তো মরেনো দুইজনই আক্রমণাত্মক ফুলব্যাক হবার কারণে লিভারপুলের একজন আদর্শ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের অভাবটা চোখে পড়ে আরও বেশী। আর সে অভাবটা হেন্ডারসন পূরণ করতে পারছেন না, যতই তাঁকে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বানানোর চেষ্টা করা হোক না কেন। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলতে গিয়ে লং পাস দেওয়ার যখনই চেষ্টা করেছেন কালকে, সফল হননি। বাকী দুইজনের মধ্যে (ভাইনাল্ডাম ও চ্যান) সেরকম খেলা বানিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা নেই। এই সমস্যাটার কারণেই কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ ফিলিপ্পে কউতিনহোকে বাম উইং থেকে সরিয়ে তিন মিডফিল্ডারের এক মিডফিল্ডার বানাতে চান, ফলে যাতে মিডফিল্ড ও আক্রমণের মধ্যে একটা যোগ থাকে। চ্যান-ভাইনাল্ডাম-হেন্ডারসন একসাথে খেললে যে যোগাযোগটা থাকেনা, তিন মিডফিল্ডারের সুযোগ সৃষ্টির অক্ষমতার জন্য। কিন্তু গোটা দলবদলের বাজারে কউতিনহো বার্সা যাবেন নাকি যাবেন না, সে নিয়ে যে নাটকীয়তা হয়েছে, সে কারণে কউতিনহোকে ভালোভাবে নিজের পরিকল্পনাতেই এখনও আনতে পারেননি ক্লপ। যেটা একটা সমস্যা।

  • ক্লপের গোঁয়ার্তুমি

বর্তমান ফুটবল বিশ্বের অন্যতম দক্ষ ও হাই-প্রোফাইল ম্যানেজার ইয়ুর্গেন ক্লপ। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁর জেদ লিভারপুলকে ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যেমন দলবদলের বাজারের কথাই চিন্তা করুন। এবারে ক্লপের মূল লক্ষ্য ছিল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার পজিশানে জার্মান ক্লাব রেড বুল লাইপজিগের গিনিয়ান মিডফিল্ডার নাবি কেইটা, সাউদাম্পটনের ডাচ মিডফিল্ডার ভার্জিল ভ্যান ডাইক ও এএস রোমার মিশরীয় উইঙ্গার মোহামেদ সালাহকে দলে নিয়ে আসা। এই তিনজনের মধ্যে শুধু সালাহই দলে এসেছেন। নাবি কেইটাকে এই মৌসুমে না আনতে পারলেও লাইপজিগের সাথে লিভারপুলের চুক্তি হয়ে আছে কেইটা সামনের মৌসুম থেকে লিভারপুলে খেলবেন। আর ভার্জিল ভ্যান ডাইককে পাওয়াই হয়নি লিভারপুলের। বিরক্তিকর জিনিস হল এই প্রত্যেকটা ট্রান্সফার টার্গেটকে না পাওয়া গেলে কাকে কেনা হবে, সেরকম কোন “প্ল্যান বি” ছিল না লিভারপুলের, ক্লপ জেদ ধরে বসেছিলেন আসলে হয় এই তিনজনই আসবেন, নাহয় এই তিন পজিশানে আর কেউ আসবেন না। ফলে ভ্যান ডাইক বা কেইটার জায়গায় এই মৌসুমে কেউ আসেনি, লিভারপুলের স্কোয়াডের মানও বাড়েনি সেসব জায়গায়। যেটার জন্য ভোগান্তি শুরু হয়েছে লিভারপুলের।

ক্লপের জেদের আরেকটা নমুনা দেখা যায় তাঁর ট্যাকটিকসের ক্ষেত্রেও। অন্যান্য ম্যানেজারদের ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রতিপক্ষ অনুপাতে ফর্মেশান বা মূল একাদশ পরিবর্তন করেন। গার্দিওলার কথাই দেখা যাক। প্রতিপক্ষ অনুপাতে ৩-৫-২, ৩-৪-৩, ৪-৪-২, ৪-২-৩-১, ৪-৩-৩ সব ফর্মেশানেই খেলাচ্ছেন দলকে। মরিনহো প্রতিপক্ষ দেখে কখনো দলকে বানাচ্ছেন আক্রমণাত্মক কখনো রক্ষণাত্মক। কিন্তু ক্লপ এক্ষেত্রে ভিন্ন। কখনো নিজের আক্রমণাত্মক স্টাইলের সাথে আপস করেন না তিনি। সবসময় ৪-৩-৩ ফর্মেশানেই থাকতে চান তিনি। আক্রমণের বাইরে কথা বলেন না। এ সপ্তাহে ম্যানচেস্টার সিটির সাথে ম্যাচটাই দেখুন। গার্দিওলা মিডফিল্ডে পাচজনকে রেখে ৩-৫-২ ফর্মেশানে দলকে খেলালেও ক্লপ নিজের দলকে খেলিয়েছেন ৪-৩-৩ ফর্মেশানেই, ফলে ম্যানচেস্টার সিটির পাঁচজনের বিপক্ষে লিভারপুলের মিডফিল্ডে ছিলেন তিনজন ; যথারীতি চ্যান-ভাইনাল্ডাম আর হেন্ডারসন। আর ওদিকে গার্দিওলার মতাদর্শ অনুযায়ী সিটির মিডফিল্ডে পাঁচজন তো ছিলেনই, পাঁচজনই ছিলেন বল পায়ে সেরকম দক্ষ মিডফিল্ডার। ফলে একেবারে নাকানিচুবানি খেয়েছে লিভারপুল। ক্লপের ট্যাকটিকসের সমস্যা এটাই। যেদিন কাজে লাগবে সেদিন প্রতিপক্ষকে ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে লিভারপুল, আর যেদিন লাগবেনা ; সেদিন নিজেরাই ছিঁড়েখুঁড়ে যাবে।

এই সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে লিভারপুলের কোন ধরণের শিরোপা জেতার আশা না করাই উচিত।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

thirteen − five =